মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
একজন ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে
প্রকাশ: ০৯:০৩ pm ৩১-০৭-২০১৬ হালনাগাদ: ১১:১৩ pm ৩১-০৭-২০১৬
 
 
 


ড. অরুণ কুমার গোস্বামীঃ  এটি কোন ‘অমর কাব্য’ নয়!  যারা সুখে আছে তাদের জন্যই ‘দু:খ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘অমর কাব্য’ লেখার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন ! বলেছেন, “অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু যাহারা আছ সুখে!’’  ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী একটি অংশের স্বেচ্ছাচারী ও নিষ্ঠুর আচরণের নির্মম শিকার, নি:স্ব, অপমানিত ও প্রতি মূহুর্তে নিরাপত্তার ভয়ে শঙ্কিত এক জনগোষ্ঠীর ক্রমহ্রাসমান প্রবণতাকে বেগবান করে একেবারে বিলুপ্ত করে দেয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার স্বরূপ উন্মোচনের ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।   হ্যাঁ, দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর প্রতিনিয়ত যে আক্রমন চলছে তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার আহ্বান সম্বলিত একটি প্রবন্ধের কথা বলছি !  বাংলাদেশ সরকারের আদমশুমারী অনুযায়ী  ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একজন বুদ্ধিজীবী  বদরুদ্দীন ওমর (ডিসেম্বর ২০, ১৯৩১--) কর্তৃক লিখিত “বাংলাদেশে সংখ্যালঘু কারা?” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ এই (জুন, ২০১৬) মাসেই দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি সম্পর্কে বর্তমান লেখাটি।  
 

প্রবন্ধ লেখার প্রধানতম একটা দিক হচ্ছে এতে যেকোন ধারণা বা কনসেপ্ট নিয়েই মূলত ব্যাপৃত হতে হয়। সাধারণত শিরোনামেই প্রবন্ধের মূল ধারণাটি উপস্থিত থাকে, এছাড়াও অন্যান্য কিছু সহযোগী ধারণাও থাকতে পারে। যাহোক, রাজনৈতিক বা যেকোন প্রবন্ধে ধারণা নিয়ে ব্যাপৃত হতে হলে সংশ্লিষ্ট ধারণা বা কনসেপ্টটির যথাযথ প্রয়োগ করা অপরিহার্য, তা না হলে এর অপপ্রয়োগের ফলে ব্যাপক হারে বিঘ্ন সৃষ্টি হতে পারে। এই বিঘ্ন কখনো কখনো লেখকের ‘গুণ’ সম্পর্কিত ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রতি পাঠকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে। মোট কথা একটা ব্যত্যয় ঘটতে পারে। একারণে, “কনসেপ্ট মিসফরমেশন ইন কম্পারেটিভ পলিটিক্স” শীর্ষক একটা প্রবন্ধে ইতালীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী  গিয়োভেন্নি সারতোরি

(মে ১৩, ১৯২৪--) এব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।  সারতোরির এই ধ্রুপদী প্রবন্ধটি ১৯৭০ সালে “দ্য আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স রিভিউতে” প্রকাশিত হয়েছে। এখানে  সারতোরি বলছেন, We lack a disciplined use of terms and procedures of comparision. This discipline can be provided, I suggest, by awareness of the ladder of obstruction, of the logical properties that are implied, and of the rules of composition and decomposition thus resulting. If no such discipline is obtained, conceptual mishandling and, ultimately, concept misinformation is inevitable.”   অর্থাৎ তুলনার জন্য পদবাচ্য এবং প্রক্রিয়ার একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবহারের অভাব আমাদের আছে। এই শৃঙ্খলা, আমি সুপারিশ করছি, বাধার সিড়ি সম্পর্কে সতর্কতা দ্বারা, প্রচ্ছন্নভাবে উপস্থিত যুক্তিগত সম্পদরাজি সম্পর্কে, এবংএর ফলশ্রুতিতে  রচনা ও পৃথককরণের নিয়মকানুন দ্বারা জোগান দেয়া যেতে পারে। এধরণের কোন শৃঙ্খলা যদি না পাওয়া যায়, তাহলে, ধারণাগত আনাড়িপনা এবং, চূড়ান্তভাবে, ধারণার ভ্রান্তপ্রয়োগ অবধারিত।

