শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
আষাঢ়ী পূর্ণিমা : বুদ্ধজীবনের সম্বোধির আলোকন
প্রকাশ: ০৭:০০ pm ০৮-০৭-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:০০ pm ০৮-০৭-২০১৭
 
 
 


দিলীপ কুমার বড়ুয়া : আড়াই হাজার বছরের ও পূর্বে বিশ্ব যখন হিংসাকবলিত, যাগযজ্ঞ, হানাহানি, অসাম্য, অজ্ঞানতার মোহান্ধকারে নিমজ্জিত মানবসভ্যতা, মানবিক মূল্যবোধ ধূলায় লুণ্ঠিত, সামাজিক ভেদনীতির ফলে খণ্ডিত মানবতা, ধর্মের নামে অধর্মের প্রসার, মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর, মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন চেতনার দ্বার রুদ্ধ, ক্লেদাক্ত পঙ্কিলে ঢাকা পড়েছিল শুদ্ধসত্তা, মিথ্যাদৃষ্টি ও অন্ধ কুসংস্কারে তমসাচ্ছন্ন সামাজিক পরিবেশ তখন প্রজ্ঞার আলো জ্বেলে প্রেম, করুণার নির্যাসে মহামানব গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব।

মানুষের কল্যাণের জন্যই তাঁর জন্ম ! মানুষের দুঃখে কাতর হয়ে সত্যানুসন্ধান করেছেন। মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনপ্রবাহে ত্রয়ীস্মৃতিবিজড়িত সমুজ্জ্বল অবিস্মরণীয় ঘটনা আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। আত্মশুদ্ধি ও আত্মবিশ্লেষণে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি বৌদ্ধিক জীবনবোধে জাগরণের দিন, প্রেষণার দিন । এ তিথিতে গৌতম সিদ্ধার্থরূপে মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। ঊনত্রিশ বছর বয়সে এ তিথিতেই প্রাণী জগতের দুঃখ মুক্তির অন্বেষণে ভোগ বিলাস, রাজেশ্বর্য ত্যাগ করে সংসার চক্রের আবর্তিত দুঃখ-জরা-ব্যাধি নিরশনে গৃহত্যাগ করেন ।

দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন প্রকৃতির সৌন্দর্যঘেরা গয়ার বোধিবৃক্ষ মূলে। সিদ্ধার্থ গৌতম আলোকপ্রাপ্ত অর্থাৎ সর্বতৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করে বোধিজ্ঞান লাভ করে জগৎপূজ্য হয়েছিলেন । বুদ্ধ মো লাভের পথ আবিষ্কার করে সকল প্রাণীর উদ্ধারকল্পে যাত্রা করলেন বারানসীর সারনাথে।

যেখানে তাঁর সময়ের ধ্যানী পাঁচ শিষ্য অবস্থান করছিলেন । বুদ্ধ তাঁর বোধির বিকাশ ঘটাতে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডন্য, বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অস্‌সজিত এর কাছে সাধারণ মানুষের দুর্বোধ্য নব ধর্ম প্রচার করেন এবং বুদ্ধচেতনার আলোক প্রাপ্তির উদ্বোধন করলেন। পরে একই পূর্ণিমায় তাঁর প্রয়াত মাতাকে সর্দ্ধম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন এবং বর্ষাবাস গ্রহণ করেছিলেন।

এ বর্ষাবাসের কারণ তাঁর প্রয়াত মাতৃদেবীর নির্বাণ লাভের হেতু উৎপন্ন করা। বুদ্ধের নির্দেশিত নীতির আলোকে এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ সৃজিত ভিক্ষু সংঘ ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান গ্রহণ করে এবং গৃহী উপাসকেরা প্রতি পূর্ণিমা অমাবস্যায় উপবাসব্রত পালন করেন। এই তিথিতে ধ্যানে, জ্ঞানে, সংযম ও চরিত্রে প্রাণিত চেতনায় নিজেকে আলোকিত করার মানসে সবাই সচেষ্ট থাকে।

আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূণির্মা এ তিনমাস ব্যাপী বৌদ্ধ ভিক্ষু, গৃহী উপাসকেরা জীবনের সমস্ত পাপ দূরীভূত করে সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি, সম্যক সংকল্প এবং সম্যক দৃষ্টি’র মার্গ পথে আশ্লিষ্ট হয়ে জীবন পরিচালনার প্রয়াসে অনুসন্ধান করে মুক্তির পথ ।

