রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
আর কোনো জগন্নাথ হল ট্র্যাজিডি নয়
প্রকাশ: ১১:৫৪ am ১৬-১০-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৫৪ am ১৬-১০-২০১৭
 
ড. এম এ মাননান
 
 
 
 



দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ১৯৮৫ এর ১৫ অক্টোবর। শরতের এলোমেলো হাওয়ায় হালকা বৃষ্টিভেজা দিন। সন্ধ্যায় নামে ঝিরঝির বৃষ্টি। মেঘলা সন্ধ্যার মন খারাপ করা সময়টায় একে একে আসছে অনেকে, ঢুকছে মিলনায়তনে। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ বা অতিথি। সারি সারি চেয়ারে বসেছে সবাই। জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ পেছনে কিংবা দরজার পাশে দাঁড়ানো। দৃষ্টি সবার বিটিভির পর্দায়। সবেমাত্র বাংলা সংবাদ শেষ হলো। বিজ্ঞাপন হচ্ছে। প্রায় চারশত মানুষ যে যার মতো জায়গা করে নিয়েছে অনুদ্বৈপায়ণ ভবনে, জগন্নাথ হলের পূর্ব-দক্ষিণ পাশের পুরনো ১৯২৫ সালে নির্মিত তত্কালীন প্রাদেশিক পরিষদ ভবন, অ্যাসেম্বলি হলে।

একটু পরেই শুরু হবে মহান মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় সিরিজের নাটক ’শুকতারা’। ঘড়ির কাঁটায় রাত আটটা তিরিশ মিনিট। শুরু হয়েছে নাটক-এর আজকের পর্ব। সবাই নিঃশব্দ। চোখ নিবদ্ধ ওখানে। আর বাইরে তুমুল বৃষ্টি, দমকা হাওয়া। ঘড়ির কাঁটা এগুচ্ছে। কাঁটাটা যখন আটটা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ঘরে, তখনই অকস্মাত্ সেই দুর্যোগ নেমে এল ভবনটিতে। বিকট আওয়াজে ধসে পড়ল জরাজীর্ণ এসেবস্টজের ছাদ। নিমিষেই নিভে গেল ৩৪টি তাজা প্রাণ। পরবর্তীতে আরো ৬ জন হারিয়ে গেল চিরতরে চিকিত্সাধীন অবস্থায়। আহত হলো তিন শতাধিক। পরের দিন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মর্মান্তিক ঘটনার বিস্তারিত খবর দেখে সারা দেশের মানুষ কেঁদেছে। ঘটনার দিনতো ঢাকা শহরের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এসেছিল হল প্রাঙ্গণে, আকুলিত হদয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আহতদের প্রাণ বাঁচাতে, বিনা দ্বিধায় রক্ত দিয়েছিল হাসপাতালে। ঠিক মুক্তিযুদ্ধের মতো সবাই এক হয়ে এই দুর্যোগকে মোকাবিলা করেছে। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা আর অব্যবস্থাপনার প্রতি ক্ষোভ দেখানোর পাশাপাশি অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, যা আমাদের আজো অনুপ্রাণিত করে, আলোড়িত করে। যেমনটি হয়েছিল স্বাধীনতা-পূর্ব গণ-আন্দোলনের সময়ে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, তেমনটি আমরা দেখতে পেয়েছি জগন্নাথ হল ট্রাজেডির সময়ে। নতুন স্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবগাহিত সর্বস্তরের মানুষ সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে, সংহতি ও সহমর্মিতার যে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত সে দিন স্থাপন করেছিল তা চিরকাল বাংলাদেশের সবাইকে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে সাহস যোগাবে।

 আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক এবং সিনেট সদস্য। থাকি সেন্ট্রাল রোডে। টিভিতে খবরটি শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। খবরাখবর নিতে থাকলাম সহকর্মীদের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল আরো একটি বিশেষ কারণে। জগন্নাথ হলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার ঢাকার জীবনের প্রথম দিনটি। ১৯৬৮’র জুনের সম্ভবত প্রথম সপ্তাহের কোনো এক দিন লাকসাম জংশন থেকে প্রথম বারের মত ট্রেনে চাপলাম ঢাকার উদ্দেশে। লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে। বয়স মাত্র আঠার। শহর সম্বন্ধে শুধু কেতাবি ধারণা। পরিচিত কেউ ঢাকায় থাকে না।  তাই অচেনা শহরে কোথায় থাকব, কার কাছে যাব, কিছুই জানা ছিল না। শুধু জানতাম আমার এক চাচাতো মামা পড়েন দর্শন বিভাগে, থাকেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। বাস্, এটুকুই। নানা বা নানী এর বেশি আর কিছুই বলতে পারেন নি। বিকেলের দিকে পৌঁছলাম কমলাপুর রেল স্টেশনে। দুরু দুরু বুকে উঠলাম একটি রিকশায়। সলিমুল্লাহ হলের ঠিকানাও জানি না। মনে পড়ল জগন্নাথ হলে থাকেন আমার হাইস্কুলের একজন শিক্ষক, উমেশ রায় চৌধুরী, বুক-কিপিং-এর শিক্ষক ছিলেন, অমায়িক মুখটা ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে। তাই রিকশা-চালককে জগন্নাথ হলে যেতে বললাম। মনে পড়ে, সে হাইকোর্টের কাছে এসে রাস্তার একজনকে জিজ্ঞেস করে, জগন্নাথ হল কোথায়? আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। ঠকবাজ লোকের পাল্লায় পড়লাম নাতো! যাহোক, অবশেষে পৌঁছলাম জগন্নাথ হলে। গেটে উমেশ বাবুর নাম বলতেই দারোয়ান চিনল। আমি ওনার কক্ষে গিয়েই পেয়ে গেলাম। বিশাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এখানেই আমার দিন বাস (রাত্রি বাস নয়)। পরের কাহিনি অন্য কিছু; এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। আমার ঢাকা শহরের জীবন শুরু এই জগন্নাথ হল থেকে। তাই স্মৃতিতে সব সময় এ হলটি অমর। অভাবনীয় দুর্ঘটনাটির খবর শুনে তাই হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম।

