শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
অসাম্প্রদায়িক উৎসব
প্রকাশ: ০৪:৪৭ pm ১৪-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:৪৭ pm ১৪-০৪-২০১৭
 
 
 


যতিন সরকার ||

সম্প্রদায়গত ধর্মতন্ত্র-সংশ্লিষ্ট কোনো দিনই যে 'সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র' হওয়ার কিংবা 'সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব' করার মতো মহৎ উৎসবের দিন বলে গণ্য হতে পারে না, এ কথা রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করেই জানতেন। তা জানতেন বলেই বাঙালির উৎসবের তিনি সন্ধান করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের মর্মস্থলে। বাঙালি সমাজের মানুষেরা বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত থাকলেও বাঙালিত্বকে তারা অধিষ্ঠিত রেখেছে সমস্ত প্রকার ধর্মসাম্প্রদায়িকতার ঊধর্ে্ব, সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ প্রকৃতি-চেতনা ও পরিপার্শ্ব-ভাবনা থেকেই উৎসারিত হয়েছে তাদের সকল উৎসব। তাদের প্রকৃতি-চেতনা ও পরিপার্শ্ব-ভাবনা বিশেষভাবে রূপ পেয়েছে ঋতুপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। এই ঋতু-উৎসবের সূচনারূপেই ঘটা করে

পালিত হয় নববর্ষ বা বর্ষবরণের উৎসব। শুধু বর্ষবরণ নয়, বর্ষবিদায়ও। চৈত্রসংক্রান্তির বর্ষবিদায়ের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। বাঙালি সমাজ আবহমান কাল ধরে লৌকিক রীতিতেই বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব করে আসছে। এ উৎসবের রীতি-পদ্ধতিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।

স্মরণাতীত কাল থেকেই উদযাপিত নববর্ষ উৎসবের নবায়ন ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। নবায়িত এই উৎসবই একালের বাঙালির ধর্মতন্ত্র-নিরপেক্ষ সার্বজনীন উৎসব। বিশেষ করে শহর-বন্দরের শিক্ষিত বাঙালি প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে নববর্ষ উৎসবে সম্মিলিত হয়ে বাঙালিত্বের বোধে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এটি যথার্থ উৎসব এ কারণে যে এ-দিনে ক্ষুদ্রত্ব পরিহার করে মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে সকলে সম্মিলিত হয়। এ সম্মিলনে কোনো ধর্মতন্ত্র তার শাস্ত্রীয় শাসনের রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে না, ধর্মের বেশে মোহ এসে কাউকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে না।

অপরিমেয় ধন, মান, প্রাণ উৎসর্গ করে আমরা পাকিস্তান নামক একটি অপরাষ্ট্রের হাত থেকে আমাদের দেশটিকে উদ্ধার করেছিলাম। পাকিস্তানের সকল অপনীতিকে পরিত্যাগ করে চারটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর আমাদের রাষ্ট্রটিকে দাঁড় করিয়েছিলাম। দ্বিজাতিতত্ত্ব নামক যে অপতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রী, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবর্জিত রাষ্ট্ররূপে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল, সে সবকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের রাষ্ট্রের সকল নাগরিকই হবে সমান মর্যাদার অধিকারী। শোষক ও শোষিতের বৈষম্যমুক্ত এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলব, যে ব্যবস্থায় দেশের সকল মানুষের জন্যই খাদ্য-বস্ত্র-আবাস-শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা লাভের নিশ্চয়তা থাকবে। এসব প্রত্যাশাকে বাস্তব করার পথ ও পদ্ধতিই আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে বিধিবদ্ধ করেছিলাম। সে পথ ধরেই কিছু দূর আমরা এগিয়েও গিয়েছিলাম। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করলাম যে, পথটি বড়ই কঠিন। দেখলাম, পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরই একটি গোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। সেই গোষ্ঠীটি সক্রিয় সহায়তা করছে আমাদের স্বাধীনতাবিরোধী দৈশিক ও বৈশ্বিক সকল অপশক্তির। বলতে গেলে, ওরা সকলে মিলে বাংলাদেশের পাকিস্তানায়ন ঘটানোরই পাঁয়তারা করছে।

