শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
অবিস্মরণীয় সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার মান্না দে’র তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০২:০৯ pm ২৪-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০২:০৯ pm ২৪-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

অজস্র ভাষায় তিনি ষাট বছরেরও অধিক সময় সঙ্গীতসাধনা করেছিলেন। বৈচিত্র্যের বিচারে তাঁকেই হিন্দি গানের ভুবনে সবর্কালের সেরা গায়ক হিসেবে স্বীকার করে থাকেন অনেক বিশেষজ্ঞ সঙ্গীতবোদ্ধারা। সঙ্গীত জীবনে তিনি সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেন। তিনি জীবনে সাফল্য এবং খ্যাতি পেয়েছেন।
সম্মাননা
সাল বিবরণ
১৯৬৯ হিন্দী চলচ্চিত্র মেরে হুজুর ছবির গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশিল্পী (পুরুষ)
১৯৬৯ জাতীয় ছায়াছবি পূরস্কার Renaissance Sanskritik Parishadএর মধ্যে মধ্যপ্রদেশ
১৯৭১ বাংলা চলচ্চিত্র নিশি পদ্মে ছবির গানের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশিল্পী (পুরুষ)
১৯৭১ ভারত সরকার পদ্মশ্রী পুরস্কার দেয়।
১৯৮৫ মধ্য প্রদেশ সরকার লতা মঙ্গেশকার পদক প্রদান করে।
১৯৮৮ রেনেঁসা সাংস্কৃতিক পরিষদ, ঢাকা থেকে মাইকেল সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে।
১৯৯০ মিঠুন ফ্যানস এসোসিয়েশনের তরফ থেকে শ্যামল মিত্র পুরস্কার।
১৯৯১ শ্রী ক্ষেত্র কলা প্রকাশিকা, পুরী থেকে সঙ্গীত স্বর্ণচূড় পুরস্কার প্রদান।
১৯৯৩ পি.সি চন্দ্র গ্রুপ ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে পি.সি. চন্দ্র পুরস্কার।
১৯৯৯ কমলা দেবী গ্রুপ কমলা দেবী রায় পুরস্কার প্রদান করে।
২০০১ ‍আনন্দবাজার গ্রুপ আনন্দলোক আজীবন সম্মাননা প্রদান করে।
২০০২ বিশেষ জুরী বোর্ড কর্তৃক সঙ্গীতে অবদানের জন্য সারল্য যশোদাস পুরস্কার প্রদান করে।
২০০৩ পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক আলাউদ্দিন খান পুরস্কারে ভূষিত।
২০০৪ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.লিট সম্মাননা প্রদান।
২০০৪ কেরালা সরকার গায়ক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার প্রদান করে।
২০০৫ ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মবিভূষণ খেতাব প্রদান।
২০০৫ মহারাষ্ট্রের সরকার কর্তৃক আজীবনকাল সম্মান প্রদান।
২০০৭ ওড়িষ্যা সরকার “প্রথম অক্ষয়” পুরস্কার প্রদান।
২০০৮ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি.লিট সম্মান প্রদান।
২০১১- ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মান প্রদান 
২০১১- পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বঙ্গবিভূষণ প্রদান। 
২০১০- সেরা বাঙালী - ই-টিভি
২০১১- Lifetime Achievement Award - Filmfare
২০১২- তার কৃতিত্বের জন্য ২৪ ঘণ্টা টিভি চ্যানেল আজীবন অনন্যা সম্মান প্রদান করে।

