eibela24.com
বুধবার, ০৮, এপ্রিল, ২০২০
 

 
ইরানের অবস্থা ইরাকের মতো হবে!
আপডেট: ১১:০২ am ০৭-০১-২০২০
 
 


কেউ কেউ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। কোনো যুদ্ধ হওয়ার নয়, ইরান জানে যুদ্ধ হলে এর অবস্থা ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো হবে? লক্ষণীয় যে, ইরানি জেনারেল নিহত হয়েছেন ইরাকে, তাই এটি ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়। ইরানের ইন্টেলিজেন্স দুর্বল, তাই ড্রোনের আঘাতে নিহত হন এর ডেকোরেটেড জেনারেল।

ট্রাম্প যখন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট উনের সঙ্গে মাখামাখি শুরু করেন তখন অনেকে বলেছেন, দুই পাগল এক হয়েছে। ট্রাম্প আসলে ‘জাতে মাতাল তালে ঠিক’। নতুন বছর শুরু করলেন এক ইরানি জেনারেলকে হত্যা করে, ভোটারদের বোঝালেন যে, প্রয়োজনে আঘাত হানতে বিলম্ব করবেন না? মাথার ওপর ইম্পিচমেন্ট খড়গ, নভেম্বরে নির্বাচনের কথা মনে রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সদম্ভে ঘোষণা করলেন, ‘যুদ্ধ শুরু নয়, যুদ্ধ থামাতেই তিনি ইরানি জেনারেলকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন’। একই সঙ্গে ইরানকে সতর্ক করেছেন, ‘প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করো না’। ইরান বলেছে, এক সপ্তাহের মধ্যে ‘চরম প্রতিশোধ’ নেবে। হুঁশিয়ার করে ট্রাম্প বলেছেন, দরকার হলে ইরানের ৫২টি স্থাপনায় দ্রুত ও কঠিন আঘাত হানা হবে। আমেরিকা ভুলেনি ইরান ৫২ জন মার্কিনিকে ৪৪৪ দিন বন্দি করে রেখেছিল। ৫২ স্থাপনার কথা বলে ট্রাম্প ইরানকে অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।

ইরাকের পার্লামেন্ট এক জরুরি অধিবেশনে ইরাক থেকে সব মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব পাস হয়েছে। এই প্রস্তাব বাধ্যতামূলক নয় এবং ইরাক সরকারের অনুমতি প্রয়োজন পড়বে। ট্রাম্প বলেছেন, তেমনটা হলে ইরাকের ওপর ‘ব্যাপক অবরোধ’ আরোপ করা হবে এবং ইরাককে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য ইরাকে মার্কিন সৈন্য না থাকলে পুনরায় শিয়া-সুন্নি গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। সাদ্দামের সময়ে ইরাকে ছিল সুন্নি সরকার; এখন শিয়া সরকার। এই কারণে ইরাক এবার ইরানের পক্ষে। একই কারণে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত মার্কিন পক্ষ নিয়েছে।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে বলা হতো, ‘৩-এইচ’; প্রথম এইচ হচ্ছে, হামাস এগেইনস্ট ইসরায়েল; ২য় এইচ হচ্ছে, হিজবুল্লাহ ইন লেবানন; তৃতীয়, হুতি ইন ইয়েমেন এগেইনস্ট সৌদি এরাবিয়া। কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুতে সুন্নিরা বহু জায়গায় আনন্দ প্রকাশ করেছেন। দিল্লিতে শিয়ারা কাসেম সোলাইমানি হত্যার বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছে। উল্লেখ্য, ইরান-ইরাকের পর সবচেয়ে বেশি শিয়া বাস করেন ভারতে। জার্মান বিল্ডডটডি নামের একটি নিউজ পোর্টাল বলেছে, ‘ট্রাম্প বিশ্বকে একজন দানব (মনস্টার) থেকে মুক্ত করেছেন’। এএফপি জানাচ্ছে, বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘাঁটিতে দুটি রকেট হামলা হয়েছে এবং মার্কিন দূতাবাসের কাছে দুটি মর্টারের শেল পড়েছে। কেউ দায়িত্ব স্বীকার করেনি।

মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বলেছে, আল-কুদ্স প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানি মার্কিন ক‚টনীতিক ও সেনাদের ওপর আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন, সেটি ঠেকানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ইরাক ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। বাগদাদের বাংলাদেশি দূতাবাস ইরাকে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, জেনারেল কাসেম সোলাইমানি দিল্লি ও লন্ডনে হামলার ছক কষছিলেন। এই জেনারেল মধ্যপ্রাচ্যে চৌকস, বুদ্ধিমান, ভীতিকর, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর বলে পরিচিত ছিলেন। সোলাইমানির নির্দেশে একবার পুলিশ একটি মেয়েকে হিজাব না দেয়ার কারণে জনসম্মুখে পিটিয়েছে। ওবামা আমলে বেনগাজি মার্কিন দূতাবাস আক্রমণ ও রাষ্ট্রদূতকে হত্যার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে। সোলাইমানি মানুষকে হত্যা করতে ভালোবাসত। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ইরাকে কিছুদিন আগে মার্কিন অফিসে হামলা হয়েছিল। তাতে একজন আমেরিকান নাগরিক মারা যান এবং একজন গুরুতর আহত হন, সোলাইমানির নির্দেশে ওই হামলা হয়েছিল।

