রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
অন্যতম কবি ও গল্পকার নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ৯২তম জন্মবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০২:০৭ pm ১৯-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০২:০৭ pm ১৯-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপা চন্দ্র সাহা

আমার শৈশবের পুরোটাই কেটেছে পূর্ববঙ্গে, ফরিদপুরের চান্দ্রা গ্রামে, ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে। ঠাকুরদা কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়। তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন যে কলকাতা এমন একটি শহর, যেখানে রুজি-রোজগার, লেখাপড়া ইত্যাকার কারণে যেতে হয় কিন্তু ওখানে থাকতে নেই, থাকার জন্য শ্রেষ্ঠ হলো গ্রাম। বলতেন, আসলে কোনো বড় শহরেই থাকতে হয় না। কারণ, বড় শহরে মানুষের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ হয় না। এই কারণে কর্মজীবন শেষে ৫০ বছর বয়সে কলকাতার পাট চুকিয়ে ঠাকুরদা দেশের বাড়ি চান্দ্রা গ্রামে থিতু হয়েছিলেন। তবে আমার বাবা কলকাতাতেই থাকতেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, সেখানকার একটি কলেজে ভাইস প্রিন্সিপালও ছিলেন। ফলে কলকাতায় আমাদের একটা বাসাবাড়ি রাখতেই হতো, কোনো উপায় ছিল না। আমার যখন দুই বছর বয়স, আমার মা তখন বাবার কাছে চলে এলেন, কলকাতায়। মা ভেবেছিলেন আমায় নিয়েই কলকাতা যাবেন। কিন্তু ঠাকুরদা-ঠাকুমা ছাড়লেন না আমাকে, তাঁদের সঙ্গে গ্রামেই রইলাম আমি। আমার ঠাকুরদার নাম লোকনাথ চক্রবর্তী। আমরা সবাই নাথ। তাই আমি মজা করে বলি, আমি নাথ বংশের শেষ কবি—রবীন্দ্রনাথ, সুধীন্দ্রনাথ তার পরেই তো নীরেন্দ্রনাথ, তাই না?