স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালেই সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতায় সেই সংগ্রামটিকে ভিন্ন লক্ষ্যে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতলব এঁটেছিল যারা; তখনই তারা সফল হতে না পারলেও, স্বাধীনতা-পরবর্তী চার বছরকাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিল। বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে তারা সপরিবারে হত্যা করল। কারাগারে আবদ্ধ করল বিপুলসংখ্যক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে। কারাগারেই নির্মমভাবে হত্যা করল জাতীয় চার নেতাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে ওরা আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানটির খোলনলচে পাল্টে দিল। ধর্মনিরপেক্ষতার উৎখাত ঘটিয়ে ও একটি বিশেষ ধর্মতন্ত্রকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে বাংলাদেশের খোলসের ভেতর পাকিস্তানের ছাঁচ ঢুকিয়ে দিল। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের বেনামিতে প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্ত্বকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করল। সমাজতন্ত্রের হাস্যকর সংজ্ঞা দিয়ে শোষণভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকেই পাকাপোক্ত করে তুলল এবং গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রের সেবাদাস বানিয়ে ফেলল। অর্থাৎ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে নাম-পরিচয়টি বহাল থাকলেও সংগ্রামের মাধ্যমে লব্ধ এর অন্তঃস্বরটি আর অবশিষ্ট রইল না। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আগুন যাদের অন্তর-গভীরে সর্বদা জ্বলজ্বল করছে, যাদের কেউই বাংলাদেশের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়াকে মেনে নিতে পারে না, তাদের সংখ্যা মোটেই কম নয়। কিন্তু তারা করবে কী? তাদের সামনে পর্বতসম বাধা। সেসব বাধা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে সেগুলোর স্বরূপ, প্রকৃতি এবং কোন পরিবেশ-পরিস্থিতি থেকে সেগুলোর উদ্ভব ও বিস্তৃতি ঘটেছে_ সবই বুঝে নিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারবাহী যারা, তারাও যে আজ পূর্বেকার সেই নিদ্বর্িধ প্রত্যয়কে ধারণ করতে পারছেন না_ সে কথা তো বেদনাদায়ক হলেও সত্য। সাম্রাজ্যবাদের কাছে তারা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বসেছেন_ এমন কথা অবশ্য বলা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের অনেক উপদেশ কিন্তু অমান্য করার সাহসও তারা দেখিয়েছেন। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। অকুণ্ঠ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মৌলবাদবিরোধী না হলে কিছুতেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা আর মৌলবাদ-বিরোধিতা একই সূত্রে গাঁথা। একটিকে বাদ দিয়ে আরেকটি হয় না। এখানেও কিন্তু নানা ধরনের দোদুল্যমানতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। একটি বিশেষ ধর্মতন্ত্রকে রাষ্ট্রধর্মরূপে বহাল রাখব, আবার সাম্রাজ্যবাদকে না চটিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ থেকে মৌলবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করব_ এ রকমটি কী করে সম্ভব হতে পারে; আমার মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষের পক্ষে তা বোঝা খুবই কঠিন।

বামপন্থিদের তো আমরা সুনিষ্ঠ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও মৌলবাদবিরোধী বলেই জানতাম। কিন্তু এখানেও তো আজ সংশয়ের কীট বাসা বেঁধেছে। বিপুলসংখ্যক বামপন্থিই তো আজ উন্মার্গগামী। সেই উন্মার্গগামীদের কাছে কিছুই তো প্রত্যাশা করা যায় না। সিপিবি ও বাসদ প্রকৃত বামপন্থি বিকল্পের মধ্যেই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা অবলোকন করছে। অথচ সেই বিকল্প উদ্ভবের আশু সম্ভাবনা যে নেই_ তা আমাদের সকলেরই জানা।

তাহলে উপায়? উপায়হীনতার মধ্যে বসবাস করাই কি আমাদের অনিবার্য নিয়তি? নিশ্চয়ই নয়। আশাবাদী আমাদের হতেই হবে। তবে আমি সবর্দাই বলে থাকি এবং আজও বলছি, নিষ্ক্রিয় আশাবাদ আমাদের কখনও গন্তব্যে পেঁৗছে দিতে পারে না। সদা সক্রিয়তাই আশাবাদকে সার্থক করে তোলার হিরণ্ময় পথ। তবে পুনরাবৃত্তি হলেও আবার বলি, সে পথ খুবই কঠিন। দৃঢ়চিত্ত হয়েই সেই কঠিন পথে চলতে হবে আমাদের। খুব সহজে যে গন্তব্যে পেঁৗছানো যাবে না_ এমন কথা মেনে নিয়েই পথে নামতে হবে। পথের কাঁটা সরাতে সরাতেই পথ চলতে হবে।

বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃত মানুষের ধর্মের অনুসারী, ধর্মকে তারা হৃদয়-কন্দরে একান্ত শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার সঙ্গে লালন করেন। ধর্মকে সাম্প্রদায়িকতার যূপকাষ্ঠে তারা বলি দেয় না। ইহলৌকিক ও আধিভৌতিক রাষ্ট্রনীতির অধীন বানিয়ে ধর্মের পবিত্রতায় ও আধ্যাত্মিকতায় সামান্য কালিমা লেপনেও তারা রাজি নয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকেই তারা পাকিস্তানবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতি বছর বৈশাখের প্রথম দিনে নববর্ষ উৎসব পালন করেই এদেশের মানুষ তা জানিয়ে দেয়।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71