সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৯ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
বড়দিন থেকে ৬৫ বার আগুন পুরুলিয়ার গ্রামে
প্রকাশ: ১২:৩৫ pm ০৮-০২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৭:২১ pm ০৮-০২-২০১৬
 
 
 


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : রাত বাড়লেই বাতাসে কেমন সন্দেহজনক গন্ধ, কারা যেন ফিসফিসিয়ে কথা কয়৷ দিনদুপুরেও স্বস্তি নেই৷ সুনসান স্টেশনটায় কাদের যেন পায়ের শব্দ, কে যেন গা ঘেঁষে চলে যায়৷ ভারতের পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের গা ঘেঁষে বেগুনকোদর স্টেশন ঘিরে এমন গা ছমছমে গল্প বহু পুরোনো৷

ইন্টারনেট খুললেই চোখে পড়বে সারা বিশ্বে ভুতুড়ে স্টেশনগুলির মধ্যে একেবারে পয়লা নম্বরে রয়েছে পুরুলিয়ার অখ্যাত এই স্টেশনের নাম৷ ভূতের ভয়েই ১৯৬৭ সাল থেকে টানা চার দশক এই স্টেশনে কোনও ট্রেন চলেনি৷ কোনও রেলকর্মী ভুলেও ওই স্টেশনে পা দিতেন না৷ অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটা এই বেগুনকোদরের কাছেই কোটশিলা থানার বড়তেলিয়া গ্রাম৷

২৫ ডিসেম্বর থেকে নয় নয় করে প্রায় ৬০-৬৫ বার আগুন লেগেছে এই গ্রামে৷ কেন? তার ব্যাখ্যা নেই গ্রামবাসীদের কাছে৷ শুকনো আশ্বাসের বেশি কিছু দিতে পারেনি প্রশাসনও৷ আগুন লাগার কারণ জানতে না পেরে রীতিমতো আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন গ্রামবাসীরাও৷ রাতে সজাগ থাকতে হচ্ছে প্রতিটি পরিবারকে৷ তবে কি অলৌকিক কিছু ঘটে চলেছে?

আজ থেকে পাঁচ দশক আগে বেগুনকোদর যে ভুল করেছিল তা কিন্তু করছে না বড়তেলিয়া৷ বরং গ্রামের মানুষ বলছেন, ভূত-টুত কিছু না, নির্ঘাত কোনও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকেই ঘটছে এমন দুর্ঘটনা৷ গাড়ি-ঘোড়ার আওয়াজ থেকে বহু দূরের এই গ্রামের বাসিন্দা দীনবন্ধু কুমারের খড়ের গাদায় ২৫ ডিসেম্বর আগুন লেগে ছাই হয়ে যায় ৫০০ আঁটি খড়৷ ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে যান গ্রামের বাসিন্দারা৷ কী ভাবে আগুন লাগল কিছুতেই তা ভেবে উঠতে পারেননি তাঁরা৷ গ্রামবাসীরা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন, ভুল করে খড়ের গাদায় জ্বলন্ত বিড়ি ফেলাতেই আগুন লেগেছিল৷ কিন্তু, একই দিনে বিকেলের দিকে পর পর আগুন লাগে বংশী কুমার ও ধর্মদাস কুমারের খড়ের গাদায়৷ সন্দেহ বাড়ে আরও৷ পর দিন, আগুন লাগে গ্রামের চার জায়গায়৷ ২৭ ডিসেম্বর আরও সাত জায়গায় আগুন লাগায় রীতিমতো আতঙ্ক ছড়ায় গোটা গ্রামে৷ এর পর থেকে প্রতিদিনই গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় এমন ভাবে আগুন জ্বলে উঠতে দেখা গিয়েছে ৷

গ্রামবাসীরা বলছেন, গ্রামের কেন্দ্রে থাকা একটি বড় পুকুরের চারপাশে যে ৩৫ ঘর বাসিন্দা রয়েছেন প্রধানত তাঁদেরই বাড়ির উঠোন, খড়ের গাদা ও খামারে আগুন লাগছে৷ গ্রামের অন্যত্র এমন ঘটনার উদাহরণ নেই৷ তাই, গ্রামবাসীদের একাংশের ধারণা ওই পুকুরের পাঁকে নিশ্চই কোনও দাহ্য গ্যাস জন্মাচ্ছে৷ এই গ্যাসই বাতাসে মিশে আগুন লেগে যাচ্ছে৷ কিন্তু, গ্রামের মাঝখানের ওই পুকুরের জলে দিব্যি সাঁতার কাটছে হাঁসের দল৷ ঘাই মারছে মাছের ঝাঁক৷ পুকুরে স্নান করছেন লোকজন, বাসন মাজতে এসে ঘাটের জলে পা ডুবিয়ে গল্প করছেন মেয়েরা৷ তবে রহস্যটা কী? বিজ্ঞান মঞ্চের পুরুলিয়া জেলা শাখার সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায় বলছেন অন্য কথা৷ বড়তেলিয়া গ্রামের ভূগর্ভে প্রাকৃতিক কোনও দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি থাকতে পারে ধরে নিয়েও তাঁর সন্দেহ অন্য৷ পুরুলিয়া জেলাতেই এমন দু'টি আগুন লাগার ঘটনার রহস্যভেদ করেছেন তাঁরা৷ দুই ক্ষেত্রেই গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে কিছু অসাধু ব্যক্তি সক্রিয় হয়েছিল৷ তারাই গ্লিসারিন ও পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে আগুন লাগায় দু'টি গ্রামে৷ পিছিয়ে পড়া মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে গুণিন বা ওঝারা এমন কাজ করতে পারে বলে আশঙ্কা নয়নবাবুর৷ বড়তেলিয়ার কাছাকাছি গঞ্জ বলতে বেগুনকোদর৷ হাট-বাজার, স্কুল-কাছারি সবই এখানে৷ সেখানে মানুষের মনে রেল নিয়ে ভূতের ভয় ছাড়াতে দীর্ঘ দিন ধরে সক্রিয় ছিলেন বাঁকুড়ার প্রাক্তন সিপিএম সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া৷

