সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০
সোমবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আগে পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে
প্রকাশ: ১১:২৮ pm ০৭-০৮-২০২০ হালনাগাদ: ১১:২৮ pm ০৭-০৮-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক

গত ২২ জুলাই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বক্তব্য থেকে যা জেনেছি- ইমরান খান সাহেব আমাদের করোনাভাইরাস এবং বন্যা পরিস্থিতি জানতে চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্বে এ ধরনের সৌজন্যমূলক টেলিফোন আলাপ অত্যন্ত স্বাভাবিক যা সচরাচর হয়ে থাকে। দুদিন আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রীও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছেন, অতীতে বহুবার ফোন করেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতীসংঘ প্রধান এবং মার্কিন পরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কিন্তু তারপরেও ইমরান খানের ওই টেলিফোন বেশ কৌতূহল এবং কিছুটা উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। এর মূল কারণ আমাদের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতার পরেও পাকিস্তান তার নির্লজ্জ অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে দাঁড়ায়নি। বহু ঘটনা এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় তা হলো এই যে, পাকিস্তান এখনো মনস্তাত্ত্বিকভাবে স্বাধীন, ধর্মনিরেপক্ষ, অসম্প্রাদায়িক বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি, এদেশে তাদের চরদের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করার প্রচেষ্টায় সদা মগ্ন। জনমনে উৎকন্ঠা এ কারণে যে, ৭১-এ গণহত্যার অন্যতম কসাই জেনারেল নিয়াজীর জ্ঞাতিগোষ্ঠী ইমরান খানের কোনো অঘোষিত মতলব ছিল কিনা? ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যায় যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে যারা মনে করেন, তাদের দাবির পেছনে অকাট্য যুক্তি রয়েছে।

প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক স্ট্যানলি উলপার্ট তার পুস্তকে এই মর্মে তথ্য দিয়েছেন যে, আমাদের স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে কট্টর বঙ্গবন্ধু বিরোধিদের সাথে সে সময়ে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো যোগাযোগ রাখতেন, যে তথ্যটি বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত বহন করে। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ খুনিদের অন্যতম কর্নেল ফারুক স্বাধীনতার মাত্র তিন দিন পূর্বে বাংলাদেশে পৌঁছেছিলেন, যদিও তিনি বিদেশে এক পাকিস্তানি দূতাবাসে চাকুরিরত ছিলেন বিধায় যথাসময়ে তার বাংলাদেশে আসতে কোন বাধা ছিল না। এ ঘটনা যা ইঙ্গিত করছে তা হলো খুনি কর্নেল ফারুক এবং আরেক খুনি কর্নেল রশিদকে পাকিস্তানের সামরিক শাসকরাই বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে, যা তারা পালন করেছিল। উল্লেখ্য যে, কর্নেল ফারুক আদালতে দেয়া হলফনামায় বলেছিল সে বাংলা জানে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর খুনি সরকারকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি দেওয়াকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার অবকাশ নেই। এতো বিদ্যুৎ বেগে অন্য দেশের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘটনাও নজিরবিহীন। এর পেছনে পূর্বপরিকল্পনা ছিল বলে যারা মনে করেন, তাদের যুক্তি বেশ শক্তিশালী। ভুট্টো সাহেব শুধু স্বীকৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি বলেছিলেন, “স্বতস্ফূর্ততার বহিপ্রকাশ হিসাবে পাকিস্তান অতি শীঘ্রই বাংলাদেশকে ৫০ হাজার টন চাল, ১ কোটি গজ মোটা এবং ৫০ লক্ষ গজ মোটা মিহি কাপড় পাঠাবে এবং ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য তৃতীয় বিশ্ব ও ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি”।

