সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১
সোমবার, ৩রা কার্তিক ১৪২৮
সর্বশেষ
 
 
চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য
প্রকাশ: ০৪:৫৮ pm ০২-০৮-২০২১ হালনাগাদ: ০৪:৫৮ pm ০২-০৮-২০২১
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


'পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। চীন কখনোই আধিপত্যকামী হবে না। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাবে না'- কথাগুলো শুনলে যে কারও মনে হতে পারে, বিশ্বের সবচাইতে বড় গণতন্ত্র মনস্ক ব্যক্তি এই মন্তব্যগুলো করেছেন। কিন্তু আসলে এই মন্তব্য চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের। চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এসব মন্তব্য করেন তিনি। তাইওয়ানের আকাশ সীমানায় বিমান পাঠিয়ে ও সমুদ্র সীমায় যুদ্ধ জাহাজ পাঠালেও বিষয়টিকে সম্ভবত 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছে না চীন। একই চিত্র হংকংয়ে। সম্প্রতি চীনের বন্ধুত্বের কল্যাণে বন্ধ হয়ে গেছে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী পত্রিকা অ্যাপল ডেইলি।

চীন সমুদ্র সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ চীন সাগর এবং সেখানকার কয়েকটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করছে। সেখানে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর আইনগত অধিকার থাকা সত্ত্বেও চীন ওই অঞ্চলকে তার একক বলেই দাবি করছে। যার জন্য বর্তমানে ওই অঞ্চলের প্রায় ২০টি দেশের সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান। এ ছাড়াও ইন্দো প্যাসিফিক, এমনকি বঙ্গোপসাগরেও আধিপত্য বিস্তার করাকে লক্ষ্যের মধ্যে রেখেছে চীন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত তাদের নৌ-শক্তির আওতায় আনার উদ্দেশ্য নিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। এই লক্ষ্যে ওখানকার পোর্টগুলোকে নেভাল বেইজে রূপান্তরিত করার যাবতীয় কাঠামোও তৈরি করে ফেলেছে চীন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সাগর ও সাগরতলের সম্পদ সব দেশের সম্পদ হওয়ায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নৌ-শক্তিতে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়া চীনের আগ্রাসী ভূমিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। চীনের এই আগ্রাসন মোকাবিলা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট কোয়াড সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জোট হিসেবে কোয়াডের উত্থানকে তাই চীন নিজের জন্য হুমকি মনে করছে। অন্যদিকে সমগ্র বিশ্বের ধারণা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যে আচরণ করছে, নৌশক্তি আরও বাড়িয়ে ইন্দো প্যাসিফিকে এসেও ঠিক একই আচরণ করবে। চীনের এই নৌপথ দখল ও সামরিক আধিপত্য ঠেকাতে একমাত্র কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে চার শক্তির সামরিক জোট কোয়াড।

ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত কোয়াড্রিলেটরাল সিকিউরিটি ডায়লগ (কোয়াড)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক না থাকলেও বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অধিকার-বহির্ভূত কথা বলেছেন এ দেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয় চীনকে। এ বিষয়ে কথা বলার কোনও এখতিয়ার চীনের নেই বলেও জানানো হয়। কিন্তু চীনের পররাষ্ট্র বিভাগ জানায়, কোয়াড চীনকে বাদ দিয়ে গঠন করায় এই বিষয়ে যেকোনও মন্তব্য করার অধিকার চীনের রয়েছে (!)। বেশ অদ্ভুত এক যুক্তি!

চীনের এমন বন্ধুত্ব অবশ্য বিশ্বজুড়ে রয়েছে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও মিয়ানমার চীনের বন্ধুত্বের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সম্প্রতি এই বন্ধুত্বের উষ্ণতা কিছুটা অনুভব করা শুরু করেছে আফগানিস্তান।

চীন পাওয়ার পলিটিকসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায় শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে। সে ক্ষেত্রে চীনের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা 'সুপার পাওয়ার পলিটিকস' কে ঘোচাবে? বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে কে?

পাকিস্তানের জঙ্গিবাদী চেতনা ও আচরণ নিয়ে কখনই কোনও মন্তব্য করেনি চীন। সেই সঙ্গে চীনে উইঘুর মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যাতন নিয়েও কখনও পাকিস্তান বিরূপ মন্তব্য করেনি। ইমরান খানের শাসনামলে পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন। শি জিনপিং সরকারের কাছে ইমরান খানদের মোট ঋণের পরিমাণ দেশটির বার্ষিক বাজেটের প্রায় ৩ গুণ। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে থাকা পাকিস্তানে নতুন কোনও বিনিয়োগ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। যার শতভাগ সুযোগ নিয়েছে চীন। দেশটির ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে মুসলিম নির্যাতন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন বিষয়ে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নগ্ন হস্তক্ষেপ নিয়েও কথা বলতে পারছেন না ইমরান খান।

একই চিত্র শ্রীলঙ্কায়। ঋণের বোঝার নিচে চাপা পড়ে শ্রীলঙ্কা তার একটি সমুদ্রবন্দর দীর্ঘ মেয়াদে চীনকে অনেকটা 'বন্ধক' দিতে বাধ্য হয়েছে, যা নিয়ে ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের টানাপড়েন চলছে দেশটির। মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একসময় চীনের নগ্ন হস্তক্ষেপের ফলে ডলারের বদলে সরাসরি চীনের মুদ্রায় বাণিজ্য চলে কিছু দিন। নেপালের সীমান্তে অবস্থিত একটি গ্রাম দখল করে নিয়েছে চীন। গত বছরজুড়ে থেমে থেমে ভারতের সীমান্তেও সংঘর্ষ চালিয়ে গেছে চীন। এসব আচরণকেও হয়তো শি জিনপিং 'আধিপত্যবাদী' আচরণ হিসেবে দেখছেন না।