অজ্ঞতা ও মোহান্ধকারের পথ পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রা। এ দিন সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধরা এবং মানবতাবাদী দার্শনিক চিন্তাবিদরা বুদ্ধের জীবন দর্শনকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন।

বিশ্বের সব বৌদ্ধরা এ দিনটি অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নানা কর্মসূচিতে উদযাপন করেন। আজ এ শুভ তিথিতে আমি বাংলাদেশ সহ বিশ্বের সব শান্তিকামী ও মানবকল্যাণে উদ্বোধিত শুদ্ধসত্তার মানবগোষ্ঠীকে জানাই আষাঢ়ী পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ও অভিবাদন ।

ঊনত্রিশ বছর বয়সে নগর পরিভ্রমণকালে সিদ্ধার্থ গৌতম চারটি নিমিত্ত দর্শনে মানসিকভাবে পীড়াগ্রস্ত হন। তাঁর অন্তরলোকে জিজ্ঞাসার ঝড় ওঠে। উপলব্ধির আলোকনে দৃঢ় মনোবলে খুঁজে ফেরেন জাগতিক প্রবহমান ধারায় বয়ে চলা জীবনের পর্যায়গুলো। জন্ম নিলেই মানব জ্বরাগ্রস্ত, ব্যাধিগ্রস্ত হবে এবং বার্ধক্যের কষাঘাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে প্রাণ বায়ুহীন শবে পরিণত হবে এটাই নিয়তির বিধান । নিমিত্ত দর্শনের শেষ ধাপে দেখেছিলেন শান্ত সমাহিত সন্ন্যাসী।

সন্ন্যাসীর বিমূর্ত রূপ দেখে তাঁর মননে জেগে উঠেছিল আরেক সত্তা। তিনি জাগরিত হলেন মনোচৈতণ্যের প্রখরতায় মানবজীবনের রহস্য উন্মোচনে। রাজৈশ্বর্য, মা-বাবা, প্রিয়তমা স্ত্রী, পুত্র রাহুল, স্বজনদের ছেড়ে মহাভিনিস্ক্রমণ করে আত্মজয়ের মাধ্যমে মানবের তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাবৎ প্রাণীকুলের কল্যাণ সাধনে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন। সাধনার প্রথম পর্যায়ে আলাড় কালামের স্মরণাপন্ন হন।

তাঁর জিজ্ঞাসা ছিল “কোন উপায়ে জ্বরা, রোগ ও মৃত্যু হতে মানবকুল উদ্ধার পাবে?” আলাড় কালামের উত্তর ছিল ‘অহং’ এর পরিশুদ্ধিতেই প্রকৃত মুক্তি। কিন্তু মুনিবরের উত্তরে সিদ্ধার্থ গৌতমের জিজ্ঞাসার সমাধান নেই। সিদ্ধার্থ গৌতম রামপুত্র উদ্রকের কাছে গিয়েও কিছু যোগবিদ্যা বৈ আর কিছুই রপ্ত করতে পারেননি।

গৌতম তাঁর অন্তরলোকে আলোড়িত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার সংকল্পে অটল, অবিচল। কঠোর তপস্যায় নিজেকে সমর্পণ করলেন। তাঁর শরীর দুর্বলতার চরমসীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু সে তপস্যায় তাঁর চরম দর্শন অর্জিত হয়নি। অবশেষে সুজাতা’র শ্রদ্ধা ভক্তি মিশ্রিত আহার্য গ্রহণের পর নৈরঞ্জনা নদী পেরিয়ে গয়ার তরুতলে ধ্যানে মগ্ন হলেন- মহাউপাসনার অনন্ত যাত্রায়। আত্মজয়ের সোপানে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ গৌতম -‘যতদিন না বাসনার সংশ্লেষ থেকে মুক্ত হব, যতদিন না এ অন্তরাত্মা দুঃখ জয় করবে ততদিন এ স্থান থেকে উঠব না।’ অন্তরের দৃষ্টি ও জীবনবোধে আন্দোলিত জিজ্ঞাসাগুলোকে প্রবাহিত করলেন অন্তরপানে। সন্ধ্যার নরম আলো ছড়ানো প্রকৃতির কোলে গৌতম ধ্যানে মগ্ন ।