তো, যা বলছিলাম, আমার ডাকনাম খোকা। মা মাঝেমধ্যেই আমাকে কলকাতায় পাঠানোর জন্য কান্নাকাটি করে ঠাকুমাকে চিঠি লিখতেন যে খোকাকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দিলে ভালো হয়। তবে গ্রামে আমার ছিল মহা স্বাধীনতা—ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ করছি, যখন তখন গাছে উঠছি; গ্রামে আপন মনে নিজের মতো করে বেড়ে উঠছি। তাই গ্রামের বাড়ি ছেড়ে আসার কোনো ইচ্ছে আমারও ছিল না। এসবই কবি হিসেবে আমাকে তৈরি করেছে। বলতে গেলে এখনো শৈশবকে ভাঙিয়েই লিখে যাচ্ছি আমি। যে কয়েক বছর গ্রামে ছিলাম দেখেছি কখন ধান ওঠে, কীভাবে সেই ধানে মলন দিতে হয়। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, পূর্ববঙ্গে কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করতে হয় না, এটা আপনাতেই তৈরি হয়; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বীজতলা বানাতে হয়। সব মিলিয়ে জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছে আজ বলতে চাই, এ জীবনে যা লিখছি, তার পেছনে শৈশবের অবদান অসামান্য। তবে ঠাকুরদার মৃত্যুর পর গ্রাম ছেড়ে আমি কলকাতায় চলে এলাম। খুব কষ্ট হয়েছিল সে সময়।
আলতাফ: আপনার কবিতা লেখার শুরু কি গ্রামেই, ঠিক কোন বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করলেন আপনি?
নীরেন্দ্রনাথ: আমার বয়স তখন চার বছর। গ্রামে আমার বড় কাকিমা থাকতেন। একদিন সারা বেলা হুটোপুটি করে সন্ধ্যারাতে বাড়ি ফিরে তাঁকে বললাম—রাত হলো, ভাত দাও। আমার কথা শুনে কাকিমা বললেন, তুই তো দেখছি কবিদের মতোন কথা বলছিস! আসলে কবিদের মতোন কথা মানে কী? আমি সেদিন যে কথাটি বলেছিলাম, পরে মনে হয়েছে এর মধ্যে সেভাবে অন্ত্যমিল ছিল না। কেবল ‘রাত’ আর ‘ভাত’ বলে দুটি কথা—তার ভেতরে যে মিল, সেটা তো প্রথাগত কোনো অন্ত্যমিল নয়। কিন্তু তাতেই আমার কাকিমার মনে হয়েছিল, ছেলেটা কবিদের মতো কথা বলছে। এভাবেই শুরু। আবার ছোটবেলায় গ্রামে কবিয়ালরা আসত, কবিগানের আসর বসতো—রামায়ণ গান হতো, আর হতো গুনাই বিবির গান—এগুলো সব আমার মুখস্থ ছিল। তারপর গ্রামের ছেলেপুলেরা এসে গাইত, ‘আইলামরে হরণে/ লক্ষ্মীদেবীর চরণে/ লক্ষ্মীদেবী দিলেন বর/ চাল কড়ি বার কর/ চাল কড়ি রামরে/ সোনা ডাঙা থামরে।’—এই যে গ্রামীণ মানুষের মুখে মুখে শোনা গানের চরণ; মনে হয় এগুলোই আমার কবিজীবনের পটভূমিকা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
আমার কল্পনাশক্তি কম। কবিতার কল্পনালতা বলে যে কথাটি আছে, ওতে আমার বিশ্বাস নেই। আমি চারপাশের মানুষ দেখি, তাদের জগৎ-সংসার ও জীবন দেখি। এভাবেই আমার কাব্যভাষা তৈরি হয়েছে। সত্য কথা হলো, কবিতা লেখার জন্য আমার কিছু কল্পনা করতে হয় না, যা দেখি তা থেকেই লিখতে পারি। ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতাটি যখন লিখলাম, তারও বহু আগে আমি ঠাকুমার মুখে এর গল্পটি শুনেছিলাম। জেনেছিলাম যে কোনো এক রাজাকে এক শিশু বলছে, রাজা তুমি তো উলঙ্গ। পরে জেনেছি এটা হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের গল্প। আসলে বিভিন্ন দেশে এ গল্পের অনেক ভার্সন আছে। গল্পটি আমার ভেতরে অনেক দিন ছিল। একসময় চারপাশের নানা অনাচার দেখে আইডিয়াটা এল। লিখলাম ‘উলঙ্গ রাজা’—‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’

আমার মনে হয়, সব লেখাই সচেতন প্রয়াস। আমার হয় কী, হয়তো একটা ঘটনা দেখলাম, সেটি মাথার মধ্যে গেঁথে রইল। অনেক দিন বাদে হঠাৎ কোনো এক দুপুরে হয়তো মনে পড়ল ঘটনাটি। এরপর লিখতে বসলাম। আর লেখার সঙ্গে সঙ্গে যে ভাবনাগুলো আমার মাথায় জড়ো হয়ে ছিল, ওই ভাবনার হাত থেকেও মুক্তি পেলাম। যতক্ষণ না লিখছি ততক্ষণ মুক্তি নেই, বুঝেছ? আমার ‘জঙ্গলে এক উন্মাদিনী’ কবিতাটি লেখার পেছনেও একটা ঘটনা আছে। এটি লিখেছিলাম ঘটনা ঘটার ২৫ বছর বাদে। আমাদের পাড়ায় এক পাগলি থাকত। এই পাগলিকে কেউ ছাড়েনি। একদিন এক বাড়ির বারান্দায় একটা বাচ্চা প্রসব করে সে। তখন লোকেরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করত। একপর্যায়ে ওই লোকদের লক্ষ করে ঢিল ছোড়ে সে; বলে যে বাবুরা, অত ঠাট্টা ইয়ার্কি কোরো না। তোমাদের এই কলকাতা নামের জঙ্গল বাঘ-সিংহীতে বোঝাই। এখানে একটা পাগলিরও নিষ্কৃতি নেই। এই ঘটনার ২৫ বছর পর একদিন বাজারে গেছি। মাছের দাম করছি। মাছের দাম তখন প্রচণ্ড। এর মধ্যে একজন বললেন, এত দাম হলে মানুষ খাবে কী, পাগল হয়ে যাবে। তাঁর কথা শুনে পাশের আরেকজন বললেন, পাগল হয়ে যেতে পারেন, তাতেও নিষ্কৃতি মিলবে না। খেয়ে তো বাঁচতে হবে। এই যে মাছের বাজারে লোকগুলো কথা বললেন, আমার কিন্তু মনে পড়ে গেল ২৫ বছর আগে শোনা পাগলির সেই কথাটি—কলকাতা নামের জঙ্গলে একটা পাগলিরও নিষ্কৃতি নেই। রাতে বাড়ি ফিরেই লিখলাম কবিতাটি। আসলে এই কবিতা কিন্তু পাগলিই আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিল। না লেখা পর্যন্ত সে আমার ঘাড় থেকে নামেনি।

