শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০
শনিবার, ৩১শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১১:১১ pm ১০-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১১:১১ pm ১০-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


যার ঘর নাই যেখানেই যায় সেখানেই তার ঘর। তাই তো বেশি দিন আর পলাশ ভাইদের বাসায় থাকা হলো না। পাশে রেল কলোনির মেস ওখানে চুন্নু নামে আমার এক বন্ধু থাকে, থাকে আরো অনেকেই। তাই এখানে উঠে পরলাম। পুরাতন জরাজীর্ণ রেল কলোনি, নেই কোন পাকা বাথ রুম, অপরিস্কার ও অস্বাস্থ্যকর একজন মানব শুন্য পরিবেশ, থাকি শুধু পাচ ছয় জন ছাত্র। মেস হিসাবে থাকা, রান্না-বান্না করে কাজের বুয়া। মোটা চালের ভাত, কম হলুদের ফ্যাকাশে তরকারির রং। প্রথম প্রথম গলার মধ্যে নামতই না। পরে অভ‍্যাস করে ফেললাম। অভ‍্যাস করলাম সবার সাথে মিলিয়ে নিতে। কলেজের শেষ পর্যায় চলে এসেছি, বন্ধুবান্ধব সবাই প্লান করছে ঢাকা যাওয়ার, আমিও ওদের তালে তাল দেই, প্রতিনিয়ত হতাশা আর ব‍্যর্থতা আমাকে আকরে ধরে। আকরে ধরে আমার দারিদ্রতার ছোয়া, বন্ধুদের বুঝতে দেই না। আজ আমি প্রাইভেট পড়িয়ে ওসি মোস্তফা কবিরের সাথে দেখা করলাম। মন খারাপ উনি টের পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে? আমি বললাম বন্ধুরা পরীক্ষার পর সবাই ঢাকা ভর্তি হবে, ঢাকায় থাকতে হবে, কোথায় থাকবো, কি করবো? বুঝে উঠতে পারছি না। উনি তাৎক্ষণিক বলে উঠলো, দাঁড়াও আমি আমার ছোট ভাই এর সাথে কথা বলে নেই। তোমার জন‍্য একটা ব‍্যবস্হা করবো। উনার ছোট ভাই ঢাকায় কম্পিউটারের ব‍্যবসা করে। ধানমন্ডি-৮ ব্রীজ সংলগ্ন কম্পিউটার সার্ভিসেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান। উনি বললো আমি সাব্বিরের সাথে আলাপ করে তোমাকে জানাবো। একটা না একটা ব‍্যবস্হা হয়ে যাবে তোমার। আমি কিছুটা আস‍্যস্ত হলাম। তারপর রেল কলোনির মেসে ফিরে গেলাম। এদিকে কাজের বুয়া আসে নাই চুন্নু আর সাজু ওরা দুজন মিলে রান্না করেছে। ওদের তো আবার রান্না করার অভ‍্যাস নাই। তরকারি তে লবনই দেয় নাই, হয়তো ভুলে গেছে। অগুত‍্যে মদুসূদন কি আর করা, শুবার চকিতে বসে সবাই খেতে শুরু করলাম, সবাই বলতে চুন্নু, মজিবর, ওবায়দুর, শাহজাহান (শাজু) আর আমি। ভাগ‍্যের ছকটা এতোটাই খারাপ, হটাৎ করে শুনতে পারলাম ওসি মোস্তফা কবির ও এসডি হয়েছে। দুর্চিন্তা আমাকে ছেয়ে ধরলো। কি করবো আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পারছিলাম না কার কাছে গেলে এর সমাধান হবে।

