সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
আধুনিক নারীবাদে সাবিত্রীবাঈ ফুলের প্রাসঙ্গিকতা
প্রকাশ: ১০:০৫ pm ২৯-০৩-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:০৫ pm ২৯-০৩-২০১৭
 
 
 


সায়ন্তনী অধিকারী : আধুনিক নারীবাদী চিন্তাধারায় একটি শব্দ কিছু কাল যাবত খুব গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে। এই শব্দটি হল ‘ইন্টারসেকশনালিটি’। ‘ইন্টারসেকশানলিটি’র ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বিভিন্ন নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা যেমন বর্ণবৈষম্য, জাতিবিদ্বেষ ইত্যাদি, একে অপরের সঙ্গে মৌলিক ভাবে যুক্ত আর তাই, একটির প্রতিবাদ করে অপর একটি সমতুল্য ব্যবস্থাকে কোনো ভাবেই সমর্থন করা যায় না।

নারীবাদে এই ধারণাটির ব্যবহার কী রকম? ধরা যাক আপনি শ্বেতাঙ্গ এবং নারীবাদী, সে ক্ষেত্রে আপনি অন্য বর্ণের মানুষ তথা নারীর বিশেষ সমস্যাগুলিকে উপেক্ষা করতে পারবেন না, নারীবাদের ‘ইন্টারসেকশানালিটি’ অনুসারে। একই ভাবে আপনি যদি ‘উচ্চবর্ণের’ মানুষ এবং নারীবাদী হন, আপনাকে দলিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যাগুলি সম্পর্কেও অবহিত হতে হবে, শুধু মাত্র সমাজের উচ্চ স্তরে অবস্থিত নারীর সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। অনেক সময় নারীবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে তাঁরা নিজের শ্রেণি ছাড়া অন্য সমস্ত শ্রেণির সমস্যার প্রতি মনোযোগী নন। আর ঠিক এই প্রসঙ্গেই এক ভারতীয় নারীর নাম উঠে আসে, তিনি হলেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে।  

সাবিত্রীবাঈ এমন এক যুগের মহিলা যে সময়ে মেয়েদের স্বাধীন কন্ঠ বিশেষ শ্রুতিগোচর হত না। সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে লিঙ্গসাম্য, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দুঃখের বিষয়, এ যুগে এসে আমরা তাঁর কথা এবং ভারতের নারীবাদী চিন্তনে তাঁর অবদানের কথা ভুলে গেছি। বোধহয় আমাদের নারীবাদী চিন্তায় ‘ইন্টারসেকশনালিটি’র অভাবই এর প্রধান কারণ।

সাবিত্রীবাঈ ফুলে, যাঁকে বলা হত আধুনিক নারীবাদীদের প্রথম প্রজন্মের মহিলা। শুধু জ্যোতিরাও ফুলের স্ত্রী, এই পরিচয়ে তিনি সীমাবদ্ধ নন। ১৮৩১ সালের ৩ জানুয়ারি জন্ম নিয়েছিলেন ভারতের অন্যতম প্রধান সামাজিক কর্মী। সাবিত্রী এক জন কবিও ছিলেন, তবে নারীবাদী ও সামাজিক কর্মী হিসাবে তাঁর পরিচিতি তাঁর কবি পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে বলেই মনে হয়। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মেয়েটির বিবাহ হয় ৯ বছর বয়সে, ১২ বছর বয়সি জ্যোতিরাও ফুলের সঙ্গে। বিয়ের পর জ্যোতিরাও তাঁকে পড়াশোনা শিখিয়ে শিক্ষিকার ভূমিকার জন্য প্রস্তুত করেন। ১৮৪৭ সালে সাবিত্রী সাগুনাবাইয়ের সঙ্গে মিলিত ভাবে একটি স্কুল স্থাপন করেন মাহারওয়াড়াতে। এর পর ১৮৪৮ সালে ভিডেওয়াড়াতে দেশের প্রথম বালিকা বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয়, যার প্রধান শিক্ষিকা মনোনীত হন সাবিত্রী। সে যুগে যখন নারীশিক্ষাকে হিন্দু ধর্মের পরিপন্থী বলে মনে করা হত, তখন এক সাধারণ কৃষক পরিবারের মহিলা শিক্ষিকা নিযুক্ত হওয়া এক বিস্ময়কর ঘটনা বললেও বোধহয় কম বলা হয়। কিন্তু সাবিত্রীবাঈয়ের জীবনে এমন বিস্ময়কর ঘটনার অভাব নেই। অস্পৃশ্যতার প্রকোপ যে সময় মারাত্মক, ঠিক সেই সময়েই সাবিত্রী তাঁর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে একটি জলের কুয়ো স্থাপন করেন, যেখানে ‘নিচু’ জাতের মানুষ কোনো অসম্মান ছাড়াই জল নিতে পারতেন।

সে যুগে স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়েদের চুল কেটে ফেলার রেওয়াজ ছিল। এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন সাবিত্রী। তিনি এক স্ট্রাইকের ডাক দেন যার ফলে কোনো মানুষ ক্ষৌরকর্মীদের কাছে চুল কাটবেন না। এতেই শেষ নয়। সেই সময়ে মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রচলিত ছিল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের বৃদ্ধ স্বামীদের মৃত্যুর পর তাঁরা বিভিন্ন ভাবে নিপীড়িত হতেন। এর মধ্যে যৌন নিপীড়নের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক সময় এই মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়তেন ও ভ্রূণহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হতেন। এই মেয়েদের জন্য সাবিত্রীবাঈ একটা আশ্রম স্থাপন করেন, যেখানে তাঁরা ও তাঁদের গর্ভস্থ সন্তানেরা স্থান পেতে পারতেন।

সাবিত্রীবাঈ এমন এক যুগের মহিলা যে সময়ে মেয়েদের স্বাধীন কন্ঠ বিশেষ শ্রুতিগোচর হত না। সেই কালপর্বে দাঁড়িয়ে লিঙ্গসাম্য, বর্ণবৈষম্য প্রভৃতি সামাজিক ব্যাধিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। দুঃখের বিষয়, এ যুগে এসে আমরা তাঁর কথা এবং ভারতের নারীবাদী চিন্তনে তাঁর অবদানের কথা ভুলে গেছি। বোধহয় আমাদের নারীবাদী চিন্তায় ‘ইন্টারসেকশনালিটি’র অভাবই এর প্রধান কারণ।

নিজেদের অপেক্ষাকৃত সুবিধার অবস্থান থেকে দেখে আমরা সাবিত্রীবাঈয়ের ‘এজেন্সি’ বা স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন কন্ঠের কথা উপেক্ষা করছি, যাতে আখেরে ক্ষতি আমাদেরই। যত দিন না তাঁর মতো করে ভাবতে পারছি, বা তাঁর ভাবনাকে গ্রহণ করতে পারছি তত দিন আমাদের নারীবাদ সীমিত এবং সুবিধাভোগী শ্রেণির মতবাদ হয়েই থেকে যাবে।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71