মনে হলো, এমনটি তো হওয়ার কথা নয়। যেখানে নিত্যদিন শত শত ছাত্রের আনাগোনা, টিভি দেখা বা আড্ডা মারার জায়গা। সেখানে কেন এত অবহেলা। জেনেছি, হলের প্রভোস্টরা বহু তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ওই ভবনটির সংস্কারের কোনো ব্যবস্থা নেননি। এ দেশে এমনই হয়। ঘটনা ঘটে গেলে সবাই ছুটাছুটি শুরু করে। অধিকাংশ কর্তাব্যক্তিরাই প্রো-একিটভ নন, বরং চরমভাবে রি-একিটভ। আর এতেই প্রাণ যায় নিরীহদের।  অনেক জায়গাতেই একই অবস্থা। মনে পড়ে, ১৯৯৭ সনে আমি প্রথম মেয়াদে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রভোস্ট। প্রথম দিনে হল ঘুরতে গিয়েই দেখি, অডিটরিয়ামটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। অথচ ছাত্ররা এখানেই টিভি দেখে, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। একদিন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও মাননীয় সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের প্রধান অতিথি হিসেবে একটি অনুষ্ঠানে এই অডিটরিয়ামে উপস্থিত থাকা অবস্থায় ভবনটির হাল দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করি। প্রকৌশল বিভাগ কত যে বাহানা দেখাল তা এখানে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। আমি দ্বিতীয় মেয়াদে থাকার সময় পর্যন্ত অডিটরিয়ামটি ভেঙে নতুন করে তৈরি করাতে পারিনি। ব্যর্থ আমি, পুরো ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আসলে দু’এক জনে কোনো শুভ উদ্যোগ নিলেও যারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন তারা যদি সে উদ্যোগের অংশীদার না হতে চান, তা হলে উদ্যোগটি মাঠে মারা যেতে বাধ্য। তাই হয়, তাই হচ্ছে সর্বত্র। আর খেসারত দেয় অন্যরা।

জগন্নাথ হলের সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে, আমি মনে করি, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতি বছর রুটিনমাফিক নিয়মিত প্রত্যেকটি ভবন পরিদর্শন করা, প্রয়োজনীয় মেরামত বা সংস্কারের কাজ সঙ্গে সঙ্গেই সম্পন্ন করে ফেলা, প্রকৌশল বিভাগের মতামতকে মাথায় রেখে কর্তাব্যক্তিদের নিজস্ব বিবেক কাজে লাগান। সর্বোপরি, নির্দিষ্ট কাজটি সঠিক সময়ে সঠিকভাবে হচ্ছে কী-না, তা প্রায় প্রত্যেক দিন মনিটরিং করা। যদি এমনটি হয়, আমাদেরকে আর জগন্নাথ হলের করুণ ট্রাজেডি দেখতে হবে না। কোনো মায়ের বুক খালি হবে না, ভাই বা বোনের অনাকাঙ্খিত অকাল প্রয়াণে কোনো বোনের চোখে অশ্রু দেখতে হবে না। বাবার আহাজারিতে আলোয় ভরা আকাশ মুহ্যমান হবে না।

এখনো ভূমিকম্প হলে কিংবা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া দেখলে সে রাতটির কথা মনে পড়ে। অনেক সময় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। উত্কণ্ঠা কাজ করে আমার মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কিছু হল যেমন আমার নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতিবিজড়িত মাস্টারদা সূর্যসেন হল, মহসিন হল, সলিমুল্লাহ হল, ফজলুল হক হল ও কার্জন হল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এ হলগুলোর আশু মেরামত ও সংস্কার প্রয়োজন। সময় থাকতেই সজাগ হওয়া জরুরি। আমার পুরো জীবনের প্রায় সত্তর ভাগ সময় কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছাত্র হিসেবে ৬ বছর, শিক্ষক হিসেবে ৪০ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন থেকে কার্জন হল পর্যন্ত প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে মিশে আছে আমার নানা রঙের স্মৃতি। আমি চাই না, কোনো ভাবেই কামনা করি না যে, আর কোনো দুঃস্বপ্নময় ’অক্টোবর’ ফিরে আসুক আমার প্রাণপ্রিয় এ প্রতিষ্ঠানে। 

 

 

প্রচ
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71