শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
অর্পিত সম্পত্তি আইনের ৫২ বছর
প্রকাশ: ০৬:৩৮ pm ২৮-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ০৬:৩৮ pm ২৮-০৫-২০১৭
 
 
 


শিতাংশু গুহ ||

ডা. দীপু মনি বিদেশমন্ত্রী হয়ে প্রথমবার ২০০৯ সালে নিউইয়র্ক এলে সংখ্যালঘু সমস্যা নিয়ে আমরা তার সঙ্গে বসেছিলাম। আলোচনায় শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি আইন প্রসঙ্গ এলে তিনি বলেছিলেন, ‘৪৪ বছর হয়ে গেছে?’ আমরা বলেছিলাম ১৯৬৫ সাল থেকে ২০০৯ দীর্ঘ ৪৪ বছর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু বিশেষত হিন্দুরা এই আইনের যাতনায় ভুগছে। এটা ২০১৭, এই কালো আইনের যাতনা কিছুই কমেনি। বর্তমান সরকার আইনটি নিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছেন। একবার বাতিল, আবার সংশোধন চলছে তো চলছেই। কিন্তু কাজের কাজ এখনো কিছু হয়নি। কোনো হিন্দু তার সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন বা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, এমন কথা শুনিনি। স্বভাবত প্রশ্ন উঠছে, সবকিছু ‘আই ওয়াশ’ নয়তো? বাহান্ন বছর ধরে এই আইন নিয়ে বারবার নাড়াচাড়া হয়েছে এবং প্রতিবারই এর শিকার হয়েছে হিন্দুরা।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অঙ্গীকার ছিল, পাকিস্তান আমলের সব কালাকানুন বাতিল হবে। রহস্যময় কারণে এই কালো আইনটি বাতিল হয়নি। বরং ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ নাম পাল্টে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ হয়ে যায়। বাংলাদেশে কেউ বলেন না যে আইনটি ভালো, কিন্তু এটি এতকাল কেন জাতির ঘাড়ে চেপে থাকল- এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কারো কাছে নেই! শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তি যে নামেই ডাকা হোক না কেন এটি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের জন্যই প্রণীত বা আজো বহাল তা দিবালোকের তো সত্য। বাংলাদেশে প্রায় সব হিন্দু পরিবার কোনো না কোনোভাবে এই আইনের বদৌলতে ক্ষতিগ্রস্ত। আর এই আইন কত সম্পত্তি হিন্দুর কাছে থেকে কেড়ে নিয়েছে এই হিসাব অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত তার বইয়ে খুব ভালোভাবেই দিয়েছেন।

এই আইন বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিক্যাল ১১/ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার; আর্টিক্যাল ১৩/ প্রিন্সিপাল অফ ওনারশিপ; আর্টিক্যাল ২৭/ আইনের চোখে সমতা এবং আর্টিক্যাল ২৮/ ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত ভিত্তিতে বৈষম্য ইত্যাদি নীতিমালার পরিপন্থী এবং সাংঘর্ষিক। দেড় দশক আগেকার মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার এই আইনের ভিত্তিতে প্রায় ৩ মিলিয়ন (৩০ লাখ) একর হিন্দু সম্পত্তি অধিগ্রহণ করেছে। একদা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষ সর্বত্র ঘৃণিত ছিল। সেখানে কালোরা শুধুমাত্র গাত্রবর্ণের জন্য সম্পত্তি হারাত। শত্রু সম্পত্তি আইনটি ‘ধর্মবিদ্বেষ থেকে প্রসূত। বাংলাদেশে হিন্দুরা শুধুমাত্র ধর্মের কারণে সম্পত্তি হারিয়েছে বা হারাচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষ আর বাংলাদেশের ধর্মবিদ্বেষ কি খুব পৃথক? জাতির ললাটে এই আইন রেখে আমরা নিজেদের ‘সভ্য’ দাবি করতে পারি?

জাতির জন্য এই আইন একটি অভিশাপ। এ থেকে মুক্তি দরকার। ২০০৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার দৈনিক সংবাদ এক সম্পাদকীয়তে বলেছিল, সংস্কার নয়, শত্রু সম্পত্তি আইনটি বাতিল করুন। পত্রিকাটি যুক্তি দিয়ে বলেছিল, সরকারের প্রতিশ্রæতিতে আমরা সন্দিহান। সরকারের উচিত আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা। পত্রিকাটি বলেছে, এটি হলে ভুক্তভোগীরা হয়রানি ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাবে। বর্তমান সরকার এখন ‘ভিশন ২০২১’ বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২১-এ ৫০ বছর বয়সে বাংলাদেশ ডিজিটাল জাতিতে পরিণত হবে। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এর সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অগ্রগতি ঘটবে তো? শত্রু সম্পত্তি আইন থাকলে আশা নেই। সরকার যাই করুন, কোনো না কোনো ফর্মে আইনটি এখনো আছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে এই আইন কি সামঞ্জস্যপূর্ণ?