 আমরা বলছি বদরুদ্দীন ওমরের সংখ্যালঘু বিষয়ক সাম্প্রতিক প্রবন্ধ সম্পর্কে। এই প্রবন্ধে লেখক বদরুদ্দীন ওমর ‘সংখ্যালঘু’ ধারণা বা কনসেপ্ট নিয়ে তিনি ব্যাপৃত হয়েছেন। স্পষ্টভাবেই বলা যায় বিশ্বখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গিওভেন্নি সারতোরির সংজ্ঞা অনুযায়ী  বদরুদ্দীন ওমর ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু কারা?” এ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে যেয়ে “সংখ্যালঘু”র কনসেপ্ট বা ধারণাগত দিক দিয়ে পুরো বিষয়টিকেই গুলিয়ে ফেলেছেন।  আবার কেউ কেউ মনে করছেন তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ক্রমান্বয়ে বিলীন হওয়ার পথে থাকা সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বী  জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি ত্বরান্বিত হওয়ার প্রক্রিয়া শক্তিশালী  করতে সাহায্য করছেন ! 
     

যে হারে সংখ্যালঘু বিশেষত: হিন্দু জনগোষ্ঠী  হ্রাস পাচ্ছিল তাতে একটি মহল সন্তুষ্ট হতে পারছে না ! তাদের ইচ্ছা হ্রাসমান প্রবণতার তীব্রতা আরো বাড়াতে হবে।  আর সে কারণেই তারা সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমন চালাচ্ছে। আর এই আক্রমন যারা থামাতে চায় সেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপরও তারা আক্রমন করছে। উদাহরণ প্রচুর । নাটোরে খ্রিস্টান দোকানি সুনীল গোমেজ, চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন, ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলী হত্যার সপ্তাহ না পেরোতেই পাবনায় সৎ সঙ্গের সেবক নিত্যরঞ্জন পান্ডের হত্যার প্রেক্ষাপটে পুলিশ দেশজুড়ে জঙ্গি দমনে সাত দিনের সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের সফলতা বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করা হবে আগামীতে। তবে এসব হত্যাকান্ডের মধ্যে শুধু বাবুল আক্তারের স্ত্রী  মাহমুদা খাতুন হত্যা ছাড়া আর সব হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন। মাহমুদা খাতুনের হত্যায় এই সংগঠন দু:খ প্রকাশ করেছে ! জঙ্গি সংগঠনের এই বিবৃতির পাশাপাশি বদরুদ্দীন ওমরের বক্তব্য যদি মিলিয়ে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে যে তারা প্রকৃত পক্ষে সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপরই আক্রমন করতে চায়, তা স্পষ্ট। তবে এর মধ্যে একটি ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের মানুষের একটি অংশের গঠনমূলক ও অসাম্প্রদায়িক  মনোভাব। জঙ্গিদের আক্রমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে না দেখে তাদের ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেয়া সম্পর্কিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের পর পরই গত ১৬ জুন যে জঙ্গিরা মাদারীপর নাজিমুদ্দীর কলেজের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর উপর হামলা করতে গিয়েছিল তাদের একজন ফাইজুল্লাহকে জনতা ধরে ফেলেছে।  
 

