বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
আমরা কি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিলাম?
প্রকাশ: ১১:১৩ am ১২-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:১৩ am ১২-০২-২০১৭
 
 
 


সুজাত মনসুর ||

আমরা কি সদ্য প্রয়াত জাতীয় নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিলাম? তাই যদি না হবে তাহলে একজন সেনগুপ্তের অন্তেষ্টিক্রিয়া শেষ হতে না হতেই কি করে আমরা অংক কষতে শুরু করি কে হচ্ছেন তাঁর উত্তরসুরি? কি করেই বা আমরা তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিতর্কের ময়দানে? এ প্রশ্নটি কেনো জানি বার বার মনে হচ্ছে, আর বিবেক তাড়িত হচ্ছি।

এই ভাবনার কারণ হলো, অতিসম্প্রতি কয়েকটি পত্রিকায় (অনলাইনসহ) প্রকাশিত একটি সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু মানুষের স্ট্যাটাস। প্রকাশিত সংবাদটি হলো, সেনগুপ্তের পরিবারের কেউ যদি তাঁর শুন্য আসনে প্রার্থী হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নাকি ইতিবাচক থাকবেন বলে জানিয়েছেন। কিছু কিছু সংবাদে আবার সরাসরি সেনগুপ্তের স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্তের নামও উল্লেখ করা হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে। আবার কোন পত্রিকায় তাঁর ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ফেইসবুকে তো শেষ কৃত্যানুষ্ঠান শেষ না হতেই শুরু হয়ে যায় এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্ট্যাটাস পোস্ট করা। সবার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, আমরা যেন সেনগুপ্তের মৃত্যুর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। আর সে অপেক্ষমান তালিকায় জয়া সেনগুপ্ত কিংবা সৌমেন সেনগুপ্তের কোন ধরনের বক্তব্য না শুনেই তাদের নাম যুক্ত করে ফেলেছি। সংবাদ বা স্ট্যাটাসগুলো দেখলে মনে হবে, উনারা এখনই সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবার জন্য মুখিয়ে আছেন। অথচ এমনটি তাঁদের চরম শত্রুও চিন্তা করার কোন কারণ নেই। জয়া সেনগুপ্ত কিংবা সৌমেন সেনগুপ্ত এমন অবিবেচক নন যে, স্বামী বা পিতার মৃত্যুর পর এক সপ্তাহ অতিবাহিত হতে না হতেই পার্লামেন্টে সেনগুপ্তের স্থলাভিষিক্ত হবার জন্যে হন্যে হয়ে উঠবেন।

এই যে জয়া সেনগুপ্ত কিংবা সৌমেন সেনগুপ্ত দিরাই-শাল্লা সংসদীয় আসনে প্রার্থী হচ্ছেন বলে গুজব বা রটনা, তার সুত্র হলো পিতার মৃত্যুর পর একজন সন্তান হিসেবে সৌমেনের একটি উক্তি। মিঃ সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র সন্তান সৌমেন মিডিয়ার সামনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, তিনি তার পিতার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নিতে চান কিংবা শেষ করতে চান। আর এই যে তার ইচ্ছে প্রকাশ, তা থেকেই আমরা ধরে নিয়েছি তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ধরে নিয়েছেন, সৌমেনের চেয়ে তার মা বরং আরো বেশি উপযুক্ত, সুতরাং তিনিই হবেন বর্তমান সময়ে মিঃ সেনগুপ্তের উপযুক্ত উত্তরাধিকারী।

আমাদের সেই ধারনাকে আরো পোক্ত করেছে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাত। দৈনিক আমাদের সময়ের সংবাদসুত্রে জানা যায়, তারা আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারী ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের যে শ্রাদ্ধ হবে, সে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলেন। যেহেতু সেনগুপ্ত আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ছিলেন, তিনি ও তাঁর পরিবারের সাথে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং দলীয় প্রধান হিসেবে তিনি দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীর অভিভাবক, সুতরাং সে সাক্ষাতে সুখ-দুঃখের অনেক কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের সান্তনা দিয়ে বলেছেন, তিনি তাদের খোঁজ-খবর রাখবেন। বিপদে-আপদে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবেন। তারাও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন সমস্যাবলী প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। আর এই সৌজন্য সাক্ষাতকারের বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে, তাতে মনে হবে সেনগুপ্তের শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ বড় কথা নয়, আওয়ামী লীগের প্রার্থীতা নিশ্চিত করাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। কী অমানবিক চিন্তা-ভাবনা! যারা এ বিষয়টি গণমাধ্যমে নিয়ে এসেছেন কিংবা ফেইসবুকে ছড়াচ্ছেন, তাদের কি সামান্যতম মানবিক মূল্যবোধও নেই? যদি থাকতো, তাহলে অন্ততঃ শ্রাদ্ধ পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।