একদিন মান্নান ভাইয়ের কাছে আলাপ করলাম। মান্নান ভাই মধুখালি চিনি কলে কাজ করে। ঢাকাতে ওনাকে অনেকেই চিনে। উনার ভাইরা একজন বড় সাংবাদিক। ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করে। উনি বললো চলো ঢাকা যাই, সমাধান একটা হবে। মান্নান ভাই পরপোকারী মানুষ। মানুষের উপকার করাটা উনার নেশা। প্রতিদিন কারো না কারো উপকার করবেই আর এটাই তার জীবনের ব্রত। দিন ভরেই লাল রঙ্গের একটা সিডিআই মটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কখন বা মধুখালী আবার কখনও বা ফরিদপুর এই ভাবেই চলে তার জীবন। যা হোক মান্নান ভাই ওসি মোস্তফা কবিরের বিযয়টি খুবই গুরত্বের সাথে নিলেন এবং যথারীতি পরের দিন সকালে আমাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আমি ভুলে যাওয়ার আগে বলে রাখতে চাই আমার ঢাকায় আশা আমার জীবনে এটাই ছিলো প্রথম। তাই ঢাকার রাস্তার আমার কাছে ছিলো এক রকমের অচেনা এক নগরী। মান্নান ভাই এর ভাইরা মোয়াজ্জেম ভাই থাকেন ভূতের গলি। রাতে এসে তার বাসায় উঠলাম। অপরিচিত বাসা তারপর আবার ঢাকা শহরে নতুন, একটু'তো ইতস্তবোধ লাগছে আর লাগাটাইতোই স্বাভাবিক। যাহোক মোয়াজ্জেম ভাই এর বৌ আমাদের রাতে খাবার দিলেন আর এদিকে মান্নান ভাই মোয়াজ্জেম ভাই এর কাছে ঢাকা আসার কারনটি বলে ফেললেন। যথারীতি সকালে মান্নান ভাই এবং মোয়াজ্জেম ভাই বের হয়ে গেলেন, বলে গেলেন প্রথমে যাবে ফরিদপুরের দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রীর বাসায় তার পর কাজ না হলে যাবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসে। আমাকে অবশ‍্য নিলেন না, আমি বাসায়ই রয়ে গেলাম। বিকালে উনারা হাসিমূখে বাসায় ফিরলেন। বুঝতে বাকী রইলো না যে কাজ হয়ে গেছে। পরেরদিন আমাদের ফরিদপুর যাওয়ার আগে ফ‍্যাক্স বার্তায় পূন নিয়োগের আদেশ চলে গেছে, শস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। আমার রেল কলোনি দুর হয় বলে চলে আসলাম চরকমলাপুর একটি টিনসেট বাসায়। এদিকেই আমার সকল কাজকর্ম, প্রাইভেট পড়ানো, নিজের পড়া, থানায় যাওয়া এদিক থাকাটাই ভালো। তাই আমি, অজয় এবং ওবায়দুর মিলে সেলিম চেয়ারম্যানের বাসার উল্টো দিকে টিনসেট একটি ঘড় ভাড়া নিলাম, মেইন রাস্তার পাশে ঘড়টি সব মিলিয়ে খারাপ না। আশে পাশের সবার সাথে পরিচয় হলো। পরিচয় হলো রিপন, রাহাত, কুদ্দুস, লেবী ভাই, তার ছোট ভাই, পাশা ভাই আরো অনেকের সাথে। দুই চার দিন যেতে না যেতেই এলাকার ছেলেরা আমাদের বিরক্ত করা শুরু করতে লাগলো বিরক্ত বলতে, এই রাতে টিনের চালের উপর ইট ছোড়া, রাতে পাহাড়া দেওয়া ইত‍্যাদি। ঐ রোডটায় ছিনতাই হতো প্রতিনিয়তোই তাই এলাকার ভাইরা হেরিকেল জালিয়ে অনাতের মোর থেকে চরকমলাপুর শেষ মাথা পযর্ন্ত রাতে পাহাড়া দিত। পর্যায় ক্রমে সবারই ডিউটি করতে হবে এটা এই এলাকার নিয়ম। মাঝে মধ্যে রাতে খিচুরি খাওয়া হতো এই টিনসেট ঘড়ে। যাহোক মানিয়ে নিলাম এবং চলতে থাকলো কিছু দিন। সময় যতোই যাচ্ছে ফরিদপুরের দিনগুলো আমার স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।

