শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
অশোক চক্রের অজানা ইতিহাস
প্রকাশ: ১২:৩৬ am ২১-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ০২:১৭ am ২১-০২-২০১৭
 
 
 


অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ একটি ভাস্কর্য্য যেখানে চারটি এশীয় সিংহ পরস্পরের দিকে পিঠ করে চারদিকে মুখ করে বসে রয়েছে। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই ভাস্কর্য্যের রৈখিক প্রতিরূপ ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

আনুমানিক ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৌর্য্য সম্রাট অশোকের শাসনকালে সারনাথ নামক স্থানে একটি অশোক স্তম্ভের শীর্ষে এই ভাস্কর্য্যটি স্থাপন করা হয়। অশোক স্তম্ভটি স্বস্থানে রাখা হলেও স্তম্ভশীর্ষটিকে বর্তমানে সারনাথ সংগ্রহালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ২.১৫ উচ্চ এই স্তম্ভশীর্ষটি অন্যান্য স্থানে প্রাপ্ত অশোক স্তম্ভগুলির স্তম্ভশীর্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যার অধিকাংশে চারটির বদলে একটি সিংহের মূর্তি রয়েছে।
 
বৈশিষ্ট্য

সারনাথ থেকে প্রাপ্ত অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষ। এই স্তম্ভশীর্ষ পালিশকরা একটি একক বেলেপাথর খোদাই করে নির্মাণ করা হয়েছে। অশোক স্তম্ভটি ও স্তম্ভশীর্ষটি দুইটি ভিন্ন পাথরের টুকরো দ্বারা নির্মিত। এই স্তম্ভশীর্ষে চারটি এশীয় সিংহ পরস্পরের দিকে পিঠ করে চারদিকে মুখ করে বসে রয়েছে। এই চারটি সিংহ যে ভিত্তিভূমির ওপর দন্ডায়মান সেখানে একটি হাতি, একটি ঘোড়া, একটি ষাঁড় ও একটি সিংহের মূর্তি খোদিত রয়েছে, যাদের মধ্যে একটি করে ধর্মচক্র খোদিত রয়েছে। এই সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটি একটি ঘন্টাকৃতি পদ্মের ওপর স্থাপিত। সম্ভবত এই স্তম্ভশীর্ষের ওপর একটি ধর্মচক্র ছিল, যার কিছু টুকরো ঐ স্থানে পাওয়া গেছে।[৪] সারনাথের অশোক স্তম্ভ ও এই স্তম্ভশীর্ষের একটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে নির্মিত প্রতিরূপ থাইল্যান্ডের ওয়াট উমোং মন্দিরে রাখা আছে, যেখানে ধর্মচক্র বা অশোক চক্র স্তম্ভশীর্ষের ওপর রয়েছে।[৫]।

১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের শীতকালে ইংরেজ প্রকৌশলী ফ্রেডরিখ অস্কার ইমানুয়েল ওয়ের্টেল সারনাথ অঞ্চল খননের দায়িত্ব পান। তিনি প্রথমে মূল স্তূপের পশ্চিমে অশোকের আমলের এক স্থাপত্যের ওপর নির্মিত একটি গুপ্ত যুগের মন্দিরের অবশেষ খুঁজে পান। এর পশ্চিম দিকে তিনি অশোক স্তম্ভের নিচের ভাঙ্গা অংশটি আবিষ্কার করেন। অশোক স্তম্ভটির বাকি অংশ তিনটি ভাগে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর অশোক স্তম্ভটির শীর্ষ ভাস্কর্য্য খোঁজার চেষ্টা করা হয় এবং অদূরেই সেটিকে পাওয়া যায়। সাঁচী থেকে প্রাপ্ত অনুরূপ সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষের চেয়ে সারনাথে আবিষ্কৃত ভাস্কর্য্যটি তুলনামূলক ভাবে যথেষ্ট ভালো অবস্থায় ছিল। শীঘ্রই উৎখননের স্থানে সারনাথ সংগ্রহালয় স্থাপন করে আবিষ্কৃত প্রত্নসামগ্রীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।[৪]

ভারতের জাতীয় প্রতীক

১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে অশোকের সিংহচতুর্মুখ স্তম্ভশীর্ষের মুদ্রণরূপ গৃহীত হয়। [৬] জাতীয় প্রতীকে গৃহীত রূপটিতে চতুর্থ সিংহটি দেখা যায় না, কারণ স্তম্বশীর্ষে এটি পিছনে অবস্থিত ও সামনে থেকে দৃষ্টিগোচরে আসে না। সিংহের পায়ের তলায় যে ভিত্তিভূমির কেন্দ্রে ধর্মচক্র, ডানদিকে ষাঁড় ও বাঁ দিকে লম্ফমান ঘোড়া দেখা যায়। বাঁয়ে ও ডানে একদম ধারে ধর্মচক্রের দুটি ধার দেখা যায়।[৭] জাতীয় প্রতীকের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল দেবনাগরী হরফে খোদিত সত্যমেব জয়তে (সংস্কৃত: सत्यमेव जयते) নীতিবাক্যটি,[৭] যা মূল স্তম্ভশীর্ষে দেখা যায় না।

