সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
সোমবার, ৮ই ফাল্গুন ১৪২৩
সর্বশেষ
 
 
রসরাজ-এর জামিন হওয়া উচিত: শিতাংশু গুহ
প্রকাশ: ০৪:৫৩ am ১২-০১-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:৫৮ am ১২-০১-২০১৭
 
 
 


শিতাংশু গুহ ||

রসরাজ কারাগারে। তার জামিনের শুনানি সোমবার ১৬ জানুয়ারি। আগেও জামিনের শুনানি হয়েছে, জামিন হয়নি, সামনের সোমবার যে হবে এর কোনো গ্যারান্টি নেই। কিন্তু কেন, রসরাজের জামিন হচ্ছে না কেন? ঘাপলাটা কোথায় এবং কারা করছেন? দেশবাসী মোটামুটিভাবে নিশ্চিত যে রসরাজ নির্দোষ, তাহলে তার জামিন হচ্ছে না কেন বা তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ প্রত্যাহার হচ্ছে না কেন? হয়তো একদিন রসরাজ ছাড়া পাবেন, তাকে নিয়ে মিছিল হবে, তিনি রাজনীতিকও হয়ে যেতে পারেন, হয়তো রসরাজ ছবি বিশ্বাসের মতো বলবেন, ‘ফিরিয়ে দাও আমার জেলের দিনগুলো’। জেলের দিনগুলো তো আর ফিরবে না কিন্তু যে প্রশ্ন এখন উঠেছে, ‘রসরাজের গ্রেফতার কি বেআইনি নয়’, এর উত্তর কে দেবে? পুলিশের কাছে অবশ্য উত্তর আছে, ‘রসরাজের নিরাপত্তার জন্যই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।’ মোক্ষম যুক্তি, এরপর কথা চলে না। আচ্ছা, পুলিশ রসরাজকে নিরাপত্তা না দিলে কি হতো? পুলিশ কিন্তু রামুর উত্তমেরও নিরাপত্তা দিয়েছিল, উত্তম এখন কোথায়? পার্থর কথা না-ই বা তুললাম।

এর আগে রসরাজের জামিন নিয়ে দুটি শুনানি হয়েছে, ৮ নভেম্বর ২০১৬ এবং ৩ জানুয়ারি ২০১৭। তিনি গ্রেফতার হন ২৯ অক্টোবর, তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে। এই আইনটি ৫৭ ধারা নামে পরিচিত এবং এটিকে অনেকেই অঘোষিত ‘ব্লু্যাসফেমি’ বলে আখ্যায়িত করছেন। এই আইনটি যথাযথ প্রয়োগের চেয়ে অপপ্রয়োগ বেশি হয়েছে। ইতিমধ্যে এটি বাতিলের দাবিও উঠেছে। পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন) এর প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এবং স্পষ্ট করেই বলেছে, রসরাজের ফেসবুক থেকে পোস্ট করা ‘কাবার ওপর শিব’-এর ছবিটি তার সেলফোন ও মেমোরি কার্ডে পাওয়া যায়নি। তবে সেটি পাওয়া গেছে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আল-আমিন সাইবার পয়েন্ট ও স্টুডিওর কম্পিউটারে, কিন্তু সেটি সম্পাদনের পর মুছে ফেলা হয়েছে। এদিকে ভালো সংবাদ হচ্ছে, দেরিতে হলেও পুলিশ হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখিকে গ্রেফতার করেছে। রিমান্ডে নিয়েছে। তাকে নাসিরনগর হামলার মূল হোতা বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। গ্রেফতার হয়েছে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মো. সুরুজ আলী। দেখা যাক, ঘটনাপ্রবাহ কোন দিকে গড়ায়!

নাসিরনগরে দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে অনেকেই সেখানে গেছেন। সর্বশেষ গেলেন সুইডিশ রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেছেন, খেয়াল রাখতে হবে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। কিন্তু এর গ্যারান্টি কে দেবে? একের পর এক ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। সদ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা গোপালগঞ্জে একটি মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। সেখানকার মানুষ এখন প্রতিবাদী এবং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন তা বলা বাহুল্য। আচ্ছা, সংসদ সদস্যরা যদি তৎপর হন তাহলে কি এসব বন্ধ হতে পারে না? পারে, তবে কিছু কিছু সংসদ সদস্য নিজেরা এসবের সঙ্গে জড়িত থাকেন এমন অভিযোগ বারবার মিডিয়ায় এসেছে। ধারণা করি, গোপালগঞ্জ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী কঠোর ব্যবস্থা নেবেন, অন্য এমপিরা তা দেখে শিখবেন বা অনুসরণ করবেন। বাংলাদেশে এমপিরা নিজ নিজ এলাকায় এক একজন রাজা, সব প্রশংসা তারা পেয়ে থাকেন, তাহলে তার এলাকায় খারাপ কিছু ঘটলে এর দায়িত্বও তাকে নিতে হবে। কজন এমপি গত তিন বছরে তাদের এলাকায় সম্প্রীতি নষ্ট হলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে বক্তব্য দিয়েছেন?

