বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
এই কালে পুরোনো কালের কথা
প্রকাশ: ১০:৫৯ am ২২-০৩-২০১৫ হালনাগাদ: ১০:৫৯ am ২২-০৩-২০১৫
 
 
 


   
শিল্পীর তুলিতে নবাব সিরাজদৌল্লাসিয়র-উল-মুতাক্ষারীণ ও সিরাজদৌল্লা শিরোনামের বইটি পরিকল্পনা, গ্রন্থনা ও প্রকাশনার দিক দিয়ে বেশ ভিন্নধর্মী। এর সম্পাদক ড. আনন্দ ভট্টাচার্য আঠারো শতকের বাংলার ইতিহাস বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ গবেষক। এ বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন গবেষণাকর্ম আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই বইয়ে আঠারো শতকের বাংলার ইতিহাস রচনায় পূর্বসূরিদের প্রচেষ্টা তুলে ধরার জন্য আলোকপাত করতে চেয়েছেন তিনি। পরিকল্পনাটি বিন্যস্ত করেছেন দুই ভাগে। প্রথম ভাগের বিষয় বাছাই ও বিন্যাস করা হয়েছে ধ্রুপদি গ্রন্থ সীয়র-উল-মুতাক্ষারীণ-এর বিভিন্ন দিক নিয়ে। এ বিষয়ে অনেক পূর্বসূরি পণ্ডিতের গবেষণা থেকে বাছাই করা আটটি লেখা পুনঃ প্রকাশ করা হয়েছে বর্তমান বইয়ে। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে কেবল সিরাজদৌল্লাকে কেন্দ্র করে দুটি লেখা। এর একটি প্রবন্ধ সম্পাদকের নিজের মৌলিক গবেষণার ফসল। শিরোনাম ‘সিরাজদ্দৌল্লা-১৭৫৭ ও পলাশী: কিছু প্রশ্ন ও অনুসন্ধান’। অপরটি নিখিলনাথ রায়ের ‘সিরাজের ইংরেজ-বিদ্বেষ’।
সম্মিলিতভাবে বইয়ের উভয় অংশের লেখক ১৩ জন পণ্ডিত। এঁদের মধ্যে অধিকাংশই আঠারো ও উনিশ শতকের লেখক। যেমন হাজি মুস্তাফা, মীর গোলাম হোসেন খাঁ, যদুনাথ সরকার, যোগীন্দ্রনাথ সমাদ্দার, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, নিখিলনাথ রায়, গৌরমোহন মৈত্রেয় ও সতীশ চন্দ্র মিত্র। তাঁরা লিখেছেন আঠারো শতকের বাংলার আর্থসামাজিক ও রাজনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে। 
সম্পাদক আনন্দ ভট্টাচার্য চেষ্টা করেছেন পাঠকের সুবিধার্থে এসব পুরোনো লেখা বাছাই করে যতটুকু সম্ভব একত্র করে এগুলো প্রকাশ করতে। তাঁর উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় এ জন্য যে লেখাগুলো এখন খুবই দুষ্প্রাপ্য। অধিকন্তু বাছাই করা কিছু প্রবন্ধ এক জায়গায় পরিবেশনের ফলে সাধারণ পাঠক অতীতের অনেক দুর্লভ লেখা হাতে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সন্দেহ নেই, সম্পাদকের উদ্দেশ্য সফল। আমরা মনে করি, এসব পুরোনো লেখা ইতিহাস গবেষণায় এখন নতুনভাবে এবং নতুন পদ্ধতিতে ফিরে দেখার সময় এসেছে।
আগেই বলেছি, বইয়ের প্রথম ভাগে রয়েছে ধ্রুপদি গ্রন্থ সীয়র-উল-মুতাক্ষারীণ ও দ্বিতীয় ভাগে স্থান পেয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ। প্রথম ভাগের আলোচনা শুরু হয়েছে একটি মূল্যবান ভূমিকা দিয়ে, কিন্তু দ্বিতীয় ভাগের জন্য এমন কোনো ভূমিকা দেওয়া হয়নি, দিলে অবশ্যই ভালো হতো, অসংগতিও দূর হতো। 
আসলে বইটির মূল পরিকল্পনায় তিনটি ভাগ করে প্রথম ভাগে একটি সার্বিক ভূমিকা উপস্থাপন করা যেত। সংকলিত গ্রন্থের এটাই সাধারণ রীতি। যা হোক, এই ভূমিকায় কালাণুক্রমিকভাবে চিহ্নিত হতে পারত সমকালীন ও পুরোনো লেখকদের অবদান বর্ণনা। 
প্রথম ভাগে রয়েছে বিখ্যাত পুরোনো লেখকদের নামীদামি লেখা। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অক্ষয়কুমার মৈত্র, সতীশ চন্দ্র মিত্র, যদুনাথ সরকার, গৌরমোহন মৈত্রেয়। আধুনিক বাংলা গদ্যরীতির বিকাশে তাঁদের পণ্ডিতি দাপট অনুভব করা যায় বিশ শতকের প্রথম সিকি পর্যন্ত। ঐতিহাসিক জ্ঞানলাভ ছাড়াও শতবর্ষের ব্যবধানে বাংলা ভাষার লৈখিক কাঠামো, শব্দসম্ভার ও বিন্যাসধারায় যে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা যাচাই করার শ্রেষ্ঠ মাপকাঠি এসব গুরুত্বপূর্ণ লেখা। বইয়ের ভূমিকাটি অনবদ্য এবং এটি সমকালীন পণ্ডিতি পরিবেশে আরও পাণ্ডিত্য যোগ করেছে বৈকি। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় আঠারো শতকের ইতিহাস বিষয়ে প্রবন্ধসমূহ একে অধিকতর বর্ণাঢ্য করে তুলেছে।