বৈশাখের পুণ্যময় রজনীর শান্ত প্রকৃতিতে প্রজ্ঞার আলোয় উদ্ভাসিত হলেন, উপনীত হলেন জ্ঞানের সোপানে। তাঁর অন্তরের আয়নায় জগতের সমস্ত প্রাণীর প্রতিচ্ছবি প্রতিবিম্বিত হল। মৃত্যুর নিমিত্তে প্রাণী পুন:পুন জন্ম নেয়। কর্মগুণে দুঃখভোগ, সুখভোগ এবং জীবন এক বিভীষিকাময় দুঃস্বপ্ন ও কন্টকময় উপত্যকা। দুঃখের হাত থেকে কারো পরিত্রাণ নেই। জন্ম মৃত্যুর অনন্ত ঘূর্ণায়মান আবর্তনচক্রে আবর্তিত হচ্ছে প্রাণীকুল। মহা মানব বুদ্ধ মানব জীবনের দুঃখময় পথ পরিক্রমা থেকে দার্শনিক দৃষ্টির প্রখরতায় আবিষ্কার করেছেন নবলব্ধ বোধিজ্ঞান।

যে জ্ঞান দর্শনের প্রভাব মানব সভ্যতার ইতিহাসে অপরিসীম। সমাজ পরিবর্তন বা নতুন সমাজ, সভ্যতা বিনির্মাণের ক্ষেত্রে এ দর্শনের ভূমিকা এককথায় অনন্য, সুদূরপ্রসারী। মানুষের ব্যক্তিগত, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বুদ্ধ দর্শনের মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং তাৎপর্য এত ব্যাপক, বিস্তৃত ও সুগভীর যে বিশ্ববাসীর কাছে এটি কেবল একটি প্রভাবশালী মানবতাবাদী দর্শন নয়- মানব মুক্তির অন্যতম প্রধান ধর্ম বা উপায় হিসেবে স্বীকৃত এবং অনুসরণীয়। এ দর্শন বিশ্ব, প্রাণী জগতের কল্যাণে মানুষের নৈতিক আদর্শ, চেতনা শাণিত বা বিকশিত করবার যে ঐতিহাসিক শিক্ষা দেয় তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল, অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয়।

বুদ্ধ তাঁর শিক্ষায়, নীতিবাক্যে চারটি উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। সেগুলো হচ্ছে- ১) ঐশ্বরিক শক্তিকে অস্বীকার ২) আত্মাকে নিত্য স্বীকার না করা ৩) কারো উক্তি বা কোন গ্রন্থের বক্তব্যকে স্বতঃপ্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা ৪) জীবনপ্রবাহ শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মনে করা। বুদ্ধের তিনটি অঙ্গীকারাত্মক দর্শন ব্রাহ্মণ্যবাদের ভিতে আঘাত করে বিশ্বাসের জায়গাটা ভেঙে দেয়। তাঁর ধর্ম হয়ে ওঠে মানবমুখি ও কল্যাণব্রতী। তাঁর কঠোর সাধনার অর্জন মহাসত্যগুলো কোন ঐশ্বরিক শক্তির আশির্বাদপুষ্ট নয়, এতে কোন অলৌকিকত্ব নেই। ঈশ্বর কিংবা দেবতার করুণায় অর্জিত হয়নি তাঁর ধর্ম। সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতা, মেধা, প্রজ্ঞায় অর্জন করেছেন বোধি যেখানে অন্ধ বিশ্বাসের অনুপস্থিতি ও যুক্তিনির্ভর তত্ত্বজ্ঞানের বিশ্বেষণ। তাঁর শিক্ষায় যুক্তি, আত্মোপলব্ধি, আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে নিজেকে জানার, মানবজীবন অধ্যয়ন করার নিরন্তর সাধনার স্ফুরিত ইচ্ছাশক্তি।

