বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণদিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলি
"জীবন এত ছোট কেনে ?"
প্রকাশ: ০১:১৫ pm ১৪-০৯-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:১৫ pm ১৪-০৯-২০১৬
 
 
 


দিনেশচন্দ্র জয়ধর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলা কথা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় শিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ( ১৮৯৮ - ১৯৭১)। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, গল্পকার,  প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও রাজনীতিবিদ। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দুইশত। তাঁর ভাষা সরল কিন্তু ঋজু। তাঁর লেখা সহজ সরল গ্রাম্য জীবনানুভূতিতে দীপ্যমান। 

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৮ সালের ২৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে। পিতা হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়,  মাতা প্রভাবতী দেবী। জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে অধ্যয়নকালে ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে যোগদানের জন্য কারানির্যাতন ভোগ করেন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য আবার গ্রেফতার। চল্লিশের দশকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৫২ সালে বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। আট বছর বিধানসভার সদস্য ও ছয় বছর রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক তারাশঙ্করের উপন্যাসের বিষয়বস্তু মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনচিত্র,  স্বাধীনতা আন্দোলন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যক্তির মহিমা ও বিদ্রোহ, সামন্ততন্ত্র-ধনতন্ত্রের দ্বন্দ্ব  সব মিলিয়ে গোটা রাঢ় অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং তারই মাঝে গোটা মানুষের অভ্যুদয় নিপুণভাবে উপস্থাপিত।

সাহিত্যই তাঁর জীবনের একমাত্র জীবিকা, সাধনা ও অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর লেখায় বিশেষভাবে পাওয়া যায় বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, বোস্টম, বাউরি, ডোম, গ্রাম্য কবিয়াল সম্প্রদায়ের কথা। শ্রেণিগতভাবে ছোট বা বড় যে কোনো ধরণের মানুষই হোক না কেন,  তিনি তাঁদের মহত্ত্ব ফুঁটিয়ে তুলেছেন। যা তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় গুণ। 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নাথে সংহতি প্রকাশ করে অনুকুল জনমত গঠনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী - সাহিত্যিক- বুদ্ধিজীবী সমিতির সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ পদ। বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রামকে বিষয়বস্তু করে রচনা করেন উপন্যাস " একটি কালো মেয়ের কথা "। এ গ্রন্থে বাংলাদেশের ত্যাগ ও সংগ্রামের অনন্যতাকে সুষ্ঠুভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হন।

কল্লোল, কালিকলম, উপাসনা, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, প্রবাসী, দেশ, ভারতবর্ষ, বসুমতি, পরিচয়সহ প্রভৃতি নামজাদা পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন তারাশঙ্করের। তাঁর রচিত প্রথম ছোটগল্প " রসকলি " (১৯২৮) এবং প্রথম রচিত উপন্যাস " চৈতালী ঘূর্ণি " (১৯৩২)। মানব চরিত্রের নানান জটিলতা ও নিগূঢ় রহস্য তাঁর উপন্যাসে জীবন্তভাবে প্রকাশিত। ' ধাত্রীদেবতা',  ' কালিন্দী ',  ' জলসাগর ',   ' কবি ',  ' গণদেবতা ',  'পঞ্চগ্রাম ',  ' হাঁসুলী বাঁকের উপকথা ',  ' আরোগ্য নিকেতন ',  ' পঞ্চপুণ্ডলী ',  ' রাধা' তারাশঙ্করের প্রতিনিধিস্থানীয় উপন্যাস। বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার ও ডাকহরকরা  ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তাঁর গল্পে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। ' রসকলি ',  ' বেদেনী',  ' ডাকহরকরা ' প্রভৃতি তাঁর প্রসিদ্ধ ছোটগল্প। তাঁর বহু গল্প ও উপন্যাস অবলম্বনে সার্থক চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সত্যজিৎ রায় " জলসাগর " ও " অভিযান " উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন সফল চলচ্চিত্র। এছাড়া " কবি ",  " সপ্তপদী" ও  " বেদেনী " অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

তারাশঙ্কর তাঁর কালজয়ী সাহিত্যকর্মের জন্য পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার। ১৯৪৭ সালে শরৎ স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার, ১৯৫৬ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, একই বছর সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, ১৯৬২ সালে ভারত সরকারের " পদ্মশ্রী " পুরস্কার,  ১৯৬৭ সালে " জ্ঞানপীঠ " পুরস্কার এবং ১৯৬৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে 
" পদ্মভূষণ "  উপাধিতে ভূষিত হন।

