শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
একজন সমাজ সেবক রাজেন্দ্র কাকার গল্প
প্রকাশ: ০৫:৩২ pm ২৪-১০-২০১৭ হালনাগাদ: ০৫:৩৯ pm ২৪-১০-২০১৭
 
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
 
 
 
 


আমাদের সমাজে বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের বসবাস। এই সমাজেই আছে ধনী, গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এ অবস্থার মধ্য থেকেই আমরা সকলে চেষ্টা করছি এ সমাজকে কিছু দেওয়ার জন্য। এর মধ্যে কেউ কিছু ভেবে করছি আবার কেউ কিছু না ভেবে করছি। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে চেষ্টা করছি সমাজে কিছু অবদান রাখার জন্য। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যিনি কোন কিছু না পাওয়ার আশায়  সমাজকে তথা দেশকে তথা দেশের মানুষকে ভালবেসে কিছু করতে চান। ঠিক এ রকম এক জন ব্যক্তি রাজেন্দ্র মন্ডল (৫৮)। তিনি হলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার শ্যামনগর সদর ইউপির দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের ভূমিদাতা এবং ক্লিনিকের সহ-সভাপতি। দেবীপুর গ্রামের পিতা মৃত মহেশ চন্দ্র মন্ডলের ৫ম সন্তান। তারা ৬ ভাই ও ৩ বোন। সকাল থেকেই যার প্রথম কাজ দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিক ভ্রমন। ১৯৯৮ সালে এ ক্লিনিকটি স্থাপনের জন্য পৈত্রিক সম্পত্তি হতে ৫ শতক জমি দান করেন তিনি। জমি দান করার পর থেকেই অদ্যবধী ক্লিনিকের সুখে দুঃখে রাজেন্দ্র মন্ডল জড়িত। তিনি ক্লিনিকের ভবন তৈরী কার্যক্রম থেকে শুরু করে সকল কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। প্রয়োজনে নিজ হাতে বহু কাজ করেছেন এবং করে থাকেন। 

কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি অনিরুদ্ধ কর্মকার সম্পদ বলেন, ভূমিদাতা রাজেন্দ্র মন্ডল প্রতিদিনই ক্লিনিকে আসেন সবার খোজখবর নেন, কিছু সময় ক্লিনিকে অতিবাহিত করেন। ক্লিনিকে আগত রোগিদের সুবিধা-অসুবিধা দেখেন। যদি কোন সময়ে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের নিকট কোন খবরা খবর থাকে রাজেন্দ্র মন্ডল সাথে সাথে সিএইচসিপিকে বা অন্যান্যদের অবহিত করেন। তিনি রোগিদের বসার জন্য চেয়ার বাহির করা আবার চেয়ার গুলি রুমে সাজানো, ক্লিনিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, ক্লিনিক চত্ত্বরে বৃক্ষরোপণ, ক্লিনিকের উন্নয়নের জন্য সবজি বাগান তৈরি, ক্লিনিক রক্ষনাবেক্ষণ, ক্লিনিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা, এলাকবাসীকে ক্লিনিক সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করা সহ বিভিন্ন কার্যক্রম করেন। বিভিন্ন সময় রোগিদের সমস্যা শুনে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন এতে রোগিরাও খুব খুশি হন। মাঝে মাঝে এ সকল কাজে তিনি কমিউনিটি গ্রুপ ও কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপের সদস্যদের সাহায্য নিয়ে থাকেন। তিনি এ জন্য ক্লিনিক থেকে আলাদা কোন প্রকার সুবিধা পান না । সম্পূর্ণ স্বেচ্ছা শ্রমের ভিত্তিতে কাজ করেন। এ কাজ গুলি করে আনন্দ পান যা রাজেন্দ্র মন্ডল জানান। তিনি বলেন, এক দিন ক্লিনিকে না আসতে পারলে তার মন ভাল লাগেনা।

জানা যায়, রাজেন্দ্র মন্ডলের পারিবারিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। সবমিলিয়ে ৭ বিঘা জমি আছে। একটি পুত্র সন্তান ও ৩টি কন্যা সন্তান। কন্যাদের বিবাহ দিয়েছেন। তার ছেলের উপজেলার নুরনগর বাজারে একটি ছোট দোকান আছে। তার স্ত্রী বাড়ীতে পরিবারের কাজ দেখা শুনা করেন। ক্লিনিকে নিয়মিত আসা যাওয়ার ব্যাপারে পরিবারের কোন বাঁধা আছে কিনা জানতে চাইলে রাজেন্দ্র মন্ডল বলেন, কোন বাঁধা নেই বরং এক দিন ক্লিনিকে না আসলে তার স্ত্রী তাকে পাঠিয়ে দেন। ক্লিনিকে তার পরিচিতির কারণে সকলে তাকে কাকা বলে ডাকেন। বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য ও পবিরার পরিকল্পনা বিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ সহ বেসরকারী পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ পরিদর্শন কালীন সময়ে ভূমিদাতা রাজেন্দ্র মন্ডলের সাথে পরিচিত হয়েছেন। সকলে তাকে প্রশংসা করেন তার অবদানের কথা উল্লেখ করেন। ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পর থেকে  তার এ পরিশ্রমের বা অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ কোন দিন কিছু পাননি বা কোন দিন কোন কিছু পাওয়ার আশাও করেন না বলে তিনি জানান। 