সুদীর্ঘ ছয় বছরের সাধনায় সিদ্ধার্থ গৌতম বোধি’র সন্ধান পান। যার আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ। জাগতিক দুঃখমুক্তির অভিযানে সিদ্ধার্থ গৌতম অবিদ্যা-তৃষ্ণা, লোভ, মোহের নাগপাশ ছিন্ন করে সম্বোধি বা সত্যজ্ঞান লাভ করেন। মহাসত্য নির্ণয় করলেন। সেই সত্যকে নিজের জীবনে উপলব্ধি করে ঋদ্ধতায় মহাঋষি আলোকিত হলেন। ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের মাধ্যমে বুদ্ধ তাঁর দর্শনের আলোকপ্রাপ্তির উদ্বোধন করলেন সারনাথে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যের কাছে। বুদ্ধ তাঁর জীবদ্দশায় জাগতিক সমস্ত দুঃখ মুক্তির লক্ষ্যে প্রথাগত চেতনার বিরুদ্ধে অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তাই এ দর্শনকে দুঃখ মুক্তির দর্শন বলা হয়। কারণ নিরলস গতিশীল সাধনার মাধ্যমে পার্থিব দুঃখ হতে মুক্তির উপায় অনুসন্ধানই হচ্ছে এই দর্শনের মূল সুর, যা প্রয়োগের ভিত্তিতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে সুত্রপাত ঘটিয়েছেন গৌতম বুদ্ধ। জীবনের চলার পথে তিনি কর্মকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সৎকর্মের জন্য মঙ্গলদায়ক কল্যাণ এবং অসৎকর্মের জন্য অকল্যাণকর ফল আসবে এটা দ্রুব সত্য। তাঁর দৃষ্টিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই পরিবর্তনশীল, অনিত্য। অনিত্যতাকে দ্রুব সত্য মেনে জীবনে দুঃখ মুক্তির উপায় অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করার পথের দিশা দেখিয়েছেন। বুদ্ধ বলেছেন ‘অপ্রমত্ত হও, আত্মদীপ হয়ে বিহার করো। আত্মদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে নিজের মুক্তির জন্য কুশল কর্ম সম্পাদন করো। আত্মশরণ নাও, অন্যের উপর নির্ভর করো না। নিজেই নিজের প্রদীপ হও। তিনি তাঁর সাধনালব্ধ ধর্মকে ঢালাওভাবে কারো ওপর চাপিয়ে দেননি। অন্ধভাবে কোন ধর্মমত, নীতিকথা গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি সাহসী কণ্ঠে বলেছেন “এস দেখ, পরীক্ষান্তে গ্রহণযোগ্য মনে করলে গ্রহণ কর, যদি গ্রহণ করার মাপকাঠিতে বিবেচ্য না হয় তবে বর্জন কর।” এমন দুঃসাহসিক বাণী একমাত্র বুদ্ধের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছিল যে কারণে বুদ্ধের ধর্ম সার্বজনীন। বুদ্ধের মতে জগতের প্রত্যেকটি জিনিস কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোন বস্তু স্বয়ং উৎপন্ন হয় না। একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনা থেকে সংঘটিত হয় ও বিস্তার লাভ করে। সবকিছুর উৎপত্তি কোন ঘটনা থেকে। তিনি তাঁর আবিষ্কৃত ধর্ম ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি’ বা কার্যকারণ নীতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যা করেছেন যেখানে কোন অস্পষ্টতা নেই। এ নীতির প্রেক্ষাপটে বুদ্ধ তাঁর সত্য সন্ধানীর দৃষ্টিতে জীবন জগতকে অবলোকন করেছেন। তিনি দুঃখের স্বরূপ নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন-জীবন দুঃখময়, এ দুঃখের কারণ আছে, এ দুঃখ থেকে মুক্তির উপায়ও আছে। তাঁর মতে জগতে সবকিছু পরিবর্তনশীল। বিশ্ব আবর্তিত হচ্ছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তরে এবং জীবন এক অবিরাম নদীর চিরন্তন বয়ে চলা অন্তহীন স্রোত যেখানে আবির্ভাব ও তিরোভাব জাগতিক নিয়মে ঘটে। কার্যকারণ তত্ত্বই ধ্যানী বুদ্ধের ‘প্রতীত্যসমুদপাদনীতি’ এবং প্রতীত্যসমুদপাদই বৌদ্ধদর্শনের আধার বলে মনীষীদের অভিমত। স্বয়ং বুদ্ধের বাণী থেকেই জানা যায়-“যিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদকে দেখেন, তিনি ধর্মকে (বৌদ্ধদর্শন) দেখতে পান, যিনি ধর্মকে দেখেন তিনি প্রতীত্য-সমুৎপাদকে দেখেন। পঞ্চ উপাদান স্কন্ধও প্রতীত্য সমুৎপন্ন” (মজ্ঝিমনিকায়)। প্রতীত্য-সমুৎপাদের নিয়মকে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে বুদ্ধ দ্বাদশাঙ্গ প্রতীত্য-সমুৎপাদের কথা বলেছেন। বুদ্ধের দর্শনের মৌলিক বিষয় হচ্ছে দুঃখ। এই দুঃখ উৎপত্তির কারণ নির্ণয়ের জন্য সাধনায় উৎসর্গ করেছেন নিজেকে এবং দুঃখ মুক্তির উপায় খুঁজেছেন। বুদ্ধ দুঃখশূন্য এক জগতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। গৌতম বুদ্ধের চারটি আর্য সত্যের (চতুরার্য সত্য) সবই দুঃখকে কেন্দ্র করে। তার শিক্ষা ও দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো প্রাণীকুলকে কীভাবে দুঃখের