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু অনুসন্ধানী  খ্যাতনামা বামপন্থী লেখক বদরুদ্দীন ওমর নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছেন যে,  ‘সংখ্যালঘু’ শব্দটির মধ্যেই এর সংজ্ঞার বীজ নিহিত আছে । তবুও বর্তমান লেখাটিতে পরে দু’একটি স্বীকৃত সংজ্ঞা নিয়ে ব্যাপৃত হওয়ার আশা রাখি। শব্দগত অর্থ অনুযায়ী  সংখ্যাগত দিক দিয়ে যাদের উপস্থিতি কম তারাই মূলত ‘সংখ্যালঘু’।  সেদিক দিয়ে বাংলাদেশে ধর্মীয় দিক দিয়ে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান এবং জাতিগোষ্ঠীগত দিক দিয়ে যারা স্বল্প সংখ্যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছেন এবং যাদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি প্রতিনিয়ত বদরুদ্দীন ওমরের সহ-ধর্মানুসারীদের ‘ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বেচ্ছাচারীতার’ শিকারে পরিণত হচ্ছে মূলত তারাই হচ্ছেন ‘সংখ্যালঘু’।  এসম্পর্কে প্রচুর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছেও প্রচুর। বদরুদ্দীন ওমর এমন এক সময় লিখেছেন যখন তথ্য-প্রযুক্তির কল্যানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যাকান্ড, বাড়ী ও জায়গা-জমি দখল প্রভৃতির সংবাদ আমরা প্রায় প্রতিদিনই জানতে পারছি। সংখ্যালঘুত্বের অভিশাপ যে কত ভয়াবহ তা বিশেষত কোন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অমুসলিম সংখ্যালঘুরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি শুধু হাহাকার উৎপাদন করে। আর এই হাহাকার ‘যথার্থ নয়’, বা  “ধর্ম, রাজনীতি ও অমানবিক নৈতিকতার যুক্তি” দিয়ে তা ব্যাখ্যা করার মত বুদ্ধিজীবী, আমলা-রাজনীতিক ও সরাসরি রাজনীতিকের অভাব হয় না। এধরণের অপব্যাখ্যা দেয়ার  ক্ষেত্রে একজন উল্লেখযোগ্য বুদ্ধজীবী  হিসেবে আলোচিত লেখাটির বিজ্ঞ লেখক এধরণের একটি স্পর্শকাতর এবং ব্যাপক-বিস্তৃত প্রভাব সম্পন্ন বিষয়ে কোন গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা ছাড়াই যেভাবে  তাঁর মতামত তুলে ধরেছেন তা সংশ্লিষ্ট সবার মনেই বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে ! 
 

১৯৮৫ সালে কমিশন অন হিউম্যন রাইটসে দাখিলকৃত একটি টেক্সটে জুলেস ডেসেনস ‘সংখ্যালঘু’র যে সংজ্ঞা দিয়েছেন। এই সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে,‘সংখ্যালঘু’ হচ্ছে, a group of citizens of a state, consisting of a numerical minority and in a non-dominant position in that state, endowed with ethnic, religious, or linguistic charecteristics which differ from those of the majority of the population, having a sense of solidarity with one another, motivated, if not implicitly, by a collective will to survive and whose aim is to achieve equality with the majority in fact and in law.   সংখ্যালঘুর এই সংজ্ঞা থেকে আমরা ‘সংখ্যালঘু’ সম্পর্কে যে ধারণা পাই সেটি হলো, (১) জনসংখ্যার মধ্যে সংখ্যালঘু হচ্ছে সংখ্যার দিক দিয়ে কম, (২) তাদের অবস্থান অপ্রধান, (৩) জাতিগোষ্ঠীগত, ধর্মীয় বা ভাষাগত দিক দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী থেকে যারা আলাদা, (৩) প্রচ্ছন্নভাবে না হলেও যৌথভাবে এমন এক ইচ্ছা দ্বারা তাড়িত যা দ্বারা একে অপরের প্রতি সংহতি বজায় রাখে এবং (৪) তাদের লক্ষ্য হচ্ছে ন্যায়ত এবং আইনগত দিক দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের সাথে সমতা অর্জন করা। বাংলাদেশের আদমশুমারীর  “জনসংখ্যার ধর্মীয় গঠন” (Religious composition of Bangladesh population) অনুযায়ী  সংখ্যায় বেশী এবং কম জনগোষ্ঠীর ভিত্তিতে অনুসন্ধান করলে যে চিত্রটি পাওয়া যায় তা হলো, সবচেয়ে বেশী সংখ্যাক নাগরিক বা অধিবাসী ধর্ম বিশ্বাসে মুসলিম,এরপরে আছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা। 
 