‘অমলকান্তি’ কবিতার ঘটনাটিও বাস্তব। অমলকান্তি আমার বন্ধু, খুবই গরিব ঘরের ছেলে ছিল। বস্তিতে থাকত। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। একদিন খেলা শেষে বন্ধুরা মিলে গড়ের মাঠে বসে কে কী হতে চাই—তা নিয়ে কথা বলছিলাম। কেউ বলল, ডাক্তার হবে। কেউ উকিল, কেউ বা মাস্টার। অমলকান্তিকে বললাম, তুই কী হবি? অমলকান্তি বলল, আমি রোদ্দুর হব। ওর কথাটি আমার মাথায় ছিল। পরে লিখলাম কবিতাটি। কবিতাটি আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ অন্ধকার বারান্দায় আছে। আচ্ছা, বলো তো অমলকান্তি কেন রোদ্দুর হতে চায়? কারণ, ঘিঞ্জি বস্তিবাড়িতে থাকার ফলে সে রোদ্দুর পায় না। তাই সে নিজেই রোদ্দুর হয়ে যেতে চেয়েছে।
কবি যে সময়ের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে, জীবন কাটায় এবং যে সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়; লেখার ভেতরে তার একটা ব্যাখ্যা দিতে চাই সে। একটা ইন্টারপ্রিটেশন তাকে দিতেই হয়, না হলে তার মুক্তি নেই।
২১ বছর বয়সে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতা প্রসঙ্গে ‘আত্মঘাতী ক্লান্তি’ কথাটি লিখেছিলাম। পরে পূর্বাশা পত্রিকায় এর জবাবও দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। সেখানে তিনি লিখলেন, না, আমার ভেতরে কোনো আত্মঘাতী ক্লান্তি নেই। তবে পাছে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়ে এ আশঙ্কায় তখন ওঁর কথার কোনো উত্তর দিইনি। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করি একটা ভয়ংকর রকমের আত্মঘাতী ক্লান্তি আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে তাঁকে। ‘আরও এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/ খেলা করে;/ আমাদের ক্লান্ত করে/ ক্লান্ত—ক্লান্ত করে;/ লাশকাটা ঘরে/ সেই ক্লান্তি নাই;/ তাই/ লাশকাটা ঘরে/ চিত হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।’—এই চরণগুলোর ভেতরে কি ক্লান্তি নেই? জীবনানন্দের জীবন সুখের ছিল না। এবং আমি জানতাম একটা আত্মঘাতী ক্লান্তি ওঁর মধ্যে কাজ করে। পরে অবশ্য তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে আমার কথাও হয়েছিল। ’৪৬-এর দাঙ্গা-পরবর্তী সময়ের ঘটনা এটা। আমরা সে সময় একসঙ্গে স্বরাজ নামে একটি পত্রিকায় কাজ করি। আমি নিউজে আর তিনি ছিলেন সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে। তিনি ছিলেন মানে সাহিত্য বিভাগে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। তখন তাঁকে বলেছিলাম, কোনো লোকের মধ্যে আত্মঘাতী ক্লান্তি থাকলে ক্ষতিটা কী? এটা নিয়ে কি মহৎ কবিতা হয় না? আপনি এই কথায় এত ঘাবড়ে গেলেন কেন? আমার কথা শুনে একেবারে চুপ হয়ে গেলেন জীবনানন্দ। আসলে তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাকে ঘষে পিটে তৈরি করার দরকার হয় না। হ্যাঁ, ওর মৃত্যুর পর অনেকে বলেছেন যে সুনীলের আসল মেন্টর হচ্ছে নীরেন্দ্রনাথ। কথাটা কিন্তু ঠিক নয়। নিজগুণেই সুনীল বড় কবি। ওর কোনো মেন্টরের দরকার হয় না। সুনীল প্রসঙ্গে আমি শুধু এটুকু বলি যে একটা চারাগাছকে ধীরে ধীরে বিশাল মহীরুহ হতে দেখলাম। সেই মহীরুহের বিস্তর ডালপালা। কত লোককে সে আশ্রয় দিল—অনেক ভাগ্য করে এসেছিলাম বলে এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে পেয়েছি। সুনীলের মৃত্যুর পর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমাদের তরুণ কবিরা। কলকাতায় এখন আর একজনও নেই যিনি তরুণ কবিদের কবিতার ভালোমন্দ বিচারের পাশাপাশি কবির ঘরে রাতের খাবার আছে কি না, সে ব্যাপারে খোঁজ নেবেন। সুনীল সম্পর্কে একটা কথা বলি, ওর মতো রেঞ্জ আর কারও নেই। যত বিষয়ের ওপর ওর হাত গেছে, আর কোনো কবির হাত অদ্দুর পর্যন্ত যায়নি।
ছন্দ আসলে সব কিছুতেই আছে। একটা লোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে—এর মধ্যে যেমন ছন্দ আছে, তেমনি পাথরে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পা টলে গেল যার—তারও একটা ছন্দ আছে। কথা হলো, প্রথাগত ছন্দটা জেনে রাখা ভালো। কিন্তু এর দাসবৃত্তি করা ভালো নয়। বই পড়তে হবে ছন্দ সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়ার জন্য। তবে শিখতে হবে নিজের মতো করে। আর ছন্দ শেখার পর ওটা ভুলে যেতে হবে। ছন্দ কাজ করবে ভেতরে ভেতরে, অত স্পষ্টভাবে তাকে টানার দরকার নেই।
আমি মনেই করি কবিতা আমার মাতৃভাষা। গদ্য নয়। গদ্য আমি বাধ্য হয়ে লিখি। খবরের কাগজে কাজ করার কারণে লিখতে হয়েছেও প্রচুর। কিন্তু কেবলই মনে হয়, কবিতাকে ফাঁকি দিয়ে, তার থেকে সময় চুরি করে নিয়ে আমি গদ্যকে দিচ্ছি। গদ্য লিখতে আমার ভালো লাগে না।
কবিতায় গল্প বলার বিষয়ে কি, সম্পূর্ণ গল্পটা তো আর আমি কবিতায় ধরে দিতে পারব না। গল্পের একটা আভাস আছে, একটা ইঙ্গিত আছে আমার কবিতায়। একটা আন্দাজ দিতে পারব। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমাদের বাংলা সাহিত্যের কবিতা সেই গোড়া থেকেই গল্প বলে। মহাভারত পুরোটা জুড়েই গল্প আর গল্প। একগাদা গল্পের সমষ্টি। আমাদের মঙ্গলকাব্য গল্প ছাড়া আর কি! আর সেগুলো তো পদ্যেই লেখা। ছন্দে লেখা গল্প। পাঁচালি গল্প ছাড়া আর কি! আমি যা করেছি তা-ও। পাঁচালিতে কি রয়েছে! একটা পরিবার খুব অশান্তিতে ভুগছে, পরিবারের যিনি শ্মশ্রুমাতা, শাশুড়ি ঠাকরুন, তিনি বনে গেছেন আত্মহত্যা করতে। তারপর সেখানে বনলক্ষ্ণীর সঙ্গে দেখা। বনলক্ষ্ণী জিজ্ঞেস করছে, বনে এসছো কেন? শাশুড়ি ঠাকরুন বলছে, আমি আত্মহত্যা করতে এসেছি। কেন? বলছে যে আমার সাতটা ছেলে, সাতপুত্র, কর্তা হয়ে, সাতপুত্র সাত হাঁড়ি হয়েছে এখন, সতত বঁধুরা মোরে করে জ্বালাতন। কেমন! বনলক্ষ্ণী বললেন তুমি বাড়ি ফিরে যাও। বুড়িবারে সন্ধ্যাকালে মিলি বামাগণ, বুড়িবার মানে বৃহস্পতিবার, বামাগণ মানে নারীগণ, সকলে লক্ষ্ণীর পূজা করো আয়োজন। তাহলে দেখবে সংসারে আবার শান্তি ফিরে আসবে। এটা গল্প ছাড়া আর কি! গল্প পুরনো ব্যাপার আর কবিতার মধ্যে গল্প বলাটা নতুন কিছু না। আসল কথাটা হচ্ছে, লিরিক কবিতা, লিরিক কবিতায় গল্প বলার চলনটা ছিল না। লিরিক কবিতার আমরা একটা ভুল ব্যাখ্যা করি। লিরিক কবিতাকে আমরা বলি গীতি কবিতা। না গীতি কবিতা নয়, এটা পারসোনালাইজড পয়েট্রি। একেবারে ব্যক্তিগত উচ্চারণ বলতে যা বোঝায়। নিজের মতো। এখানে গদ্যের মধ্যেও কবিতার সেই গীতসুধাটা থাকে। তো সে অর্থে আমি কোনো নতুন কাজ করিনি। যেটা করেছি, সেটা হল আমি আমার ভাষায় করেছি, এবং আমি মনে করি, আমি যদি গল্প ঢুকিয়েও থাকি কবিতার মধ্যে সেটা কোনো অন্যায় করিনি।