হাত থেকে বাঁচানো যায়। গৌতম বুদ্ধ দুঃখের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাননি, তিনি দুঃখকে জয় করতে চেয়েছেন। দুঃখের হাত থেকে বাঁচার জন্য গৌতম বুদ্ধ কারো কাছে সাহায্য না চেয়ে নিজের ইচ্ছাশক্তি ও সংযমের মাধ্যমে দুঃখের হাত থেকে অব্যাহতি লাভের চেষ্টা করেছেন। গৌতম বুদ্ধের এই শিক্ষা ও দুঃখ মুক্তির দর্শনই বৌদ্ধ দর্শন নামে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর মতে, এ জগৎ দুঃখের সরোবর। দুঃখই আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেয় সুখ অকল্পনীয় ও অসম্ভব বস্তু। যতই আমাদের জ্ঞানের পরিধি বাড়ে, ততই আমাদের দুঃখ বাড়ে। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ দুঃখের কথা বললেও আশার বাণী শুনিয়েছেন, দুঃখ মুক্তির আর্যসত্যের মাধ্যমে সঠিক পথের অনুসন্ধান দিয়েছেন । দুঃখ থেকে পরিত্রাণের জন্য বুদ্ধ দশ পারমী, দশ উপ-পারমী ও দশ পরমার্থ পারমী পূরণ করেছেন এবং অন্তিম জন্মে পারমিতা সাধনার উৎকর্ষতায় বুদ্ধত্ব লাভ করে দুঃখের অন্তসাধন করেছেন এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছেন। বুদ্ধ বলেছেন দুঃখের মূল উৎপত্তি হচ্ছে তৃষ্ণা বা অবিদ্যা থেকে। তৃষ্ণার মরীচিকার পেছনে ধাবমান প্রাণী মাত্রই জন্ম জন্মান্তরে সংসারচক্রে বিঘুর্নীত হচ্ছে। চতুরার্য্য সত্যের চারটি স্তম্ভে দুঃখ নামক অবিনাশী মহাশক্তির আস্ফালন। ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র অনুসারে চতুরার্য সত্যকে ঠিক মতো বুঝতে প্রতিটি সত্যের জন্য তিনটি করে ধাপে মোট বারোটি অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োজন। সত্য সম্বন্ধে জানা, সত্য সম্বন্ধে কি করতে হবে তা জানা, যা করতে হবে তা সম্পন্ন করা। দুঃখময় এ জগতে মানবজীবন দুঃখের সমুদ্রে অবিরাম ভাসমান। এই দুঃখ আর্যসত্যের কারণ তৃষ্ণা, আসক্তি, অবিদ্যা, ইস্পিত বস্তুর অপ্রাপ্তি থেকে। তৃষ্ণাই দুঃখ সমুদয় আর্যসত্য, দুঃখের কারণ। দুঃখ উৎপত্তি অজ্ঞানতার কারণে ,সত্যকে অসত্য জ্ঞান করা। তৃষ্ণার কারণে রূপ, রস, গন্ধ, পর্শ, লোভ -লালসার সৃষ্টিতে জন্মের কারণ সৃষ্টি হয়। দুঃখ নিরোধ তখনি সম্ভব যদি তৃষ্ণা, অবিদ্যা, অজ্ঞানতার নিরোধ হয়। দুঃখরূপ আসক্তি, তৃষ্ণা নিরোধের উপায় হলো আর্য অষ্ঠাঙ্গিক মার্গ। অষ্ট অঙ্গযুক্ত মার্গ-সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। বুদ্ধ অষ্টাঙ্গিক মার্গকে প্রজ্ঞা, শীল ও সমাধি নামক তিনটি বিশেষ অঙ্গে বিভাজন করেছেন। সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম ও সম্যক জীবিকা শীলের অন্তর্ভুক্ত। সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধির অন্তর্ভুক্ত , আর প্রজ্ঞার দুটি পথ হলো সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সংকল্প। আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের দ্বারা কেবল শান্তি, দিব্যজ্ঞান, সম্বোধি বা নির্বাণ লাভই হয় না, জীবনে সুখ, কীর্তি, যশও লাভ হয়। প্রজ্ঞার দ্বারা সর্বভবকে, শীল দ্বারা পাপকে এবং সমাধির দ্বারা কামধাতুকে অতিক্রম করা যায়। দুঃখনিরোধগামিনী প্রতিপদা বা নির্বানই হচ্ছে পরম বিমুক্তি। সত্য উপলব্ধি করার মধ্য দিয়েই মানবের দুঃখ মুক্তি সম্ভব। নির্বাণ লাভের উপায় হচ্ছে আর্য অষ্টাঙ্গিঁক মার্গ? এই আটটি মার্গ বা পথ অনুশীলন খুবই কঠিন, কিন্তু এতে দুজ্ঞেয়তা বা অস্পষ্টতা নেই। এই পথ অনুসরণ করলে বুদ্ধ আবিষ্কৃত নির্বাণের ঠিকানায় পৌঁছানো যায়। অন্তর্দৃষ্টি উন্মিলিত করে, স্মৃতি সম্প্রজ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমে সকল কুশল কর্ম, চিন্তা-চেতনার মূলভিত্তি প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি ও সত্যকে ধারন করে নিরোধ সত্যকে উপলব্ধি করলে নির্বাণ সাক্ষাত করা যায়। বুদ্ধ বলেছেন মানুষের মুক্তির উপর ঈশ্বরের কিংবা কোন দৈবশক্তির প্রভাব নাই। সত্য উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে মানুষের দুঃখমুক্তি সম্ভব। সর্বোপরি মানবপ্রেমী বুদ্ধ উদাত্তকণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন - প্রত্যেক মানুষের মুক্তি-অমুক্তি তাদের নিজের হাতে, এতে কারো কাছে করুণা ভিক্ষার প্রয়োজন হয় না। সমস্ত সংস্কার অনিত্য, সমস্ত সংস্কার দুঃখ এবং সমস্তধর্ম অনাত্ম ;এ তিনটি সত্য যিনি প্রজ্ঞার আলোয় ধারণ করেন, অনুশীলন করেন তিনিই সমস্ত দঃখ থেকে মুক্ত হন।