৭৫-এর ২৪ অগাস্ট পাকিস্তানের অতি প্রতাপশালী ডন পত্রিকায় লেখা হয়, “শেখ মুজিব হত্যার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ভুট্টো মুসলিম দেশগুলোর কাছে জরুরি তারবার্তায় বাংলাদেশের মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ জানায়। পাকিস্তান গোয়েন্দা সার্ভিস থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল খাজা খায়েরউদ্দিনকে (ঢাকার নবাব পরিবারের উর্দুভাষী নেতা এবং তখন পাকিস্তানে পলাতক) বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট করার। ভুট্টোর সঙ্গে খয়েরউদ্দিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।” পাকিস্তান সরকারের করাচি রেডিও ১৭ অগাস্ট বলে, “বাংলাদেশের নতুন সরকারের ইসলামিক আদর্শের নীতিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং এ বিষযের উপর ভিত্তি করেই পাকিস্তান তাৎক্ষণিক ভাবে ‘ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ’কে স্বীকৃতি দিয়েছে” প্রভাবশালী নওয়া-ই-ওয়াক্ত পত্রিকা ১৬ অগাস্টের সম্পাদকীয়তে এই মর্মে পরামর্শ দেয় যেন, বাংলাদেশকে পাকিস্তানের সাথে একত্রিত করে দেশের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ রাখা হয়। সরকারি পাকিস্তান রেডিও ১৭ অগাস্ট ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য ইসলামিক রাষ্ট্রসমূহের কাছে পাকিস্তানের অনুরোধের প্রশংসা করে। ১৫ অক্টোবর ফরাসির লা ফিগারো পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভুট্টো পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের সাথে কনফেডারেশনের পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

পঁচাত্তরের ১৮ এপ্রিল কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ভুট্টো বলেছিলেন উপমহাদেশে শিগগিরই কিছু পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। ভুট্টোর সেই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার বলা যায় ভুট্টোই সেই পরির্বতনে চাবিকাঠি ছিলেন অথবা এটি তিনি জানতেন। এর দুই মাসের মধ্যেই ভুট্টো এক বিরাট প্রতিনিধিদল নিয়ে বাংলাদেশে গেলে বঙ্গভবনের ভোজসভায় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা টাকা দাবি করলে ভুট্টো নির্লজ্জের মতো বলেছিলেন, ‘আমি ব্যাংক চেক নিয়ে আসিনি’।

তখন ৭১-এর গণহত্যার কথাও তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি জেনারেল রাও ফলমান আলীর ডায়েরির কয়টি পৃষ্ঠাও দিয়েছিলেন ভুট্টোর হাতে। সেখানে ফরমান আলী লিখেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানকে রক্তে লাল করে দেওয়া হবে। বাংলাদেশে ভুট্টো সফর সঙ্গী হিসেবে আসা একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক পাকিস্তানে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন, “বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের সম্ভবনা আছে”।

পাকিস্তানের আর এক সাংবাদিক জেড এ সুলেরি বলেছিলেন, “শেখ মুজিব যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না”। ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ লন্ডনের প্রাচীনতম বাংলা পত্রিকা, জনমতে (১৯৭৮ সন থেকে কয়েক বছরের জন্য আমি যে পত্রিকার একক মালিক ছিলাম) যে খবর প্রকাশিত হয় তা ছিল- “বাংলাদেশ থেকে পলাতক এবং ভুট্টোর মন্ত্রিসভার বাঙালি সদস্য মাহমুদ আলী এখন লন্ডনে। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে মুজিব সরকারবিরোধী তৎপরতা গড়ে তোলার জন্য তাকে লন্ডনে পাঠানো হয়। পাকিস্তানি দূতাবাসের অর্থ সাহায্য বাংলাদেশ বিরোধী বাঙ্গালীদের দ্বারা দুটো সাপ্তাহিক কাগজ লন্ডনে বের করা হয়েছে”।

জনমতের পরবর্তী সংখ্যায় লেখা হয় “আজ পূর্ব লন্ডনে মাহমুদ আলী কিছু বাঙালিকে নিয়ে একটি সভা করেন। সভায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে মীরজাফর বলে অবিহিত করেন।” আমি তখন লন্ডনে। এ সভার পরপরই লন্ডনে প্রবাসী কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বাঙালি ব্যারিস্টারের সমন্বয়ে ‘ইস্ট পাকিস্তান গভর্মেন্ট ইন একজাইল’ গঠন করা হয়, যাদের কর্মকাণ্ড ছিল বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেয়ার তৎপরতা।

