শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০
শনিবার, ৩১শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
আমার জীবনের গল্প: যশোদা জীবন
প্রকাশ: ১০:৫৮ pm ১৭-০৫-২০২০ হালনাগাদ: ১০:৫৮ pm ১৭-০৫-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


আমি চলে গেলাম টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর করিয়ান কোম্পানি হুন্দাই'তে জয়েন্ট করার জন‍্য। থাকার একটা জায়গা বন্দোবস্তো করলাম ভুয়াপুর। পরের দিন সকালে যমুনা বহুমুখী সেতুর প্রজেক্ট অফিস ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় চলে গেলাম। কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানি ঐ ব্রিজের প্রধান কন্টাক্টর হিসেবে কাজ পেয়েছে। ব্রিজের পাইলিং কাজের আগেই আমার নিয়োগ হয়েছে। আমার বস কে. ওয়াই কিম। আমি দায়িত্ব পেলাম জেনারেল প্রকিউরমেন ম‍্যানেজার হিসাবে। বেতন হিসেবে ধরলো ১৫০০ শত মার্কিন ডলার এবং সাথে অন‍্যান‍্য এলাউন্স সব মিলিয়ে একটি সন্মান জনক প‍্যাকেজ। বিদেশী কোম্পানি জানে কিভাবে স্টাপ দিয়ে কাজ উঠিয়ে নিতে হয়। সকাল ৮ থেকে প্রজেক্টের কাজ শুরু বাসায় আসতে আসতে রাত ৯ টা বেজে যেত একটানা ১২ ঘন্টা কাজ। প্রতি ১৫ দিনে একদিন ছুটি পাওয়া যেতো ঐ দিনে আমি ঢাকা আসতাম বন্ধুদের সাথে দেখা করতে, ঐ দিনে আবার ফিরে যেতাম প্রজেক্টে। মাঝে মাঝে প্রজেক্টের পাজেরো জিপ নিয়ে আসতে হতো আমায় ঢাকায় অফিসিয়াল কাজের জন‍্য। জীবনে টাকা পয়সা খরচ করলে বন্ধুর অভাব হয়না তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সাথে আমার বেশ আড্ডা জমে উঠতো। দিন দিন বন্ধুদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো আমার। মাঝে মধ্যে যখন ঢাকায় আসতাম বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমার চাইনিজ খাওয়া'ও চলতো বেশ। সময়টা চলছে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে, যদি কেউ চরম ব‍্যস্ততায় সময় কাটায় অথবা ভালো সময় কাটায় তার সময়টা দ্রুতগতিতেই চলে যায়, আমারও তার ব‍্যাতিক্রম হচ্ছে না। প্রজেক্টে আমার দায়িত্ব এতোটাই বেড়ে গেলো যে, সাধারণ জিনিস পত্র যেমন- বালু, সিমেন্ট, রড থেকে শুরু করে স্টেশনারি, বিদেশী বিয়ার আরো কতো কি সব কিছুর দায়িত্ব আমাকেই নিতে হয়। মি: কিম আমাকে ভিশন পছন্দ করেন ফলে আমার অভিজ্ঞতার চেয়ে দায়িত্ব অনেক বেশি হয়ে গেলো সেই সাথে বেড়ে গেলো আমার সুযোগ সুবিধাও। কন্টাক্টর'রা আমার পিছনে লেগেই থাকতো এই ভেবে যে আমাকে কি ভাবে খুশি করা যায়। মি. কিম একটা বদের হাড্ডি ছিলো, হন্দাই কোম্পানির দ্বিতীয় পজিশনের ব‍্যাক্তি মি. কিম। কিম সপ্তাহে দুই তিনদিন প্রজেক্টে আসতো, বলতে গেলে আমাকেই চালাতে হতো বাকি কাজ কর্ম। আমি মাঝে মধ্যে হতবাক হয়ে যেতাম কন্ট্রাক্টরদের বিলের নমুনা দেখে। একই বিল দুই তিন বার