এক অজানা মান্না দে… প্রশান্ত ভট্টাচার্য্য

জগন্ময় মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্য, সুধীরলাল চক্রবর্তী তখন আধুনিক বাংলা গানের প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। সবে শোনা যাচ্ছে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এইসব শিল্পীদের নাম। এঁরা সকলেই পরবর্তীকালে বিখ্যাত হয়েছেন। এই মধ্য পঞ্চাশ দশকে হঠাৎ একদিন অনুরোধের আসরে একটা নতুন গান হল — ‘কত দূরে আর নিয়ে যাবে বলো কোথায় পথের প্রান্ত …’ যেমন সুন্দর গলা‚ তেমনই সুন্দর গাওয়া। — শিল্পী মান্না দে। অনুরোধের আসরে আস্তে আস্তে মান্না দে-র বাংলা আধুনিক বাজানো বাড়তে লাগলো। ‘এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি …’ এই সব গান আমার মনের মণিকোঠায় জমা হতে লাগলো। 
মান্না দে বিরাট মাপের শিল্পী। হিন্দি ছায়াছবিতে ওঁর গাওয়া ক্লাসিক্যাল গান, কাওয়ালি, সুফি থেকে শুরু করে রোমান্টিক গান কালজয়ীই শুধু নয়, বহু শিল্পী তাঁকে অনুকরণ করেই বিখ্যাত হয়েছেন। নাম, যশ ও অর্থ উপার্জন করেছেন। অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি ছবিতে উত্তমকুমারের গলায় গান করার পর বাংলা ছবিতে মান্না দে নিয়মিত নায়কের গলায় গান গাইতে শুরু করেন। প্রায় সব প্রযোজক ও সুরকার মান্না দে-র জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকতেন কবে উনি কলকাতায় আসছেন। কেননা তখন মান্নাদা এত জনপ্রিয় শিল্পী যে পশ্চিমবাংলায় সর্বত্র ওঁকে ফাংশন করতে আসতে হত। বাংলা ছবির প্রযোজক সুরকার সবাই দিন ঠিক করে রেকর্ডিং স্টুডিও বুক করে রাখতেন — ফাংশনের আগে-পরে যাতে মান্না দে-কে দিয়ে রেকর্ডিং করা যায়। বিরাট শিল্পী — বিশাল চাহিদা। শত ব্যস্ততার মাঝে ঠিক সময়ে এসে রেকর্ডিং করতেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে। গান কন্ঠে ঠিকমতো তুলে তবেই রেকর্ডিং করতেন। 
একটা বাংলা ছবিতে হয়তো কয়েকটা গান থাকতো। হিরোইনের গান যদি লতা মঙ্গেশকর বা আশা ভোঁসলের কন্ঠে থাকতো তবে প্রযোজক, সুরকার দল বেঁধে বোম্বে গিয়ে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতেন এসব শিল্পীর রেকর্ডিং করার জন্য। আর নায়কের গান যদি মান্না দে বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া হয় — তবে ওঁরা কলকাতায় এলে এঁদের রেকর্ডিং করা হত। এটা করা হত মূলত আর্থিক খরচ কমানোর জন্য। বোম্বেতে স্টুডিও ভাড়া, মিউসিশিয়ান পেমেন্ট কলকাতার তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ওঁরা ভুলে যেতেন যে বোম্বের রেকর্ডিং অনেক উন্নত মানের। 
আমার ছবির প্রোডিউসার আর্থিক দিক থেকে বেশ স্বচ্ছল ছিলেন। তবু আমায় বললেন মান্না দে-র গানগুলি কলকাতায় করুন আর আশা ভোঁসলের গানগুলো বোম্বেতে করা হোক। আমার নিজের অনেক গান বোম্বে থেকে বেরিয়েছে। মান বা কোয়ালিটির তফাৎ হয় বোম্বে ও কলকাতার রেকর্ডিং-এর মধ্যে। সেজন্য আমি জেদ ধরলাম — যদি আমায় সত্যিই কাজ করতে হয়, তবে সব গান বোম্বেতেই করব। কথামতো কাজ। মান্নাদার সঙ্গে ফোনে কথা বলে নিলাম। উনি খুব খুশি। আমার এই ব্যবহারে।

বোম্বেতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি রেকর্ডিং করতে হবে প্রোডিউসারের অর্থ বাঁচাবার জন্য। সুতরাং বোম্বে শহরে সমাচার মার্গে Western Outdoor Studio বুক করা হল। জুহুতে মান্নাদার বাংলোতে গিয়ে গান তোলালাম। মান্নাদাই আশাজী-র সঙ্গে আমার গান তোলাবার সময় ঠিক করে দিলেন। বললেন, পেডার রোডে প্রভুকুঞ্জের ফ্ল্যাটে আশা পরের দিন সকাল ঠিক দশটায় আসবে। তুমি দশ মিনিট আগে যাবে কিন্তু পরে নয়। কথামতো সময়মতো গিয়ে আশাজীকে গান তুলিয়ে আসলাম। হোটেলে ফিরে শুনলাম মান্নাদা রিসেপশনিস্ট-এর কাছে একটা চিরকূট রেখে গেছেন — রাতে ওঁর বাড়িতে খেতে হবে। তবে যেতে হবে সন্ধ্যায়, গানগুলো একটু ঝালিয়ে নেবেন উনি।

পরের দিন Recording। আশাজী তখন থাকতেন পঞ্চমদার সঙ্গে সান্তাক্রুজে। মান্নাদা বললেন, দ্যাখো, সান্তাক্রুজ থেকে ফ্লোরা ফাউন্টেন-এর কাছে সমাচার মার্গে Western Outdoor অনেক দূর। আশা একটু গাইঁ-গুইঁ করছে। তোমরা চিন্তা কোর না। আজ একটু তোমাদের বৌদির হাতের ভালমন্দ খাও। আর কাল আমিই আশাকে রেকর্ডিং-এ নিয়ে যাব তবে একটু ওর গালমন্দ খেয়ো। সত্যিই আশাজীকে নিয়ে স্বয়ং মান্নাদা Studio-তে Recording-এর জন্য চলে এসেছিলেন। আমার আজও মনে হয় — সেদিন যদি অন্য প্রোডিউসারদের মতো মান্নাদার গান কলকাতায় রেকর্ডিং করতাম — তাহলে আশাজী অন্তত সান্তাক্রুজ থেকে সকালের ব্যস্ত বোম্বাই শহরে এসে আমাদের রেকর্ডিংটা করতেন কিনা সন্দেহ। এটা সম্ভব হয়েছিল মান্নাদার জন্য। যেন ওঁরই সব দায়দায়িত্ব।

