মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
সাদাসিধে কথা
এই লেখাটি অভিভাবকদের জন্য
প্রকাশ: ১০:৫৬ am ২০-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৫৬ am ২০-০৫-২০১৭
 
 
 


আমি আজকের লেখাটি একটি চিঠি দিয়ে শুরু করতে চাই। আমি চিঠিটি পেয়েছি দিন দশেক আগে। চিঠিটি পড়ার পর কী করব বুঝতে না পেরে ব্যাগে ঢুকিয়ে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি।

মনের ভেতর এক ধরনের চাপা অশান্তি। আমি চিঠিটি হুবহু তুলে দিচ্ছি, কে চিঠিটি লিখেছে সেটা যেন বোঝা না যায় তাই দু-একটা শব্দ পাল্টে দিয়েছি। চিঠিটি এ রকম :

‘প্রিয় লেখক,

জানেন আমি কতটা কষ্টের মধ্যে আছি? একটা রাতও আমি ভালোভাবে ঘুমাতে পারছি না। এখন বাজে রাত ২.৩৭। কিন্তু আমার চোখে বিন্দুমাত্র ঘুম নেই। আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী, বয়স ১৬ বছর। আগামী ৪ মে আমাদের রেজাল্ট দিবে। আমি জানি যদি আমি এ প্লাস না পাই তাহলে আমার বেঁচে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ জন্যই আমি আগে থেকে ঘুমের তেরোটা ট্যাবলেট জোগাড় করে ফেলেছি। আমি একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারের মেয়ে, কিন্তু জানেন তারা কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করেনি, তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও? তাদের ইচ্ছায় আমি ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু জানেন আমার সেটাতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই। আবার মেডিক্যালে ভর্তি হতে হলে নাইন পয়েন্ট দরকার। তাই আমি যদি এ প্লাস না পাই এসএসসিতে, তাহলে আমার আব্বু বলেছেন সব কিছু আমার শেষ হয়ে যাবে। কারণ ইন্টারমিডিয়েট নাকি অনেক কঠিন।

২০১১ সালে আমি সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছিলাম, কিন্তু এ প্লাস পাইনি। আমার আম্মু চিৎকার করে মরা কান্নার মতো করে কেঁদেছেন। আমি কিন্তু তখনো বুঝতাম না এ প্লাস কী? এ প্লাস না পাওয়াতে আমার পৃথিবী অন্য রকম হয়ে গেল। সেই ছোট্ট বয়সেই আমি সবার অবহেলার পাত্র হলাম। ফ্যামিলির কেউ আমাকে মূল্যায়ন করত না। জানেন সেই ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ প্রায় প্রতিদিন আমি দরজা লাগিয়ে কেঁদেছি। আমার আব্বু প্রকাশ্যে সব মানুষের কাছে বলতেন, আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।

কিন্তু আমি আসলে সে রকম না। খেলাধুলা, নাচ, গান, অভিনয়, বক্তৃতা, আবৃত্তি সব পারি। আমি গান প্রতিযোগিতায় বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তাঁরা কখনো আমার সুনাম করেন না। সব সময় বলেন, আমি নাকি কিছুই পারি না। সব সময় অন্যসব বান্ধবীর সঙ্গে আমাকে তুলনা করেন। আমি ২০১৪ সালে এ প্লাস পাই। জেএসসিতে কিন্তু আমাকে কিছুই দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমার ছোট ভাই ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে স্মার্টফোন কিনে দেওয়া হয়েছে।

আপনি কি জানেন এখন আমার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে? ২০১৪ সালের রেজাল্ট ভালো করার পর সবাই এখন ভালোভাবে দেখে, কিন্তু আমি জানি যদি আমি এ প্লাস না পাই এসএসসিতে, তাহলে আমার আবার আগের মতো দশা হবে।

আপনি কি বুঝতে পারছেন না, আমি কতটা কষ্টের মধ্যে আছি? আমি আমার স্বপ্নের কথা যতবার আব্বু আর আম্মুর কাছে বলেছি ততবার তাঁরা বলেছেন ওটা আমাকে দিয়ে হবে না, কারণ আমি গাধা।

আচ্ছা, শুধু পড়াশোনা নামক জিনিসটার জন্য ১৬ বছরের একটা কিশোরী কেন এতটা কষ্ট পাচ্ছে আপনি কি বলতে পারবেন?’