সাবমিট করেছে বিলের জন্য, কতবার ধরেছি। বসের এই নিয়ে কোনো মাথা ব‍্যাথা নাই, যে কোন বিল'ই সে অনুমোদন দিয়ে দিতো। এতো কাঁচা টাকার মধ্যে নিজেকে সৎ রাখা বড় চ্যালেঞ্জ এর কাজ আর সেই কাজটা আমি শতভাগ সততার মধ্যে করে যাচ্ছি। সততাই যেহেতু আমার সম্পদ তাই সততার সাথে কাজ করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। হন্দাই কোম্পানিতে আমার কাজের পরিবেশ ও কাজের সূত্র ধরেই বলছি সমাজ ব‍্যবস্হায় চতুর্দিকে যদি ৯০% অসৎ হয়ে যায় তখন নিজেকে বিব্রত হতে হয় প্রতি পদে পদে, এখানে মাঝে মাঝে আমার সেটাই হচ্ছে। জীবনভর যে মানুষটা কাচা টাকার লোভ সামলাতে পারে সেইতো প্রকৃত মানুষ। আমার সময় গুলো চলছে তার নিজস্ব গতিতে। মাঝে মধ্যে আমার বন্ধু বাবুল এবং অজয় ভুয়াপুর বেড়াতে আসত আমাদের মেইন প্রজেক্টে যেখানে ব্রীজের পাইলিং কাজ হচ্ছে। একদিন বাবুল একা আসলো প্রজেক্ট ঘুরতে বাবুল সারাদিন আমার সাথে, রাতে ফিরে আসলাম আমার ভুয়াপুর বাসায়। আমার রুমমেট টাঙ্গাইলের ছেলে অসীম, খালি গাজা খায়, এমনকি গাজা বানিয়ে নিয়ে অফিসেও যেতো। পৃথিবীতে গাঁজা খাওয়ার উপরে যদি কেউ অ্যাওয়ার্ড পেত তাহলে সেটা অসীম পেত কারণ অসীম এমন গাঁজা খায়। যে জন্য অসীমের কথা আসলো ঐ রাতে অসীম এমন পটানো দিল বাবুলরে, রাতে খাওয়ায়ে দিলো-কি এক কান্ড? প্রজেক্ট আর ভুয়াপুর সব মিলিয়ে এক অস্হির জীবন।

ইতিমধ্যে রেজাল্ট হয়ে গেছে, মোটামুটি বলা যায় বন্ধুরা সবাই ঢাকা চলে আসলো। ঢাকা আসলো জুয়েল, পপি, অপেল, শামীম আরও অনেকে। যথারীতি সব ফরমালিটিস শেষ করে আমার ভর্তির পর্ব শেষ হলো। জুয়েলের কাছ থেকে নোট নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে গেলাম আমি। একদিকে চাকরির ব্যস্ততা অন্যদিকে পড়ালেখা সব মিলিয়ে এক দুর্বিসহ জীবন আমার। প্রজেক্টে যারা কাজ করে তারাই জানে বাস্তবতাটা কি? যদিও টাকা পয়সার কোন অভাব নাই প্রজেক্টে। মা বাবার জন‍্য বাড়ীতেও মাঝে মধ্যে টাকা পাঠাচ্ছি, একটু চেষ্টা করা তারা যেনো ভালো থাকে। একটি কথা বলে রাখা ভালো, হটাৎ করে কেউ যদি বেশী টাকা পয়সা ইনকাম করে ঐ টাকার আলাদা একটা প্রতিক্রিয়া হয়, শরীর গরম গরম লাগে, খরচের হাত গুলো বেড়ে যায়, নতুন নতুন বন্ধু বান্ধব তৈরি হয়। কিছুটা আত্ম অহংকার বোধের জন্ম হয় আর আমি যেহেতু রক্ত মাংসে গড়া মানুষ, আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলো না। আমারও একই অবস্থা হলো, হাত খরচ বেড়ে গেলো, নতুন নতুন অনেক বন্ধু বান্ধব হয়ে গেলো, মান সন্মানের মাত্রও বেড়ে গেলো। হটাৎ হটাৎ মাইন্ড করা শিখে গেলাম যেটা আমার কখনই ছিলো না। সত্যিকারের মানুষ হতে গেলে অর্থ মুদ্রা যদি জীবনের গতিবিধি, আদর্শ পরিবর্তন করে তাহলে সেই অর্থ হয়ে যায় অনর্থের মুল আর আমার সেটাই হয়েছে। একদিন আমার বস মি. কিম এর সাথে ঢাকায় আসার পথে, অনেক আলোচনার মধ্যে বস