যারা জেনেশুনে এ কাজটি করছেন, তারা নিজেদের চামড়া বাঁচানোর জন্যেই তা করছেন। এই মানুষগুলো সেনগুপ্তকে ব্যবহার করে অনৈতিকভাবে, অসদুপায়ে শুন্য থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তাদের অত্যাচারে দিরাই-শাল্লার মানুষ অ তিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেনগুপ্ত জীবিতাবস্থায় কেউ কিছু বলার সাহস পাচ্ছিল না। তাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে পরলোকের দিকে যাত্রা করছেন, তা নিশ্চিত হয়ে তারা জনরোষ থেকে নিজেদের চামড়া বাঁচানোর জন্য অবলম্বন খুঁজছিল। কিন্তু কোন অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই সেনগুপ্তের মৃত্যুর সাথে সাথে যখনই সৌমেন সেনগুপ্ত ঘোষনা দিলেন, তিনি তার পিতার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব নিতে চান, তখনই ঐ অশুভ চক্রটির চোখের সামনে থেকে অন্ধকার দুরীভুত হয়ে আলোর ঝলকানি দেখা দিল। আর সেই আলোর ঝলকানি দেখিয়েই নিজেরা সান্তনা খোঁজার চেষ্টা করছে এই বলে যে, যাক শেষ পর্যন্ত অবলম্বন পাওয়া গেছে। দেখি কে কি করতে পারে? এই অসুস্থ মানসিকতা থেকেই সেনগুপ্তের পরিবারকে ঘিরে এসব রটনার জন্ম দিচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতির যে বর্তমান ট্রাডিশন, তাতে করে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শুন্য আসনে তাঁর স্ত্রী কিংবা সন্তান যদি প্রার্থী হন, তাতে কিছু মানুষের আশাভঙ্গের কারণ হলেও অপ্রত্যাশিত কিংবা আশ্চর্য হবার কিছু নেই। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা থাকুক আর নাই থাকুক, রাজপথের মিছিলে, সভা-সমিতিতে কস্মিনকালেও পদচারণা না থাকলেও বাধা নেই। উত্তরাধিকার সুত্রে দলীয় পদবী কিংবা সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে যাবেন। কিন্তু তার জন্যও একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। মানবিকতাবোধ থাকুক আর না থাকুক, চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা কথা আছে। অন্তত এই চক্ষু লজ্জার কারনেই না হয় অতি উৎসাহি চাটুকারেরা বিরত থাকবেন অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ানো থেকে। যতদিন না নির্বাচনী শিডিউল ঘোষনা হচ্ছে, অথবা সেনগুপ্তের পরিবার থেকে এ সংক্রান্ত কোন ধরনের ঘোষনা না আসছে। এর ফলে আর যাই হোক না কেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিদেহী আত্মা অন্ততঃ শান্তি পাবে। আর বিবেকের তাড়না থেকে মুক্ত থাকবেন সেনগুপ্তের পরিবারের সদস্যরা।

আরেকটি বিষয়ের প্রতি দিরাই-শাল্লাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষন করে সমাপ্তি টানতে চাই। সেনগুপ্তের মৃত্যুর পরপরই তাঁর উত্তরাধিকারী অর্থাৎ দিরাই-শাল্লার সাংসদ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অনেকেই লম্ফ-জম্ফ শুরু করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তা তারা করতেই পারেন। তবে লম্ফ দেবার আগে কোথায়, কোন পরিস্থিতিতে লম্ফ দিচ্ছেন, তা একটু সক্রিয় বিবেচনায় নিলে বুদ্ধিমানের কাজ করবেন। দিরাই-শাল্লা নির্বাচনী এলাকা থেকে স্বাধীনতাপুর্ব থেকে যারা প্রতিনিধিত্ব করেছেন (একবারই শুধু ব্যতিক্রম), তারা ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এছাড়া এ এলাকায় প্রগতিশীল রাজনীতির চাষ যারা করেছিলেন, তাদের মধ্যে কমরেড বরুণ রায় ছিলেন অন্যতম। এই এলাকারই সন্তান অক্ষয়কুমার দাশ ছিলেন বৃটিশ আমলের মন্ত্রী। সুতরাং দিরাই-শাল্লার মানুষ কিন্তু খুবই রাজনৈতিক সচেতন। এছাড়া সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মৃত্যুতে শুন্য হওয়া সংসদের এ আসনটির গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ে একেবারে কম নয়। সে বিবেচনাবোধ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আছে বলেই বিশ্বাস করি। তাই হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠা নেতাদের লম্ফ-জম্ফ অসাড় প্রমানিত হবার সম্ভাবনাই বেশি।

 

সুজাত মনসুর, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

ইমেইল: suzatmansur@yahoo.com

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71