ক্লিনিক নিয়ে রাজেন্দ্র মন্ডলের স্বপ্ন জানতে চাইলে বলেন, দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিককে একটি মডেল ক্লিনিক হিসেবে দেখতে চাই। তিনি বলেন, ক্লিনিকটি রাস্তার পাশে হওয়ায় বহু দুর দুরান্ত থেকে রোগিরা আসেন। বছরে প্রায় ১২০০০ জন রোগি এখান থেকে স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে থাকেন। এখানে সরকারী ছুটির দিন ব্যাতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্য্যন্ত ক্লিনিকটি খোলা রেখে বিভিন্ন ধরনের রোগিদের প্রাথমিক সকল রোগের চিকিৎসা সহ ৩০ রকমের ঔষধ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এখানে কর্মরত আছেন একজন সিএইচসিপি- নাম অনিরুদ্ধ কর্মকার যাকে প্রত্যহ পাওয়া যায়, দুইজন স্বাস্থ্য সহকারী- নাম  ছিদরাতুননেছা ও রেহানা পারভীন সপ্তাহে-৩দিন অবস্থান করেন , ও একজন পরিবার কল্যাণ সহকারী নাম  নাজমা পারভীন  তিনিও সপ্তাহে-৩দিন স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকেন। তাদের কার্য্যক্রম পরিদর্শন করার জন্য মাসে কয়েকবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক অপূর্ব রঞ্জন মন্ডল ক্লিনিকটি পরিদর্শন করেন। ক্লিনিকটি পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিউনিটি গ্রুপ ও ৩টি কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ আছে।

তিনি আরও বলেন, এখানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপি অনিরুদ্ধ কর্মকার (সম্পদ) কাজের প্রতি খুবই আন্তরিক, সদালাপী, মিষ্টভাষী, কর্মতৎপর, পরিশ্রমী ও দক্ষতা সম্পূর্ণ একজন ছেলে। সে সব সময় নিজস্ব উদ্যোগে, পরিকল্পনায় ও অর্থায়নে আমাদের সহযোগীতা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভাবনী কার্য্যক্রমের মাধ্যমে আজ ক্লিনিকটিকে সারাদেশের মধ্যে একটি মডেল ক্লিনিকে পরিণত করেছেন। তাকে এই ক্লিনিকে পেয়ে আমরা সকলেই খুব খুশি। তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী করেন, বেশী বেশী ঔষধ সরবরাহের ব্যাপারে ও যাতে সপ্তাহে তিন দিন এ ক্লিনিকে রোগিদের সেবা দিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এক জন মেডিকেল অফিসার আসার জন্য। তিনি আরও বলেন, ক্লিনিকটির নিরাপত্তার জন্য প্রাচীর ও গেট তৈরী করা প্রয়োজন। ক্লিনিকে আগত রোগিদের সুপেয় পানির ব্যবস্থার জন্য রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং প্লান্ট স্থাপন ও সোলার সিস্টেম স্থাপন করা প্রয়োজন।

ক্লিনিকের সভাপতি শ্যামনগর ইউপি সদস্য শেখ মাসুদুর রহমান বলেন, ক্লিনিকের ভূমিদাতা রাজেন্দ্র মন্ডলের অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ক্লিনিকে কোন উর্দ্ধধন কর্মকর্তার পরিদর্শন থাকলে সে দিন তিনি সকলের আগে এসে হাজির হয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেন।  তিনি ক্লিনিকের প্রাণ বলে উল্লেখ করেন।

দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি অনিরুদ্ধ কর্মকার (সম্পদ) বলেন, এ ক্লিনিকটি মডেল ক্লিনিকে পরিণত করার জন্য তিনি নতুন ধরনের বিভিন্ন কার্য্যক্রম যেমন- ক্লিনিক চত্ত্বরে বৃক্ষরোপণ, ক্লিনিকের তহবিল বৃদ্ধির জন্য কীটনাশকমুক্ত সবজি বাগান, ব্রেষ্ট ফিডিং কর্ণার, ভিডিও ডকুমেন্টরি তৈরি, ক্লিনিকের বিভিন্ন অনুষ্ঠান পত্রিকায় প্রকাশ করা ও জনসচেতনতা মুলক বিভিন্ন তথ্যের প্রদর্শন সহ বিভিন্ন কার্য্যক্রম সম্পাদন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি, বাংলাদেশের গাইনি ও প্রসুতি বিভাগের সভাপতি, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ইনজেন্ডার হেলথের কান্ট্রি ম্যানেজার, জেলা সিভিল সার্জন, কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রোগ্রাম ম্যানেজার, শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান শ্যামনগর সদর ইউপি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বেসরকারী সংগঠনের বিভিন্ন কর্মকর্তাবৃন্দসহ অন্যান্যরা দেবীপুর কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শন করে এটি একটি মডেল ক্লিনিক হিসাবে পরিদর্শন বহিতে আখ্যায়িত করেছেন এবং সিএইচপিকে অন্যান্য ক্লিনিকে এ সকল কাজ বাস্তবায়ন করার জন্য সহযোগীতা করার পরামর্শ প্রদান করেছেন।

আর/এসএম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71