বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
আওয়ামী লীগকেই বারবার বলতে হবে বাংলাদেশ ধর্মরাষ্ট্র নয়
প্রকাশ: ০২:০১ pm ২২-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ০২:০১ pm ২২-১১-২০১৬
 
 
 


মোস্তাফা জব্বার ||

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট যে একাত্তর অতিক্রম করেনি সেটি আবারো প্রমাণিত হলো যখন পাকিস্তান সব লজ্জা শরম গিলে খেয়ে বাংলাদেশের কাছে ৭০০ কোটি রুপি পাওনা দাবি করল। যে কাজটি বাংলাদেশেরই বহু আগে করার কথা সেটি পাকিস্তানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের করতে হয়েছে। এতে সম্ভবত একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে যে, আমরা অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি এবং যে কাজ যখন করার কথা সেটি তখন করতে পারছি না। বিশেষ করে আমরা আামদের নতুন প্রজন্মের কাছে পাকিস্তানিদের ঔপনিবেশিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, শোষণ ও নির্যাতন বিষয়ে যদি না বলি তবে তারা পাকিস্তানকেও আরো একটি সাধারণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করবে। আমাদের নতুন প্রজন্মের জানা দরকার যে দুনিয়ার সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ ও বাঙালিরা পাকিস্তানকে এক কাতারে দাঁড় করাতে পারে না। ১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়ার পরও পাকিস্তান প্রতিদিন আমার দেশের বিরুদ্ধে, আমার দেশের জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যত ষড়যন্ত্র করে এবং তাদের দালালরা এখনো বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে যত অপকর্ম করে তার বিরুদ্ধে আমাদের এখনো একাত্তরের মতোই লড়াই করতে হবে। আমি বিশেষত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

