eibela24.com
বুধবার, ০৫, আগস্ট, ২০২০
 

 
নওয়াপাড়ায় বাতাসে বিষ, মরছে গাছ : হুমকিতে পরিবেশ
আপডেট: ১২:২৮ pm ২৪-০১-২০২০
 
 


যশোরের শিল্প, বাণিজ্য ও বন্দর নগরী নওয়াপাড়ার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে বিষ। নাজেহাল হচ্ছে সাধারণ মানুষ। পথে ঘাটে হাটতে চলতে শ্বাস প্রশ্বাসের সাথে মানবদেহে ঢুকে পড়ছে রাসায়নিক বিষের উৎকট গন্ধ। দিন দিন অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ। এদিকে রাসায়নিক বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী শত শত গাছ। শূণ্য হচ্ছে অক্সিজেনের ভান্ডার। উত্তপ্ত হচ্ছে পরিবেশ। আর এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে জনবহুল অঞ্চলে যত্রতত্র কয়লার স্তুপের কারনে। কতিপয় ব্যবসায়ী ও জমির মালিকেরা লোভের বশবর্তী হয়ে ধ্বংস করে চলেছে পরিবেশ। ফলে গোটা পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। যদিও এ নিয়ে পরিবেশ অধিপ্তরসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কোন মাথা ব্যাথা নেই। জমির মালিকরা কোন প্রকার চাষবাষের ঝামেলা ছাড়াই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা পাওয়ার লোভে তারা কয়লার স্তুপের জন্য তাদের জমি ভাড়া দিচ্ছে। আর ঘাট মালিকরা জনবহুল এলাকা বিবেচনায় না নিয়ে ঘাটের খোলা অংশ ভাড়া দিচ্ছে কয়লা স্তুপের জন্য। ফলে গোটা পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

স্থানীয় সচেতনমহল ও সাধারণ মানুষ একের পর এক প্রতিবাদ জানিয়ে আসলেও বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কারও যেন মাথা ব্যাথা নেই। আর পরিবেশ অধিদপ্তর গা-ছেড়ে বসে আছেন। ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। জানাগেছে, শিল্প-বাণিজ্য ও বন্দর নগর নওয়াপাড়া পৌরসভা সহ ভাঙ্গাগেট, চেঙ্গুটিয়া, বুড়োরদোকান, উড়োতলা, চাঁপাতলা, প্রেমবাগ, নগরঘাট, ঘোপেরঘাট, তালতলা, রাজঘাট, মহাকাল, নওয়াপাড়া জুটমিল, লক্ষীপুর, মশরহাটিসহ নওয়াপাড়ার বাজার অংশে বিভিন্ন ঘাটে কয়লা ড্যাম্পিং করছে। এতে করে বিপাকে পড়েছে সাধারন মানুষ। এর জন্য সচেতন মহল ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি জমির মালিকদের বহুলাংশে দায়ি করছেন। কারন হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, যারা শত বছরের পুকুর, কৃষি আবাদি জমিতে এবং জনবহুল এলাকায় এই কয়লা ড্যাম্পিং এর সুযোগ করে দিচ্ছে তারা পরিবেশ ধ্বংসের জন্য সর্বাপেক্ষা দায়ি। 

বিগত যে কোন সময়ের চেয়ে সর্বাধিক কয়লা মজুদ করতে ব্যস্ত অভয়নগর সহ আশে পাশের ব্যবসায়ীরা। ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা, ভারত সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নৌ পথে কয়লা আমদানি করে অভয়নগরের উপজেলাব্যাপী পাহাড় সমতুল্য উচ্চতা করে কয়লা মজুদ করা চলেছে। আবাসিক বসত এলাকায় এ কয়লা ড্যাম্পিং করার ফলে সাধারন মানুষ পড়েছে চরম বিপাকে, বাতাসের ধুলা কনায় মিশে কয়লার বিষ মানুষের ফুফফুস ও অন্ত্রের মধ্যে প্রবেশ করে দেখা দিয়েছে নানান জটীল রোগের। বিশেষ করে হৃদরোগী, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের সমস্যা আক্রান্ত রোগীরা আছে চরম সমস্যায়। অভয়নগরের গাছপালা, রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী সর্বত্রই কয়লার ছাপ। নদী তীরবর্তীতে বড় বড় উচু ড্যাম্পিং করে কয়লা মজুদ করায় নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। এছাড়া এ অঞ্চলের অগণিত গাছ কয়লার বিষক্রিয়ায় মারা গেছে। কয়লার কারনে বায়ু দূষন চরম পর্যায়ে পৌছেছে। দিন দিন বাড়ছে মুখে মাস্ক লাগানো মানুষের সংখ্যা। দুই চোখে শুধু কয়লা দেখতে পাওয়ায় নাকেমুখে মাস্ক পরাটাও বাধ্যতামূলক হয়ে যাচ্ছে। অচিরেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নাই।

চিকিৎসা বিষয়ক ‘জার্নাল ল্যানসেট’ এ প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী দূষনের কারনে সারা বিশ্বে প্রায় ৯০ লাখ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। কয়লা ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে বলতে গেলে একে সভ্যতার সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর উপাদান হিসাবে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও ইটের ভাটায় কয়লার ব্যবহার হয়ে থাকে। সারাবিশ্বে কয়লার দূষনের কারনে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২৪ হাজার এর উপর বেশী মানুষ মারা যায়। কয়লার থেকে উড়ন্ত ছাই (ফ্লাই আ্যাশ) বার্নারের নিচে জমা হওয়া ছাই (বাটম অ্যাশ), মারকারি, তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, আর্সেনিক, ভারি ধাতু সহ বর্জ্য উৎপাদন হয়ে থাকে। কয়লা বেশি করে মজুদ করায় উচ্চ মাত্রার সালফার মিশ্রিত এসিড বৃষ্টি হয়ে থাকে। যে এলাকায় কয়লা মজুদ হয় তা থেকে বিষাক্ত পদার্থ সমূহের ভূগর্ভস্থ জলাধারে এবং খনি এলাকায় মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আবাসিক এলাকা হতে দেড় কি.মি দূরে এসব কয়লা ড্যাম্পিং সেটের মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরের ড্যাম্পিং এর নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না কেউই। এর ফলে কৃষি জমিতে ফসল ফলছে না, বনজ ও ফলজ বৃক্ষ মারা যাচ্ছে, ফসলি জমি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কযলার কারনে সবচেয়ে বেশী পরিমানে কার্বনডাইঅক্সাইড নিঃসরিত হয় যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশী দায়ী। কয়লা ড্যাম্পিং বন্ধ করার জন্য অভয়নগরের বিভিন্ন জায়গায় মানববন্ধন সহ পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে বারংবার স্মরক লিপি পেশ করেছে। কিন্তু তার কোন প্রতিকার না হওয়ায় এলাকাবাসী চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ। 

তবে ইতিমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর এই জমির মালিকদের খুজে বের করে বড় ধরনের আর্থিক জরিমানা সহ আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহন করবে বলে জানাগেছে। স্থানীয় সাধারণ মানুষের দাবি অবিলম্বে আবাসিক এলাকার মধ্য থেকে কয়লা ড্যাম্পিং বন্ধ করে দূষণ বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সূএ: দৈনিক নওয়াপাড়া

নি এম/