মান্নাদার সঙ্গে বলতে গেলে প্রায় এক পাড়ায় থাকি। আমার জীবনে এটা একটা বড় মিল। ওঁর বাড়ির ঠিকানা ৯ নম্বর মদন ঘোষ লেন, কলিকাতা – ৬। আমার ঠিকানা ৯ নম্বর মদন মিত্র লেন, কলিকাতা – ৬। ওঁর বাড়ি গলির ভিতর বাঁদিকে। আমার বাড়িও গলির ভিতর বাঁদিকে। তফাৎ উনি মান্না দে — আমি প্রশান্ত ভট্টাচার্য্য এক পাড়ায় থাকার সুবাদে মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে যেত। যেমন ওঁর পাড়ায় নকুড়ের মিষ্টির দোকান থাকতেও দু-একবার আমাদের পাড়ার ঘোষের মিষ্টির দোকান থেকে ওঁকে মিষ্টি কিনতে দেখেছি।

একবার উনি যাত্রায় সুর করেছিলেন। জ্যোৎস্না দত্ত ও গুরুদাস ধাড়া অভিনীত শিল্পীতীর্থ দলে। দলের মালিক ছিলেন বৈদ্যনাথ শীল। একদিন ওঁর বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলাম। বললেন — হুঁ বাবা — এবার আমিও যাত্রায় সুর করছি — বুঝেছ! কথাবার্তা চলার মাঝেই হঠাৎ একটা রেশন থলে হাতে যাত্রাদলের মালিক বৈদ্যনাথ শীলের আগমন। দাদা থলেটা রাখেন। থলেটার মধ্যে কাঁচা টাকা ছিল। মান্নাদা বললেন, থলে নিতে পারব না। সময় বুঝে আমি চলে এসেছিলাম। শুনেছিলাম — যাত্রায় সুর করা ওঁর খুব সুখকর হয়নি বা ভালো লাগেনি। 
বাংলা সিনেমায় নায়কের গলায় বা লিপে গান — হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-এরই একচেটিয়া ছিল — পঞ্চাশ দশক ও ষাটের গোড়া পর্যন্ত। শ্যামলদা দু-একটি গান গেয়েছেন, তবে সেটা ব্যতিক্রম। সেখানে রোমান্টিক নায়কের লিপে মান্নাদার আবির্ভাব একটু অন্যভাবে।

বহু বাংলা ছবির প্রযোজক বি এন রায়কে কিশোর বয়সে দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। ইচ্ছে ছিল, সিনেমায় নামা। একদিন টালিগঞ্জের কালিকা ফিল্মসের স্টুডিও থেকে দারোয়ান তাড়িয়ে দেয়। উনি প্রতিজ্ঞা করেন — স্টুডিওতে ঢুকবেন সিনেমা তৈরি করতে। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। রায়মশাই ধানবাদে ব্যবসা করে বেশ অর্থবান হয়ে ওঠেন। এমন সময় প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী শ্যামল মিত্র বি এন রায়কে ছবি করতে বলেন যেহেতু দুজনের পূর্ব পরিচয় ছিল। উনি বলেন, তুমি ছবি করো। টাকা আমি দেব। ছবি হল। উত্তমকুমার হিরো, তনুজা হিরোইন। শ্যামল মিত্র সুরকার এবং উত্তমকুমারের লিপের সব গান শ্যামল মিত্রের কন্ঠে গাওয়া। সিনেমা সুপারহিট, গানও হিট। বি এন রায় সিনেমাতে মজলেন। সঙ্গীতবহুল ছবি করতে হবে। ছবি হবে অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি। উত্তমকুমার নায়ক। সুরকার অনিল বাগচী। উত্তমকুমার চেয়েছিলেন গানগুলো অভিন্ন হৃদয় বন্ধু শ্যামল মিত্র রেকর্ড করুক। কিন্তু বি এন রায় বললেন, মান্না দে-কে দিয়ে গানগুলো গাওয়ানো হোক। সেই শুরু — ‘আমি যে জলসাঘরে …’ কিংবদন্তী শিল্পীর বাংলা সিনেমায় পথচলা শুরু — যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বি এন রায় আজও সুস্থ আছেন। তাঁর কাছ থেকে শোনা এই ইতিহাস।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71