না, আমি বলত পারব না। শুধু আমি নই, আমার ধারণা ১৬ বছরের এই মেয়ের প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারবে না। এই চিঠি লেখার পর এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হয়েছে, আমি জানি না পরীক্ষায় মেয়েটি এ প্লাস পেয়েছে কি না। নাকি মেয়েটিকে তার জোগাড় করে রাখা ১৩টি ঘুমের ট্যাবলেটের কাছে আশ্রয় নিতে হয়েছে, আমি সেটাও জানি না।

হতে পারে মেয়েটি অনেক বেশি আবেগপ্রবণ, যেটি লিখেছে সেটি এই বয়সী ছেলে-মেয়ের তীব্র আবেগের এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু মুশকিল হলো, এটি কিন্তু আমার কাছে লেখা একমাত্র চিঠি না। আমি হুবহু এ ধরনের অসংখ্য চিঠি, ই-মেইল, এসএমএস পেয়েছি, যার বক্তব্য ঠিক এ রকম। আমার কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই; কিন্তু আমি জানি আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের অভিভাবক প্রজাতির জন্ম হয়েছে, লেখাপড়া নিয়ে তাঁদের সম্পূর্ণ ভুল এক ধরনের চিন্তাভাবনা এ দেশের ছেলে-মেয়ের শৈশবকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। একজন মানুষের কৈশোরটি হচ্ছে স্বপ্ন দেখার বয়স। এ বয়সে যদি একজনকে ঘুমের ট্যাবলেট মজুদ করতে হয়, তাহলে তার জীবনকে আমরা কী নিয়ে স্বপ্ন দেখাতে শেখাব?

সব অভিভাবক নিশ্চয়ই এ রকম নন, যাঁদের ওপর ভরসা করতে পারি সে রকম অভিভাবক নিশ্চয়ই আছেন। একটি ছেলে বা মেয়ের পরীক্ষা খারাপ হলে সান্ত্বনা দেন, তাদের দুঃখ-হতাশা বা স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণাটা ভাগাভাগি করে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করেন—এ রকম অভিভাবকও নিশ্চয়ই খুঁজে পাওয়া যাবে। ছেলে-মেয়েদের ভালো মানুষ হতে শেখানো, শত প্রলোভনেও সৎ মানুষ হয়ে থাকার কথা বলা মা-বাবাও নিশ্চয়ই আমাদের ভবিষ্যতের মানুষ গড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এ কথাটি এখন নিশ্চয়ই কেউ আর অস্বীকার করবে না আমাদের ভেতরে অভিভাবকের নতুন একটি প্রজন্মের জন্ম হয়েছে, তাঁরা শুধু যে তাঁদের ছেলে-মেয়েদের পীড়ন করে তাদের শৈশবকে বিষাক্ত করে দিচ্ছেন তা নয়, তাদের হাতে ধরে অন্যায় করতে শেখাচ্ছেন। পরীক্ষার হলে গেলেই সেগুলো দেখা যায়। একটা সময় ছিল যখন পরীক্ষা শুরুর আগের মুহূর্তে ছেলে-মেয়েরা শেষবারের মতো বই আর ক্লাস নোটের ওপর চোখ বোলাত, এখন শেষ মুহূর্তে তারা তাদের স্মার্টফোনের ওপর চোখ বোলায়। তাদের মা-বাবা পাশে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের উৎসাহ দেন। পরীক্ষা শুরুর আগে নিশ্চিতভাবে বহু নির্বাচনী প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়, তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ে। ছেলে-মেয়েরা যেটুকু আগ্রহ নিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করে, মা-বাবার আগ্রহ তার থেকে কম না। আমরা চোখের সামনে একটি নতুন বিষয় দেখছি, মা-বাবারা প্রকাশ্যে সবার চোখের সামনে নিজের ছেলে-মেয়ের হাতে ধরে অন্যায় করতে শেখাচ্ছেন। পত্রপত্রিকায় সেসব ছবি এতবার ছাপা হয়েছে যে এখন মনে হয় এগুলো সবার গা সহা হয়ে গেছে।

