বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯
বুধবার, ৫ই আষাঢ় ১৪২৬
 
 
অরিত্রীর আত্মহত্যা: শিক্ষিকাদের আচরণ ও বাংলাদেশের অদূর ভবিষ্যৎ!
প্রকাশ: ১২:০১ pm ১১-১২-২০১৮ হালনাগাদ: ১২:০১ pm ১১-১২-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


'যে মেয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাস্থানে ৩য় স্থান অর্জন করে, যে মেয়ের ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে নোবেল রিডিং এ ১ম রানারআপ হয়েছে। যে মেয়ে স্পেনিশ, চাইনিজ, কোরিয়ান, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় ভালো দক্ষ সেই মেয়ের বিরুদ্ধে পরীক্ষার হলে মোবাইলে নকল করার অভিযোগ আনা সম্পূর্ণ বৃত্তিহীন। শিক্ষিকার এই বৃত্তিহীন অভিযোগের খড়গে পরে আত্মঘাতী হয়েছে ভিকারুননিসা নূর স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী!'

'প্রসঙ্গত, গত ২ই ডিসেম্বর রোববার স্কুলে পরীক্ষার সময় অরিত্রী মোবাইল নিয়ে গিয়েছিল। মোবাইলে নকল আছে এমন অভিযোগে ওই স্কুলের শিক্ষক সোমবার অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী এবং মা বিউটি অধিকারী কে স্কুলে আসতে বলেন। অভিবাবকরা স্কুলে আসলে তাদের ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে গেলে তারা মেয়ের ব্যাপারে ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল কিছু করার নেই বলে তাদের প্রিন্সিপালের রুমে যেতে বলেন। সেখানে গিয়েও তারা ক্ষমা চান কিন্তু প্রিন্সিপালও তাতে সদয় হননি। পরে অরিত্রি প্রিন্সিপালের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলেও তাদের বেরিয়ে যেতে বলেন এবং পরের দিন টিসি (স্কুল ছাড়পত্র) নিয়ে যেতে বলেন। এ সময় বাবা দিলীপ অধিকারী মেয়ের সামনেই কেঁদে ফেলেন! বাবার এই কান্না-অপমান মেনে নিতে না পেরে ঢাকার শান্তিনগরের বাসায় নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে অরিত্রী(১৫)।'

'এখানে অরিত্রীর মৃত্যু হয়েছে এবং সেই সাথে মৃত্যু হয়েছে একটি সম্ভাবনারও। অরিত্রীর এই মৃত্যু বাংলাদেশের শিক্ষকদের আচরণকে আজ প্রশ্নেরমুখে ফেলেছে। ভিকারুননিসা নূর স্কুলের অনেক অজানার রহস্য দেশবাসীর সামনে বের হচ্ছে। এখানে অরিত্রী কি সত্যি নকল করেছিল নাকি নকলের অভিযোগ এনে তাকে টিসি দিতে পারলে একটি সিট কালি হবে আর সেই সিটটি স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অধ্যক্ষ বিশেষ কোনো অসৎ উদ্দেশ্য সম্পাদনের কাজে লাগাতে পারবে?'

'অবশ্যই পরীক্ষার হলে মোবাইল নেওয়া অপরাধ। অরিত্রী পরিক্ষার হলে মোবাইলের মাধ্যমে নকল করে থাকলে সে যেই পরীক্ষায় নকল করেছে শিক্ষিকা সে পরিক্ষাটি বাতিল করতে পারত। কিন্তু পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়ার পরও একটা কোমলমতি স্কুল শিক্ষার্থীকে টিসি দেওয়া কোনো যুক্তির মধ্যে পরে না। এটা স্কুলের নীতিমালা বিরুধী কাজ।'

'২০০২ সাল থেকে এই পর্যন্ত এই স্কুলটির বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্য, ঘুষ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কোচিং বাণিজ্যের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ভর্তি নীতিমালা জারি করার পরেও অযৌক্তিকভাবে সুপারিশের অজুহাত দেখিয়ে নীতিমালা অমান্য করে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ২শ’র বেশি ছাত্রী ভর্তি করা হয়েছে। যা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসকে শোকজ নোটিশও করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের ওই নোটিশকেও কোনো গুরুত্ব দেননি ভিকারুননিসা অধ্যক্ষ। এর আগেও শিক্ষার্থীদের থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের দায়ে বিদ্যালয়টির সাবেক এক অধ্যক্ষের এমপিও স্থগিতও করা হয়েছিল।'

