মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০
মঙ্গলবার, ২৭শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: ড:যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১১:১৭ pm ০২-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১১:১৭ pm ০২-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


বাবা কানাইপুর হাট থেকে সন্ধ্যায় ফিরলেন সামান্য কিছু বাজার নিয়ে, রান্না শেষে রাতে সবাইকে এক সাথে খাবার দিলো মা, খেতে খেতে বাবা বলছিলেন কানাইপুর থেকে সংবাদ পেলাম কল্পনার বিয়ের ব‍্যাপারে ঝিনাইদহ থেকে দেখতে আসবে। কল্পনা আমার বড় বোন। এদিকে অভাবের সংসার তারপর আবার বারতি চাপ। বড় বোনের বিয়ের বয়সও হয়ে গেছে, বিয়ে দেওয়াটাও জরুরী, তাই বাবা তাদের না করতে পারেনি, আরো বললো আগামী পড়শুদিন আমার বড় বোন কল্পনাকে দেখতে আসবে। পাত্রপক্ষ কানাইপুরে একটা মেয়ে দেখবে তারপর আমাদের বাড়ী এসে আমার বড় বোন কল্পনাকে দেখে চা নাস্তা খাবে। কথাগুলো শুনে মার দুর্চিন্তা যেন বেড়ে গেলো, কোন মতে সবাই ঘুমালো। সকালে মা ঘুম থেকে উঠে গোবরের গোলা দিয়ে উঠান লেপে দিলো। বাড়িতে একদিন সবার মনে কৌতুহল আবার অন্যদিকে আতঙ্কিত, ছেলে এবং ছেলের বন্ধু আসবে আমার বড় বোনকে দেখতে। পাশে পঙ্কজ কাকাদের বাড়ি থেকে কয়েকটি চেয়ার এবং টেবিল আনলাম সব কিছু আমাদের বাড়ির মধ্যে ঠিকঠাক মত সাজিয়ে রাখা হলো যাতে তারা এসে বসতে পারে। গাছ থেকে কয়েকটি ডাব'ও পেরে রাখা হলো অতিথি বলে কথা। যথারীতি পরের দিন বিকেলে অথিতি আসলো এর আগে তারা কানাইপুরে একটি মেয়ে দেখেছে, তাই খাওয়া দাওয়ার পর্বটা ওখানে সেরে ফেলেছে। খাওয়া দাওয়ার পর্বটা ওখানে সেরে ভালোই করেছে নইলে আমাদের উপর চাপ পরতো, এমনিতেই অভাবের সংসার আমাদের। সমাজপতিদের অনুমতি নিতে হয়, পাড়ার সমাজপতি হিসাবে গুরুপদ দেবনাথ, বুদ্ধিস্বর দেবনাথ, বিষুপদ দেবনাথ সবাইকে ডাকা হলো, ডাকা হলো পাড়ার মহিলাদের, এটি গ্রামের প্রথা। যা হোক ছেলের আমার বড় বোনকে দেখে পছন্দ হলো, তারা বিয়ের দিন ধার্য‍্য করতে চায় তারাতারি, সবমিলে এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যে বিয়ে। বাবার মাথায় যেনো যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো হাতে নাই কোন টাকা পয়সা এদিকে বড় মেয়ের বিয়ে। সমাজের মোরল বা সমাজ পতি হিসাবে খ্যাত গুরুপদ বাবুকে আমাদের ঠাকুর বাড়ির কিছু জমি বিক্রি করার জন‍্য প্রস্তাব দিলো বাবা। সম্ভবত জমির দাম তখন ১৮,০০০/- টাকা থেকে ২০,০০০/- টাকা দরে বিঘা। মোরল গুরুপদ বাবু বললো ১২,০০০/- টাকা দরে বিঘা, দরদাম ঠিক হলে সে নিতে পারে। ঠিক হলো তিন বিঘা জমি ১২,০০০/- টাকা দরে সে কিনবে। এদেশের সমাজের চিরাচরিত একটা নিয়ম আছে সমাজে যারা সমাজপ্রতি তারা তাদের সুবিধার্থে নিয়ম বানায়। মিথ‍্যাকে সত‍্য আবার সত্যকে মিথ‍্যা এটা তাদের জন‍্য নিয়মে পরিণত হয়েছে। যা হোক বিয়ের দুইদিন আগে গুরুপদ বলে আমি জমি কিনতে পারবো না। একথা শুনে আমার বাবা মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো, আমি কিং কর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। জমি বিক্রির টাকায় বোনের বিয়ের একমাত্র ভরসা আমাদের, জমি বিক্রি করতে না পারলে বোনের বিয়েটা হবে না আর তার সাথে অতিথিদের সামনে আমাদের মান সম্মান ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে, সমাজপতিদের ছলে পরে আমাদের ঠাকুর বাড়ীর আট বিঘা জমি ৪,০০০/- টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ‍্য হলাম। বিয়ের দিন আগেই ঠিক হয়েছে, বাদ‍্যকার সানাই সব ঠিক হলো, সমাজপতিদের সমাজ মান‍্য (মান‍্য হচ্ছে- অর্থের বিনিময়ে সমাজপ্রতিকে সম্মানিত করা) দিতে হবে এটাও ঠিক হলো, ঠিক হলো ৫০ জন বরযাত্রীর খাবার ব্যবস্থা, প্রতিবেশিদেরও নিমন্ত্রন করতে ভুল করলাম না। প্রতিবেশিদের নিমন্ত্রন না করলে আবার সবাই মিলে এক হয়ে সমাজ থেকে একঘরে করে রাখবে এটাই আমাদের গ্রামের প্রথা। তাই অভাবের মধ্যে থেকেও কোনভাবে ভুল হলো না তাদের নিমন্ত্রন করতে।