এছাড়াও মোটামুটি স্বীকৃত উল্লিখিত চারটি মানদন্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু যদি অনুসন্ধান করা হয় তাহলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য হয়। আবার ভাষাগত দিক দিয়ে উর্দু ভাষী বা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষেরা জাতিগোষ্ঠী ও ভাষাগত দিক দিয়ে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। এইসব স্বীকৃত পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণরূপে অবজ্ঞা করে বদরুদ্দীন ওমর ‘সংখ্যালঘু’ হিসেবে এদেশের শুধু অবাঙালি জনগোষ্ঠীকে আখ্যায়িত করতে চাচ্ছেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে তিনি কোন জনগোষ্ঠীকেই পরিচিত করাতে আগ্রহী  নন। অথচ এদেশে বর্তমানে যে সব নৃশংস ঘটনাগুলো ঘটছে তা ধর্মের নামেই ঘটছে এবং এসবের মধ্যে আলোচিত অনেক নির্মম ঘটনার শিকারেরা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু । 
 

ধর্ম বিশ্বাসীদের সংখ্যানুপাতিক উপস্থিতির যুক্তির কারণেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়েছিলেন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। এর পরিবর্তে সংবিধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মকে প্রাধান্য দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এর পরে আর একজন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম করেছিলেন। এসব করার এবং এগুলো টিকিয়ে রাখার প্রধান যুক্তি প্রকৃত পক্ষে, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তি,  যা প্রকৃত পক্ষে সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের চিহ্নিত করে দেয়। এখন মাননীয় বদরুদ্দীন ওমর এই চিহ্নিত সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করতে চান ! তাই তিনি বলেন, “মুসলমানরা অনেক অধিক সংখ্যায় ক্ষতিগ্রস্ত, এমনকি নিহত হলেও কেউ বলে না যে, মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বা সাম্প্রদায়িক ভাবে মুসলমানদের ওপর আক্রমন হচ্ছে। কিন্তু কোন হিন্দু এভাবে নির্যাতনের শিকার হলেই কিছু লোক সমস্বরে বলতে থাকে, ‘হিন্দুদের’ ওপর নির্যাতন হচ্ছে!”  তারমানে হচ্ছে, ‘পূর্নিমা রানী শীল থেকে শুরু করে অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী, আনন্দ গোপাল চক্রবর্তী, নিরঞ্জন পান্ডেসহ যতসব হিন্দু নিধনের কাহিনী  ঘটেছে বা এখনো ঘটছে তা ঘটতে থাক ! হিন্দুরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক!’  বদরুদ্দীন ওমর সাহেব সেটাই চাচ্ছেন !
 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল ভিত্তি ছিল ধর্মীয় পরিচিতি। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম থাকা না থাকা নিয়ে কথা বার্তা এখনো চলমান আছে। ধর্ম নিয়ে রাজনৈতিক বাড়াবাড়ি বা কড়াকড়ি থামানোর জন্য ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এত কিছু হয়ে যাবার পরেও বদরুদ্দীন ওমর সাহেব ‘সংখ্যালঘু’ খুঁজে পাবার চেষ্টা করে এক ধরনের ঁেখাড়া যুক্তি সর্বস্ব ‘পরিচিতির রাজনীতির’ আশ্রয় নিয়েছেন। এ ধরণের বাস্তবতা বিবর্জিত অনুশীলনের কারণে উগ্রবাদীরা উৎসাহ পেয়ে থাকে। এবং প্রকৃত সমস্যা সব সময়েই আড়ালে রাখার প্রয়োজন দেখা দেয়। 
 