১৯৭৫-এর ৩০ জানুয়ারিতে ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর সাংবাদিক স্টকওয়েল আব্দুল গফফার চৌধুরী সাহেবকে বলেন “আমেরিকার প্রশাসন বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করতে চায়। তারাও এবার চরম আঘাত হানতে চাইবে। আর এ কাজ সফল করার জন্য এগিয়ে যেতে হাতের পাঁচ পাকিস্তান তো প্রস্তুত হয়েই আছে”। বঙ্গবন্ধু হত্যার দিনই বিবিসি বলে, “অভ্যুত্থানের ফলে বাংলাদেশ তার অফিসিয়াল নামে পরিবর্তন এনে নতুন নাম দিয়েছে ‘দ্য ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ”। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই মোশতাক ভুট্টোকে পাঠানো বার্তায় বলেন, তিনি অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের নব দিগন্তের দিকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেই ভুট্টো উঠেপড়ে লেগে যান বঙ্গবন্ধুর ঘাতক সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোকে প্রভাবিত করার কাজে। ভুট্টোর প্রচেষ্টায় সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম রাষ্ট্র তড়িৎ ১৫ অগাস্ট পরবর্তী সরকারকে তথাকথিত স্বীকৃতি প্রদান করে, যা তারা পূর্বে করেনি। যে চীন মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, সে দেশটিও বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৬ দিন পর ঘাতক সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। ভুট্টোর সহায়তায় কয়েকজন খুনিকে লিবিয়ায় পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

১৯৭৫-এর ১৬ অগাস্ট যুক্তরাজ্যর ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার করাচিতে কর্মরত সংবাদদাতা পাকিস্তান থেকে পাঠানো সংবাদে লেখেন, “বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে কূটনীতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য অযাচিতভাবে দ্বার উম্মুক্ত হলো”। ১৯৭৫-এর ১৮ অগাস্ট ডেইলি টেলিগ্রাফের ঢাকাস্থ সংবাদদাতা একটি প্রতিবেদন পাঠান যার শিরোনাম ছিল- “পাকিস্তান ট্রেইন্ড ট্রপস লেড বাংলাদেশ ক্যু” (পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যরাই বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়াছে)। ২০ অগাস্ট জামায়াতে ইসলামীর লন্ডনভিত্তিক মিল্লাত পত্রিকা এই মর্মে লেখে যে, বঙ্গবন্ধু হত্যায় ভুট্টোর হাত আছে। এ খবর প্রকাশের পর পাকিস্তান খুব বিব্রত হয়ে পড়ে।

এগুলো দূর অতীতের কথা। কিন্তু পাকিস্তানের মনোজগতে পরবর্তী বছরগুলোতেও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তারা সেই আগের মতোই স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতা মানতে নারাজ। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে ২০১৩ সালে পাকিস্তান পালার্মেন্টে যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার জন্য বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা। ওই নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গণঘাতক নিয়াজীর জ্ঞাতিগোষ্ঠী ইমরান খানের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান এবং সরব, যদিও তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংসদ। বলাবাহুল্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে পাকিস্তান পার্লামেন্টে এই ধরনের প্রস্তাব আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নগ্ন লংঘন। পাকিস্তান পার্লামেন্টে আলোচনার সময় যুদ্ধাপরাধীদের পাকিস্তানের নিজের লোক এবং দেশপ্রেমিক বলে আখ্যায়িত করে পাকিস্তান নির্লজ্জ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, যার জন্যও তাকে আলাদা করে ক্ষমা চাইতে হবে। বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিম বহুবছর ধরে পাকিস্তানে জামাই আদরে বসবাস করছে, তাকে ফেরত দিতে হবে।

ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাস কূটনীতির বিধান, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদ লংঘন করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকাশ্য এবং গোপন ভূমিকা রেখে আসছে। বিএনপি-জামাতের পক্ষে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ২০০০ সালে নির্বাচনের খরচ মেটানোর জন্য প্রচুর অর্থ প্রদানের কথা পাকিস্তানের আদালতে পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রধান শুধু স্বীকারই করেননি, তিনি বলেছিলেন পাকিস্তানের স্বার্থেই এই টাকা বিএনপি-জামাতকে দেয়া প্রয়োজন ছিল। এই খবর পাকিস্তানের গণমাধ্যমে ব্যাপক ভাবে প্রচারিত। ২০০০ সালে ঢাকায় কর্মরত পাকিস্তানের উপরাষ্ট্রদূত ইরফান রাজা ঢাকায় বসে প্রকাশ্যেই ৭১-এর রাজাকারদের সমর্থনে বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন, ৭১-এ আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরাই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং ৭১-এ শহীদদের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার। তার ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের জন্য তাকে অবাঞ্চিত ব্যক্তি বলে ঘোষণার পর বহু নাটক দেখিয়ে অবশেষে ২০০০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলার সময়ে পাকিস্তান দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশে জঙ্গিদের সাথে দূতাবাস ভবনেই বৈঠক করলে তা আমাদের গোয়েন্দাদের নজরে আসে এবং পরবর্তীতে তাকেও বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। কাছাকাছি সময়েই পাকিস্তান দূতাবাসের এক জৈষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে প্রচুর পরিমাণ নকল ভারতীয় মুদ্রার থাকার কথা প্রকাশ পায়, যে নকল অর্থ তিনি ভারতে পাঠিয়ে ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করছিলেন।

ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস যেভাবে প্রকাশ্যে আমাদের দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছিল এবং ঢাকার দূতাবাসকে প্রতিবেশী দেশের ক্ষতি করার জন্য ব্যবহার করছিল, ভবিষ্যতে যেন তা আর না হয় সে নিশ্চয়তা পাকিস্তান থেকে আদায় করতে হবে। এই ধরনের সম্ভাবনা এখন আরোও বেশি কেননা মূলত মৈত্রিহীন রাষ্ট্র চীনের দুটি মৈত্রীর একটি হচ্ছে পাকিস্তান, আর ভারতের সাথে উভয় দেশের সম্পর্কই বৈরিতাপূর্ণ।

বতমানে চীনের আশেপাশে উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান ছাড়া এই অঞ্চলে চীনের কোনও মিত্র নেই, শত্রু অনেক। চীনের বিরুদ্ধে তার প্রতিবেশীদের বৈরিতার মূল কারণ চীনের আগ্রাসী ভূমিকা। চীন আন্তর্জাতিক সমুদ্র কনভেনশন ভঙ্গ করে দক্ষিণ চীন সাগরের একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করায় এবং বহু দ্বীপের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় ২০টি দেশের সাথে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। চীন সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে ভারত আক্রমণ করেছে। বন্ধুহীন চীন এখন তাদের আগ্রাসী নীতি চালিয়ে যাওয়ার জন্য নিরলসভাবে বিভিন্ন দেশকে বিভিন্ন ভাবে অর্থঋণে জর্জরিত করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, যে ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। ঢাকাস্থ পাকিস্তান দূতাবাসকে এর আগেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার এবং ভারতের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপের দুর্গ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছে। তাই আগামীতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে পাকিস্তান লিপ্ত হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? তার মাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এ জন্য যে, চীন ভারতকে কোণঠাসা করার জন্য ব্যস্ত আর পাকিস্তান হচ্ছে চীনের শ্রেষ্ঠতম বন্ধু এবং পাকিস্তান দূতাবাস হচ্ছে এই কাজ করার সবচেয়ে নিরাপদ এবং ফলপ্রসূ স্থান। সম্প্রতি চীন এবং পাকিস্তান গোপনে জীবাণু অস্ত্র তৈরির পরীক্ষাগার পাকিস্তানে স্থাপনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। সে ধরনের জীবাণু যাতে তারা আমাদের দেশে আনতে না পারে সে দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে।

যে দেশ ৭১-এ ৩০ লাখ (হিন্দু, মুলসমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান) লোককে হত্যা করেছে বাংলাদেশে, তার আগে গণহত্যা করেছে বেলুচিস্তানে, এখনো করছে পাখতুনিস্তান, সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানে, তাদের কাশ্মিরের ব্যাপারে কিছু বলার অধিকার আছে কিনা সেটা একটি যৌক্তিক প্রশ্ন বটে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী গুম, অপহরণ, হত্যা এবং যৌন নির্যাতন করেছেন বলে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। ২০১৯-এর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে পাকিস্তানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয় নাই।

পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী অধ্যাপক পারভেজ হুদা ভাই সম্প্রতি করাচিতে বসেই এক সেমিনারে বলেন, “পাকিস্তান একটি বিভ্রান্ত দেশ, যে দেশ বাংলাদেশের মুসলমানদের নিম্নবর্ণের মানুষ মনে করে, বেলুস্তান, সিন্ধু এবং পাস্তুনদের নির্যাতন করছে।” সম্প্রতি মনজুর পাস্তুনকে গ্রেপ্তার করে পাস্তুনদের দাবি ভুলুণ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। উল্লেখ্য আইয়ুব খানও তার গ্রন্থ “ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস”-এ বাঙালি মুসলমানদের নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বংশধর বলে উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে পাকিস্তান আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত একটি দেশ, চীন ছাড়া এই অঞ্চলে যার কোনও বন্ধু নেই। তাই বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা। কিন্তু তার আগে গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়া, আমাদের পাওনা টাকা সুদসহ ফেরত দেওয়া, শহীদ ও নির্যাতিত পরিবারসমূহকে ক্ষতিপূরণ প্রদান, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধে বাংলাদেশের যে ধ্বংস তারা করেছে তার জন্য ক্ষতিপূরণ, বিহারীদের ফিরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি দায়িত্বসমূহ অবশ্যই পালন করতে হবে। যে দাবিগুলো বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে বঙ্গবন্ধু ঘাতকরা কোনোদিনও তোলে নাই। তাদের দূতাবাসকে বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী কোনো দেশের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্বক কাজে ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। তার আগে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা জাতি মেনে নেবে না।

জিন জিয়াং এলাকায় চীন অভিনব কায়দায় উইঘুর মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, ২০ লাখ উইঘুরকে অন্তরীণ করে রেখেছে জানার পরও ইমরান খানের কোনও প্রতিবাদ নেই। এটা ইমরান সাহেবদের দ্বৈত চরিত্রেরই প্রমাণ। সম্প্রতি মানজুর পাস্তুন নামক এক স্বাধীনতা সংগ্রামী বেলুচ নেতাকে পাকিস্তান গ্রেপ্তার করলে তার প্রতিবাদে সহস্র বেলুচ রাস্তায় নেমে আসে। আর পাকিস্তান এইসব তরুণদের অনেককে গ্রেপ্তার করে, গুম করে এবং হত্যা করেছে বলে বিশ্ব গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো কঠোর ভাষায় পাকিস্তানের সমালোচনা করেছে। বলা বাহুল্য এদের প্রায় সকলেই মুসলমান। সর্বশেষ মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের রূপান্তরিত করার খায়েশ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মনে এখনও জাগ্রত। তাদের এই খায়েশে সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশে পাকিস্তানি চরদের অভাব নেই, যারা মূলত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী।

উল্লেখ্যযোগ্য যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীই সে দেশের নিয়ন্ত্রক, যে কথা প্রকাশ্যেই অধ্যাপক পারভেজ হুদা ভাই বলছেন। আর সেই সেনাবাহিনী মূলত বাংলোদেশবিরোধী। এরাই কেউ-ই ১৯৭১ সালে তাদের অসহায় আত্মসমর্পন ও পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারেনি। যে বেসমারিক সরকার রয়েছে সেটা নামে মাত্র, আসল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর। আর সেই ক্ষমতাশীলরা চায় অর্থের মাধ্যমে হোক বা তথাকথিত বন্ধুর বেশে হোক বাংলাদেশে থেকে প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করা এবং আস্তে আস্তে বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত করা। তাই পাকিস্তানের যে কোনো নড়াচড়াকে আমাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে হবে। যদিও শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বের সামনে ইমরান খান কিছুই নন, তারপরেও তাদের অর্থ এবং আমাদের দেশের স্বাধীনতাবিরোধীরা যাতে অঘটন ঘটাতে না পারে সেদিকে সর্তক থাকতে হবে। তাই শক্র থেকে শত হস্ত দূরে থাকা ও সাবধান থাকার বিষয়টি আমাদের চিন্তার জগতে রাখতে হবে।সূএ: বিডি নিউজ

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71