বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২০
বুধবার, ২১শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১০:২৭ pm ০৩-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১০:২৭ pm ০৩-০৫-২০২০
 
eibela desk
 
 
 
 


অনেক দুর্চিন্তা এবং আতঙ্কের মধ‍্যে দিয়ে আমার বড় বোন কল্পনার বিয়ে হয়ে গেলো। দুই দিন পরে আমিও ফরিদপুর চলে আসলাম সরাসরি সচিন বাবুর বাড়িতে উঠে গেলাম লজিং মাস্টার হিসাবে। আর্থিক দিক থেকে গোপাল'দার চেয়ে একটু ভালো সচিন বাবু, সচিন বাবু স্ত্রী যাকে আমি মাসীমা বলে ডাকি বেশ আন্তরিক মানুষ। উনাদের ছেলে মেয়েকে দু বেলা করে পড়াতে হবে। এদিকে রীতিমত আমার ক্লাস চলছে, নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে কথা হচ্ছে, অনেক বন্ধুরা কলেজে ব‍্যাক্তিগত মটর সাইকেল নিয়ে আসে। আমাদের মধ্যে অনেক বন্ধুরা ব‍্যাক্তিগত মটর সাইকেল নিয়ে আসা ওদের সাথে খাতির করতে চায় আর চাইবে না কেন? সুন্দর বা বিলাসিতার পূজারী তো সবাই, যে বন্ধুরা বেশী শো-আপ করতে পারে কিছু আলগা খরচ করে পারে সবাই যেন তাদের বন্ধু হতে চাই এবং আলাপচারিতায় শুধু তাদের কথায় বলে। আমার ভীষন মন খারাপ থাকে এই ভেবে যে, আমার নতুন একসেট জামা কাপর কিনা সামর্থ্য নাই, নাই একটু আকটু অতিরিক্ত বাজে খরচ করার সামর্থ্য। বন্ধু'তো তাদেরই হয়, যারা চায়ের দোকানে বন্ধুদের চা খাওয়াতে পারে তাদের পিছনে খরচ করতে পারে।
বন্ধুরা'তো সেভাবেই সময়টা কাটাচ্ছে যে ভাবে ওদের কাটানোর কথা- আড্ডা দেওয়া, হাসি ঠাট্টা করা, বয়সটাতো এমনি, কিন্তু আমি কেন ব্যতিক্রম ভাবে সময়টা কাটাচ্ছি। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি? আমার দারিদ্রতা, অভাব অনটনই কি আমার প্রধান কারন? ইতিমধ্যে অনেক বন্ধুরা রাজনৈতিক দলে নাম লেখালো, বেশ পয়সা পাতি খরচ করে নেতাদের পিচ পিচ মিছিল মিটিং এ যায়, আমার মিছিল মিটিং মন টানে না। মন টানে না এই ভেবে যে আমার নিজেরই চলে না। দুপুরে একটু টিফিন খাব সেই পয়সায় জোটে না আমার, মনটা এক রকম উদাসীনতায় ভরে থাকে সবসময়।