তবে অর্থনৈতিক এসব আধিপত্যবাদের থেকেও বড় একটি বিষয় এখন কপালে ভাঁজ ফেলছে বিশ্বনেতাদের। বিশ্বের ১৬০টি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলাতে যাচ্ছে চীন। ওই সব দেশে ক্ষমতায় থাকা সরকারের 'পাওয়ার পলিটিকস' হয়তো সহ্য করবে না চীন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সরকারি দলকে পাশ কাটিয়ে ছোট, মাঝারি অন্য দলগুলোর সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখছে সিপিসি।

দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় শঙ্কার বিষয় আফগানিস্তান। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। এই সুযোগে আবারও দেশটির ক্ষমতা দখলে নিতে চাইছে তালেবান। যেখানে দেশটিতে তালেবানের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্ব, তখন জঙ্গিবাদী তালেবানদের সহায়তায় পাশে দাঁড়াচ্ছে চীন! পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো দুটি দেশে জঙ্গিদের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে ঘাঁটি তৈরি হলে বিষয়টি শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বরং বিশ্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। প্রশ্ন হলো, কোন সৎ (!) উদ্দেশ্যে চীন তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে সেই সুযোগ সবচাইতে বেশি ভোগ করবে কোন দেশ?

তালেবানের পুনরুত্থান আফগানিস্তানকে আবার বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসছে। পরাশক্তিগুলোর নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ভারত, চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশকে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষতে হচ্ছে। দুই দশক পর আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে দেশটির নিজেদের প্রধান বিমান ঘাঁটি থেকে সেনা সরিয়ে নিয়েছে তারা। এরপরই আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের দখল নেওয়া শুরু করেছে কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী তালেবান। দেশটিতে তালেবান ক্ষমতায় এলে সংকটে পড়তে পারে কিছু দেশের স্বার্থ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা যত বাড়ছে, গোষ্ঠীটির সঙ্গে নানা দরকষাকষি ও বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো।

আফগানিস্তানের প্রধান কয়েকটি শহর দখলের পর বুধবার প্রথমবারের মতো তালেবানের কোনও শীর্ষ নেতা হিসেবে চীন সফর করেছেন দলটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা আবদুল ঘানি বারাদার।

দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহর তিয়ানজিনে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঘানি বারাদারের নেতৃত্বে নয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। এ সময় ওয়াং ই বলেন, ‘তালেবান আফগানিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। দেশের শান্তি, সংহতি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়াতেও গোষ্ঠীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রতিবেশী চীনের প্রায় ৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। ওয়াখান করিডর নামে ওই অঞ্চলটি পড়েছে চীনের উইঘুর মুসলমান অধ্যুষিত শিনজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, উইঘুরদের বিভিন্ন ক্যাম্পে আটকে রেখে নিপীড়ন চালাচ্ছে চীন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিনজিয়াংয়ের স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম)।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক র‍্যান্ড করপোরেশনের বিশ্লেষক ডেরেক গ্রসম্যান ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তী আফগানিস্তানে আরেকটি কারণে নিজের অবস্থান সংহত করতে চাইছে চীন। সেটি হলো দেশটির পার্বত্যাঞ্চলে মাটির নিচে থাকা ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ। চীন এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে চায়। এ ছাড়া আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল থেকে পাকিস্তানের পেশওয়ার শহর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীন। এটি চীন ও পাকিস্তানকে যুক্ত করবে। এর ফলে চীনের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হবে কাবুল।

আফগানিস্তানে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভারতকেও এক হাত দেখে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো যখন আফগানিস্তানে তালেবানদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে 'তালেবানদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না' এমন বার্তা দিচ্ছে, তখন বিনা বাক্যব্যয়ে তালেবানদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে চীন। কারণ একটাই। আফগানিস্তান থেকে যেন উইঘুর ও ইস্ট তুর্কেমিনিস্তানের নির্যাতিত মানুষগুলো কোনও সহায়তা না পায়। সেই সঙ্গে তালেবানদের সহায়তায় চীনের কথা না মানা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যেন অস্থিরতা সৃষ্টি করা যায়, সেই পরিকল্পনায় হয়তো করছেন শি জিনপিং।

ইতোমধ্যে চীনের পাওয়ার হাইড্রো প্রজেক্টগুলোর কারণে পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারত। সামনে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের নামে বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে চীন। সমুদ্রসীমা, আকাশসীমা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সব নিয়ম অমান্য করে বারবার নিজ আগ্রাসনের বার্তা দিচ্ছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পাশাপাশি এই আগ্রাসন বিস্তৃত আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলো পর্যন্ত। চীনের আগ্রাসী আচরণকে হুমকি হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করলেও কোনও পরোয়া নেই চীনের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পর সবচাইতে সুসংহত এক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। সেই যুদ্ধ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত বিশ্ব? সূএ: বাংলা ট্রিবিউন

ফারাজী আজমল হোসেন

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2021 Eibela.Com
Developed by: coder71