শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
আসলেই কি আমরা এই দেশে থাকতে পারব না?
প্রকাশ: ০৪:০৯ pm ৩০-০৭-২০১৬ হালনাগাদ: ০৪:০৯ pm ৩০-০৭-২০১৬
 
 
 


তুহিন দাস ||

প্রশ্নটা নতুন নয় বাংলাদেশের একজন ধর্মীয় সংখ্যালঘুর কাছে। ১৯৪৭ সাল থেকে এক প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের মনে? কখনো নিভৃতে, নিরুচ্চারিত থেকে গেছে, কোন প্রশ্ন করারও সুযোগ হয়নি, কখনো প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রশ্নটি আবার শুনলাম। কিন্তু তা ব্যক্ত করার সময়ও পাননি নারায়নগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের রতন বর্মন, তার ১০ বছরের সন্তান সাগর বর্মনকে তার কর্মক্ষেত্রে গত ২৫শে জুলাই তারিখে হোসপাইপ দিয়ে পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ কেমন বর্বরতা!

 

অন্যদিকে ২১ তারিখে দুর্জয় দাস মরণ নামের আরেক শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে, সে অপহৃত হয়েছিল তিন দিন আগে। কিছুদিন আগে এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে শিশুহত্যা বাড়ছে, পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রোশ মেটাতে গিয়ে শিশুরাও হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে এখন অনেক বেশি।

সংখ্যালঘুদের হত্যার হুমকি এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে গত কয়েক মাসে। গত ২৮ জুলাই প্রেরিত আইএস এর এক চিঠিতে যশোর জেলার কেশবপুরে পুজা উদযাপন পরিষদের নেতা নন্দ দুলাল বসুকে হত্যার হুমকি দিয়ে প্রেরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘তোমাদের এ দেশে থাকার মেয়াদ শেষ, তোমাকে আর এক মাস সময় দেয়া হলো। এক মাসের মধ্যে দেশত্যাগ করতে হবে। তা না হলে তোমার মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া সব রকম পূজা ও অন্য সামাজিক কার্যক্রম বন্ধ করবে। তোর মৃত্যু ও পরিবারের ক্ষতি কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমরা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রথমে ইসলামের পতাকা তুলব।’ এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি। কেউ কেউ দেশত্যাগ করেছেন ইতোমধ্যে।

ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ হত্যার হুমকি পাওয়ার পরপর কদিন আগে ভারতে চলে গেছেন।  মন্দির ও প্রতিমা ভাঙচুর চলছে, নেই প্রতিরোধ, নেই প্রতিকার!এ বিষয়ে কেউ  অভিযোগ করলে তাদের উল্টো পেটানো হচ্ছে, সংবাদপত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। একের পর এক মন্দিরের সেবায়েত হত্যার পর আতঙ্ক বিরাজ করছে মন্দিরে। কোনো কোনো পুরোহিত হত্যার হুমকি পাওয়ার পরে পুজাঅর্চনা বন্ধ করে দিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন, কোথাও কোথাও তাদের খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের, তুলেছিলেন শরীফ খিয়াম।

 

গত ২৬ জুন প্রকাশিত এক খবরে দেখা যায় এখন ঘরের মধ্যে ঢুকে সর্বস্ব লুট করে নেয়াও হচ্ছে। খবরটি বরিশালের আগৈলঝাড়ার,অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা এক সংখ্যালঘু পরিবারের সবাইকে ঘরের ভেতরে অজ্ঞান করে মূল্যবান মালামাল নিয়ে গেছে।

বিদ্যালয় থেকে পর্যন্ত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। যশোরে দলিত সম্প্রদায়ের একদল ছাত্রকে একজন শ্রেণীশিক্ষক বলেন ‘তোমরা নোংরা। তোমাদের গা দিয়ে গন্ধ বের হয়। তোমাদের স্কুলে আসার দরকার নেই। তোমাদের লেখাপড়া শিখে কোনো লাভ নেই।’