যাক সে কথা, একদিন হিসাব বিজ্ঞান ক্লাসে আমার পাশে এক বন্ধু বসেছে, ওর নাম রেজাউল ডাক নাম স্বপন, আমাকে বলে এই তুই সরে অন্য কোথাও বয়, তোর গা দিয়ে মনে হয় দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। মনে হওয়ারই কথা, আমিতো গতো চার পাঁচ দিন জামা কাপরগুলো পরিস্কার করার সময় পায়নি কারণ একটা জামা কাপড় পড়ে কলেজে আসা যাওয়া করি। স্বপ্নের কথা আমি থতমত খেয়ে গেলাম। প্রতি উত্তর করলাম না আমার ব্যর্থতার কথা ভেবে। আমার অন্তরে এমন ভাবে আঘাত আনলো কথাটা যেনো মনটা ভেঙ্গে দ্বি-খন্ডিত হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে পিছনের ছিটে গিয়ে বসলাম যেখানে আর কোন ছাত্র বসে নাই। ওই ক্লাস শেষে আর কোন ক্লাস করার মতো মানসিকতা থাকলো না আমার। এক অসয‍্য মানুষিক যন্ত্রণায় হাটতে হাটতে বাসায় চলে গেলাম। বাসা বলতে ওই শচীন সাহার বাড়ী যেখানে আমি লজিং মাস্টার থাকি। লজিং মাস্টার এর বাইরে টিউশনি করে যে টাকা পাই ও দিয়ে চলতে হয় আমার, তাই তেমন অতিরিক্ত খরচ খরচা করতে পারি না। কিছু বন্ধুদের সাথে সখ‍্যতা বেশ ভালো হলো, ওদের সাথে কথা বলে আমার ভালো লাগে। কেউ কেউ রাজনৈতিক ভাবে বেশি বেশি সময় কাটাচ্ছে কলেজে, আমার ভালো লাগে না। রাজনীতি করলে টাকা পয়সা খরচ করতে হয় যেটা আমার নাই। কলেজে সময় যতো যাচ্ছে নতুন নতুন বন্ধুরও যোগসুত্র হচ্ছে আমার কিন্তু ভাগ‍্যের চাকা ঘুরছে না। ঘুরছে না আর্থিক দৈন্যদশা। বন্ধুরা ইতিমধ্যে কেউ কেউ অনেকটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দুই একজন কলেজের সিড়ির উপর দাড়িয়ে লম্বা লম্বা বক্তব্য দেওয়াও রপ্ত করে ফেলছে। আমিতো ওদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, ভাবছি কিছু একটা করার দরকার যেখান থেকে আমি বন্ধুদের মাঝে কলেজে পরিচিত হতে পারি, তবে কি সেটা? কে না চায় বন্ধুদের মধ্যে পরিচিত হতে, জনপ্রিয়তায় আশা মনে মনে সংকল্প করে ফেললাম। জ্ঞান আরোহনের বিকল্প নাই ভেবে ফেললাম। সুন্দর করে কথা বলা শিখতে হবে যদিও ছোট বেলা থেকে আমি একটু লাজুক প্রকৃতির। এটা আমার দোষ না দোষ আমার দারিদ্রতার। যাই হোক না আমি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হলাম। কথা বলা আমার শিখতেই হবে। সুন্দর করে কথা বলা একটি আর্ট আর যে এই আর্ট'টি জানে সে একজন আর্টিস্ট। পরের কয়েক দিনে মধ্যে আমি প্রয়োজনীয় কথা বার্তা বলা, আড্ডার ছলে বন্ধুদের মাঝে হাত দেখার মতো করে অতীত ভবিষ্যৎ বলা, মাঝে মধ্যে দু-একটা অতিরন্জিত কথা বলাও রপ্ত করে ফেললাম। ভবিষ্যৎ সম্মন্ধে কথা মানেতো এক প্রকার অতিরন্জিত বলারই সামিল। জ্ঞান অর্জনের জন‍্য পাঠ‍্যপুস্তকের বাইরে মহাপুরুষদের জীবনী গ্রন্থ থেকে কিছু কিছু কোটেশন মুকস্হ করে ফেললাম। নাজিম ভাই এর কাছ থেকে কিছু বই মাঝে মধ্য নিয়ে আসতাম, ওহ নাজিম ভাই পুস্তক ঘড়ের মালিক। সময় পেলে অনেক আড্ডা দিতাম। কেরু'র কিছু বই পরতাম যেটায় হাতের রেখা গুলো চিনিয়ে দিতে সাহায্য করেছে আমায়। দিন যতই যাচ্ছে আমার মুখে কথার খই ফুটছে, কলেজে বড় হতে থাকলো আমার বন্ধু বান্ধবের তালিকা। ক্লাসের ফাকে ফাকে বন্ধুরা আমাকে ডেকে নিতো, আমি যেনো ওদের একটা হাসি ঠাট্টার খোরাক। মাঝে মধ্যে রেস্টুরেন্টে নিতো বিল গুলো অবশ‍্য ওরাই দিতো। ইতিমধ্যে আমি দুই একশো ছেলে মেয়ের হাত দেখে অতীত ভবিষ্যৎ বলে দিছি। প্রতিটি বন্ধুদের চরিত্রের নমুনা একই রকম কথাগুলো শুধু ঘুরিয়ে বলা, সবই কথার মার প‍্যাচ। বন্ধুদের মাঝে জ‍্যামিতিক হারে বেড়ে যেতে লাগলো আমার পরিচিতি। অল্পদিনের মধ্যে অনেকেই আমাকে চিনে ফেলেছে। জ্ঞান আরোহনের জন‍্য সারা রাত জেগে বই পরতাম আমি। বই পরতাম এই ভেবে যে বন্ধুদের চেয়ে আমাকে একটু আলাদা হতে হবে। সময়ের সাথে সাথে আমার পরিচিতি যেন বন্ধুদের কাছে গাণিতিক হারে প্রতিনিয়ত বাড়তে লাগলো।