ভারতের মৌর্য রাজবংশের তৃতীয় সম্রাট অশোক

খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন অশোক। সম্রাট বিন্দুসার এর ঔরসে ও রাণী ধর্মা ( মতান্তরে সুভদ্রাঙ্গির) গর্ভে। উত্তর - ভারতের কিম্বদন্তী অনুসারে চম্পাদেশীয় রাজকণ্যা সুভদ্রাঙ্গী ছিলেন অশোকের মা।আর দক্ষিণ ভারতীয় কিম্বদন্তী অনুসারে তাঁর মায়ের নাম ধর্মা।তাঁর চারজন স্ত্রীর নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন- তিশ্যারাক্ষ, পদ্মাবতী, কারুভাকী, বিদিশা। মাত্র ১৮ বৎসর বয়সে বিন্দুসার তাঁকে উজ্জ্বয়িনীর শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। তক্ষশীলাবাসী রাজশক্তির অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে, তক্ষশীলায় বিদ্রোহ শুরু হলে বিন্দুসার তাঁকে বিদ্রোহ দমনের জন্য তক্ষশীলায় পাঠান। অশোক এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হলে, তাঁকে তক্ষশীলার শাসনভার লাভকরেন। এই মসয় তিনি মহাদেবীকে বিবাহ করেন। বিন্দুসারের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর পুত্রদের মধ্যে সিংহাসনের দখল নিয়ে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

বৌদ্ধ কিম্বদন্তী অনুসারে জানা যায়, বিন্দুসারের স্ত্রীর সংখ্যা ছিল ১৬ জন এবং পুত্রের সংখ্যা ছিল ১০১ জন।তাঁর মত্যুর পর পুত্র অশোক অন্যান্য ভাইদের পরাজিত ও হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছিলেন। সিংহলীয় উপাখ্যানসমূহে পাওয় যায়, তিনি তাঁর ৯৮ জন ভাইদের হত্যা করেছিলেন। এই জন্য তাঁকে চন্ডাশোক বলা হয়েছে। সিংহাসন দখলের পর, দেবানাম - প্রিয়- পিয়দসী অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয় প্রিয়দর্শী উপাধি ধারণ করেন। ধারণা করা হয়, তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ অব্দের দিকে সিংহাসন লাভ করেন।কিন্তু তাঁর সম্রাট হিসাবে অভিষেক হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৯ অব্দের দিকে। 

খ্রিষ্টপূর্ব ২৬০-৬৩ অব্দের দিকে তিনি কলিঙ্গ রাজ্য জয় করেন।এই যুদ্ধে কলিঙ্গবাসী সর্বশক্তি দিয়ে অশোকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও কলিঙ্গবাসী পরাজিত হয়।এই যুদ্ধে এক লক্ষ নরনারী প্রাণ হারায় এবং প্রায় দেড়লক্ষ নরনারী বন্দী হয়।এই যুদ্ধের এই বীভৎসতা সম্রাট অশোককে বিষাদগ্রস্হ করে তোলে। পরে তিনি যুদ্ধের পথত্যাগ করে অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনের নীতি গ্রহণ করেন।এরপর তিনি ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নেন । এরপর থেকে তিনি অহিংসা নীতি গ্রহণ করেন।

তিনি তার গুরু উপগুপাদ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু,লুম্বিনী,কুশীনগর, বুদ্ধগয়া -সহ নানা স্হানে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন।এই সময় তিনি নানা স্হানে ম্তপ, স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বানী লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যাবস্থা করেন।জনকল্যাণের জন্য তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করেন।জলকষ্ট দূরীকরণের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন স্হানে জলাশয় তৈরি করে দেন।অশোকের এই অহিংস নীতির কারণে, তার্র সাথে প্রতিবেশী রাজ্যে এবং গ্রিকদের সাথে বিশেষ সখ্যতা গড়ে উঠে।

তিনি সিরিয়া, মিশর, এপিরাস, সিংহল, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, নেপালপ্রভৃতি দেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য প্রতিনিধি পাঠান।খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২অব্দে সম্রাট অশোক মৃত্যুবরণ করেন।তিব্বতীয় কিম্বদন্তী অনুমারে জানা যায়, তিনি তক্ষশীলায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

অশোকের ধর্মনীতি ও ধর্ম প্রচারঃ

অশোক বৌদ্ধ ,জৈন এবং হিন্দু ধর্মের অনুরাগী ছিলেন।তবে তাঁর ধর্ম প্রচারণা এবং জীবনাদর্শ বৌদ্ধ ধর্ম প্রাধান্য পেয়েছিল। অশোক বিহারযাএার পরিবর্তে ধর্মযাএার প্রচলন করেছিলেন।

