মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯
মঙ্গলবার, ৪ঠা আষাঢ় ১৪২৬
 
 
আমেরিকায় কালীপুজো আর ভাইফোঁটা
প্রকাশ: ০৯:৫৯ am ২৯-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ১০:১৪ am ২৯-১১-২০১৬
 
 
 


ধর্ম  ::  আসলে, আমেরিকা নামক স্বর্গরাজ্য নিয়ে এতদিন ধরে যেসব স্বপ্নের ফানুস উড়িয়েছেন, বা অন্যদের ওড়াতে দেখেছেন, সেইসব ফানুস একটার পরে একটা এমন করে চুপসে গিয়ে আকাশ থেকে মাটিতে ধাঁই ধাঁই করে এসে পড়ছে, এতে তাঁরা পিঠে খুব ব্যথা পেয়েছেন। আবার কিছু কিছু শুভানুধ্যায়ী আর আমাকে শুভ অনুধ্যায় করছেন না। লাল লাল চোখে তাকাচ্ছেন আমার দিকে।  

কী করবো বলুন তো? মিথ্যে কথা বলে সারা জীবন কী করে কাটাবো?

সম্প্রতি আমার স্মৃতিকথা ‘ঘটিকাহিনি’ পড়ে আমাকে কয়েকজন তাঁদের নিজেদের জীবনের কিছু কথা লিখে পাঠিয়েছেন। সেসব গল্প অতি সুন্দর। স্মৃতির মণিকোঠায় পরতে পরতে সাজানো। ‘ঘটিকাহিনি’-তে আমার লেখা উত্তর কলকাতার ঘটিপাড়ার গপ্পো শুনে তাঁরা   বলেছেন, যেন তাঁদেরই জীবনের গপ্পো। এর থেকে প্রশংসা আর কিছু হতে পারে না। আমার জীবন তো শুধু আমার জীবন নয়। আমাদের সকলকার জীবন। এই যেমন আমার মতো যাঁরা স্কটিশ স্কুলে পড়েছেন বা হিন্দু স্কুলে, বা ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে, মিত্র ইনস্টিটিউশনে, বা নিবেদিতা গার্লস, কমলা গার্লস, টাউন, শৈলেন্দ্র সরকার, বাগবাজার মাল্টিপারপাস। হোলি  চাইল্ড বা সেন্ট মার্গারেট বা বেথুন। আমার ফেলে আসা জীবনের গল্প আমাদের সকলেরই ফেলে আসা জীবনের গল্প। মনের গোপন কথা। যেসব কথা ভাবলে সুখ হয়। দুঃখের গল্প পড়েও এতদিন পরে আর তেমন দুঃখ থাকে না। কেমন যেমন একটা থেরাপির কাজ করে।

যেমন ধরুন, বিখ্যাত সংগীতশিল্পী অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় তাঁর নিজের স্মৃতিকথা আমাকে অটোগ্রাফ করে উপহার দিলেন। কী সুন্দর সে গল্প! গানের গল্প, উত্তর কলকাতায় বড় হয়ে ওঠার গল্প। সেই ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতেই পড়ার গল্প। আর সে বইতে তিনি লিখেছেন, কালীপুজোর রাত্তিরে লাহাবাড়ি থেকে, মিত্রবাড়ি থেকে, আরো সব বর্ধিষ্ণু বাড়ি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন ফানুস ওড়ানোর গল্প। সেইসব রঙিন ফানুস যেন এক একটা গল্প নিজেরাই। কোনওটা লাল, কোনওটা সবুজ, কোনওটা বা বেগুনি বা হলদে রঙের।   

এক একটা ফানুস যেন এক একটা মেটাফর। জীবনের একটা একটা অধ্যায়ের প্রতীক।

আমাদের উত্তর কলকাতার কালীপুজোর অধ্যায়ের গল্প বলি।

আমাদের গোরাচাঁদ বসু রোডে পাড়ার দাদারা খুব খেটেখুটে কালীপুজো করতো। আমাদের পাড়া মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তদের পাড়া। দুর্গাপুজো করার সাধ্য বা সঙ্গতি আমাদের নেই। তাই কালীপুজো। তার ওপরে পাশেই বহুকালের ট্র্যাডিশনাল দুর্গাপুজো হচ্ছে জাঁকজমক করে সাহিত্য পরিষদ স্ট্রিট আর কারবালা ট্যাংক লেনে। সাহিত্য পরিষদের বিখ্যাত রাখাল পালের করা প্রতিমা। আর এদিকে আমাদের পাড়াতেই ব্রহ্মবাড়িতে ওদের বাড়ির দুর্গাপুজো। সেখানেই আবার একটা দুর্গাপুজো পাড়াতে কী করে করা যাবে? তাই কালীপুজো। খুব আনন্দ করতাম আমরা কচিকাঁচারা সে পুজোতে।

তার পর আমরা যখন বড় হয়ে পাড়ার পান্ডা হলাম, অর্থাৎ যখন গোরাচাঁদ বালক সংঘ থেকে গোরাচাঁদ যুবক সংঘে প্রোমোশন হলো, তখন আমাদের উপরেই ভার পড়লো কালীপুজো করার। সেই সময়ে, সেই একাত্তর না সত্তরে, আমাদের পাড়ার পুজোর রজত জয়ন্তী হলো। ফলে, সে এক বিশাল ব্যাপার। বোধহয় পাঁচ হাজার টাকার বাজেট। মানে, সেই সময়ে পাঁচ হাজার টাকার পুজো মানে বিশাল পুজো। হই হই ব্যাপার। আমার বাবাই পাঁচ টাকা চাঁদা দিলেন। তাতে আমারই মাটিতে গর্বে পা পড়ে না!