হঠাৎ একদিন ডাক আসলো আমার ঝিলটুলি ফারুক ডাক্তারের বাসা থেকে। উনার বৌ আমার সাথে দেখা করতে চাই। আমাদের কলেজে জীবন নামে একটা ছেলে খুব ভালো হাত দেখে, কোন এক বন্ধু আমার কথা বলেছে ঐ ভদ্র মহিলার কাছে। দুই চার দিন পর আমি ফারুক ডাক্তারের বাসায় গেলাম, ভীষন আদর যত্ন করলো আমায়। পরে আমারে হাত দেখার কথা বলে ভদ্র মহিলা, আমি অপ্রস্তুত ছিলাম তাই, হাত দেখার বিষয়টা শুনে চমকে উঠলাম। আমি এতোদিন বন্ধুদের সাথে যা করেছি সেটা তো কলেজে আমার পরিচিতি বাড়ানোর একটা কৌশল ছিল মাত্র, এখন আমি কি করবো? ভদ্র মহিলা নাছোড়বান্দা তার হাত আমাকে দেখতে হবে কোন উপায়ন্তর না দেখে আমি ভয়ে ভয়ে ঐ ভদ্র মহিলার হাত ধরলাম। গুনে গুনে চার থেকে পাচটি কথা বললাম। চারটি অতিতের কথা একটি ভবিষ্যতের কথা। মূখ ফুসলে বের হয়ে গেলো- ভাবী আপনার পরক্রীয়ার যোগ রয়েছে, সংসারে অশান্তি সমূহ সম্ভাবনা, বলা মাত্রই ভাবী আমার মুখ থাবা দিয়ে ধরছে। পাঁচটি কথাই নাকি উনার মিলে গেছে। আমাকে উনি কি ভাবে যে অভিবাদন দিবে মনে হচ্ছে ভাষা খুজে পাচ্ছে না। উনি খুশি হয়ে অনেকগুলো টাকা দিল। ইতিমধ্যে উনার একটা ফোন আসলো ফরিদপুর কোতয়ালী থানা থেকে। ওসি মোস্তফা কবিরের বৌয়ের ফোন। ডাক্তার ভাবী আমার সামনেই আমার কথা বলতে শুরু করে দিলো সেকি প্রশংসা বলে বুঝানো যাবে না। মনের মধ্যে এক ভালো লাগা নিয়ে আমি বাসা থেকে চলে আসলাম।