আমার পরিচিত একজন পরীক্ষার ফাঁস হওয়া প্রশ্ন মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়া একজনকে জিজ্ঞেস করেছিল, এ রকম একটা অন্যায় কাজ করতে তাদের খারাপ লাগে না? ছেলেটি অবাক হয়ে তাকে পাল্টা প্রশ্ন করল, খারাপ লাগবে কেন? আপনারা পরীক্ষা দেওয়ার সময় ‘সাজেশন’ নিয়ে পরীক্ষা দেননি? যারা ফাঁস করা প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষা দেয় তাদের ভেতর অপরাধবোধ নেই। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রশ্ন ফাঁসের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এগুলোকে ‘সাজেশন’ বলে অনেকবার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন এটাই হয়েছে কাল। একজন যখন অন্যায় করে তখন তার ভেতরে অপরাধবোধ থাকলে আমরা তবু আশা করতে পারি হয়তো কখনো তার ভেতরে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু যদি অপরাধবোধ না থাকে, তাহলে তো আমাদের সামনে তাকানোর কিছু নেই। আর যখন এই অশুভ অন্যায়ে সন্তানদের হাতেখড়ি হয় তাদের মা-বাবার হাত ধরে তখন আমরা কার দিকে মুখ তুলে তাকাব?

একজন মা-বাবা যখন তাঁদের সন্তানকে পৃথিবীতে নিয়ে আসেন তখন তাঁদের সন্তানের জন্য কিছু দায়িত্ব থাকে। সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি হচ্ছে যে এই সন্তানকে একটা আনন্দময় শৈশব দিতে হয়। কিভাবে কিভাবে জানি এ বিষয়টি অনেক মা-বাবাই ভুলে গেছেন। তাঁদের সব হিসাব গোলমাল হয়ে গেছে, তাঁরা কিভাবে কিভাবে জানি মনে করছেন তাঁদের সন্তানদের জন্য একটিমাত্র দায়িত্ব, সেটি হচ্ছে পরীক্ষায় এ প্লাস পাওয়া! সেই এ প্লাসের জন্য তাঁরা শিশুদের পুরো শৈশবকে ধ্বংস করে ফেলতে তাঁদের কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সংকোচ নেই।

একটা সময় ছিল যখন কোনো একজন বাবা কিংবা মা যখন তাঁর সন্তানকে দেখিয়ে আমাকে বলতেন, ‘স্যার, আমার এই ছেলেটি (কিংবা মেয়েটি) গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। ’ আমি তখন আনন্দে আটখানা হয়ে বলতাম, ‘সত্যি? কী চমৎকার! বাহ! ওয়ান্ডারফুল! ফ্যান্টাস্টিক!’ তারপর ছেলেটি বা মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে একেবারে বুকের ভেতর থেকে আশীর্বাদ করে দিতাম।

আজকাল আর সেটি হয় না। আজকাল যখন একজন বাবা কিংবা মা আমাকে তাঁর সন্তানকে দেখিয়ে বলেন, ‘স্যার, আমার ছেলেটি বা মেয়েটি গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। ’ তখন আমি আনন্দে আটখানা হই না, আমি এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে ছেলেটি বা মেয়েটির দিকে তাকাই। আমার চোখের সামনে দিয়ে একের পর আরেক দৃশ্য খেলে যেতে থাকে। আমি জানি এই ছেলে বা মেয়েটির জীবনটি নিশ্চয়ই ভয়ংকর একটি জীবন। এই ছেলেটি বা মেয়েটি শুধু যে স্কুলে গিয়েছে তা নয়, নিশ্চয়ই স্কুলের পর তাকে প্রাইভেট পড়তে হয়েছে, কোচিং সেন্টারে যেতে হয়েছে। এই ছেলে বা মেয়েটির জীবনে নিশ্চয়ই বিনোদনের জন্য একটি মুহূর্তও রাখা হয়নি। তাকে গল্পের বই পড়তে দেওয়া হয়নি, গান শুনতে দেওয়া হয়নি, ছবি আঁকতে দেওয়া হয়নি, তাকে শুধু পড়তে হয়েছে। নিরানন্দ পাঠ্য বই পড়েও শেষ হয়নি, তাকে গাইড বই পড়তে হয়েছে। শেখার জন্য পড়ার এক ধরনের আনন্দ আছে; কিন্তু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রশ্নের উত্তর হিসেবে মুখস্থ করার মধ্যে কোনো আনন্দ নেই। বাংলাদেশের সব সম্ভ্রান্ত পত্রিকা নিয়মিত গাইড বই ছাপায়, মা-বাবারা সেই পত্রিকার পৃষ্ঠা কেটে নিশ্চয়ই গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া এই ছেলেটি বা মেয়েটিকে মুখস্থ করতে দিয়েছেন। এই ছেলেটি বা মেয়েটি সেগুলো মাথা গুঁজে মুখস্থ করেছে।