এক দিন হঠাৎ আমার কাছে অরুণ সরকার এসে বলেন, আমার বন্ধু, যে, তোমার কাছে সিগনেট প্রেসের দিলীপ গুপ্ত মশায়, সিগনেট তখনকার কালে ভীষণ নামকরা পুস্তক প্রকাশন প্রতিষ্ঠান, তারা তখন নেহরুর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া বের করেছে, এবং বড় কবিদের, বড় লেখকদের বই বের করে যাচ্ছে, তার মধ্যে অরুণ এসে বলল, তোমার একটি বই দিলীপবাবু চেয়েছেন। তুমি একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট তৈরি করে দাও। আমি সত্যি বলছি, আমি বিশ্বাস করিনি, উনি বললেন যে, সত্যিকথা বলছি, তৈরি করে দাও, তোমার নাম করে চেয়েছেন দিলীপবাবু। তো ওর জোরাজুরিতে বিশ্বাস করতে হল, একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দিলাম, অরুণকুমারের হাতেই দিয়ে দিলাম, তিনি গিয়ে দিলীপবাবুর হাতে দিলেন, বই বেরিয়ে গেল। বই বেরুবার পর কিন্তু আমি জানতে পারলাম দিলীপবাবু আমার বই চাননি। তিনি অরুণের বই চেয়েছিলেন। তিনি অরুণকুমার সরকারের বই চেয়েছিলেন, বই বেরিয়ে গেছে আমার। আমি জেনে তো রেগেমেগে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এটা তুমি কেন করলে। তোমার বই উনি চেয়েছেন আর তুমি আমাকে বললে আমার বই চেয়েছেন, এটা তুমি কেন করলে? আমার বই বেরুনো দরকার ঠিকই কিন্তু তোমার বইও তো বেরুনো দরকার! তুমি আমার কাছে চাইলে কেন? আমি চার্জ করলাম।
অরুণ হেসে বলল, তুমি আমার চেয়ে বড় কবি এমন কথা ভেবে কিন্তু বলিনি। তুমি ভেবো না তুমি আমার চাইতে ভালো লেখ। কিন্তু তোমার বই বেরুনো দরকার আমার চাইতে বেশি। এ জন্য আমি নিজের বই না করে তোমার বই দিয়েছি।