বুদ্ধের ধর্মমত, দর্শন হলো বাস্তবভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত সত্য ধর্ম। সংসারচক্রের জন্ম-মৃত্যুর আবহে দুঃখ মুক্তির হাহুতাশে উৎকণ্ঠিত প্রাণীকুল। দুঃখের সাগরে প্রতিনিয়ত সাঁতার কেটে কুলের সন্ধানে ব্যাপৃত সকল। বুদ্ধের বোধিজ্ঞানের অমোঘ সত্যগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে মানবকুল পেতে পারে অমৃতের সন্ধান। আমাদের চারপাশ ঘিরে কেবলই অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা, হিংসা, দ্বেষ, হানাহানি, নৈতিক অবক্ষয়ের ঝড়ের তান্ডব। মানব সভ্যতা হুমকির মুখে। মানবতা ভুলুণ্ঠিত। বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এ তান্ডবতাকে রুখতে পারে বুদ্ধের সার্বজনীন, মৈত্রী, অহিংসার বাণীর চর্চা। বুদ্ধ নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করলে মিলবে দুঃখ মুক্তির সনদ। বুদ্ধ মানবতার মুক্তিসাধনে অজেয় এবং একজন শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী। তাঁর মানবতাবাদী জীবন দর্শন সর্বমানবের হিত সাধনে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। বুদ্ধের আধুনিক, উদার চেতনা মানবসভ্যতার বৃহত্তর কল্যাণে বিশ্বব্যাপী উজ্জ্বল বাতিঘর হিসেবে আলোর পথ দেখাবে। হিংসা দ্বন্ধযুক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিপরীতে একটি অহিংস সমাজ ব্যবস্থা, মৈত্রীময় সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় মহামানব বুদ্ধের যুগান্তকারী মানবতাবাদী দর্শন বিশ্বে শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনুক, বুদ্ধের অহিংসার বাণী ছড়িয়ে যাক সবার মাঝে, অনাবিল, অকৃত্রিম, শর্তহীন প্রেম, শুচিশুভ্র পূর্ণতায় মানব চেতনাকে বিকশিত করুক।

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, ইউএসটিসি
(সংগৃহীত)

 

এইবেলাডটকম/পিসিএস 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71