সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮
সোমবার, ৭ই কার্তিক ১৪২৫
 
 
"ছাতারবক্স সাহেব এবং তার তিন ছেলে," দ্বিতীয় খন্ড
প্রকাশ: ১১:২৮ pm ০৭-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ১১:২৮ pm ০৭-০৬-২০১৫
 
 
 


গোলাম মাওলা শকিল: যার দেখা পাচ্ছে তাকেই ধরে জিজ্ঞেস করছে; তার মাকে দেখছে কিনা? কেউ কেউ বলতেছিল, ঝড়ের আগে আগে বাজারে দেখছিল। বৃদ্ধ মানুষ ঝড়ের দিনে এখনো নাই.....এই বলে কেঁদে যাচ্ছিল নালু । ইউনুস নালুর বাড়ীর পিছনে বসে নালুর সব অভিনয়ের সাক্ষী। আর, মনে মনে ভাবে যে দুই টাকার জন্য তার মাকে মেরে ফেলে, চুরি করতে গিয়ে ধরা পরলে তো সে তার শরীরের সব লোম উঠাইয়ে মেরে ফেলবে। তার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়, আর তখনোই তার বাবার সেই কথাটা মনে পড়ে, কৃপণের বাড়ীতে চুরি করবি না। সে সেইরাতে ফিরে আসে ঘরে খালি হাতে। দ্বিতীয় দিন সে বের হয় একটু বেশী রাত করে। সেইরাতে সে যায় গোলজারের বাড়ী। গোলজারের বাড়ীর গোয়ালঘরের পিছনে সে লুকিয়ে থাকে। রাত প্রায় বারোটা বাজে, গোলজার এখনোও বাজার থেকে ফিরে নাই, ওর বউ 'জলসা মুভিজে' দেবের সিনেমার গান শুনতেছে 'চোর পুলিশের প্রেমে পড়েছে।' গোলজার বাড়ী ফিরলো, সাথে সাথেই তার বউ শুরু করে দিলো এতো রাত পর্যন্ত বাজারে কার 'কি' ছিঁড়েন। বাঁশ বিক্রির টাকা কই? বউ এর একেকটা ধমকে, গোলজার কোনোমতে বলে ভাত কোথায়? যাও, হাঁত মুখ ধুয়ে এসে রান্নাঘরে ভাত আছে নিয়া খাও। গোলজার যে একটা পুরুষ মানুষ, তার টিউবওয়েল থেকে পানি বের করে হাত-মুখ ধুয়ে আসার শব্দে একটু বুঝতেছিল ইউনুস গোয়ালঘরের আড়াল থেকে।
গোলজার নি:শব্দে খেয়ে এসে, শুপারি কাটতে থাকে। এবার তার বউয়ের গলা শোনা যায়, 'তোমরা এমন মানুষ, একাই শুপারি খাইলেন!' কথা শেষ হইছে মনে হয়, ইউনুস এগিয়ে যায়। কোন ঘরে চাল কে জানে? সে রান্নাঘরে ডুকবে বলে ঠিক করে। এমন সময় গোলজারের বউ এর আবার কথা শুনতে পায়, গোলজারকে কি জন্য জানি আবার ধমক দিচ্ছে? হঠাৎ করে তার বাবার সেই কথাটা মনে পড়ে যায় তখনোই , যে সংসারে মহিলা দেওয়ানী সে বাড়ীতে যেনো সে চুরি না করে। সত্যি তো, যে রাগি(দেওয়ানী) মহিলা স্বামীকে এক ধমকে সোজা করে, আর তাকে যদি চুরি করতে ধরা পায়, তাহলে তো মাথা ন্যাঁড়া করে পুরো গ্রাম ঘুরাবে। সেদিনও সে রিক্ত হস্তে ফিরে আসে। তৃতীয় দিন সে একটু দূরে যাবে বলে ঠিক করে। সেদিন রাতে জোঁছনা ছিল, সে পাশের গ্রামের মনি মৌলভীর বাড়ীতে যাওয়ার জন্য মনস্থির করে। রাত প্রায় দশটা, জোঁছনায় নিজের ছায়াও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পানার ভিটা পার হতেই ইউনুস দেখতে পায়, অনেক লম্বা করে সাদা পোশাক পড়া এক লোক তার সামনে। কে তুমি,বাবা?
