রবিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
রবিবার, ১২ই ফাল্গুন ১৪২৫
সর্বশেষ
 
 
আমার শিক্ষক ও শূন্য
প্রকাশ: ১১:১১ pm ২৬-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:১১ pm ২৬-০৪-২০১৭
 
 
 


রাজিব শর্মা : ছোটবেলায় এক পাগলাটে শিক্ষক ছিলেন আমাদের স্কুলে।

সারাক্ষণ বিড়বিড় করে কি বলতেন আপন মনে।উস্কোখুস্কো চুল,কোনদিন আঁচড়াতেন কিনা সন্দেহ, অনেকগুলো উকুন পরিবার সেখানে নিরাপদ বাসা করেছিল নিশ্চয়ই।বিয়েথা করেননি জীবনে, পোষাকআশাক এলোমেলো, ময়লা, এখানে ওখানে তালি দেওয়া।

হেডমাস্টারসাহেব সুযোগ পেলেই তাঁকে ধমকাতেন, চাকরি খোয়াবার হুমকি দিতেন, অন্যান্য শিক্ষকরা তাঁর সংসর্গ এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু ছাত্রদের কাছে এই শিক্ষকটিই ছিলেন সবচেয়ে প্রিয়।

তিনি ক্লাসে এসে অন্যান্য শিক্ষকদের মত বই খুলে গড়গড় করে পড়ে যেতেন না, বা বোর্ডের ওপর লিখতে শুরু করতেন না।গল্প
করতেন, দেশবিদেশের মজার মজার গল্প, নানা যুগের নানা দেশের উত্থান ও পতনের গল্প।কেমন করে মানুষ গড়ে নতুন জিনিস, আবার কেমন করে সেই একই মানুষ তা নিজের হাতে ভেঙ্গে ফেলে।এসব আশ্চর্য, অবিশ্বাস্য গল্প।

আমরা চুপ করে শুনতাম, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে।তিনি আমাদের ইংরেজি ব্যাকরণ আর রচনা শেখাতেন।একদিন ক্লাসে এসে গল্পসল্প না করে রচনা লিখতে বললেন আমাদের। রচনার বিষয়? একটা অর্থমূলক হাসি দিয়ে বল্লেনঃ “কিছু না”।আমরা থ। বেকুব।

পরস্পর চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম।কিছু না’র ওপর লেখার কি আছে? কিছু না তো কিছুই না–অস্তিত্বহীন। নাথিং, নট, ননএক্সিস্টেন্ট। শূন্য।আমাদের মধ্যে একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করল, স্যার, যা নাই তার ওপর কি লিখব আমরা?

বললেনঃ তোমাদের কল্পনা কোথায় গেল? যা নেই তার মধ্যে “কিছু”কে সৃষ্টি করা, কল্পনা তো তাকেই বলে। অস্তিত্বহীনকে অস্তিত্ব দাও,সুন্দর করে তোল নিজের মনের মত করে,তখনই বুঝবে কিছু না থাকার কী শক্তি।আমরা খেই হারিয়ে অথৈ সাগরে ভাসছি তখন।

মাথা চুলকাচ্ছি। কল্পনার ঘোড়ার পিঠে চাবুক মেরে ছোটাবার চেষ্টা করছি। আমাদের দুরবস্থা দেখে উনার একটু মায়া হল হয়ত। বললেনঃ অংকের ক্লাসে “শূন্য” শিখেছো নিশ্চয়ই। সেই শূন্য নিয়ে লেখ।শূন্যকে তোমরা কিভাবে দেখ তা নিয়ে লেখ।এর চেয়ে পাগল আর কে হতে পারে বলুন।

বলা বাহুল্য সেদিন আমরা সবাই লাড্ডু মেরেছিলাম।আমি নিজে কি লিখেছিলাম মনে নেই।ওই বয়সের ওটুকু জ্ঞানে কিই বা লিখা যায়।কোনরকমে পৃষ্ঠা ভরামাত্র।ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা।তার অনেক, অনেক কাল পর যখন আমি নিজেই শিক্ষাপেশাতে মোটামুটি সুপ্রতিষ্ঠিত, দুচারজন জ্ঞানীগুণি মানুষের সান্নিধ্যলাভের সৌভাগ্য হয়েছে, দুচারটে ভাল ভাল বই পড়বার সুযোগ পেয়েছি, পুরাকালের দুচারটে সভ্যতার উত্থানপতনের ইতিহাস জানবার অবকাশ হয়েছে, তখন হঠাত একদিন সেই পাগল শিক্ষকটার কথা মনে পড়ে গেল।

লোকটা হয়ত এক গরিব স্কুলের ছোটখাটো শিক্ষক ছাড়া আর কিছু হতে পারেনি জীবনে, কিন্তু তাঁর ছাত্রদের মনের পর্দায় দূর দিগন্তের রঙ ছড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন,মহাকাশের বিপুল শূন্যতার বুকে কান পেতে তার নীরব বার্তা শুনতে শিখিয়েছিলেন, আমাদের অজান্তে তিনি প্রতিটি ছাত্রের অন্তরে জাগিয়ে দিয়েছিলেন অজানার পিপাসা, বাজিয়েছিলেন অচেনার বাদ্য।

তাঁর জ্ঞান অবশ্যই বড় বড় পণ্ডিতদের সমতুল্য ছিল না, কিন্তু তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ছিল ঋষিতুল্য।আজকে,এতদিন পরে আমি বুঝি, “শূন্য” মোটেও শুন্যগর্ভ নয়, তার একটা নিজস্ব সত্তা আছে। আছে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব।আজকে আমি জানি শূন্যের মত শক্তিশালী জিনিস সংসারে বেশি নেই।

শূন্য একটা সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে, তারপর সেই ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে পারে।ইতিহাসে তার নজিরও রয়েছে।শূন্য আর অসীম, এরা একে অন্যের যমজ।যেখানে শূন্য সেখানেই সীমাহীনতা।দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবলে যেখানে কিছু নেই সেখানেই সবকিছু।

শূন্য দ্বারা বৃহত্কে পূরণ করুন, বৃহত্ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।এই একই শূন্য দ্বারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রকে ভাগ করুন, ক্ষুদ্র অসীমের অঙ্গধারণ করবে। শূন্য সবকিছু শুষে নিয়ে অসীমের দরবারে পাঠিয়ে দেয়।বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি। শুনুন তাহলে।

এইবেলাডটকম/রাজিব/এফএআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71