শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা
প্রকাশ: ০১:৫১ pm ২০-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:৫১ pm ২০-১২-২০১৬
 
 
 


সবচয়ে বড় ও ভয়াবহতম প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিকম্পের অবস্থান একেবারে প্রথম সারিতে। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে এমন দশটি প্রাকৃতিক দূর্যোগের মধ্যে পাঁচটিই ভূমিকম্প।

এই পাঁচ ভূমিকম্প-ই কেড়ে নিয়েছিল ২১ লাখের বেশি মানুষের জীবন। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে ভয়াবহ দুটিই ঘটেছিল চীনে। শুধু এই দুটোতেই মারা পড়েন প্রায় ১৩ লাখ মানুষ।

তবে মানুষের হতাহতের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় দূর্যোগ হল প্লাবন। ভয়াবহ দশ দূর্যোগের প্রথম দুটিই কিন্তু প্লাবন। শুধু এ দুটোতেই ২০ লাখের ওপর মানুষ মারা যান। আরও লক্ষ্যণীয় তথ্য হল, এ দুটো সহ সবচেয়ে ভয়বহ চারটি (অপর দুটি হল আগে উল্লেখিত দুটি ভূমিকম্প) দূর্যোগই ঘটেছিল চীনে। আরেকটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ হল সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়।

১৯৭০ সালে বাংলাদেশেরই ভোলায় ঘটে যাওয়া সাইক্লোন ইতিহাসের ভয়াবহতম দূর্যোগের মধ্যে পাঁচে স্থান করে নিয়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রায় ৪ লাখ জনসম্পদ হারায়। তবে আপাতত জেনে নেওয়া যাক সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প সম্পর্কে।

১৫৫৬ সাল। চীনের শানসি প্রদেশের অধিবাসীরা একটি সুন্দর সকাল উপভোগ করছিলেন। কে জানতো, ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক ভূমকম্পের মুখোমুখি হতে হবে তাদেরকেই। ঐ বছরের জানুয়ারির ২৩ তারিখে আঘাত হানে ভূমিকম্পটি। প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা পড়েন এই এই ভয়াবহ দূর্যোগে। শানসি, হেনান, গাংসু, হুনানসহ বিভিন্ন প্রদেশে সব মিলিয়ে ৯৭টিরও বেশি জেলা আক্রান্ত হয় এতে। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ৫২০ মাইল ব্যাপী দীর্ঘ এলাকা। কোনো কোনো জেলায় ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষ মারা যান। বেইজিং, চেংদু ও সাংহাই শহরের কিছু ভবনও ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

 

চিত্রঃ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। সূত্রঃ উইকিপিডিয়া।

চিত্রঃ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল। সূত্রঃ উইকিপিডিয়া।

ভূমিকম্পের কেন্দ্র (epicenter) ছিল ওয়েই নদীর উপত্যকায়। জায়গাটি শানসি প্রদেশের হুয়াজু, ওয়েনান ও হুয়াইন শহর থেকে খুব নিকটে অবস্থিত। হুয়াজু শহরের প্রতিটি বাড়ি ও ভবন ধসে পড়ে। মারা পড়েন অর্ধেকের বেশি অধিবাসী। মৃত্যুর পরিমাণ লাখের কাছাকাছি। ওয়েনান ও হুয়াইন শহরের চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম। কোনো কোনো এলাকায় ২০ মিটার (৬৬ ফুট) গভীর ফাটল তৈরি হয়। পাশাপাশি ঘটতে থাকে ভূমিধ্বস। এটাও ছিল বেশি মৃত্যুর আরেক কারণ। এলাকাটি সেই সময় অবস্থিত ছিল মিং রাজ বংশের অধীন জিয়াজিং সাম্রাজ্যে। এ কারণে চীনের ইতিহাসে অনেক সময় একে জিয়াজিয়াং গ্রেট আর্থকোয়েক বলেও আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও আক্রান্ত এলাক্র মানচিত্র। সূত্রঃ উইকিপিডিয়া থেকে অনুবাদ।

চিত্রঃ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও আক্রান্ত এলাক্র মানচিত্র। সূত্রঃ উইকিপিডিয়া থেকে অনুবাদ।

ভূমিকম্পটির মাত্রা সে সময় জানা না গেলেও আধুনিক কালে এসে সেটা বের করা হয়েছে। মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল অনুসারে এর মানছিল প্রায় ৮ বা তার একটু বেশি। ১৯৭০ সালে থেকে ব্যবহৃত মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল হল রিখটার স্কেলে আধুনিক সংস্করণ। ইতিহাসে এই মাত্রার চেয়েও বড় ভুমিকম্পও হয়েছে। তবে সেগুলোতে এত বেশি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি কিন্তু হয়নি। এই ভূমকম্পটির আফটার শক চলতে থাকে ছয় মাস ধরে। প্রতি মাসেই কয়েকবার করে দেখা যেত তার লক্ষণ ।