ছেলেবেলায় তো ওস্তাদ রেখে তালিম করে গান শিখতে হয়েছে। সেটা আমার কান তৈরি করে দিয়েছিল সেই ছোটবেলাতেই। গান নিয়ে চাওয়াটা বোধহয় ছিল না। গান আমি এখনও ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু কবিতা আমাকে নিজের মধ্যে ডুবিয়ে নিয়েছে। গান খুব ভালোবাসি, কালকেই যেখানে গেলাম, একটি মেয়ে, কৃষ্ণকলি বলে নাম, কি গাইল, ভগবান কি গলা ওকে দিয়েছেন! ওর গলাটা, ওখানে সুর নিয়ে ও যে খেলা করছে, অসাধারণ, আমার, আমার তো রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে পড়ে গেল, গাইছে কাশিনাথ, নবীন যুবা, ধ্বনিত সভাগৃহ আজি, ডানা মেলিতেছে সাতটা সুর, সাতটা যেন পোষা পাখি, এই মেয়েটির কালকে গান শুনছিলাম, গলায় খেলা করছে যেন পোষা পাখির মতো, গানের কথাও খুব চমৎকার।
সহোদরা (কবিতা)
‘না, সে নয়। অন্য কেউ এসেছিল। ঘুমো তুই ঘুমো।
এখনও রয়েছে রাত্রি, রোদ্দুরে চুমো
লাগেনি শিশিরে। ওরে বোকা,
আকাশে ফোটেনি আলো, দরজায় এখনো তার টোকা
পড়েনি। টগর-বেলা-গন্ধরাজ-জুঁই
সবাই ঘুমিয়ে আছে, তুই
জাগিসনে আর। তোর বরণডালার মালাগাছি
দে আমাকে, আমি জেগে আছি।
না রে মেয়ে, না রে বোকা মেয়ে,
আমি ঘুমোবো না। আমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে
এমন জেগেছি কত রাত,
এমন অনেক ব্যথা-আকাক্সক্ষার দাঁত
ছিঁড়েছে আমাকে। তুই ঘুমো দেখি, শান্ত হ’য়ে ঘুমো।
শিশিরে লাগেনি তার চুমো,
বাতাসে ওঠেনি তার গান।
ওরে বোকা,
এখনও রয়েছে রাত্রি, দরজায় পড়েনি তার টোকা।’