আমাকে হটাৎ করে বলে উঠলো তোমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বান্ধবী নাই। আমি বললাম কেন থাকবে না? অনেক আছে, সে বললো আজ সন্ধ্যায় ওদের নিয়ে আসো গুলশানে ওদের ডিনার করাব। ভাবলাম বস আমাকে অনেক ভালোবাসে তাই হয়তো। আমি বাবুলকে বললাম ও চার পাচ জন বান্ধবীকে বললো, কথা মতো সামসুন্নাহার হলের সামনে আমার প‍্যাজারো জীপ নিয়ে গেলাম। বাবুল সহ চার জন বান্ধবী গাড়ীতে উঠলো আর আমি বসলাম গাড়ীর পিছনের ডেক সেটে চললাম গুলশানে বসের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। আথীয়তা ছিলো অন‍্য রকম, রাতে বেশ খাওয়ালো আমার বস অত্যাধুনিক ডিনার তাই সাথে বেয়ারও ছিল। রাতে ডিনার শেষে চলে আসলাম আসার সময় বস ওদের সবার ঠিকানা রাখলো। আমি যথারীতি ওদের হলে নামিয়ে পরের দিন সকালে টাঙ্গাইলের প্রজেক্টে চলে গেলাম। দুই তিন পরে যমুনা ব্রীজের পাইল উদ্ভোদন আর এই উদ্ভোধক হিসাবে থাকবেন মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী জনাব অলি আহম্মেদ ফলে আমার কাজের চাপ আরো বেড়ে গেলো। তাই আমি আর ঢাকা আসতে পারলাম না। মন্ত্রী আসবেন সেই উপলক্ষ্যে এক এলাহী কান্ড যার পুরোটাই ব্যবস্থা করতে হবে আমাকে, যথারীতি মন্ত্রী আসলেন যমুনা ব্রীজের পাইলিং উদ্ভোদন করলেন। মন্ত্রীর সাথে আমার বস চলে আসলো ঢাকায়, আমাকে আর আসতে দিলেন না। আমি রয়ে গেলাম ভুয়াপুরেই।

মি. কিম আমার বস যে বদ তা টের পেলাম দুই সপ্তাহ পরে যখন আমি টিএসসিতে ঔ বান্ধবীদের সাথে দেখা করলাম। ডাকসু কালচারাল রুমে বিকালে ওরা আড্ডা দেয়। ওদের মধ্যে একজন বললো তোর বস খুব বাজে, আমি বললাম কেনো? কি হয়েছে? গত সপ্তাহে তোর বস এসে আমায় স্লিপ পাঠিয়েছিলো, আমি বের হয়েছি, গাড়িতে উঠতে বললো একটু বিশ্ববিদ্যালয় ক‍্যাম্পাস দেখার জন‍্য আসলাম। আমি গাড়ীতে উঠার পর তোর বস আমাকে কুপ্রস্তাব দেয় তখন আমি চিৎকার করে উঠি, ভয় পেয়ে আমাকে নীলক্ষেত মোরে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আমার বান্ধবী আমাকে বলছে আর কান্না করছে সবার সামনে। ওর কথা শুনে আমি আর বাবুল তো হতোভম্ব হয়ে গেলাম, কয়েক মিনিটের জন‍্য কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে রইলাম। ভীষন রাগ হতে লাগলো আমার বসের উপর, আমি আর দেরি করলাম না ঐ রাতে চলে গেলাম ভুয়াপুর। সকাল সাতটার মধ্যে প্রজেক্টে আমি হাজির হয়ে গেলাম, অপেক্ষা শুধু বসের জন‍্য অবশেষে বস আসলেন আমার ঐ বাস্টার্ড বস। অপেক্ষা করলাম না এক মিনিটও বস আসা মাত্রই নাকের উপরে দিলাম এক ঘুসি, সাথে লাথিও দিলাম একটা, ইতিমধ্যে রাতে আমি রিজাইন লেটার লিখে রেখেছিলাম, ছুড়ে দিলাম তার মুখের উপর সাথে প্রজেক্টের চাবি গুলো, আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো Bastard, I hate you. চলবে...

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71