পুরো পাড়াটা আলোয় আলোয় সাজানো হলো। তাও আবার যে সে আলো নয়। আর্টিস্টিক আলো। আমাদের পাড়ায় ছিল একজন দাদা, বীরেন মল্লিক। তাকে সবাই ‘কাকা’  বলে ডাকতো। আমরাও। কাকা আমাদের গলিতে বিরাট বিরাট ক্যানভাসে শ্মশানের ব্যাকগ্রাউন্ড এঁকে ফেললো কয়েক সপ্তাহ ধরে। সেই ল্যান্ডস্কেপ ঠাকুরের মূর্তির ঠিক পিছনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো। আর সামনে অন্ধকার অন্ধকার, আর যেন এখানে ওখানে চিতার আগুন জ্বলছে। ডাকিনি যোগিনী। ওঃ, সে কী রোমহর্ষক ব্যাপার!

আমরা কয়েকজন, যেমন সেই কাকা, আমাদের বাড়ির বাড়িওলার ছেলে অর্জুনদা, আর সবেতেই ভীষণ উৎসাহ সেই ক্লাস নাইন না টেনের পিছনপাকা আমি-- সবাই মিলে কয়েকশো তুবড়ি তৈরি করে ফেললাম আমাদের বাড়ির ছাতে বসে বসে।এরা আবার দুজনেই দারুণ ভালো গান গায়। আমার গানের প্রশ্রয় বাড়িতে মাসি শোভা আর ছোটমামা বুদ্ধ, আর পাড়াতে এই দাদারা। যাই হোক, তুবড়ি হলো। সোরা, গন্ধক, লোহাচুর, ম্যাগনেসিয়াম পাউডার আর সব কী কী যেন কিনে আনা হলো আমাদের মানিকতলা বাজার থেকে। উৎসাহে রাতে ঘুম নেই। তার উপরে বিবেকানন্দ রোডের দোকান মিলনী থেকে কিনে আনা রংমশাল, ইলেকট্রিক ফুলঝুরি, কালীপটকা, দোদমা, হাতচরকি, ভুঁইচরকি এসব তো রয়েছেই। রজত জয়ন্তী বলে কথা!

মাঝরাত্তিরে পুজো। কে বলবে মাঝরাত্তির! পাড়ার সবাই সে পুজোতে হাজির। তার পর ভাসানের দিন নাচতে নাচতে ঠাকুরের সঙ্গে সেই গঙ্গা পর্যন্ত যাওয়া পাড়ার দাদাদের সঙ্গে। ওই ভালোছেলেগুলো যায়নি। আমরা বাকিরা সব কলার তুলে পাড়ার সুন্দরী মেয়েদের প্রশংসাদৃষ্টিতে ভাসতে ভাসতে বা আসলে কল্পনা করতে করতে, সেই গঙ্গা পর্যন্ত। অনেক রাতে বাড়ি ফেরা।

যেন যুদ্ধজয় করে এলাম।

তার পর ভাইফোঁটা। আমার একটাই বোন বুবু, আমার থেকে অনেক ছোট। তার ফোঁটা তো নিতেই হবে। তারপর গাঁধি কলোনিতে আছে আমার মাসতুতো বোন বুরু আর মিতু। তাদের ওখানে যেতেই হবে। তবে সুবিধে, ওদের বাঙালদের আমাদের একদিন আগেই ভাইফোঁটা। তাই সেদিন এইট বি বাসে ওদের বাড়ি সন্ধেবেলা, আর তার পরের দিন আমাদের বাড়ি সকালবেলা। আমাদের ভাইবোনদের ফোঁটা। আর, তার উপরে আছে আমার মামার বাড়ি হরতুকি বাগান। আমার তিন মামা, মাসি সবাই আসবে। মা রান্না করবে অনেক কিছু। মার সেই জগৎ-বিখ্যাত রান্না। যে রান্না খাবার লোভে আমার সব বন্ধুরা আর আমাদের যত আত্মীয় সব কারণে অকারণে আমাদের বাড়ি আসবেই আসবে। আর আসবে গাঙ্গুরাম আর শ্রীদুর্গার বিখ্যাত মিষ্টি। বাবা চলে যাবে সেই হাজরা রোডে সেজপিসির বাড়ি ফোঁটা নিতে।

শাঁখ বাজবে। ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়লো কাঁটা, যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা, ভাই যেন হয় লোহার ভাঁটা-- এগসব মুখস্থ হয়ে যাওয়া মন্ত্র পড়া হবে। বছরে একদিন আমার বোন বুবু ‘লোহার ভাঁটা’ আমাকে প্রণাম করবে-- তাতেই আমি সকাল থেকে চান টান করে ধুতি টুতি পরে রেডি। দুব্বো হাতে নিয়ে। ওঃ, আশীর্বাদ করতে হবে কপালে চন্দনের ভিজে ভিজে ঠান্ডা ঠান্ডা ফোঁটা নেওয়ার বদলে। আর একটা কিছু উপহার। সবাইয়ের হাসিমুখ। গল্প। গান। রসিকতা। শরৎকালের আকাশের মতোই উদার। নির্মল। পবিত্র।  

সেসব দিন মনে পড়লেই -- ওই যে বললাম থেরাপি?

আমেরিকার স্বর্গরাজ্যে আর স্বপ্নের দেশে সেইসব গিয়েছে চিরকালের মতো। বাজিও পোড়ানো যায় না। পুলিশ ধরবে। আর ফোঁটা কেই বা দেবে? সব ভোঁ-ভাঁ। নয়তো সব দেশে বসে রয়েছে। আর আমরা এখানে।  

ওই স্বপ্ন দেখে উঠে সকালে মুখ ধুয়ে ফেলার মতোই।

 

এইবেলাডটকম/নীল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71