তার কয়েকদিনের মধ্যে সাব ইন্সপেক্টর হারুন ভাই'কে ওসি পাঠিয়েছে আমার কাছে, হারুন ভাই এসে বলছে আপনাকে থানায় যেতে হবে থানায় ওসি আপনাকে যেতে বলেছেন। আমি একটু আজ করতে পারলাম আমাকে কেন ডেকেছে, আমি হারুন ভাইকে বললাম দুই চার দিন পর যাবো। রাজনৈতিক অস্হিরতা তখন তুঙ্গে। পুলিশ দেখে ভয় পায় না এমন লোক ফরিদপুরে খুজে পাওয়া তখন মুস্কিল। আর ওসি মোস্তফা কবির সে তো এক ত্রাসের নাম। শুনলেই সবাই চমকে উঠে। ছোট বড় সবাই তাকে দেখে ভয় পায়। যখন শুনলাম ঐ ওসি আমাকে ডেকেছে শুনা মাত্রই আমার আত্মারাম ভয়ে থর থর করে কাপছে। আমি সত্যিই বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমার কি করা উচিত? ভয় এবং আতঙ্ক আমাকে আকড়ে ধরছে। রাত নয় কি দশটা বাজে, কোন মতে টিউশনি গুলো শেষ করলাম আমি। হাটতে হাটতে প্রভুর আঙ্গিনার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ছিলো করুনাময়ী প্রভুর কাছে নিজেকে সমার্পন করা। সেই পারে একমাএ এই বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করতে। ওসিকে যদি কোন ভুলভাল তথ‍্য দেই জেল আমার নিশ্চিত। হে প্রভু তুমিই আমাকে রক্ষা করতে পারো। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস গিয়ে দেখি আঙ্গিনার প্রধান ফটক বন্ধ। ভেতরে ঢুকতে পারলাম না তাই আঙ্গিনার পুকুর ধারে যেয়ে বসলাম। জন-মানব শুন‍্য ঐ জায়গাটি, ঘুটঘুটে অন্ধকার। পুকুরে দুই একটা মাছের শব্দ শুনা যাচ্ছে। আমার বুকে মধ্যের শা শা শব্দ টা মনে হয় একই রকম। প্রভুর আঙ্গিনার দিক মুখ করে পুকুর পারে বসে আমি ভীষন ভাবে কান্না করছি, সে কি কান্না? কান্না আসছে অন্তরের থেকে। অশ্রুসিক্ত চোখ ভরে গেছে আমার মূখমন্ডল। ভিতর থেকে একটিই কথা বের হচ্ছে- হে প্রভু। হে প্রভু আমাকে পথ দেখাও। পথ দেখাও। হটাৎ করে এক আচমকা বাতাস প্রভাবিত হয়ে আমার শরীরের উপর এসে থেমে গেল। আমার নাকে একটা সুগন্ধ পেলাম এক মহিমান্বিত অপূর্ব স্রোতধারার সুগন্ধির স্বাধ। মনে হলো একটি আধ্যাত্মিক কোন শক্তি আমার ভিতরে প্রবেশ করলো। হতে পারে এটা কোন জীন প্রভাবিত কোন বাতাস। শুনেছি এরা নাকি এরকমের বাতাসেই ভেসে বেড়ায়। পৃথিবীতে এরকম অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে যা মনুষ্যকুলে অনুধাবন করা যায় না, কোন বিজ্ঞান ও এর কূল কিনারা করতে পারেনি, ভাবতে ভাবতে বাসায় আসলাম। যথারীতি দুই দিন পরে আমি কোতয়ালী থানায় গেলাম। ওসি মোস্তফা কবির আমাকে ডেকে পাঠালেন উনার বাসায়। উনার বৌ আমার সম্মন্ধে ওসি মোস্তফা কবিরকে বলেছেন। উনার চোখগুলো অনেক বড় বড়, এমনিতেই ফরিদপুরের লোকজন ভয় পায়। হটাৎ করে ওসি বলে উঠলেন, এই তুমি নাকি হাত দেখতে পারো? দেখো তো আমার টা। আমি যখনই আমার হাত উনার হাতে স্পর্স করলাম এক আচমকা আধ্যাত্মিক শক্তি অনুভব করলাম। মনে হলো আমার মুখের ভাসা অন‍্যকেউ কেড়ে নিয়ে বলতে থাকলো তার পূর্বের এবং বর্তমান কথা যা হুবহু মিলে গেলো। মিলে গেল তার খুবই সম্প্রতির দু-একটি কথা যা কি-না তিনি ছাড়া আর কেউই জানেন না। ওসি হতবাগ হয়ে আমার মূখের দিকে ফ‍্যাল ফ‍্যাল করে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে। আমার হাতটি ওসি'র হাত থেকে সরিয়ে নিলাম, আচমকা একটি ঝাকুনি দিলো আমার শরীরের ভেতর যেন তীব্রগতিতে রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে এবার আমিও ওসি'র অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম...।
চলবে....

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71