তখন ছোট থাকলেও আমার মনে আছে, ১৯৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকালে চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের জনসভায় নেতারা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এই যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানের পক্ষে কিন্তু হিন্দুদের ওপর যেন কোনো অত্যাচার না হয়। পাকিস্তান সরকার তখন হিন্দুদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু ব্যবস্থা নিলেও জনগণ সেটা সমর্থন করেনি। বাংলাদেশ হওয়ার পর আমরা অমন বক্তব্য আর শুনি না। তাই হয়তো অত্যাচারের স্টিমরোলার প্রতিদিন বাড়ছে। নাসিরনগরে মৌলবাদীরা যখন ফুঁসছেন, মন্ত্রী তখন ঢাকায় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী যদি আমেরিকা থেকে ঢাকায় অফিস করতে পারেন, তাহলে মন্ত্রীর জন্য ঢাকায় বসে নাসিরনগরের ঘটনা সামাল দেয়া খুব কঠিন কাজ ছিল না। সামাল তো দূরের কথা, তিনি বরং উস্কে দিয়েছেন। বলা হচ্ছে, নাসিরনগরের ঘটনা আওয়ামী লীগের দুই নেতার মধ্যকার দ্ব›েদ্বর ফসল? কেউ কেউ মোক্তাদির সমর্থকের দিকে আঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। পুলিশের গাফিলতির কথাও বলছেন। মন্ত্রীর কথা-সাফাই আমরা বহুবার শুনেছি, কিন্তু রবিউল মোক্তাদীদের কথা ততটা শুনিনি, কদিন আগে তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ ও আমাকে সাম্প্রদায়িক বানানোর অপচেষ্টা চলছে।’

একটি ঘটনা বলি, ওই সময়কার ছাত্রলীগ নেতারা সবাই তা জানেন : ওবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী রবিউল ১৯৭৩/৭৪-এ বলাকা সিনেমা হল সংলগ্ন ছাত্রলীগ অফিসে বসে একজন হিন্দু নেতাকে ‘মালাউন’ বলেছিলেন। সেই বঙ্গবন্ধুর আমলে তখন সেটা নিয়ে যথেষ্ট হৈচৈ হয়। শেখ শহীদ, ইসমাত কাদির গামা, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শেখ কামাল বা খালেদ খুররম ও অন্য নেতারা এটি নিয়ে দরবার করেছেন। তখনকার হিন্দু ছাত্রনেতাদের অনেকেরই যাতায়াত ছিল আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও আবদুর রাজ্জাকের বাসায়, তারা ওই সময় এ নিয়ে যথেষ্ট সোচ্চার ছিলেন। বড় বড় নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটে কিন্তু মোক্তাদির রবিউলকে হিন্দুরা আর কখনোই বিশ্বাস করেনি। এবারকার নাসিরনগরের ঘটনার পর মন্ত্রী বা মোক্তাদির দুজনের প্রতিই সম্ভবত স্থানীয় সংখ্যালঘুরা আস্থা হারিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী যতবারই বলুন না কেন, তিনি ‘মালাউন’ বলেননি, ভুক্তভোগীরা বলেছেন অন্য কথা। লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনাটি ঘটেছিল নিউইয়র্কে এবং বিশ্বাস ভঙ্গ করে টেপ ছেড়েছেন বড় নেতা; কিন্তু নাসিরনগরের ঘটনা মন্ত্রীর বাসা কাম অফিসে এবং সেটা নাসিরনগর, কার ঘাড়ে কটি মাথা যে মন্ত্রীর কথা টেপ করে?

যা হোক, বড় বড় নেতাদের কথা বাদ দেই, আমরা গরিব রসরাজ-এর কথায় ফিরে আসি। রসরাজ জেলে পচলে ক্ষতি সিস্টেমের। রসরাজ বাইরে থাকলে কারোরই ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সমাজের জন্য তিনি বিপজ্জনক নন। সমাজের জন্য ক্ষতিকারক মৌলবাদীরা দিবালোকে সবার সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন কি বিশ্বজিৎ হত্যার দায়ে দণ্ডিত আসামিকে জনসভায় দেখা যায়, তাহলে নিরপরাধ রসরাজ জেলে কেন, এ প্রশ্ন স্বাভাবিক? রসরাজের মুক্তির জন্য একমাত্র শাহরিয়ার কবিরকে কেন চিল্লাতে হবে, দেশে কি আর কেউ নেই? সোস্যাল মিডিয়ায় রসরাজের জন্য সাধারণ মানুষের আকুতি আছে কিন্তু সাধারণের কথা কে শোনে? দেশে বড় বড় দল বা সংগঠনগুলোর সাড়াশব্দ নেই কেন? দেশে আওয়াজ উঠছে না কেন যে, ‘রসরাজের মুক্তি চাই’? আর এখানে তো রসরাজের মুক্তি নয়, শুধু জামিন চাওয়া হচ্ছে, বাধা কোথায়? বাধা সম্ভবত ৫৭ ধারা? শুধু রসরাজ নয়, সম্ভবত ৫৭-ধারা থেকেও মুক্তি চাওয়ার সময় এসেছে। স্বাধীনতা সনদে সব কালো আইন বাতিলের অঙ্গীকার ছিল কিন্তু শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হয়নি, বরং জেঁকে বসেছে। একই কারণে হয়তো ৫৭-ধারাও বাতিল হবে না, দিনে দিনে আরো জেঁকে বসবে।

নিউইয়ক থেকে

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

 

আরও পড়ুন:: ‘হিন্দুদের তাড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসিত করা হোক’

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Migration
 
আরও খবর

 
 
 

News Room: news@eibela.com, info.eibela@gmail.com, Editor: editor@eibela.com

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

Copyright © 2017 Eibela.Com
Developed by: coder71