মা-বাবা নিশ্চয়ই এই ছেলে বা মেয়েটিকে কোনো রকম উৎসাহ দেননি, অনুপ্রেরণা দেননি। নিশ্চয়ই তাকে শুধু চাপের মধ্যে রেখেছেন। প্রতি মুহূর্তে অন্য ছেলে-মেয়ের সঙ্গে তুলনা করে তাকে অপমান করেছেন, অপদস্থ করেছেন, তাকে ভয় দেখিয়েছেন। শুধু মা-বাবা নন, নিশ্চয়ই স্কুলের শিক্ষকরাও তাকে পীড়ন করেছেন, তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ দিয়েছেন। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় পুরো ২৫ মার্ক পাইয়ে দেওয়ার জন্য তার কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন।

গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া এই ছেলে বা মেয়ের কষ্টের জীবন এখানেই শেষ হয়নি, পরীক্ষার আগে আগে তার মা-বাবা নিশ্চয়ই ফেসবুক আতিপাতি করে খুঁজেছেন প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কি না সেটি দেখার জন্য। ফেসবুক নিশ্চয়ই তাদের হতাশ করেনি, ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন নিয়ে তখন তিনি শিক্ষকদের কাছে, ‘মেধাবী’ প্রাইভেট টিউটরদের কাছে ছুটে গেছেন তার সমাধান বের করে দেওয়ার জন্য। সেই সমাধান তুলে দিয়েছেন তাঁদের সেই ছেলে বা মেয়েটির হাতে। তাকে দিয়ে সেটি মুখস্থ করিয়েছেন।

পরীক্ষার দিন তাকে পরীক্ষার হলে নিয়ে গেছেন। সেখানে তাঁরা স্মার্টফোনের দিকে নজর রেখেছেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে যখন এমসিকিউ প্রশ্নগুলো ‘হোয়াটসঅ্যাপ’ বা ভাইবারে চলে এসেছে তখন সেগুলো সমাধান করে সন্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাকে মুখস্থ করিয়েছেন। পরীক্ষা শেষে যখন ছেলে বা মেয়েটি পরীক্ষার হল থেকে বের হয়েছে তখন তাকে ‘পরীক্ষা কেমন হয়েছে’ জিজ্ঞেস না করে ‘কত নম্বর উত্তর দিয়েছিস’ জিজ্ঞেস করেছেন। পুরো উত্তর না দিয়ে থাকলে তাকে নিষ্ঠুর ভাষায় গালাগাল করেছেন, অপমান করেছেন।

পরীক্ষা শেষে ফলাফলের জন্য যখন অপেক্ষা করছে তখন প্রতি মুহূর্তে সন্তানকে গালাগাল করেছেন, গোল্ডেন এ প্লাস না পেলে যে কী সর্বনাশ হয়ে যাবে বারবার সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন।

এরপর পরীক্ষার ফলাফল বের হয়েছে এবং সন্তান গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। কাজেই গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া ছেলেটি বা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। আমি মনে মনে ভাবি, ‘আহা, এই ছেলেটিকে (বা মেয়েটিকে) না জানি কত কষ্ট, কত অপমান, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে!’

