শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
 বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর টার্গেট সক্রিয় হয় বাংলাদেশের হিন্দুনিধন
প্রকাশ: ০৩:২৪ pm ১৮-০৭-২০১৭ হালনাগাদ: ০৩:২৪ pm ১৮-০৭-২০১৭
 
 
 


 রাজিব শর্মা

বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর থেকেই শুরু হয়েছে হিন্দু-বিরোধী হিংসাত্মক ঘটনা। হিন্দুদের উপর আক্রমণ চলছে, তাদের মন্দির এবং বিগ্রহ ভাঙচুর করে দেবালয়ের সম্পত্তি লুট করা হচ্ছে, আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে হিন্দু- বাড়িতে এবং ধর্ষিতা হচ্ছেন হিন্দু মহিলারা। বলাই বাহুল্য, এই সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় নিতান্তই কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছেন বাংলাদেশের হিন্দুরা। ১৯৪৭ তাঁরা ছিলেন জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের শিকার।

১৯৭১-এ আওয়ামি লীগকে ভোট দেওয়ার জন্য অপরাধী হতে হয় তাঁদের। আবার ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোটের পক্ষে ভোট না দেওয়ার জন্য দোষী ঠাওরান হয় হিন্দুদের। আর এখনও বিএনপি-জামাতের নির্বাচন বয়কটের ডাক উপেক্ষা করার জন্য অভিযুক্ত হতে হচ্ছে তাঁদের। অর্থাৎ কোনও না কোনও অছিলায় যা কিছু তাঁদের ছিল, তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের কাছ থেকে।

সাম্প্রতিক দশম সাধারণ নির্বাচনের পরেই যে চরম অত্যাচার শুরু হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর, তা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যা করেছিল দখলদারি পাকিস্তানি সেনা বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী জামাত, তার সঙ্গে অনেকাংশেই তুলনীয়। আর এখন জামাত এই আক্রমণ চালাচ্ছে তাদের পৃষ্ঠপোষক বিএনপি-র সঙ্গে যোগসাজশে। বস্তুত এটা অদৃষ্টের পরিহাস যে, বিএনপি-জামাতের জোট নির্বাচনে হারলেও হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালায়, জিতলেও। আওয়ামি লীগ জিতলে হিন্দুদের সেই দলের সমর্থক ধরে নিয়ে আক্রমণ চলে, আবার বিএনপি-জামাত জোট জিতলেও হয় সেই আক্রমণ–এবার হিন্দুরা তাদের ভোট দেয়নি, এই অভিযোগ তুলে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় অসংখ্য হিন্দু তাঁদের ঘর বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কারণ জিন্নার দ্বিজাতি তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি নতুন দেশে তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা করা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। এর পরে প্রথমে ১৯৫০ এবং তার পর ১৯৬৪ সালে পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে আবার বহু হিন্দুকে নিরাপত্তার জন্য ভারতে পালিয়ে আসতে হয়।

ফের ১৯৭১ সালেহিন্দুরা আওয়ামি লীগকে ভোট দিয়েছে, এই বিশ্বাসে দখলদারি পাক সেনা এবং তাদের সহযোগীরা প্রবল প্রতিশোধস্পৃহায় খুঁজে খুঁজে হিন্দু-নিধন চালিয়েছিল।বহু হিন্দু বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবী, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে থাকা সহস্রাধিক হিন্দু ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল সেই সময়। ১৯৭১ -এর স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গণ হত্যার শিকার এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় দু কোটি বলে ধরা হয়। কোনও একটি জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বৃহত্তম।

১৯৭১ সালের ২রা অগাস্ট সংখ্যায় টাইম ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছিল, “উদ্বাস্তুদের তিন- চতুর্থাংশ এবং নিহতদের গরিষ্ঠ অংশই ছিলে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, কারণ মুসলমান (পাকিস্তানি) সামরিক আক্রমণের আঘাত বেশি করে তাদের উপরেই নেমে এসেছিল।”

বহু ঐতিহাসিক নথিতে এই কথাই বলা হয়েছে যে, ‘বাঙ্গালি এবং হিন্দুদের হত্যা কর”, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তোলা এই স্লোগান খুব উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ১লা নভেম্বর তারিখে ইউ এস সিনেট কমিটিকে দেওয়া একটি প্রামাণ্য প্রতিবেদনে সেনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি লিখেছিলেন, “সব থেকে বেশি আঘাত এসেছে হিন্দুদের উপর, যে সম্প্রদায় মানুষদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, দোকান লুট হয়েছে, পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং কিছু জায়গায় তাদের শরীরে হলুদ রঙ দিয়ে \’এইচ\’ লিখে দেওয়া হয়েছে…আর এ সবই হয়েছে ইসলামাবাদের সামরিক শাসকদের আদেশ এবং অনুমতিক্রমে।

এর পরে ১৯৭১ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বকে খারিজ করে বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পরেও সেই ছবির খুব বেশি বদল হয়নি। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পরে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সেই সময় ধর্ষণ সহ নানা পাশবিক অত্যাচার করে হিন্দু পরিবারগুলিকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে, এ রকম শত শত উদাহরণ আছে।

একই ভাবে ১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের পর হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালিয়ে জামাত কর্মীরা তাদের দেশ ছাড়তে অথবা ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য করে। সেই সাথে আগুন লাগিয়ে এবং ভাঙচুর চালিয়ে ধ্বংস করা হয় তাদের বাড়ি ঘর, ব্যবসার জায়গা এবং উপাসনাস্থল।এই সময় হিন্দুদের জমি ও অন্যান্য সম্পত্তিও লুট হয়ে গিয়েছিল। এমন কি নবম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামি লীগ-নেতৃত্বাধীন জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও হিন্দুদের উপর নির্যাতন চলে। এবার আওয়ামি লীগের পক্ষে ভোট দেওয়ার অপরাধে আক্রমণের লক্ষ্য করা হয় তাদের।