দীর্ঘদিন রেলের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি এই রেলপথ চালু করার চেষ্টা করেন৷ তাঁর কথায়, 'ভূতের ভয় বাজে কথা৷ গ্রাম থেকে অনেক দূরের ওই স্টেশনে একটাই ট্রেন চলত৷ সে জন্য কেউ ওখানে কাজ করতে চাইত না৷ ওরাই এ সব ভূতের গল্প রটায়৷ তবে বড়তেলিয়ার ঘটনাটা আমা জানা নেই৷ শনিবার সারাদিন আমি পুরুলিয়াতেই ছিলাম৷ কেউ আমায় কিছু জানায়নি৷ নিশ্চয় এ ব্যাপারটা খোঁজ নিয়ে দেখব৷' প্রায় চল্লিশ বছর বন্ধ থাকার পর ২০০৯ সালে বেগুনকোদরে ফের ট্রেন চলা শুরু হয় তত্কালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে৷ সেই কুসংস্কারের অন্ধকার অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে প্রত্যন্ত এই এলাকার মানুষ৷ বেগুনকোদরের হাইস্কুলে পড়তে যান এই গ্রামের ছেলেমেয়েরা৷ তাদেরই একজন দশম শ্রেণির ছাত্রী অপর্ণা কুমার৷ অপর্ণার আশঙ্কা, তার ঘরের তাকে রাখা বইপত্রে না আগুন লেগে যায়৷ তবে এ সবের পিছনে ভূত নয়, প্রকৃতির কোনও কারসাজি আছে বলেই মনে করছেন এই ছাত্রীর মতো আরও অনেকে৷ 'বিতর্কিত' ওই পুকুরের জল নিয়মিত ব্যবহার করেন পারুল কুমার৷ তিনি জানিয়েছেন, জলে কোনও অস্বস্তিকর গন্ধ টের পাননি তিনি৷ তাঁর বাড়ি পুকুর থেকে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে৷

দিন দশেক আগে এক সন্ধেয় তাঁর বিছানায় হঠাত্ আগুন লেগে যায়৷ পুকুর থেকে এত দূরে একটি বাড়িতে কী ভাবে আগুন লাগল তার জবাব নেই কারও কাছেই৷ বিষয়টি কোটশিলা পঞ্চায়েত সমিতির দপ্তরে জানানো হয়েছে৷ সভাপতি শিখা কুমারের বক্তব্য, ওই পুকুরটি বহুকাল সংস্থার না হওয়ায় পাঁকে মিথেন জাতীয় কোনও গ্যাস সৃষ্টি হতেও পারে৷ তাঁর দাবি, পুকুরের জল পরীক্ষা করিয়েছেন তিনি৷ কিন্তু তাতে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি৷ তবে বিডিও, মহকুমা শাসক, জেলাশাসক, থানা-পুলিশ কাউকেই ঘটনার কথা জানাননি গ্রামবাসী এবং পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি৷ 'এই সময়'-এর কাছ থেকে খবর পেয়ে রাতেই ওই গ্রামে যান বিজ্ঞানমঞ্চের সদস্যরা৷ এই ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না স্থানীয় জয়পুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক বীরেন্দ্রনাথ মাহাতো৷ তবে পাশের বিধানসভা বাঘমুন্ডির বিধায়ক নেপাল মাহাতো জানিয়েছেন, গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগার তদন্ত করার জন্য জিওলজিকাল সার্ভের সঙ্গে কথা বলবেন তিনি ৷ বড়তেলিয়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই মুরগুমা জলাধার৷ অযোধ্যা পাহাড়ের রেঞ্জ শুরু এখান থেকেই৷ ছবির মতো সাজানো এই প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের পেশা বলতে চাষবাস আর বিড়ি বাঁধা৷ কিন্ত্ত তা সত্ত্বেও শিক্ষার আলো কিছুটা হলেও পড়েছে বড়তেলিয়ায়৷ তাই বেগুনকোদরের মতো ভূতের ভয়ে গুটিয়ে গিয়ে নয়, প্রশ্ন করেই 'রহস্যের' সমাধান খুঁজছে বড়তেলিয়া ৷

এইবেলাডটকম/এএস
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71