'এই অনিয়মের কথা শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদও শিকার করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নির্দিষ্ট সিট থাকার পরও তা না মেনে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ। পূর্বেও একজন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে ১০ লাখ টাকা করে নিয়েছে তারা।'

'সেই সাথে স্কুলের শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের জানাই তাদের কথায় কথায় স্কুলের শিক্ষিকারা টিসি দেয়ার ভয় দেখাই। মানবিক আচরণ করে না, সবসময় মানসিক নির্যাতন করে থাকে। কিসের আলামতে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের টিসি দেয়ার ভয় দেখায়? তা শিক্ষামন্ত্রীর শিকারোক্তিতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। বাড়তি ছাত্রী ভর্তি করানোর পর নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বের করার ধান্দায় মত্ত থাকে এই শিক্ষকরা। তাই তারা ছাত্রীদের দোষত্রুটিই খুঁজে বেড়ায় সবসময়।'

'শিক্ষিকার মানসিক অত্যাচারে ২০১২ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিল চৈতি রায় নামে ভিকারুননিসা স্কুলের নবম শ্রেণীর আরেক ছাত্রী। ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও শিক্ষিকার অমানবিক আচরনের কারনে বিজ্ঞান বিভাগে পড়তে না পেরে ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করে চৈতী রায়।'

'শিক্ষার নামে ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষের হয়রানিমূলক কর্মকান্ড বন্ধ ও তাদের ভর্তি বাণিজ্য, ঘুষ, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কোচিং বাণিজ্যের কর্মকান্ড রোধে গভর্নিং বডিসহ সংশ্লিষ্ট দুষ্টচক্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায়, সেইসাথে চৈতি রায়ের আত্মহত্যা প্ররোচনাকারীদের বিরুদ্ধে যতাযত ব্যবস্থা না নেয়ায় আজ অরিত্রীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ আজ ছাত্রীদের শিক্ষার স্থল না হয়ে হয়ে উঠেছে প্রান নেবার স্থল।'

'শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কখনো নির্যাতনের কেন্দ্র হতে পারেনা, শুধু ভিকারুননিসা নূর স্কুল নয়, বাংলাদেশের অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী নামকরা স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রতি এধরনের মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। আর এভাবে নির্যাতন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শত শত অরিত্রীর মৃত্যু মিছিল ধরবে। তাই অরিত্রী হত্যার দোষীদের কঠোর শাস্তি দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করতে হবে।'

'একজন অরিত্রী কিংবা চৈতিকে পাওয়া একটা দেশের জন্য সৌভাগ্যের। এরা দেশকে উন্নত বিশ্বের কাছে নিয়ে যেতে পারতো। এরা হতে পারতো বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ কিংবা মহাকাশ গবেষক। কিন্তু ভর্তি বাণিজ্য, স্কুল কতৃপক্ষ এবং শিক্ষিকাদের মানসিক নির্যাতনের কারনে এই মেধাবীদের অকালে জড়ে যাওয়া জাতির জন্য এক বিরাট ক্ষতি। দেশের প্রতিটি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ছাত্র-ছাত্রীর প্রতি মানবিক, সংবেদনশীল এবং অসাম্প্রদায়িক হতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের উচিত ছাত্র-ছাত্রীদের সংবেদনশীল মনন বুঝার জন্য শিক্ষিকাদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহন করে প্রতিটি স্কুল কলেজে একজন মনোবিদ প্রশিক্ষক রাখা। উন্নত বিশ্বে স্কুল কলেজে শিক্ষকরা কিভাবে পাঠদান করে, কিভাবে শিক্ষার্থীদের ভালো বন্ধু হয় সেই বিষয়ে শিক্ষিকাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তা না হলে প্রতিনিয়ত এই দেশ অরিত্রীদের মত মেধাবীদের হারাতে থাকবে। আর তার মাসুল দিতে হবে বাংলাদেশকে। এইভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের দিকে এসে তখনো আমাদেরকে বলতে হবে বাংলাদেশ এখনো উন্নত বিশ্ব থেকে ৩০ বছর পিছিয়ে!'

নি এম/রাজু দাশ
অনলাইন অ্যাক্টিভিষ্ট

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71