কিছু দিনের মধ্যেই আমার ফরিদপুর থেকে চলে আসতে হবে কারণ ফাইনাল পরীক্ষা হতে আর বেশি দিন বাকি নেই। কয়েকদিন পরেই পরীক্ষা শুরু হবে সবাই খুবই সিরিয়াস। আমাদের সার্কেলে জুয়েল, পপি, শামীম, মুজিব, অপেল, হালিমা খুবই মনোযোগী হয়ে গেলো পড়াশুনায়। জুয়েল পড়াশুনায় খুব ভালো আর বাকি সবাই একই ধাচের। এদিকে কুদ্দুস, নঈম, রাহাত ওরা একটু বিজ্ঞ বিজ্ঞ ভাব পড়াশুনা ছারা আর কিছুই করে না। ওরা ফরিদপুরেরই ছেলে। পড়াশুনার ফাকে ফাকে আমাকে ভাবিয়ে তুলছে এই আন্তরিকতার ফরিদপুর থেকে আমাকে চলে যেতে হবে এক সময়, ফরিদপুরের সব এলাকার মানুষের সাথে সম্পর্কের বাধন ভেঙ্গে। কিছু সম্পর্ক আমার হৃদয়ে বার বার দোলা দিতে থাকলো। মনে পরে আন্তরিকতার সম্পর্ক রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ের বরকত, রুবেল, চান চেয়ারম্যান, গোয়ালচামট ১ং সরকের মদন, ডাবলু, সালু, টুলু, ডিউক। মনে পড়ে অরুন সাহার ডালের পিছনে তিন তলায় আমার জামাইবাবু, দিদি, ও ওদের একটি ফুটফুটে ছোট ছেলে অমিত কে। কতোবার ওদের বাসায় যেয়ে খেয়েছি দুপুরে অথবা রাতে আন্তরিকতার এক অনন‍্য উদাহরণ। মনে পড়ে খোদাবক্স রোডের ডাবলু, শরিফ, ভৈরব, বকু, নীপু, রাম, বিশু, পিলু আরো অনেকের কথা। কতোই না আন্তরিকতা ছিলো মিত্রিকা, জয়া, রাম, অজয়, বিজয় এবং অজয়ের বাবা মার সাথে। ভুলে যাই নাই শোভারামপুরে কেষ্ট সাহার ছেলে মেয়েদেরকে। মনে পরে ছোট আঙ্গিনার প্রদীপ, বিকাশ, শংকর, বিজয়, শর্মীলীদের কে। মনে পড়ছে আলীপুরের রামুদাদের পরিবার, আসলাম, শামীম, সেলিম ভাই, বিশুদা কে আরো মনে পড়ছে বাকাউল উকিল সাহেবের ছেলেদেরকে। কতোইনা সময় কাটিয়েছি মেথর পট্টির মুকেশের সাথে। ওর গানের কথা কি ভাবে ভুলে যাই। কখনোই জাত হিসাবে অবচেতন মনের কোনে দাগ কাটেনি। কতোবারই এক সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি। মনে পড়ছে হরিসভার সুবির, বুজু, মুরাদ, মোসা ভাই, বিউটি, ভারতী, কাউসার ভাই ওদের কথা। হৃদয়ে কম্পন করে যাদের কথা মনে পড়লে- ছাত্রনেতা জাহিদ ভাই, মিঠু ভাই, আরিফ ভাই, অনিমেষ দা, নান্নুভাই, পলাশ ভাই, সবাইকে ছেরে চলে যেতে হবে এটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে। কষ্ট লাগছে এই ভেবে যে ফরিদপুর থেকে চলে যাওয়া মানে আপন মানুষদেরকে ছেরে চলে যাওয়া ভাবতেই মনটা আমার ভেঙ্গে পড়ছে। মনের অজান্তেই দুই চার ফোটা অশ্রু ঝরে গেছে কখন টেরও পাইনি। ফরিদপুরের সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি বার বার। মনে পড়েনা কারো সাথে ছলচাতুরি করছি কিনা জীবনে কখনোই বরং সবার আন্তরিকতায় আমি চির কৃতজ্ঞ।

জীবনের যেকোন প্রস্তান চলে আসে খুব তাড়াতাড়ি। যথারীতি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলো। যাদের সাথে এক'টা কথা না বললে মনে হয় পেটের ভাত হজম হতো না, দুরুত্ব হতে চললো তাদের সাথে। দুরত্ব হয়ে গেলো- পপি, নিলিমা, ভারতী, বিউটি, হালিমা, কুদ্দুস, রাহাত, রিপন, শামীম, জুয়েল, মুজিব, ওপেল, সাজু, নঈম আরো অনেকের সাথে। সবাই যে যার গতিতে চলছে। অনেক বন্ধুদের ফরিদপুর নিজেদের বাসা আছে তাই ওরা ধীরে সুস্হে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ঢাকায় আসার আর আমি যেহেতু আমি গ্রাম থেকে এসেছি সেহেতু আমার সিদ্ধান্ত তাড়াতাড়ি নিতে হচ্ছে। গ্রামে ফিরে গেলে