আমি ইউনুস, ডাকুয়াপাড়ার ছাতারবক্সের ছোটছেলে। তা এতো রাতে কোথায় যাও, সত্যি কথা বলবা কিন্তু? ইউনুস একটু ভয় পেয়ে বলে - আমি পাশের গ্রামের মনি মৌলভীর বাড়ী যাচ্ছি চুরি করতে। ঠিক আছে, যাও। আজ মনি মৌলভী রাতে মারা যাবে, তার বাড়ীর সব দরজা খোলা। তুমি যা পারো, নিয়ে আসো। এবার ইউনুস ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনি কে? লোকটা বললো- আমি সেই মৌলভীর বাড়ীর 'লক্ষী' তিনি যেহেতু পৃথিবীতেই থাকবেন না, আমি সেখানে থেকে কি করবো। বলেই অদ্ভুত মানুষটা চলে গেলো। ইউনুস মৌলভীর বাড়ী পৌছায়। সত্যি সেই বাড়ীর কেনোজানি বড় ঘরের দরজা খোলা। ইউনুস খুব ধীরে সেই ঘরে ঢুকে দেখে মনি মৌলভী প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সে ঘরের কোনায় গিয়ে এক বস্তায় চাল দেখতে পেয়ে, খুশিতে লুঙ্গীতে কেজি পাঁচেক চাল বেধে নিয়ে যখনি উঠে চলে যাবে, ঠিক তখনোই দেখতে পায় এক মস্ত বড় সাপ মনি মৌলভীর বিছানার উপর প্রায় উঠে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি পাশেই একটা লাঠি দেখতে পেয়ে তাদিয়ে সে সাপটাকে মেরে ফেলে। এবার সে চলে যাবে, এমন সময় ইউনুসের তার বাবার শেষ কথাটা আবার মনে পরে যায়। সাপটাকে মেরে মৌলভীর প্রাণ বাঁচানো কি কোনো উপকার এই বাড়ীর। হয়তোবা, এইভেবে সে শ্রদ্ধেয় মৌলভীড় বিছানার নীচে বসেই তার ঘুম ভাঙ্গার অপেক্ষা করতে করতে নিজেই ঘুমিয়ে যায়। ফজরের আযানের সময় মৌলভী সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আর, ঘুম ভাঙ্গার সাথেই ইউনুসকে বিছানার পাশে দেখতে পেয়ে তিনি 'চোর...চোর' বলে চিৎকার শুরু করে দেন। সাথে সাথেই মৌলভীড় ছেলেরা বাবার চিৎকারে ঘুম থেকে উঠে এসে ইউনুসকে ধরে ফেলে, কিল-ঘুষি শুরু করে দেয়। দু-চারটা মারের পর মৌলভী সাহেব সেই ভোরে ইউনুসকে চিনে ফেলেন এবং চুরি করতে আসলে কেনো সে বিছানার পাশে ঘুমিয়ে গিয়েছিল জিজ্ঞেস করলেন? ইউনুস আস্তে আস্তে গতোরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ঘটনা বলে যায়। সত্যিই, মৌলভীড় বিছানার নীচে গিয়ে মস্ত বড় এক মৃত সাপ দেখা যায়। এবার মৌলভী সাহেব ইউনুসকে জড়িয়ে ধরেন, 'বাবা, ইউনুস; তুমি আমার আজ থেকে আরেকটা ছেলে, যে আমার জীবন বাঁচিয়েছে।

তোমার যেনো জীবনে আর চালের অভাব না হয়, বাবা। সেইভেবে তার ধানের মাঁচা থেকে তাকে পাঁচশো মন ধান দিয়ে দেন তিনি। শুধুই কি তাই, দলবাড়ির(দোলার) মৌলভীড় বিশাল জমি-জমা থেকে ইউনুসকে অর্ধেক দিয়ে দেন তিনি। ইউনুস না করতে পারে নাই, কারন মৌলভী সাহেব তাকে বাবা হিসেবে ভালোবেসে সম্পত্তিগুলো দিয়েছেন। ইউনুসের সংসারে আর অভাব নাই, সেদিনের পর তাকে আর চুরি করতে হয় নাই। এখন ডাকুয়াপাড়ার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক সে। সুখেদুঃখে গ্রামের মানুষের পাশে ইউনুস সবার আগে, ওইদিকে দোলায় এবার মৌসুমে সবচেয়ে বেশী ধান ইউনুসঈ পেয়েছে। সবমিলিয়ে সে এখন
একজন সফল এবং সুখী মানুষ সেই পাড়ায়। সর্বোপরি, একেই বুঝি বলে বাবার কথা এবং দোয়া...........।
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71