রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৮ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ইতিহাস বিকৃতি, আদর্শ বিচ্যুতি ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে বাংলাদেশ!
প্রকাশ: ০২:৪৫ pm ০৭-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০২:৪৫ pm ০৭-০৬-২০১৭
 
 
 


ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী ||

চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সুলতানা কামালকে গ্রেপ্তার করার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এছাড়া তাঁকে দেশ ছাড়া করতে, রাস্তাঘাটে হেনস্থা করতে এবং ফাঁসির দাবি জানিয়ে গলা ফাটাচ্ছে তারা। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে সুলতানা কামালের করা একটি মন্তব্যকে বিকৃত করে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

সুলতানা কামালের পরিচয় নতুন করে দেবার প্রয়োজন নেই। কবি সুফিয়া কামালের এই কন্যা তাঁর কাজের মধ্য দিয়েই আপন আলোয় উদ্ভাসিত। তবুও দুর্ভাগা এক জাতি আমরা। তাই সেদিনের অনুষ্ঠান এবং আলোচনা না দেখে শুনে যারা   “কান নিয়েছে চিলে ”  বলে সুলতানা কামালের বিচারের দাবিতে অশ্লীলতা আর সহিংসতায় মেতে উঠেছে তাদের মুুুুখে ছাই দিতে এই দুর্ভাগা জাতিকে সুলতানা কামালের পরিবার, পরিচয় ও কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে সামান্য কিছু তথ্য মনে করিয়ে দিতে চাই।

প্রথিতযশা কবি সুফিয়া কামাল। সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম।

১৯২৫ সালে বরিশালে প্রকাশ্য জনসভায় গান্ধীজীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন নিজ হাতে চরকায় কাটা সুতা। নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার “আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম” এর সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯২৯ সালে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমন্ত্রণে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। ১৯৪০ – এ বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী কর্মকাণ্ডের সুবাদে বঙ্গবন্ধুর সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৪৬ সালে। ১৯৪৭ – এ দেশ বিভাগের পূর্বে বাংলা ভাষায় মুসলমানদের প্রথম নারী সচিত্র সাপ্তাহিক ” বেগম ” পত্রিকার প্রথম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।

দেশ বিভাগের পর  ভাষা আন্দোলনের সময় নারীদের সংগঠিত করে মিছিলের আয়োজন করেন, মিছিলে নেতৃত্ব দেন।  ছিলেন ” পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি ” এর সভানেত্রী, ছায়ানটের সভানেত্রী। তাঁর বাসভবনের আঙিনাতে আয়োজিত সভায় প্রতিষ্ঠা হয় জাতীয় শিশু সংগঠন কচি – কাঁচার মেলা’র।

মুক্তিযুদ্ধ, নারী আন্দোলন, সমাজকর্ম,  বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আন্দোলন সর্বোপরি কাংখিত এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য বহু আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন, লড়ে গেছেন আমৃত্যু। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে গণ আদালতে তাঁকে আমরা পেয়েছি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সাথে একই মঞ্চে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। একই মঞ্চে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, কবি সুফিয়া কামাল এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক সেই মুহূর্ত প্রজন্মকে এক গর্বিত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে সাহস জুগিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে কবি সুফিয়া কামালের কর্মশক্তি, সংগ্রাম, অর্জন ও অবদানের ব্যপ্তি অল্প কথায় বর্ণনা করা দুঃসাধ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশবরেণ্য কবি সুফিয়া কামালের দুই কিশোরী কন্যা লুলু (সুলতানা কামাল) এবং টুলু (সাঈদা কামাল) আগরতলা  হাসপাতালে সেবিকার দায়িত্ব পালন ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি লেখা গ্রন্থ  ” একাত্তরের দিনগুলি ” যারা পড়েছেন, তাদের জেনে থাকবেন এ সম্বন্ধে। কবি সুফিয়া কামালের নিজের লেখা  “একাত্তরের ডায়েরী ” – তেও  এ তথ্য পাওয়া যাবে।

সুবিশাল কর্মযজ্ঞ ছাপিয়ে কবি সুফিয়া কামাল একজন রত্নগর্ভা মা। তাঁর সন্তানেরা প্রত্যেকেই মায়ের এবং দেশের সুযোগ্য সন্তান। সুলতানা কামাল তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।

ধর্ম নিরেপেক্ষ পরিবারের সদস্য হিসেবে সুলতানা কামাল আজ অবধি কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো কটুক্তি করেছেন বলে আমার জানা নেই। 