দ্বিতীয় ভাগে সংকলক কর্তৃক আলোচিত ‘সিরাজদৌল্লা-১৭৫৭ ও পলাশী: কিছু প্রশ্ন ও অনুসন্ধান’ অনেক তথ্যপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য। সমগ্র বইয়ের এটিই একমাত্র নতুন লেখা। আনন্দ ভট্টাচার্যের এ লেখাটি যত প্রশ্ন নিরসন করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ও জটিল প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। যেমন, সিংহাসনে আরোহণকালে সিরাজের কোষাগারে নাকি বিপুল পরিমাণ টাকা থই থই করছিল। অর্থাৎ রাজকোষে যে পরিমাণ অর্থ স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার কথা, এর চেয়ে বিদ্যমান মজুতের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এটি একটি প্রমাণবিহীন শৌখিন আন্দাজ মাত্র। এ আন্দাজের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আপন স্বার্থোদ্ধারের জন্য যুদ্ধকালে গুজব রটনা একটি বিশ্বজনীন প্রবণতা। পলাশীর পর খোদ নবাবসহ সাধারণ বণিক শ্রেণির অনেকেই ইংরেজদের লুটপাটের শিকার হন। অনেকে আবার লুটপাট কর্মকাণ্ডে সহায়তাও করেন। ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠীগুলো ছিল সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র। নানা কারণে এরা ছিল নবাবের প্রতি অসন্তুষ্ট। অসন্তুষ্টির প্রধান কারণ ছিল বিদেশি বণিকদের কাছ থেকে সরকার কর্তৃক অযৌক্তিকভাবে টোল আদায় করা। এসব বণিকগোষ্ঠী ছিল টোলমুক্ত বাণিজ্যের পক্ষপাতি, কিন্তু নবাব ছিলেন বৈদেশিক বাণিজ্য বাবদ টোল আদায় করার পক্ষে। সমকালীন ইউরোপে সরকার কর্তৃক এহেন টোল আদায় ছিল এক সাধারণ রীতি। বস্তুত, উভয় পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বের প্রধান কারণ ছিল টোল–প্রশ্ন। এ টোল ইস্যু নিয়ে লেখকের বিশেষ আলোচনা খুবই প্রাসঙ্গিক ও মূল্যবান। 
বইয়ের শেষ অধ্যায়ে নিখিলনাথ রায় লিখিত ‘সিরাজের ইংরেজ-বিদ্বেষ’ লেখাটি আকারে ছোট কিন্তু খুবই তথ্যপূর্ণ, প্রাসঙ্গিক ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ঐতিহাসিক চিত্র পত্রিকার পঞ্চম সংখ্যায় (ভাদ্র, ১৩১৬)। শতবর্ষ আগে একটি যুগসন্ধিক্ষণে লিখিত প্রবন্ধটি অসাম্প্রদায়িক এবং বঙ্গীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরিপুষ্ট। লেখাটি বাংলায় জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার উদ্ভব ও হিন্দু-মুসলিম ঐক্য বিষয়ে চেতনা উন্মেষকালের প্রতিনিধিত্ব করে। 
বইয়ে সন্নিবেশিত বাঙালি পুরোনো লেখকদের লেখাগুলো উনিশ শতকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবাদী চিন্তাধারার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু আক্ষেপের কারণ হলেও সত্য যে উনিশ শতকের বাঙালি চিন্তাবিদদের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে একক বাঙালি সত্তাকে পেছনে ফেলে দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। এটি একটি দুঃখজনক অবক্ষয়।
কলকাতার কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত এ বইটি আকারে ছোট হলেও সমকালীন হিন্দু-মুসলিম সহযোগী ও সমমর্মী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস মনে করি। এ প্রয়াসে ফুটে উঠেছে বাঙালি লেখকদের উনিশ শতকের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারা ও জাতীয়তাবাদী মনোভাব। এ চেতনা পোষণের শক্ত ভিত্তি রয়েছে। এই ভিত্তির পরিচয় মেলে বইয়ের বিভিন্ন প্রবন্ধে। আশা করি এটি সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71