ঘৃণা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ছিনতাইকারীরাও হিন্দু শুনলে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মৃন্ময় মজুমদার ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে বাড়িতে বাগেরহাটের দিকে রওয়ানা দেন, তিনি তখনও জানেন না তার জন্য কি ভয়াবহতা অপেক্ষা করছে সামনে। পথে বাড়ির নিকটে গতিরোধ করে তিন সন্ত্রাসী, তার কাছে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান যা কিছু ছিল সব অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নেয় তারা। তারপর নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন ‘মৃন্ময় মজুমদার’। প্রকৃতপক্ষেই তিনি হিন্দু কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার তার প্যান্ট খুলে চেক করে সন্ত্রাসীরা। হিন্দু পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই চাকু চালিয়ে দেয় গলায় ৩ বার, বুকে ৪-৫ বার,বাম হাতে ও পেটে কিডনী বরাবর আরো কয়েকবার। জীবন বাঁচাতে মৃত্যুর ভান করে পড়ে গেলে তাকে মৃত ভেবে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায় তখন। রক্তাক্ত অবস্থায় তার দিদির বাড়িতে ছুটে যান মৃন্ময়। তখন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন গত জুন মাসে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বলেন, ‘শিক্ষা বিভাগে এই সরকার ৯০ ভাগ হিন্দুদের নিয়োগ দিয়েছে। এটা কি হিন্দুদের দেশ! মুসলমানের শিক্ষা কি করে হিন্দুরা নির্ধারণ করে?যে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান সেই দেশের জনগণ এটা মেনে নিতে পারে না।’

বাংলাদেশের একজন প্রাক্তন মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ কিভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পোষণ করে জনসম্মুখে এ ধরনের বক্তব্য দেয়! সাধারণ জনগণ বা কেন এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ করেনি আজো? এ দেশ কি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ? তাদের অনুসারীরা সারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ইসলামকে নিয়ে কটুক্তির মিথ্যে অভিযোগ, কখনো কখনো স্কুলছাড়া করছে, কখনো তাদের পুলিশে সোপর্দ করছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের এক প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করায় তুলকালাম ঘটে গেল দেশে। সে ঘটনায় সমগ্র শিক্ষক সমাজকে লাঞ্ছিত করা হয়েছিলো এবং তথাকথিত ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এসেছে মসজিদের মাইকের ঘোষণার মাধ্যমে।

মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গ্রামবাসীদের ডেকে সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলার মতো মারাত্মক ঘটনাও ঘটেছে এ বছরে সিলেটের গোলাপগঞ্জে। হিন্দুদের জমি দখল চলছে। গত ১৮ জুলাই নবীনগর পৌর এলাকার ভোলাচং পাল পাড়ায় অসহায় এক হিন্দু পরিবারের উপর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে তাদের বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে স্থানীয় কয়েকজন সন্ত্রাসী, তারা সব আসবাবপত্র ফেলে দিয়ে বাড়িঘর ভেঙে দেয়। এমনকি শ্মশানের জায়গা পর্যন্ত দখল করার অভিযোগ উঠেছে। জমি দখলের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনের জরিপে দেখা যাচ্ছে শুধু বাংলাদেশ জামায়াম ইসলাম নয় বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা নিজ নিজ এলাকায় মদদ দিচ্ছেন।

স্কুলপড়ুয়া সংখ্যালঘু বালিকাদের স্কুলে যাবার পথে উত্যক্ত করা হচ্ছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক মা ও তাঁর মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে নদীতে ‘প্রমোদতরী’ভাসিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দিনাজপুর জেলায় ইসকন মন্দিরে বোমা ও গুলি ছোঁড়া হয়েছে। মন্দির-গীর্জায় পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে। গত জুন ও জুলাই মাসে এক মাসের ব্যবধানে ঝিনাইদহ জেলায় দুজন হিন্দু পুরোহিতকে হত্যা করায় আতঙ্কে আরো পুরোহিতরা দেশ ছেড়েছেন, অনেকে দেশ ছাড়ারপ্রক্রিয়ায় আছেন।