রাত সারে সাতটার মধ্যে বরযাত্রী এসে গেলো, ঢাক ঢোল বাদ‍্যযন্ত্র বেজে উঠলো, বরকে দেখার জন‍্য আনন্দের শেষ নাই সবাই উৎসুক ভাবে বরকে দেখার জন‍্য এগিয়ে আসছে কিন্ত তখন আমার মেঝো বোনকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। যাচ্ছে না তো যাচ্ছেই না, কি মুস্কিল? কই গেলো? কই গেলো? সবার মুখে একই কথা কই গেলো? মেঝো বোনকে না পাওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে বরযাত্রীরা অনেকেই জেনে ফেললো। অনেক খোজাখুজির পর তাকে মা দেকতে পেলো ঘড়ে মাচার উপরে বসে মেঝো বোন কান্না করছে। মা যখনই তার গায়ে হাত দিয়ে বললো তোর কি হয়েছে? অমনি বিকট শ্বব্দে মাকে গালাগালি করতে শুরু করে দিলো মেজো বোন। সবাই হতোভম্ব! এ যেনো আমার মেঝো বোন'না তার মূখ দিয়ে অন‍্য স্বরে অন‍্য কেউ কথা বলছে। তার গলার সাউন্ড বের হচ্ছে বিকট শব্দে। যে আসছে তার সাথেই খারাপ ব‍্যবহার করছে, কাউকেই মানছে না, তার মূখ দিয়ে কম্পিত শব্দ প্রতিধ্বনি আকারে বের হচ্ছে। ইতিমধ্যে সে ঘড়ের বাইরে চলে আসছে, হাতে লোহার দাউ, আমার মেঝো বোনের কাছে কেউ এগোতে পারছে না, না জানি কোপ-ঠোপ দিয়ে দেয় কাউকে। এক থেকে দেরশো মানুষ বাড়ীর মধ্যে, এক অস্বাভাবিক কান্ডলীলা শুরু হয়ে গেলো মুহুর্তের মধ্য। অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকর এক অবিস্বরনীয় ঘটনা, মুহুর্তের মধ্যে বোনটি মানুষের মাথার দুই চার হাত উপরে শূন্যে ভাসতে লাগলো। বিকট শব্দে কিছু পুরানো কথা বলতে শোনা গেলো যা আমাদের কারো জানা নাই, কথাগুলো না জানে আমার মা না জানে বাবা, ইতিমধ্যে আমার বৃদ্ধ ঠাকুমা ঘড় থেকে বের হয়ে আসলো আর বলতে থাকলো ও-রে শোন! শোন মানে আমার বাবাকে বলছে অর্চনা তো ঠিকই বলছে, অর্চনা মানে আমার মেঝো বোন যে এখন শূন্যে ভাসছে। শূন্যে থেকে আমার বোন যে সমস্ত কথা বলছে তার উত্তর শুধু আমার ঠাকুমাই জানে তাই সে বাবাকে ডেকে নিয়ে চুপি চুপি কিছু কথা বললো যা আমার বাবার জন্ম লগ্নের কথা। ঠাকুমার কথা মতো বাবা জোর হাত করে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর সাথে সাথে কিছু প্রতিশ্রুতি দিলো অমনি বোনটি শুন‍্য থেকে মাটিতে পরে অজ্ঞান হয়ে গেলো। আমি কোন ধর্মীয় অনুশাসনের কথা বলছি না। সবই আমার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। তাই তো মনে হচ্ছে মহাজ্ঞানী মহাপুরুষরা যুগে যুগে বলে গেছেন- তোমরা মনুষ্যকুল যা করছো বা দেখছো তা এক অলৌকিক ঘটনা মাত্র। আর আমরা মানে মহাপুরুষ'রা যা করি বা দেখি তা অত‍্যান্ত লৌকিক। মনুষ্যকূলে অনেক কিছু ঘটবে যা তোমাদের চোখের দৃষ্টিগোচর হবে না, তোমাদের কাছে মনে হবে এটা অলৌকিক কিন্ত সত‍্য কথা এই যে, এটি অত‍্যান্ত লৌকিক। জ্ঞানের সাগরে ডুব দিলে পাগল থেকে মহাপাগলে পরিনতো হওয়া শুধু মাত্র সময়ের দাবি...। চলবে...

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71