বাংলাদেশ কেমন রাষ্ট্র? এর জাতিসত্তা কি, কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এই রাষ্ট্রের জাতীয়তা? আমরা কি রাগ করে দুই ভাই আলাদা হওয়ার জন্য পাকিস্তান ভাঙলাম? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কি ছিল? স্বাধীনতার এত বছর পর এসব প্রশ্ন ওঠারই কথা নয়। এসব প্রশ্নের জবাব আমাদের সবার জানা থাকার কথা। কিন্তু আমরা কি সেসব জানি? আমাদের মাঝে বসবাস করা পাকিস্তানি দালালদের আচরণ কি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় না যে, আমরা একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। অথচ আমাদের রাষ্ট্রের কোনো স্তরেই সাম্প্রদায়িকতার কোনো অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম বহাল থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রটির সংবিধানের মূল নীতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভালোভাবে জানলে এটি জানার কথা যে, বাংলাদেশ একটি ভাষাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশের তাবৎ নাগরিককুলের জানার কথা, এই রাষ্ট্রের ভিত্তিটা ধর্ম নয়। বরং মনে রাখা দরকার যে, পাকিস্তান নামক একটি ধর্মরাষ্ট্রকে লাথি মেরে ভেঙে আমরা বাংলা ভাষাভিত্তিক বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছি। আমাদের যদি একটি ধর্মরাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকত তবে আমরা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা পাকিস্তানেই খুশি থাকতাম, আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল না। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর বসবাস করার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না। মুসলমানের পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর থাকার কি অধিকার ছিল? তাদের থাকার কথা ছিল হিন্দুস্থানে। আমরা একাত্তরে এটি লক্ষ করেছি যে বাঙালিরা পাকিস্তানিদের হাতে হিন্দু হিসেবে নির্যাতিত হয়েছে। এর বহু আগেই পাকিস্তানিরা যখন বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর নগ্নভাবে হামলা করে, আমাদের মুখের ভাষা উর্দু করতে চায় ও বাঙালিদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চায় তখন আমরা আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তা গড়ে তুলেছি। আমরা বাঙালিরা হিন্দু-মুসলমান দ্বিজাতিতত্ত্ব না মেনে এই অঞ্চলের প্রথম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখি। শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষের এই দেশে ধর্মরাষ্ট্র থেকে বের হয়ে এসে ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার লড়াইটা দুঃসাহসী পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পাকিস্তান আমলেই আওয়ামী মুসলিম লীগকে শুধু আওয়ামী লীগ করেছি। এরপর বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। সেই লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা সশস্ত্র যুদ্ধ করে জিতে বাঙালিদের রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের সংবিধান বলছে বাংলাদেশ একটি জাতীয়তাবাদী, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর জন্মকালীন নীতিমালায় সমাজতন্ত্রও ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশের সব নাগরিককে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং কে হিন্দু, কে মুসলমান বা কে বৌদ্ধ-খ্রিস্টান তার কোনো বাছবিচার করেনি। কিন্তু পঁচাত্তরে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করার পর মরহুম জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পায়ের পাতাকে পাকিস্তানের দিকে ঘুরিয়ে দেন এবং এরশাদ কফিনের শেষ পেরেক হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে যুক্ত করেন। এর প্রথম ব্যতিক্রম হয় ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন তার প্রথম সরকার গঠন করেন। তিনি পাকিস্তানমুখী পায়ের পাতাটিকে বাংলাদেশের দিকে ঘুরিয়ে দেন। তবে তার পক্ষে একুশ বছরে জমে থাকা ময়লা মাত্র পাঁচ বছরে পরিষ্কার করা সম্ভব ছিল না। ততদিনে জিয়া এরশাদ ও খালেদা একটি পাকিস্তানপন্থী প্রজন্ম সৃষ্টি করে ফেলেছিল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাঙালি জাতিসত্তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি ও সংবিধান এর কিছুই জানেনি। সর্বোপরি ২০০১ সালে সেই পাতাকে আবার উল্টে ফেলা হয়। ২০০৮ অবধি সেটি চলতে থাকে। বস্তুত ১৯৭৫-এর পর মাত্র ৫ বছর ছাড়া বাকি সময়টা পাকিস্তানের দালালরাই দেশটি শাসন করেছে। তবে ২০০৮-এর নির্বাচনের পর বাংলাদেশ তার জন্মকালীন পরিচয়ে ফিরে যেতে শুরু করে। এরপর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও তাদের ফাঁসি পাকিস্তানপন্থীদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তোলে। সে জন্য জামায়াতের ইচ্ছায় বিএনপিসহ পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে নানাভাবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিপন্ন করার জন্য ব্যবহার করতে থাকে। অতিসাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজ বাড়তেই থাকে। সুখের বিষয় হচ্ছে বছরের পর বছর পরিচালিত সেই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই দেশের মানুষ মোকাবেলা করে আসছে। মাঝেমধ্যে হলি আর্টিজানের মতো হামলা হলেও মোটামুটি এক ধরনের স্থিতিশীলতার মাঝে আমরা বসবাস করছিলাম। চারপাশে জীবনের চিত্র স্বাভাবিকই ছিল। বিদেশি ক্রিকেট টিম পর্যন্ত বাংলাদেশে খেলে গিয়ে প্রমাণ করেছে যে আমরা অশান্তিতে নেই। এমন একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলা সদরে শত শত হিন্দু বাড়িঘর লুটপাট হয়, হামলা হয়, অগ্নিসংযোগ হয় এবং মন্দিরও ভাঙা হয়। এর কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও ঘটে। দেশের নানা স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে আগুন দেয়ার চেষ্টা বা মূর্তি ভাঙার চেষ্টাও হয়। সেসব ঘটনা বিশাল আকৃতি ধারণ করতে না পারলেও আমরা নাসিরনগরের ঘটনাটিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি না। প্রায় কাছাকাছি সময়ে সাঁওতালদের ওপরও হামলা হয়। আমাদের জন্য এই দুটি ঘটনা নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, নাসিরনগরের ঘটনাটি ঘটেছে একটি ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ঘিরে। নাসিরনগরের রসরাজ নামক এক জেলে কাবা শরিফের ছবির ওপর শিবের মূর্তি বসিয়ে একটি ছবি বানিয়ে তার ফেসবুক পেজে পোস্ট দেয়ার অভিযোগ ওঠে। এখন অবধি যেসব খবর আমরা জানি তাতে এটি জানা যায় যে, নাসিরনগরের ফারুক নামক এক লোক সেটিকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করে এবং পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করে। আমি বিস্মিত হয়েছি এটি দেখে যে, পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করে রসরাজকে গ্রেপ্তার করে এবং তাকে রিমান্ডেও নেয়া হয় কেন? আমি ছবিটি দেখেছি। ছবিটি এতই নিখুঁতভাবে তৈরি করা যে, পঞ্চম শ্রেণি পাস করা কোনো জেলের পক্ষে ফটোশপে সেটি তৈরি করা অসম্ভব। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করা একজন যুবকের ফেসবুক পেজ খোলা, ব্যবহার করা ও তাতে সাম্প্রদায়িক চিত্র আপলোড করার বিষয়টি আগে খতিয়ে দেখে পরে তাকে গ্রেপ্তার করা যেত। সে বিষয়গুলো তলিয়ে না দেখে রসরাজকে গ্রেপ্তার করে আইসিটি আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে বস্তুত প্রাথমিকভাবে সাম্প্রদায়িকতাকেই উস্কে দেয়া হয়। আমরা আরো লক্ষ করলাম যে, প্রশাসন রসরাজের ঘটনার প্রতিবাদে একটি উগ্রবাদী ও সাম্প্রদায়িক দলকে সমাবেশ করতে দেয় এবং সেই সভাতে সরকারি দলের স্থানীয় নেতরাসহ প্রশাসনের লোকরাও যোগ দেয়। আরো অবাক করার বিষয় ছিল যে, প্রশাসনের নাকের ডগায় সেই সমাবেশের লোকজন মিছিল করে নাসিরনগরের শত শত বাড়ি ভাঙে, আগুন লাগায়, লুটপাট করে, মারধর করে এবং আমরা একাত্তরে যে ধরনের নৃশংসতা দেখেছি তার মতোই ভয়াবহতম ঘটনা ঘটে।

আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে সরকারি দলের রাজনীতিকদের সম্পৃক্ততা। দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্মদাতা আওয়ামী লীগের স্থানীয় কিছু নেতা এমন একটি সাম্প্রদায়িক কাজে লিপ্ত হয়েছে। এর ফলে সরকারি দলটির মাঝে পাকিস্তানপন্থীদের ঘাপটি মেরে বসে থাকার বিষয়টি আশঙ্কায় পরিণত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ঘটনায় শাসকদলের স্থানীয় সাংসদ পুরো বিষয়টিকে গুরুত্বহীনভাবে নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি এমন সব মন্তব্য করেছেন যা একটি ভাষা রাষ্ট্রের সাংসদের মুখে শোভা পায় না।

আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শম্বুকের গতি গ্রহণ করা হয়েছে। ঘটনাটির গুরুত্ব যথাযথভাবে যথাসময়ে অনুধাবন করা হয়নি এবং এর কুফল হিসেবে দেশজুড়ে আরো কিছু ঘটনা ঘটতে পারে সেটিও ভাবা হয়নি।

আমাদের তৃতীয় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে। আমাদের স্মরণে থাকা দরকার যে, এর আগে রামুতে ফেসবুক নিয়ে এমন ঘটনা ঘটেছে। বগুড়ায় সাঈদীকে চাঁদে দেখার ঘটনাও ফেসবুকেরই প্রভাব। এ ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ফেসবুক ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে অপপ্রচার চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে বিরাজ করছে। আমরা খুব উদ্বেগের সঙ্গেই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ হিসেবে এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিষয়টিকে ভাবতে পারছি।

নাসিরনগরের ঘটনায় কতগুলো অপ্রিয় সত্য দেশবাসীর সামনে উঠে এসেছে। ক) বাংলাদেশের সব মানুষ দেশটির অস্তিত্বের আদর্শ বা অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে না। ১৯৭০-এর নির্বাচনে এবং তার পরের বছরগুলোতে বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধর্মরাষ্ট্রের আদর্শকে লালন করে। রামু ও নাসিরনগরের ঘটনায় উদ্বেগজনকভাবে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাম্প্রদায়িকতায় লিপ্ত হতে দেখা গেছে। এতে বোঝা যায় যে আওয়ামী লীগের এই নেতারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস না করেই আওয়ামী লীগার হয়েছে। তারা পাকিস্তানপন্থী অনুপ্রবেশকারীও হতে পারে। শাসক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে তার সব নেতাকর্মীকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে স্থিরভাবে অনুপ্রাণিত করা। পাকিস্তানের আদর্শ মগজে রেখে আর যাই হোক আওয়ামী লীগ করা যাবে না। আওয়ামী লীগের সাংসদ পর্যায়ে যদি বিভ্রান্তি থাকে তবে আতঙ্ক তো বিরাজ করবেই।