সহোদরা, দুই বোনের দুঃখের কথোপকথন। বুঝতেই পারা যাচ্ছে যে এক বোন যে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, রাত জেগে জেগে, সেই কষ্টের ভেতর দিয়ে তার দিদিও এক দিন গিয়েছিল, দিদির মনে পড়ে যাচ্ছে তার নিজের জীবনের কথা, এই কষ্টটা সেও এক দিন ভোগ করেছে।

আমি ও তিনি

আমি বললুম, “এটা কিছু নয়।”
তিনি বললেন, “এটাই
মন্দাকিনীর ধারা নিশ্চয়,
এতেই তৃষ্ণা মেটাই।”

আমি বললুম, “মন্দাকিনী কি
এত কাছে? এটা ছল।”
তিনি বললেন, “না, না, এটা ঠিকই
স্বর্গঙ্গার জল।”

আমি বললুম, “পিছনের টানে
ঠিক নয় বসে যাওয়া।”
তিনি বললেন, ”বইছে এখানে
অতি পবিত্র হাওয়া।”

আমি বললুম, “বসুন তা হলে,
স্নান করে হাওয়া খান,–
পাথরে পা রেখে আমি যাই চলে।”
তিনি বললেন, “যান।”

অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসত, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।
আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল !
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরূলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।


— অমলকান্তি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

পুরস্কার ও সম্মাননা
সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার|(১৯৭৪)}}
তারাশঙ্কর-স্মৃতি
আনন্দ শিরমণি

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71