সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯
সোমবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৬
সর্বশেষ
 
 
হতবাক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা
ঐতিহ্যবাহী মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দে ‘নাছিম ওসমান স্নানঘাট’
প্রকাশ: ০৯:১৩ am ১৭-০৪-২০১৬ হালনাগাদ: ০৯:৩৮ am ১৭-০৪-২০১৬
 
 
 


নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে সনাতনধর্মীয় সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান দুইটির মধ্যে একটি হলো নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ, অপরটি সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ ধাম। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জগতের সকল পবিত্র স্থানের জল ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস- তখন নদীর জল স্পর্শ মাত্রই সকলের পাপ মোচন হয়। তাই প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত অষ্টমী তিথিতে এই তীর্থস্থানে পূণ্যস্নান করতে আসেন পাপমুক্ত হয়ে পূণ্যলাভের আশায়। তবে এই ঐতিহ্যবাহী পবিত্র হিন্দু তীর্থস্থানটির একটি স্নানঘাটের নামকরণ স্থানীয় এমপির নামে ‘নাছিম ওসমান স্নানঘাট’ করায় উঠেছে বিতর্ক। চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তদের মাঝে।

 

লাঙ্গলবন্দের ইতিহাস:

এই লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সম্পর্কে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরাণ মতে, জমদগ্নি নামের এক মুনি পিতৃভক্তি পরীক্ষা করার জন্য তাঁর চার ছেলেকে তাদের মা রেনুকাকে হত্যা করার আদেশ দেন। কিন্তু চার ছেলে এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরাম কুঠার দিয়ে মাকে দ্বিখণ্ডিত করে। তাঁর পিতৃভক্তিতে প্রসন্ন হন জমদগ্নি মুনি। এরপর মন্ত্রবলে মুনি তাঁর সহধর্মিনীর দেহে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়ে জীবিত করে তোলেন। কিন্তু মাতৃহত্যার শাস্তিস্বরূপ কুঠার পরশুরামের হাতেই লেগে থাকে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও কুঠার হাত থেকে ছাড়ানো যায়নি। মাতৃহত্যার পাপে আক্রান্ত হয় পরশুরাম। এ পর্যায়ে পিতা জমদগ্নি তাঁর পুত্র পরশুরামকে তীর্থ ভ্রমণের আদেশ দেন। যে তীর্থে তার হাতের কুঠার খসে পড়বে, সে স্থানই হবে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান।

এরপর পরশুরাম তার কুঠার লাঙ্গলবদ্ধ করে পর্বতের মধ্য দিয়ে চালাতে থাকেন। সেই লাঙ্গলের ফলায় তৈরি পথ ধরে সৃষ্টি হয় ব্রহ্মপুত্র নদের। ওই পথ ধরে চলতে থাকেন পরশুরাম নিজেও। এভাবে অনেক দিন পর নারায়ণগঞ্জের বর্তমান স্নানঘাটে এসে লাঙ্গলটি আটকে যায়। হিমালয় থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহে ওই স্থানে স্নান করে পাপমুক্তি ঘটে পরশুরামের। খসে পড়ে হাতের কুঠার। অর্থাৎ পরশুরামের লাঙ্গলের ফলা থেমে যাওয়া বা বন্ধ হওয়া থেকেই এ স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্ধ। কালক্রমে তা স্থানীয়দের উচ্চারণ বিবর্তনে ওঠে লাঙ্গলবন্দ। সেই থেকে পুণ্যার্থীদের কাছে স্থানটি লাঙ্গলবন্দ নামেই পরিচিত।

 

লাঙ্গলবন্দের বর্তমান অবস্থা:

মহাতীর্থ লাঙ্গলবন্দ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার গা ঘেষে প্রবাহিত আদি ব্রহ্মপুত্রের সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবস্থিত। অন্যান্য তীর্থের মতো এই তীর্থেরও জন্মের সন তারিখ নির্ণয় করা অসম্ভব। ত্রেতাযুগ থেকেই লাঙ্গলবন্দ মহার্তীথ হিসেবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে নমস্য। লাঙ্গলবন্দে বর্তমানে মোট ১৬টি স্নানঘাট রয়েছে। এই ঘাটগুলির পাশাপাশি সেখানে রযে়ছে ১০টি মন্দির ও কয়েকটি আশ্রম। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড কর্তৃক ২০১৩-২০১৪ সালে বরাদ্ধকৃত প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি স্নান ঘাটে টাইলস বসানো হয়েছে। এছাড়া মহিলাদের জন্য চেঞ্জিং রুম, নতুন পানির পাইপ বসানো সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে। অষ্টমী স্নানের সামগ্রিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্দ্যোগে ৩৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি রয়েছে যারা নিম্নোক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকেন:

  • লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব এলাকা প্রায় ৩ কিলোমিটার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতাধীন থাকে
  • আইন-শৃংখলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ ফোর্স নিযোগ করা হয়
  • ডুবুরীসহ ফায়ার সার্ভিস ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয় এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোও স্বেচ্ছাসেবী ডুবুরী প্রস্তুত রাখে
  • তীর্থ যাত্রীদের জরুরী স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের জন্য মেডিক্যাল টিম ও এ্যম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করা হয়  
  • এছাড়াও পূণ্যার্থীদের পানীয় জলের জন্য মোট ৪৫টি টিউবওয়েল, ৩০টি খাবার পানির ট্যাংক ব্যবস্থা রাখা হয়
  • ঘাট সমুহ সংস্কার ও মেরামত করা হয়
  • কচুরীপানা অপসারণ করা হয়
  • নদীতে মাছ ধরার স্থাপনা সরানো হয় এবং
  • স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

     

 

সাম্প্রতিক বিতর্ক:

সম্প্রতি হিন্দু তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দের একটি স্নান ঘাটের নাম দেয়া হয়েছে স্থানীয় এম.পি নাছিম ওসমানের নামে। যেখানে অন্যান্য ঘাটগুলোর নাম অন্নপূর্ণা ঘাট, রাজঘাট, বরদেশ্বরী ঘাট, গান্ধীঘাট, জয়কালী ঘাট, পাঠানকালী ঘাট, শ্রীরামপুর ঘাট, কালীবাড়ী ঘাট, কালীদহ ঘাট, শঙ্কর ঘাট, শিখরী ঘাট ও রক্ষাকালী ঘাট। এই নামকরণের পরে প্রশ্ন উঠেছে, যেহেতু এটি একটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান, সেহেতু এখানকার ঘাটের নামগুলোতে সনাতন ঐতিহ্য বা ধর্মীয় ছোঁয়া থাকা বাঞ্ছনীয়। বাকি ঘাটগুলোর নামে সনাতনধর্মীয় ছোঁয়া থাকলেও এই ঘাটের নামটি কোনোভাবেই বাকি নাম এবং স্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এনিয়ে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তদের মাঝে। জানা যায়, স্থানীয় এমপি নাছিম ওসমান খুব প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ সাহস করে জোরালো প্রতিবাদ করতে পারছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় ভক্ত বলছিলেন, “সনাতন ধর্মীয় তীর্থস্থানের একটি ফলকের শুরুতেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখাটা দেখেই খটকা লাগে। তার ওপর স্নানঘাটের নামকরণটা এই পবিত্র মহাতীর্থস্থানের ঐতিহ্যের সাথে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জ-০৫ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্যের নাম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘নাছিম ওসমান স্নানঘাট’। ‘নাছিম ওসমান স্নানঘাট’ আমাদের এমপি হন কিভাবে?” তিনি আরও বলেন, “এই ঘাট তো এমপি সাহেব নিজের টাকায় সংস্কার করে দেননি। বাংলাদেশ সরকারের ট্যুরিজম বোর্ড এটা সংস্কার করে দিয়েছে। তবে কেন এমপির নামে নামকরণ করা হবে? এটা অবশ্যই সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নাম হওয়া উচিত।”

 

এইবেলাডটকম/এআরসি/এমআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

Editor: Sukriti

E-mail: news@eibela.com, news.eibela@gmail.com Editor: sukritieibela@gmail.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71