তীর্থযাএার সাথে তিনি যুক্ত করেছিলেন শ্রামণদের উপহার দান, বুদ্ধের বাণী প্রচার এবং নানাবিধ উপদেশের মধ্য দিয়ে মানুষকে ধর্মভাবাপন্ন করার কার্যক্রম। সাধারণ মানুষকে বৌদ্ধ ধর্মে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তিনি রাজ্যের বিভিন্ন স্হানে (পাহাড়ের গায়ে, পাথরের স্তমম্ভে, পবর্তগুহায়)বুদ্ধের বাণী এবং উপদেশে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।ধর্মীয় প্রচারের জন্য তিনি রাজুক, যুত এবং মহাপাএ নামক পদের সৃষ্টি করেছিলেন।এরাঁ অশোকের ধর্মনীতিকে প্রচার করতেন।এছাড়া রাজকর্মচারীদের দ্বারা সাধারণ মানুষ যাতে নিগৃহীত না হয় ,তার জন্য ধর্মমহাপাএ নামক কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন।

বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সংহতি স্থাপনের জন্য এবং বৌদ্ধ সংঘসমূহের ভিতরে র্আন্তসম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য পাটলিপুত্র নগরে একটি বৌদ্ধ সংগীতি অর্থাৎ তৃতীয় সংগীতি আহ্বান করেন। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিনি রাজপুত্র মহেন্দ্রকে সিংহল দ্বীপে পাটিয়েছিলেন।

অশোকলিপি :

অশোক নানারকমের বাণী পাহাড়ের গায়ে, পাথরের স্তম্ভে, পর্বতগুহায় লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যাবস্থা করেন। যে সকল লিপিতে এই বাণী লেখা হয়েছিল, সে সকল লিপিকে সাধারণভাবে অশোকলিপি বলা হয়। এই সকল বাণী লেখা হয়েছিল ব্রাক্ষীলিপি ও খরোষ্ঠীলিপিতে। অবশ্য ব্রাক্ষীলিপির আদিপাঠগুলো সম্রাট অশোকের নির্দেশে স্থাপিত হয়েছিল বলে, অনেকে এই লিপিকে অশোকলিপি নামে অভিহিত করেছেন।

অশোকস্তম্ভ ও অশোকচক্র :

চারটি সিংহের মুখযুক্ত একটি একক মূর্তি।এই সিংহ চারটি পশ্চাৎ অংশ যুক্ত থাকে এবং মুখগুলো চারটি দিকের নির্দেশ করে।এর ফলে যে কোন দিক থেকে তিনটি সিংহের মুখ একবারে দেখা যায়।এই চারটি সংযুক্ত সিংহমূর্তি একটি উল্টানো পদ্মফুলের উপরে বেদীটি স্হাপিত থাকে।এই বেদীর পার্শ্ব বরাবর খোদিত আছে চারটি প্রাণীর রিলিফ মূর্তি।এই প্রাণীগুলো হলো -একটা হাতি, একটি দৌড়ানো ঘোড়া, একটা ষাঁঙ এবং একটি সিংহ।এই চারটা জন্তুর মাঝে রয়েছে একটি করে চক্র।এই চক্রকে বলা হয় অশোক চক্র বা ধর্ম চক্র।

অশোক চক্র বা ধর্ম চক্র :

অশোক চক্রের কেন্দ্র থেকে ২৪ টি শলাকা, সাইকেলের চাকার মতো এর ছড়ানো। তবে এই শলাকাগুলো এর পরিধির সাথে যুক্ত থাকে না। এর শলাকাগুলো ২৪ টি বিষয়ের প্রতীক হিসাবে নির্দেশিত হয়। সুএ নিপাতে বলা হয়েছে, শাক্যদের একটি গ্রাম লুম্বিনি জনপদে গৌতম বুদ্ধ জন্ম হয়।

বৌদ্ধ পুরাণ অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধের মা মায়াদেবী শাক্য রাজধানী কপিলাবস্তু থেকে তার পৈতৃক বাসগৃহে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে লুম্বিনি বনের একটি শালগাছের নিচে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়। বুদ্ধের জন্মের আগে মায়াদেবী এখানে একটি দীঘিতে স্নান করেন। সিদ্ধার্থ গৌতমকে ও জন্মের পর এই দীঘিতে স্নান করানো হয়। পরে এখানে মায়াবেদী মন্দির প্রতিষ্টিত হয়।

এই মন্দিরের একটি স্থানকে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্হান হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুুরক্ত হয়ে অশোক এই তীর্থভূমি পরিদর্শনে এসেছিলেন।অশোকের আগমনের স্মারক হিসাবে এখানে একটি অশোক স্তম্ভ স্থাপন করা হয়।

এম. বোধিরত্ন ভিক্ষু, বি,এ ( অনার্স) এম,এ, ত্রিপিটক বিশারদ,অধ্যক্ষ,দমদমা অভয় শরণ বৌদ্ধ বিহার।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71