১৯৬৫ : পাকিস্তান সরকার এক নির্বাহী আদেশে ‘শত্রু সম্পত্তি (কাস্টডি অ্যান্ড রেগুলেশন) অর্ডার ২ অফ ১৯৬৫’ জারি করে। জরুরি অবস্থাকালে ‘পাকিস্তান ডিফেন্স রুলাস’- এর আওতায় ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ এটি জারি হয়। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট আইনটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চায় (২১ ডিএলআর (এসসি) পৃষ্ঠা ২০)। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান থেকে জরুরি অবস্থা উঠে যায়, কিন্তু শত্রু সম্পত্তি আইনটি ওঠে না। বরং পাকিস্তান সরকার নতুন অর্ডিন্যান্স (অর্ডিন্যান্স ১ অফ ১৯৬৯) জারি করে শত্রু সম্পত্তি আইনটি জিইয়ে রাখে। আইয়ুব খান এ সময় ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২৫ মার্চ ১৯৬৯ ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করেন। ১ এপ্রিল সংবিধান বাতিল হয়। সংবিধান বাতিল হওয়ার পরও শত্রু সম্পত্তি আইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি নুতন অর্ডিন্যান্স জারি হয় এবং সেটি বলবৎ করা হয় ২৫ মার্চ ১৯৬৯ থেকে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগরে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। একই দিন ‘লজ অফ কন্টিন্যুয়েন্স এনফোর্সমেন্ট অর্ডার ১৯৭১’ জারি হয়। ফলে পাকিস্তানের সব আইন সদ্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশেও বহাল থাকল। অর্থাৎ অর্ডিন্যান্স ১ অফ ১৯৬৯ বা শত্রু সম্পত্তি আইনটি থেকে গেল। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ সরকার শত্রু সম্পত্তি নাম পাল্টে ‘ভেস্টিং অফ প্রপার্টি অ্যান্ড এসেট অর্ডার ১৯৭২’ (নির্দেশ ২৯, ১৯৭২) রাখে। ১৯৭৪ সালের ২৩ মার্চ সরকার অর্ডিন্যান্স ১ অফ ১৯৬৯ এবং এতদ সংক্রান্ত ধারাগুলো বাতিল করে এবং একই সঙ্গে ‘অর্পিত ও অনাবাসী সম্পত্তি (প্রশাসন) অ্যাক্ট (অ্যাক্ট ৪৭, ১৯৭৪) চালু করে। সেই থেকে এটি শত্রু (অর্পিত) সম্পত্তি নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করে।

১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই আইনের ভয়াবহতা তেমন টের পাওয়া যায়নি। কিন্তু ১৯৭৫ সালে সরকার অ্যাক্ট ৪৭, ১৯৭৪ বাতিল করে নুতন অর্ডিন্যান্স ৯২ অফ ১৯৭৬ (পরে ৯৩ অফ ১৯৭৬) জারি করেন। শত্রু সম্পত্তি নামক আইনের চরম আঘাতটি নেমে আসে জিয়াউর রহমানের হাত দিয়ে। তার অর্ডিন্যান্সের বদৌলতে একজন তহসিলদার যে কোনো সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ ঘোষণার ক্ষমতা পান এবং সেই সম্পত্তির মূল্যের ওপর একটি কমিশন পান। তহসিলদাররা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হিন্দু নাম দেখে দেখে হিন্দুদের বাড়িঘর শত্রু সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করেন। আর একবার কারো সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হলে তা থেকে বেরিয়ে আসা ছিল দুঃসাধ্য কাজ। ওটা সম্ভব ছিল শুধুমাত্র আদালত ও সচিবালয়ে মামলা করে, যা সাধারণ হিন্দুদের পক্ষে ছিল অসম্ভব। এদিকে ‘লিজের’ বিধান থাকায় প্রভাবশালী মুসলমান শত্রু সম্পত্তি লিজ নিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে।

এমন অসংখ্য ঘটনা আছে যে, একজন মুসলমান হয়তো কোনো হিন্দুবাড়ির একটি অংশ লিজ নিয়েছেন কিন্তু শক্তি প্রয়োগ করে তিনি পুরো বাড়িটিই দখল করেন। ১৯৭৭-১৯৯০ জিয়ার পর জেনারেল এরশাদের আগমন। হিন্দু বাড়িঘর দখলের মহোৎসব চলতেই থাকে। একই সঙ্গে এ নিয়ে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ল। এক সময় এরশাদ নির্দেশ দিলেন যে, ‘আর কোনো সম্পত্তি নতুন করে শত্রু সম্পত্তি করা যাবে না’। ফল হলো উল্টো। ব্যাক ডেটে হিন্দু সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হতেই থাকল। জিয়া-এরশাদ, এই দুই সামরিক শাসকের আমলে সম্পত্তি হারিয়ে বহু হিন্দু দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে কিন্তু এই আইনের ওপর হাত দেয় না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে প্রায় পাঁচ বছর সময় নেয় কিছু একটা করতে। ১১ এপ্রিল ২০০১ পার্লামেন্টে ‘রেস্টোরেশন অফ ভেস্টেড প্রপার্টি অ্যাক্ট ২০০১’ (অ্যাক্ট ১৬, ২০০১) পাস করে। এতে হিন্দুদের মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়।

কিন্তু ২০০১-এর অক্টোবরে নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসে। ২০০২ সালের ২৬ নভেম্বর পার্লামেন্টে ‘রেস্টোরেশন অফ ভেস্টেড প্রপার্টি অ্যাক্ট ২০০২’ পাস হয়। এর ফলে আওয়ামী লীগের আমলে পাসকৃত আইনটি মূলত শিকেয় তুলে রাখা হয়। এর ফলে সব শত্রু বা অর্পিত সম্পত্তি ডেপুটি কমিশনারের অধীনে চলে আসে এবং বরাবরের মতো তিনি সেটি লিজ দেয়ার ক্ষমতা পান। শত্রু সম্পত্তি আইনের অত্যাচার অব্যাহত থাকে। ২০০৯-এ আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতাসীন হয়। এই আইনটি নিয়ে তারা কিছু করার প্রয়াস পান। ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত অনেক দৌড়াদৌড়ি করে ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন ২০১৩ পাস করে এবং এটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ১০ অক্টোবর ২০১৩ (২০১৩ সালের ৪৬ নং আইন)। এর আগে পরে বেশ কটি সংশোধন এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবাই ‘গরলভেল’। প্রশ্ন হলো, ৫২ বছর তো হলো, আর কত? এই জঞ্জাল কবে শেষ হবে?

 

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71