পাকিস্তানের আদর্শ দেশের প্রশাসনেও রয়েছে বলে নাসিরনগরের ঘটনায় ওসি এবং ইউএনও নিজেরাও সাম্প্রদায়িকতায় যুক্ত হয়ে গেছেন যা আমাদের সংবিধানের লঙ্ঘন ও সরকারি চাকুরের জন্য দণ্ডনীয় অপরাধ। আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে স্থানীয় সাংসদ একটি নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়ার বদলে সাম্প্রদায়িকতার দায়ে নিজেই অভিযুক্ত হয়ে পড়েছেন। ঘটনাটি এমন হতে পারে যে, স্থানীয় সাংসদ যথাযথ ভূমিকা পালন না করায় আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন স্তরের নেতারা ও প্রশাসন ভুল পথে পা দিয়েছেন। এখানে ভোটের রাজনীতি বা স্থানীয় দলীয় কোন্দল যুক্ত থাকতে পারে। অন্যদিকে ঘটনাটি এমন হতে পারে যে, কোনো একটি গোষ্ঠীর দুর্বলতার সুযোগ নেয়া হয়েছে।

তবে ঘটনা যাই হোক না কেন, নাসিরনগরের ঘটনায় আমাদের জাতীয় ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। এর আগে রামু-বগুড়ার ঘটনার পাশাপাশি গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতালদের ওপর গুলিবর্ষণও পুরো জাতিকে ভুল সংকেত দিচ্ছে। সেখানেও স্থানীয় সাংসদ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আওয়ামী লীগ বরাবরই জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়। কিন্তু দিনাজপুরে সেই দলের সাংসদ গুলিবর্ষণের পরও জনগণের পক্ষে দাঁড়াতে পারেননি।

আমরা আরো শঙ্কিত হচ্ছি ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে। ফেসবুককে ব্যবহার করে যেমনি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সাংসদসহ কিছু মানুষকে বিভ্রান্ত করা গেছে তেমনি প্রশাসনকেও বিভ্রান্ত করা গেছে। অন্যদিকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রমাণ করেছে যে, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেসব অপরাধ করা হচ্ছে সেটি মোকাবেলা করার ক্ষমতা তাদের নেই। বরং রসরাজের দৃষ্টান্ত বা উত্তম বড়–য়ার দৃষ্টান্ত প্রমাণ করেছে যে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এ বিষয়ে ন্যূনতম যোগ্যতাও রাখে না।

আমাদের এই কথাটিও মনে রাখা দরকার যে, সাধারণ মানুষ যাদের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্পর্ক নেই তাদের এই প্রযুক্তির অন্তর্গত বিষয়াদি এখনো বোঝানো যায় না। ওরা আমাজনের জঙ্গলে বাস করার মতো চাঁদে সাঈদীর ছবিকে বিশ্বাস করে। তারা রসরাজকে বা উত্তম কুমারকে অপরাধী মনে করেছে। তারা কোনোভাবেই প্রকৃত অবস্থা বিবেচনাই করেনি। আমরা যারা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের পক্ষে কাজ করি তাদের জন্য এটিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে হবে। আমরা যদি এই অবস্থার পরিবর্তন না করতে পারি তবে রামু-নাসিরনগরের পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে এবং আমাদের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা বিঘ্নিত হবে।

তবে সবার ওপরে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির। এই রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান যদি এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে থাকে তবে আমাদের জাতিসত্তায় বড় ধরনের আঁচর পড়তে বাধ্য। যদিও পাকিস্তানপন্থীদের সংখ্যা ততবেশি নয় এবং আমাদের সঙ্গে তারা কখনো জয়ী হতেই পারেনি তবুও আমাদের জন্য একটি বড় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সব নাগরিকের কাছে আমাদের রাষ্ট্রের জন্মকাহিনী তুলে ধরা। আমরা যে পাকিস্তান, আফগানিস্তান নই এবং একটি আধুনিক ধারণার রাষ্ট্র সেটি বোঝাতে না পারলে আমরা দেশটিকে ডিজিটাল যুগের শ্রেষ্ঠ আসনে স্থাপন করতে পারব না।

আসুন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় আমরা আমাদের ডিজিটাল যুদ্ধটাতে ঝাঁপিয়ে পড়ি। মনে রাখা দরকার যে, সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে আর যাই হোক ডিজিটাল বাংলাদেশ বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে না।

 

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট।

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71