হয়তো জীবনটাই শেষ হয়ে যাবে। তাই সিদ্ধান্ত নিতেই হচ্ছে স্রোতের কেন্দ্র বিন্দুতে পৌছাইতে হবে। দুই একদিন পড় আমি ওসি সাহেবের সাথে দেখা করলাম। উনি ইতিমধ্যে ওনার ছোট ভাই সাব্বির ভাইয়ের সাথে আলাপ করে ফেলেছে। সাব্বির ভাই ওসি সাহেবর ছোট ভাই। কম্পিউটার সার্ভিসেস এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর। আমাকে বললো ওসি সাহেব তুমি কবে যেতে চাও.? যেহেতু এই সুযোগটা হলো আর দেরি না করে ঢাকা যাওয়ার মন স্হির করে ফেললাম। মনে মনে ভাবলাম এটাই আমার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে। শনিবার সকাল সাতটায় বিকাশ পরিবহনে টিকেটও সংগ্রহ করে ফেললাম। জানি না কোথায় যেয়ে থাকবো, খাবো কি.? কোন কিছুই ঠিক নাই। এ যেন এক অজানা গন্তব্যের দিকে পথ চলা। পকেটে অল্প কিছু টাকা যা দিয়ে সপ্তাহ দুয়েক চলবে। যখন আমি বিকাশ পরিবহনে উঠলাম, আমার মনটা ভেঙ্গে চুরমার হতে লাগলো, কান্নায় দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরে পরছে, কন্ঠে যেনো ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে আমার। আমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে তাই কন্টাক্টর দুই একটা কথা জানতে চাইল কোনরকম তার উত্তর দিলাম। কথা বললাম না পাশের সীটে যে ভদ্রলোক বসেছে। পিছনে ফেলে আশা দিনগুলোর কথা বার বার হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছে। কৃতজ্ঞতার সাথে মনে পরছে আমার বন্ধু নয়নের কথা মধুখালীতে যার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। মনে পড়ছে আমার গ্রামের স্বপন সাহার কথা যিনি আমাকে ফরিদপুরে প্রথম চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, হয়তো উনি চাকরি না দিলে গ্রাম থেকে আমার ফরিদপুর শহরে আসা হতো না। মনে পড়ছে সেই মানুষটার কথা চাকরি জীবনে যে আমাকে মাঝে মাঝে ডেকে নিয়ে বলতো অর্থের অভাবে পড়াশোনা থামিও না কখনো, নাম মনে নেই কিন্তু আজও আমার মস্তিষ্কে তার সেই কথা বাজে। হৃদয়ে কম্পন করছে আমার মিতা জীবনের কথা ভেবে যার আশ্রয় থেকে একটা নতুন ঠিকানার সন্ধান পেয়েছিলাম গোপালদার বাড়ি, তাই গোপালদার কথা খুব মনে পড়ছে। আমি বিশেষভাবে স্মরণ করছি সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরা সেই ভদ্রলোক জনাব নুরু মিয়াকে যার টাকায় আমি কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলাম, উনি টাকা না দিলে হয়তো আমি ওই সময় ভর্তি হতে পারতাম না। আরো মনে পড়ছে পলাশ ভাই এর আম্মার আথীয়তার কথা। মনে পড়ছে অরুন সাহার বৌ মানে মেঝো বৌদির কথা, মনে পরছে শান্তি সুজিতের মা, মাসীমার কথা। আরো অনেকের কথাই মনে পড়ছে যাদের নাম হয়তো এখানে বলা হয়নি.! বলা না বলা হাজারো কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে আমি অজানা এক গন্তব্যে ছুটে চলছি যেখানে আমার সাথে সঙ্গী শুধুই আমার স্মৃতির কান্না। চলবে...

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71