২০১৩ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামাত নেতা দেলোয়ার হোসেন সাইদীর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করলে জামাত এবং তাদের ছাত্র সংগঠন, ইসলামি ছাত্র শিবির হিন্দুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর পরে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নির্ঘন্ট ঘোষণা হওয়ার পর আবার হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালায় জামাত। সংবাদ মাধ্যমের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অল্প সময়ের মধ্যেই ৪৮৫ টি বাড়ি, ৫৭৮টি ব্যবসা কেন্দ্র এবং ১৫২টি মন্দিরে লুটপাট চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়, নয় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

৫ই জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার চার দিনের মধ্যেই জামাতের হিংসার শিকার হন ২৫০০ হিন্দু পরিবার। ফটিকছাড়িতে তারা একটি হিন্দু পরিবারের তিন জনকে জীবন্ত পুড়িয়েও মারে। এই মূহুর্তেও হিন্দুরা চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাঁদের বাড়ি ঘর, সম্পত্তি লুট করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে তান্ডব চালানো বিএনপি-জামাত বাহিনী। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাস করছেন আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মধ্যে। ইতিমধ্যেই যাঁরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন সেই সব হিন্দুদের অধিকাংশই আরও আক্রমণের আশঙ্কায় পরিবারের মেয়েদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।পরিবারের মহিলাদের ধর্ষণ করা হবে বলে হুমকিও পাচ্ছেন তাঁরা। এর মধ্যে, জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখে যশোরের মনিরামপুর উপজিলার হাজরাইল ঋষি পাড়ায় দুটি হিন্দু তরুণীকে বন্দুকের নলের সামনে ধর্ষণ করেছে মুখোশধারী বিএনপি-জামাত কর্মীরা। বাড়ির পুরুষ সদস্যদের বেঁধে রেখে তাঁদের সামনেই ধর্ষণ চালায় তারা। এর আগে, জানুয়ারির ৭ তারিখে মনিরামপুরেই ধারালো অস্ত্রধারী এই সব দুর্বৃত্ত আর এক জন হিন্দু নারীকে ধর্ষণ করেছিল।

খবর পাওয়া গেছে যে, নির্বাচনের তিন দিন পর, ৮ই জানুয়ারিতেও বিএনপি-জামাতের লোকেরা হিন্দুদের উপর নতুন করে আক্রমণ চালিয়ে বেশ কয়েক জন হিন্দুকে আহত করেছে, জ্বালিয়ে দিয়েছে তাদের সাতটি বাড়ি এবং দুটি মন্দির, আর সেই সাথে ভাঙচুর করেছে মন্দিরের বিগ্রহ। একই দিনে নেত্রকোণায় তিনটি কালী মূর্তি ভেঙ্গে দিয়ে একটি মন্দিরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তারা।

ঠাকুরগাঁওয়ের ঝাড়গাঁওতে আরও একটি মন্দিরে আগুন লাগানো হয়েছে। সেই থেকে ওই অঞ্চলে হিন্দু- মালিকানার সমস্ত দোকান পাট এবং ব্যবসা কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। হিন্দু অঞ্চলে অস্থায়ী ছাউনি করে পাহারা দেওয়া আইন রক্ষকদের দেওয়া নিরাপত্তার আশ্বাস সত্ত্বেও চরম আতঙ্কে বাস করেছেন এই অঞ্চলের হিন্দুরা।

গত নির্বাচনের সময় থেকেই আতঙ্কে থাকা অনেক হিন্দু পরিবার ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। খুবই বেদনার বিষয় যে, সমস্ত সংবেদনশীল জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করার পরেও এই ধরণের আক্রমণের ঘটনা ঘটে চলেছে। বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ যে, গোপালপুর গ্রামের একটি মন্দিরে প্রায় ১২০০ হিন্দু পরিবার এসে আশ্রয় নিয়েছে। দিনাজপুরে প্রায় ৩৫০টি হিন্দু বাড়ি এবং দোকানে ভাঙচুর এবং লুট করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ও দিকে চট্টগ্রামে জামাতের শক্ত ঘাঁটি সাতক্ষীরা, লোহাগারা এবং বাঁকশালি উপজিলায় হিন্দুরা রয়েছেন বিপদের মধ্যে।

২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর হিন্দু-বিরোধী হিংসাত্মক কান্ড কারখানার তদন্তে নেমে বিচারপতি এম সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশন এই ধরণের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য কিছু সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশে যে সব দুষ্কৃতি ২০০১ সালের অক্টোবর এবং ২০০২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩৫৫ জনকে হত্যা করা ছাড়াও ৩২৭০টি নির্দিষ্ট অপরাধ করেছিল, তাদের ধরার জন্য দেশের প্রতি জেলায় একটি করে তদন্ত কমিটি অথবা কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়।
জেলাগুলিতে তদন্তকারী কমিটিগুলির কাজ কর্মের উপর নজরদারি করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে আলাদা সেল খোলা এবং যাঁরা হিংসার শিকার হয়েছেন, তাঁদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথাও এতে বলা হয়। কিন্তু এই সুপারিশগুলি মানা হয়নি। এই ধরণের হিংসাত্মক ঘটনায় জড়িত ২২০০০ জনের নাম করে কমিশন প্রায় সমস্ত অপরাধীকে চিহ্নিত করলেও রহস্যজনক ভাবে কোনও পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। তার ফলে ওই সব ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত ব্যক্তিরা এখনও মুক্তই রয়েছে এবং আরও বেশি সাহস সঞ্চয় করছে একই ধরণের আক্রমণের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71