তারাশঙ্করের চৌষট্টিটি উপন্যাস, আটত্রিশটি ছোটগল্প, দশটি নাটক ও প্রহসন,  চারটি প্রবন্ধ এবং সাতটি স্মৃতিকথা ও ভ্রমণকাহিনীর বিশাল সাহিত্যভাণ্ডারের সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছে বিরহ মিলনের অন্তর্লীন ভালোবাসার জীবন্ত বাণী  " কবি  " উপন্যাস। তৎকালীন হিন্দু সমাজের রূপ ও আচার,  প্রেম, জীবনসংগ্রাম, মনের বিভিন্ন দিক বিষয়বস্তু হলেও প্রেম এ উপন্যাসের মূল উপজীব্য। একটি মানুষকে ঘিরেই কাহিনী আবর্তিত। সে মানুষটি হলো নিতাই, নিতাইচরণ। নিতাই অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। চোর, ডাকাত, খুনিদের বংশে জন্মেও সে চায় জন্মের চেয়ে কর্মকে বড় করে দেখতে। সে সুমিষ্ট কণ্ঠে জগৎকে জয় এবং বংশের পাপ মোচন করতে চায়। রেলস্টেশনে অবস্থানের পর সুযোগ পেয়ে নিতাই গ্রামের আসরের কবি গান গেয়ে বনে যায় নামকরা কবিয়াল। সে ঠাকুরঝিকে মনে মনে ভালোবাসত। কিন্তু প্রকাশ করে নি। একদিন রাজা ঠাকুরঝিকে কালো কুৎসিত বলে অবজ্ঞা করলে নিতাই রাগ ভাঙ্গায় সবার অগোচরে এই বলে,

" কাল যদি মন্দ হবে

কেশ পাকিলে কাঁদ কেনে? /

কালো চুলে রাঙা কুসুম

হেরেছ কি নয়নে?  " 
 

ভালোবাসা আর ভয় একসাথে একাকার হয়ে যায় এখানে এসে,

" চাঁদ দেখে কলঙ্ক হবে বলে

কে দেখে না চাঁদ? /

তার চেয়ে চোখ যাওয়াই ভালো

ঘুচুক আমার দেখার সাধ।  "

এরমধ্যে ঠাকুরঝি তার ভালোবাসার আঁচ করতে পারলেও বিধিবাম। বুঝতে পারে বাস্তবতা আরও গভীরভাবে। এক পর্যায়ে বাসন্তির সাথে প্রেম জমে ওঠে নিতাইয়ের। নিতাইয়ের ভাষ্য ----

" এই খেদ মোর মনে,

ভালোবেসে মিটল না আশ,

কুলাল না এ জীবনে।

হায় জীবন এত ছোট কেনে,

এ ভুবনে ?  "

কিন্তু বাসন্তি পরজীবনে পাড়ি দেয়ায় শোকে-দুঃখে পাগলপ্রায় নিতাই ঝুমুর দল ছেড়ে বৈরাগী হয়। অবশেষে ট্রেনে চেপে দেশে ফেরে নিতাইচরণ। ততদিনে সে মস্তকবি আর ঠাকুরঝিও গত। তাই নিতাইয়ের শেষ ইচ্ছা প্রতিভাত হয় রাজার সাথে মায়ের দরবারে গিয়ে...........
 

  " জীবন এত ছোট কেনে?  " 
 

এর চেয়ে বড় প্রশ্ন,  প্রশ্নের শক্তি ও দার্শনিকতা আর কী থাকতে পারে? জীবনকে কত কাছ থেকে এত বড় মাপের জীবনমুখী সাহিত্য রচনা করা যায় তার বাস্তব প্রমাণ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। আক্ষেপ, যেনো মিটলো না আশা,  কুলাল না এ জীবনে। তাই বিরহক্লিষ্ট মনে অপূর্ণ জীবন নদীর কূল না পেয়ে পাড়ি জমালেন অসীমের পানে। ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর পরলোক গমন করলেন। এই মহীয়ান সাহিত্যিকের প্রয়াণদিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা। 


লেখক : প্রভাষক,
বাংলা বিভাগ,
সরকারি শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ,
মাদারীপুর।

এইবেলা ডটকম/এসবিএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71