‘কাউন্টার পাঞ্চ’ নামে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি নিউজ পোর্টাল বলেছে, ইসরায়েলি মোসাদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে টার্গেট করেছে, ট্রাম্প শুধু ট্রিগার টিপেছেন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানির ওপর আঘাত হানার বিষয়টি কংগ্রেসকে জানিয়েছে। নিয়ম হচ্ছে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জানাতে হয়, হোয়াইট হাউস তাই করেছে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানির স্থলাভিষিক্ত হয়ে রিভ্যুলিউশনারি গার্ডের ফরেন অপারেশন আর্মের প্রধান হয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল ঘানি। তিনি বলেছেন, একটু ধৈর্য ধরুন, মধ্যপ্রাচ্যের রাস্তায় রাস্তায় মার্কিনিদের লাশ দেখতে পাবেন।

ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ইরান জামকারান মসজিদে রক্তলাল যুদ্ধের পতাকা উড়িয়েছে। এতে লেখা, ‘যারা হোসেনের রক্তের বদলা নিতে চায়’। শিয়া সংস্কৃতিতে লাল পতাকা অন্যায় রক্তপাতের বদলা নেয়ার প্রতীক। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রতীক। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি হত্যায় বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কানাডায় বেশকিছু ইরানি রাস্তায় নেমে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। এই ইরানিরা অত্যাচারিত হয়ে কানাডায় আশ্রয় নেন এবং তারা মনে করেন এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইরানে শাসক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, মার্কিন সেনা, ক‚টনীতিক, নাগরিকদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে এমন পদক্ষেপ আমরা নিতে পারি না। ইরানে ব্রিটিশ পতাকা পোড়ানো হয়েছে। ব্রিটেন পারস্য উপক‚লে দুটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছে। রাশিয়া ফ্রান্স চীন জার্মানি এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছে। ঠিক এই সময়ে রাশিয়া ও চীন ইরানের সঙ্গে যৌথ নৌমহড়া দিচ্ছে, যা ইরানের ক‚টনৈতিক বিজয় বলে দেখা হচ্ছে।
ইরাকে মার্কিন অভিযানের পর সবচেয়ে লাভবান হয় ইরান, কারণ সেখানে এখন শিয়া সরকার। ইরাক ছিল ইরানের চির প্রতিদ্ব›দ্বী, সেই ইরাকে এখন তাদের সরকার? সুন্নিরা সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করছে, এতে ইতোমধ্যে কয়েকশ সুন্নি মারা গেছে। জেনারেল কাসেম সোলাইমানি সুন্নি বিক্ষোভ দমনে ইরাকে যাতায়াত করতেন। আমেরিকা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৩ জানুয়ারি ২০২০ সকালে বাগদাদ বিমানবন্দরের অদূরে ড্রোন আক্রমণে তাকে হত্যা করে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এর সাম্রাজ্য বিস্তারে কুর্দশ ফোর্সের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ছিলেন অগ্রদূত। সৌদির সঙ্গে ঝামেলার পর কাতার চলে যায় ইরানের পক্ষে। গাজা, সিরিয়া বা আফগানিস্তানে ইরানের প্রভাব বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সমরবিদ হিসেবে কাসেম সোলাইমানির সুখ্যাতি আছে। মার্কিন হিটলিস্টে তিনি ছিলেন দীর্ঘদিন। সৌদি আরব ও ইসরায়েলি হিটলিস্টেও তিনি ছিলেন। হিটলিস্টে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এতকাল তাকে নিয়ে খুব মাথা ঘামায়নি। স্বল্পদিন আগে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে বিক্ষোভকারীরা হামলা করে। পেন্টাগন এজন্য জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে দায়ী করে এবং প্রথম সুযোগেই হত্যা করে।

জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যু ইরানের জন্য বিরাট আঘাত। শিয়া সাম্রাজ্য বিস্তারে তিনি অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেও সুন্নি হামাস ও তালেবানকে তিনি বা তার কুর্দশ ফোর্স সাহায্য করত। ইমাম খামেনি এই জেনারেলের কপালে ‘চুম্বন’ করেছেন, এ থেকে স্পষ্ট তিনি ইরানের সর্বোচ্চ মহলে সমাদৃত। তার মৃত্যু হামাস ও তালেবানের জন্যও বিরাট ক্ষতি। ইরান এই ধাক্কা সহসা কাটিয়ে উঠতে পারবে না। বরং সামনে ইরানের জন্য কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্নটি হচ্ছে, যুদ্ধ কি হচ্ছে? উত্তর : না। তবে বাকযুদ্ধ চলছে এবং চলবে। চোরাগোপ্তা আক্রমণ ছাড়া কোনো প্রকার প্রতিশোধ নেয়া ইরানের পক্ষে অসম্ভব। সেই রিস্ক ইরান নেবে না? কেউ কেউ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুজুর ভয় দেখাচ্ছেন। কোনো যুদ্ধ হওয়ার নয়, ইরান জানে যুদ্ধ হলে এর অবস্থা ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো হবে? লক্ষণীয় যে, ইরানি জেনারেল নিহত হয়েছেন ইরাকে, তাই এটি ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়। ইরানের ইন্টেলিজেন্স দুর্বল, তাই ড্রোনের আঘাতে নিহত হন এর ডেকোরেটেড জেনারেল। ইরানের এক নেতা বলেছেন, তারা ইসরায়েলের ওপর আঘাত হানবেন। সেটি হবে ইরানের জন্য আত্মহত্যার শামিল।

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।
guhasb@gmail.com

নি এম/