মায়ের আদর্শের অমূল্য রত্নখচিত মুকুট এই অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্বের ললাটে যেন আলো ছড়িয়ে চলেছে অবিরাম। 

মুক্তিযোদ্ধা, তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, বিশিষ্ট আইনজীবী, একজন মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মী হিসেবে সুলতানা কামাল সততা ও সাহসের সাথে কাজ করে চলেছেন দেশের কল্যাণে। নারী নির্যাতন, সাঁওতালদের উচ্ছেদ, সুন্দরবন রক্ষা , দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা দেখেছি তাঁর নির্ভীক ও নিরপেক্ষ অবস্থান। 

হাওড়ের দুর্গত মানুষের পাশে যেমন থেকেছেন, তেমনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন বরাবর। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে সুলতানা কামাল সম্প্রতি , ধর্মের অপব্যাখ্যাকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক দল, হেফাজতে ইসলামীর দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ” জাস্টিসিয়া ” ভাস্কর্যটি অপসারণের বিপক্ষে তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে অংশ নেন সুলতানা কামাল। এই টকশো’র উপস্থাপক ছিলেন রোবায়েত ফেরদৌস। অনুষ্ঠানে সুলতানা কামাল ছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অপু উকিল, গণজাগারণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার ও হেফাজত প্রতিনিধি মুফতি সাখাওয়াত হোসেন।

টকশোর আলোচনার প্রসঙ্গে সুলতানা কামালের যে বক্তব্য অনলাইন পত্রিকাগুলোতে পাওয়া গেছে তাতে তিনি  বলেছেন , ‘‘সে দিনের টকশোতে হেফাজতের একজন ছিলেন। সেখানে প্রশ্ন উঠেছিল, সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় ভাস্কর্য থাকলে আপত্তিটা কিসের? তিনি (হেফাজতের প্রতিনিধি) বলেছিলেন, ‘এটা মূর্তি, ধর্মীয় স্থাপনা। কোর্ট এলাকায় কেন ধর্মীয় স্থাপনা থাকবে?’ এটি ছিল তার কথা। তখন তার জবাবে বলেছি, ‘আমিও আপনার কথায় একমত। আমিও মনে করি, কোর্ট এলাকায় কোনও ধর্মীয় স্থাপনা থাকা উচিত না। মূর্তি যেমন ধর্মীয় স্থাপনা, তেমনি মসজিদও। আপনার কথা অনুযায়ী সেখানে মসজিদও তো থাকা উচিত না। এটা আমি বলে ফেলেছি ঠিকই। কিন্তু তার এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই। কথাটা এভাবেই হয়েছে।’’

হেফাজতে ইসলাম নামের এই সংগঠনটি এযাবৎকালে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কী অবদান আছে আমার জানা নেই। ২০১৩ সালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হয়ে বিতর্কিত অবস্থান নেয়ার মধ্যে দিয়ে তারা আলোচনায় আসে। এদের শীর্ষনেতা আল্লামা শফী নারীদেরকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করার মতো অশালীন মন্তব্য করে ধিক্কৃত হয়েছে এদেশে। কোন দুঃসাহসে আস্তিক – নাস্তিক বিচারের ক্ষমতা অলিখিতভাবে এরা নিজেদের করে নিয়েছে ! প্রতিনিয়ত ধর্মের নামে অধর্মের বিষ ঢালছে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জীবনধারায়। 

রাজনীতির অংগনে একজন দূরদর্শী বিশ্বনেতা দেশনেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতোনা এদেশে কোনোকালে।  রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে হলেও বংগবন্ধু কন্যাকে এদেশের মানুষ হেফাজতে ইসলামের অন্যায় দাবিকে প্রশ্রয় দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বা তেঁতুল হুজুরের সাথে সভা করতে দেখতে চায়না। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ কোনো ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ধর্মের অপব্যাখ্যা আর মিথ্যে দোহাই দিয়ে  বাংলাদেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতেই হবে। 

সিদ্ধান্ত নেবার সময় এসেছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশে বাস করার অধিকার কাদের? ফতোয়াবাজ, ক্ষণে ক্ষণে হত্যার হুমকিদাতা, দেশের মাটিতে খেয়ে-পরে দেশের মানুষের শিক্ষা – সংস্কৃতিকে ধ্বংসের চক্রান্তকারী, হিংস্র সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ? নাকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন বোনা, দেশ মাতৃকার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ মেধাবী মানুষগুলোর? 

আজকে সুলতানা কামালের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ আমরা বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান করছি।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71