ভূমিকম্পের ফলে পাল্টে যায় পাহাড় ও নদীর মানচিত্র। নষ্ট হয়ে যায় রাস্তাঘাট। কোনো কোনো জায়গায় ভূমি উঁচু হয়ে গিয়ে পাহাড়ের মতো হয়ে যায়। কোথাও আবার নিচু হয়ে তৈরি হয় উপত্যকা। কোনো এলাকায় হঠাৎ করে নদীর উত্থান ঘটে। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয় গিরি খাত। ঘর-বাড়ি, উপাসনালয়, অফিস-আদালত ও শহরের দেয়াল-সবকিছু হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ে। ভূমিকম্পের সময়ে ভূমির ফাটলের শব্দ শুনে মনে হচ্ছিল মেঘের সংঘর্ষে আকাশে তুমুল বজ্রপাত হচ্ছে। পাল্টে গিয়েছিল রাস্তা-ঘাটের গতিপথ। গাছপালা উপুড় হয়ে পড়ে। পাহাড়ের ভিত্তিমূল কেঁপে কেঁপে ওঠেছিল এ সময়।

চিত্রঃ ইয়েলো নদীর ক্ষতিগ্রস্থ পাথরের বাঁধ।

চিত্রঃ ইয়েলো নদীর ক্ষতিগ্রস্থ পাথরের বাঁধ।

বহু দিন দিন আবার জ্বলছিল আগুন। বেঁচে যাওয়া মানুষকে বাস করতে হত খোলা আকাশের নিচে। ওদিকে আবার শুরু হয়েছিল বন্যাও। মানুষের অসহায় অবস্থার সুযোগ নেয় চোর-ডাকাতরাও। সমানে চলতে থাকে লুট-তরাজ। ফলে ভূমিকম্পের পাশাপাশি বহু মানুষ মারা পড়েছিল বন্যা, আগুন ও ডাকাতির কবলে পড়ে।

এই ভূমিকম্পের চীনের বিখ্যাত জাদুঘর স্টিলি ফরেস্ট ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। স্টিলি হল পাথর বা কাঠের বিশেষ ধরনের খণ্ড। প্রাচীন কালে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে ব্যাপকভাবে এগুলোর ব্যবহার ছিল। অবশ্য বর্তমানে জাদুঘরটি আবার সমৃদ্ধ হয়েছে। ১৯৩৬ সালে ক্যালিগ্রাফার ইউ ইউরেন তাঁর সংগ্রহে থাকা সমস্ত স্টিলি দান করে দিয়ে পুনরায় জাদুঘরটিকে চাঙা করেন। বর্তমানে এতে তিন হাজার স্টিলি রক্ষিত আছে, যা সাতটি আলাদা হলে রাখা আছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা হয়-ভূমিকম্পের সরাসরি আঘাতের চেয়ে বাসা-বাড়ি থেকে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়েই বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এই ভূমিকম্পটির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিখ্যাত গবেষক কিন কেদা সমসাময়িক যুগের মানুষ ছিলেন। ভূমিকম্পের পরে তিনি এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে বিস্তারিত ধারণা লাভ করার চেষ্টা করে এটি উপলদ্ধি করেন। এক্ষেত্রে তাই তাঁর স্বাভাবিক পরামর্শ হল, ‘ঘরের মধ্যেই চুপটি করে বসে পড়ুন আর অপেক্ষা করুন। নীড় যদি ভেঙেও যায়, কিছু ডিম তো অবশ্যই অক্ষত থাকবে।‘

সে সময় লোয়েস সমভূমির (অপর নাম হুয়াংতু সমভূমি) কাছে পাহাড়ের গুহায় বাস করতেন লাখ লাখ মানুষ। গুহা ছিল পলি মাটি দ্বারা তৈরি। শানসি, শাংসি ও গাংসু-প্রত্যেক প্রদেশেই এই সমভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল। এই ভূমিকম্পটিতে এত বেশি পরিমাণ মানুষ মারা যাবার বড় একটি কারণ হল এই গুহা এলাকায় সৃষ্ট ভূমি ধস। ভূমিকম্পে গুহাগুলো একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়।

এই ভূমিকম্পে কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব বর্তমানে বের করা কষ্টসাধ্য। তবে মানুষ মারা যান ৮ লাখ ২০ হাজার থেকে ৮ লাখ ৩০ হাজারের মতো। চীনের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। আনুমানিক ৬০% মানুষ মারা যান ঐ অঞ্চলের।

অনেক সময় প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঘটনার সাথে ধূমকেতু দেখার সম্পর্ক কল্পনা করা হয়। এই সম্পর্কের অবশ্যই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে সে বছরও একটি ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল বটে। এর নামও সালের নামেই-দা গ্রেট কমেট অব ফিফটিন ফিফটি সিক্স। আকারে চাঁদের প্রায় অর্ধেক এই ধূমকেতুটি পৃথিবীর আকাশে প্রথম দেখা যায় ফেব্রুয়ারি মাসে। অবশ্য ভূমিকম্প ঘটেছিল জানুয়ারি মাসে।

ইতিহাসের ২য় ভয়াবহতম ভূমিকম্পটিও ঘটেছিল চীনেই। এটি ঘটে ১৯৭৬ সালে। চীনের তাংশান প্রদেশে ঘটা এই ভূমিকম্পে হতাহতের পরিমাণ ছিল আগেরটির প্রায় অর্ধেক। তবুও এটি ছিল বিংশ শতকের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প। এ থেকেই অনুমান করা যায়, প্রথমটি কতটা ভয়াবহ ছিল।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71