শুধু তা-ই নয়, গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া ছেলে বা মেয়েটিকে দেখে আমার অন্য সব ছেলে বা মেয়ের কথা মনে পড়ে যায়, যারা গোল্ডেন ফাইভ পায়নি। তারা না জানি কত যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি ছেলে বা মেয়ের আশাভঙ্গ হয় তখন মা-বাবাকে তাঁদের বুক আগলে সান্ত্বনা দিতে হয়, সাহস দিতে হয়। কিন্তু আমাদের হয় ঠিক তার উল্টোটা, মা-বাবারা ভয়ংকর একটা আক্রোশে তাঁদের ছেলে-মেয়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাই প্রতিবছর যখন একটি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বের হয়, আমি তখন কয়েক দিন নিঃশ্বাস বন্ধ করে থাকি, খবরের কাগজ খুলতে আমার ভয় হয়। কারণ আমি জানি আমি দেখব যে পরীক্ষার ফল ভালো হয়নি বলে এ দেশের ছেলে বা মেয়েরা আত্মহত্যা করেছে। কেন জানি আমার নিজেদের দোষী মনে হয়। আমরা এখনো এ দেশের ছেলে-মেয়েদের বোঝাতে পারিনি, জীবনটা অনেক বিশাল একটা ব্যাপার। তার মাঝে একটা পরীক্ষার ফলাফল অনেক ক্ষুদ্র একটা বিষয়!

আমি এই লেখাটি লিখছি অভিভাবকদের জন্য। আমি তাঁদের বলতে চাই আপনার সন্তানকে একটি আনন্দময় শৈশব উপহার দিন। আপনি আপনার জীবনে যেটি পাননি, সেটি পাওয়ার জন্য আপনার সন্তানকে জোর করবেন না। তাকে তার মতো করে নিজের জীবনের স্বপ্নকে বেছে নিতে দিন। সে হয়তো জীবনের অনেক বাস্তবতা জানে না, তাকে সেই তথ্যটুকু দিতে পারেন; কিন্তু তার স্বপ্নের ওপর আপনার ইচ্ছাটুকু জোর করে চাপিয়ে দেবেন না। পৃথিবীর সব ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষ নন। একটিমাত্র জীবন, সেই জীবনটিতে যদি সুখ আর আনন্দ না থাকে, তাহলে সেই জীবন দিয়ে আমি কী করব?

স্কুল-কলেজের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার বাইরে আনন্দ করার জন্য, উপভোগ করার জন্য অনেক সময় থাকতে হয়। তাদের জন্য সেই সময়টুকু বের করে দিন। মাঠে গিয়ে ছোটাছুটি করতে দিন। গল্পের বই পড়তে দিন, গান গাইতে দিন, নাচতে দিন, অভিনয় করতে দিন। যদি কিছু না করে আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখতে চায় তাকে সেটাই করতে দিন। লেখাপড়ার বাইরে আনন্দ উপভোগ করার জন্য সময় বের করা খুব সহজ। তাকে প্রাইভেট আর কোচিং থেকে মুক্তি দিন। একটা ছেলে বা মেয়ে নিজে নিজে পড়ালেখা করতে পারে, তাকে সেই আত্মবিশ্বাসটি নিয়ে বড় করে তুলুন। আপনাদের মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে এই প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসী ছেলে-মেয়েরা, গোল্ডেন ফাইভ পাওয়া ছেলে-মেয়েরা নয়।

আমি এই লেখাটি শুরু করেছিলাম একটি চিঠি দিয়ে। লেখাটি শেষ করতে চাই একটি চিঠি দিয়ে। একজন আমাকে লিখেছে :

‘দাদু,

আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি। আমি কখনো প্রাইভেট বা কোচিং করিনি; কিন্তু আমি আমার ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল আর আমার স্কুলের হেড গার্লও। সবাই বলে প্রাইভেট না পড়লে নাকি ভালো রেজাল্ট করা যায় না; কিন্তু আমি একা একা পড়ে যখন ভালো রেজাল্ট করি তখন আমার সব বন্ধু একদম অবাক হয়ে যায়, সবাই আমাকে বলে আমি নাকি লুকিয়ে কোচিং করি, কিন্তু তাদের বলি না। আমি তাদের কিভাবে বোঝাব যে নিজে নিজে পড়তে আনন্দটা অনেক বেশি এবং কোনো প্রাইভেটের প্রয়োজন আমাদের নেই। (আমি জানি না তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে কি না। কারণ আমার এ কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না!)’

অবশ্যই আমি এই ছোট মেয়েটির কথা বিশ্বাস করেছি। কারণ আমি নিজেই এ কথা বহুদিন থেকে বলে আসছি। অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, আপনারাও এই মেয়েটির কথা বিশ্বাস করুন। প্রাইভেট, কোচিং থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের আনন্দ করার সময় বের করে চমৎকার একটা শৈশব উপহার দিন।

 

লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

 

এইবেলাডটকম/পিসি 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71