প্রথম পর্বে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এদেশের “সংখ্যালঘুদের” উপর বিশেষত: হিন্দু ধর্মাবলস্বী  সংখ্যালঘুদের উপর হিংসাত্মক আক্রমন, জমি-জায়গা দখল, ভিটে-মাটি থেকে উচ্ছেদ করা, সংখ্যালঘু নারীদের উপর অত্যাচার প্রভৃতি ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চলার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সাময়িককালের জন্য কিছুটা তা বন্ধ ছিল (কেউ কেউ বলেন তখনো সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর অত্যাচার হয়েছে, তবে তখন রাষ্ট্রীয়ভাবে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা ছিল)। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পর থেকে তা আবার শুরু হয়েছে।  বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকার সংখ্যালঘুদের স্বার্থের জন্য ইতিবাচক কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তাতে এদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তির ঘোর আপত্তি। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হিংসাত্মক আক্রমন এত তীব্র আকার ধারণ করেছে যে, সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী আক্রমন বন্ধ করার জন্য শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে বিভিন্ন দাবী-দাওয়া উত্থাপন করছে।  

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সফলতার ফলে সরকারের প্রতি  মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতি ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের আস্থা চিরকাল। পর্যবেক্ষকদের অভিমত হচ্ছে, “কেন্দ্রীয়ভাবে আওয়ামী লীগের গৃহীত নীতি-আদর্শ ও অবস্থান তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য সংখ্যালঘুদের কাছে, এটাই এখনো আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের সমর্থনের প্রধান কারণ।” আওয়ামী লীগকে সমর্থন করার অপরাধে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অনেককে অকথ্য নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। ১৯৭৫, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ এবং ২০১৫ সাল এভাবে পঁচাত্তর পরবর্তী প্রায় প্রতি বছরেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে।

 সাংবাদিক কুররাতুল-আইন-তাহ্মিনা “আমরা কি করছি ?” শিরোনামে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে যেয়ে বলেছেন, “২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের জোট জিতেছিল। বলা হয়, সেই উপলক্ষে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষজনের ওপর হামলা হয়েছিল, তারা পরাজিত আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে বলে ধরে নিয়ে। বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় উপদ্রুত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে তখন শুনেছিলাম, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা পলাতক আর জাতীয় নেতাদের কেউ তাঁদের পাশে আসেননি।” এই পরিস্থিতি প্রত্যেক নির্বাচনের সময় চলতে দেখা যায়। পাশাপাশি প্রতিদিনই প্রায় বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন বা আক্রমনের ঘটনা ঘটছে। যাদের পরিচিত লোক আছে উপরের দিকে তারা দৌঁড় ঝাপ করে এর বিহিতের ব্যবস্থা করে। আর যাদের তা নেই তারা নীরবে দেশ ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত এইসব ঘটনা দেখভাল করার জন্য তথা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য “সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠা করা এখন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। 
 

 বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ২৮এর উপ-অনচ্ছেদ (১) এ বলা হয়েছে, “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।” উপ-অনুচেছদ নং (২) এ বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।” উপ-অনুচ্ছেদ নং (৩) এ বলা হয়েছে “কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।” উপ-অনুচ্ছেদ নং (৪)-এ বলা হয়েছে, “ নারী বা শিশুদের অনুকুলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।” ২৮ অনুচেছদ এর ৪ নং উপ-অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে ”বিশেষ বিধান প্রণয়নের” কথা। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এই চেতনার বহি:প্রকাশ তথা একটি বাস্তব সম্মত উদাহরণ হিসেবে আমরা গণ্য করতে পারি। তবে “নারী ও শিশু” ছাড়াও “নাগরিকদের” একটি “অনগ্রসর অংশের জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়নের” প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে অনেক আগে থেকেই। এই বিশেষ বিষয়টি হচ্ছে “সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠা করা। কল্যাণকামী বাংলাদেশের সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে “সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠা করবেন বিবেকবান মানুষেরা সেই আশাই করে।

 

লেখকঃ অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী, চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক, সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

এইবেলা ডটকম/এসসি 
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71