২৭ জুলাই অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবরসূত্রে দেখা যায় ঝিনাইদহের শৈলকূপার মঠবাড়ি কালীমন্দিরের পুরোহিত সোনা সাধু ও রামগোপাল মন্দিরের পুরোহিত স্বপন চক্রবর্তী ভারতে চলে গেছেন। রামগোপাল মন্দিরের সভাপতি কালাচান সাহা জানান, দুই হত্যাকান্ডের পর তাদের মন্দিরের পুরোহিত অন্য একজনকে দায়িত্ব দিয়ে ভারত চলে গেছেন।

অন্যদিকে মঠবাড়ি কালীমন্দিরের বর্তমান পুরোহিত প্রতাপ চন্দ্র সাহা জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্ক থাকতে বলার পর দেশে ছেড়েছেন তাদের পুরোহিত। পুজো অর্চনার কাজ চলছে মন্দিরের ফটক আটকে, কোথাও কোথাও পুলিশ পাহারা বসালেও তাতে আতঙ্ক কাটেনি, কেননা কোথাও কোথাও অপরিচিত যুবকরা খোঁজখবর নিচ্ছে বলে জানা গেছে ও প্রতিদিন নতুন নতুন হত্যার হুমকিদেয়া হচ্ছে।

গত ২৫ জুন রেমা-কালেঙ্গা বনের আদি বাসিন্দা প্রায় ১৮৭ জন ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ নিজ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সহায়তায় ত্রিপুরা রাজ্য থেকে ওই ১৬৮ জনকে যদিও পরে ফিরিয়ে আনে। তারা বাংলাদেশের বনকর্মীদের অত্যাচারে দেশ ছেড়েছিলেন। ছাতকে মণিপুরী আদিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে বলে তারা সংবাদ সম্মেলন করেছে।

আমরা এবার গত ছয় মাসের খতিয়ানে চোখ রাখি। ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত  বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর কমপক্ষে ৯১টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ সবের অধিকাংশ একক ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার সংখ্যা কয়েক হাজার। এ সময়ে ১৫ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২৮ জন। অপহরণের শিকার হয়েছেন ছয় জন। আটটি ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। জমিজমা ঘরবাড়ি মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা দখল ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৭১টি। এক হাজারটি বা তার বেশি হিন্দু এবং সাতশ খাসিয়া পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিমা ভাঙ্গচুর ১৬, মন্ডবে হামলা ১০টি। জীবন নাশের হুমকি অসংখ্য, ৩৬৫টি মন্দিরে পূজা বন্ধ। (প্রায়) এই হল বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সার্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশে।

লেখাটার শুরু করেছিলাম একটি প্রশ্ন দিয়ে— ‘আসলেই কি আমরা এই দেশে থাকতে পারব না?’ প্রশ্নটি আমার নয়, পিরোজপুর জেলার দক্ষিণ সিকদার মল্লিক গ্রামের বাসিন্দা সংখ্যালঘু যুবক দেবাশীষ মাঝির। সে গত ৪ জুন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পর থেকে ঘরছাড়া। তার প্রশ্ন যা অসংখ্য সংখ্যালঘুদের মনে আজ বেজে চলেছে- ‘মা বলছে দেশ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচে থাক। আসলেই কি আমরা এই দেশে থাকতে পারব না?’

এ দেশে জন্ম, এ দেশের মাটি-জল-বায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষগুলোর তবে পরিচয় কি? কেমন করে তারা এ দেশে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার হারালো? কেন কেড়ে নেয়া হলো মানবিক অধিকার? এই প্রশ্ন আপনাদের কাছে রেখে গেলাম।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71