বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
একটি মানববন্ধন এবং ঢাকেশ্বরী মন্দির
প্রকাশ: ০৮:৫১ am ২৪-০৩-২০১৮ হালনাগাদ: ০৮:৫১ am ২৪-০৩-২০১৮
 
শিতাংশু গুহ
 
 
 
 


একটি মানববন্ধনের দুটি প্ল্যাকার্ডের বক্তব্যে চোখ আটকে গেল! একটিতে লেখা, ‘মসজিদের শহর ঢাকা, একে মূর্তির শহর বানানো যাবে না’। অন্যটির বক্তব্য হচ্ছে, ‘ঢাকেশ্বরী মন্দির সম্প্রসারণের নামে মুসলিম বিতরণ মানব না’। বেশ লম্বা এই মানববন্ধনে আরো অনেক ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড ছিল, তবে ততটা স্পষ্ট নয়? ঢাকার একটি দৈনিক বেশ বড়সড় হেডিং করেছে। ওলামা লীগ ও ১৩টি সংগঠনের নেতাদের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি বলেছে, ‘বাবরি মসজিদ স্টাইলে মুসলমানদের সম্পত্তি দখলের চক্রান্ত করছে ঢাকেশ্বরী মন্দির কমিটি’।

সদ্য ঢাকা মহানগর পূজা কমিটি এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ যৌথভাবে ঢাকেশ্বরী মেলাঙ্গনে মন্দিরের বেহাত হওয়া সম্পত্তি উদ্ধারে এক গণঅনশন কর্মসূচি পালন করে এবং এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকে যোগ দেন। তাদের মতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ১৪ বিঘা জমি বেদখল রয়েছে। অনশনের পরপরই একটি বিশেষ মহলের মানববন্ধন ইঙ্গিত করে যে, ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না’। অনশনের কর্মসূচি ছিল সর্বজনীন, পক্ষান্তরে মানববন্ধনের বক্তব্য সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের মোট সম্পত্তি ২০ বিঘা। দখলে আছে ৬ বিঘা; বেদখল ১৪ বিঘা। দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধারের দাবি হতেই পারে। যারা ওই সম্পত্তি দখল করেছেন তারা অবৈধ, অন্যায় করেছেন। এই অন্যায়কারীদের প্রশ্রয় দিয়ে যে সব সংগঠন মানববন্ধন করেছেন, তারা কি আর একটি অন্যায় করলেন না? ওলামা লীগ এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০১৩ সালে রমনা কালীবাড়িতে অনুষ্ঠেয় ‘গণশ্রাদ্ধ’ অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছিলেন ওলামা লীগ এবং তাদের কথা শুনে সরকার সেটি নিষিদ্ধ করেছেন। সময় এসেছে, মনে হয় এখন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওলামা লীগের সম্পর্ক পরিষ্কার হওয়া দরকার।

ইতিহাস বলে, ঢাকেশ্বরী থেকে ঢাকা। একাদশ শতাব্দীতে রাজা বল্লাল সেন মন্দিরটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক জেমস টেলর, কেদার নাথ মজুমদার বা শিশির কুমার বসাক ও অন্যদের ঢাকার ইতিহাস পড়ে দেখা যেতে পারে। কথিত আছে, ওই অঞ্চলের নাম ছিল ‘ঢাক ফরেস্ট’ বা বনাঞ্চল, যা থেকে ঢাকেশ্বরী এবং পরে ঢাকা। আর একটি মতবাদ আছে যে, বল্লাল সেনের আমলে ওখানে পূজার সময় হাজার হাজার ঢাক বাজতো; ঢাক থেকে ঢাকেশ্বরী বা ঢাকা। অন্যান্য মতবাদ আছে বটে? বাংলাদেশের হিন্দুরা এটিকে ‘জাতীয় মন্দির’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, প্রকৃতপক্ষে এটি জাতীয় মন্দির নয়?

ইতিহাস আরো বলে, সম্রাট আকবরের সময় ১৭ শতকে রাজা মানসিংহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন। আহমদ হাসান দানির তার ‘ঢাকা, এ রেকর্ড অফ ইটস চেনজিং ফরচুন’ বইয়ে এর সত্যতা স্বীকার করেছেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবার এটি সংস্কার করেন। ১৯ শতকে বল্লাল এস্টেট পুনরায় সংস্কার করে। ভাওয়াল রাজা মন্দিরের নামে ৬৬০ ডেসিমেল বা ২.৬৭২ হেক্টর জমি প্রদান করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার নেমে আসে, অনেক মন্দির আক্রান্ত হয়, ঢাকেশ্বরী মন্দির বাদ যায় না।

ঐসময় মন্দিরের সেবাইত প্রহ্লাদ মোহন তেওয়ারি এবং হরিধর চক্রবর্তী মন্দিরের সোনার মূর্তি নিয়ে ভারত পাড়ি জমান। ১৯৪৮-এ হেম চন্দ্র চক্রবর্তী নতুন মূর্তি গড়ে দেন এবং মন্দিরে আবার নিয়মিত পূজার্চনা শুরু হয়। ১৯৫০-এর দাঙ্গায় আবার ঢাকেশ্বরী আক্রান্ত হয়, স্বর্ণালঙ্কার লুট হয়, মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়? ১৯৫৮-তে আইয়ুব খানের শাসনামলের শুরুতে এবং ১৯৬৪-র দাঙ্গায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বেশ কিছুটা সময় পূজার্চনা বন্ধ থাকে। ১৯৭১-এ রাজাকাররা আবার মন্দির লুট এবং ভাঙচুর করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ২৫ নভেম্বর ১৯৭৫ আবার মন্দিরের ওপর হামলা হয়?

৩১ অক্টোবর ১৯৮৩, শুক্রবার জুমার নামাজের পর আবার মন্দিরের ওপর আক্রমণ করা হয়। মন্দির লুট হয়, আগুন লাগে। মন্দিরের সেবাইত প্রাণভয়ে পালায়। সন্ধ্যায় সরকার কারফিউ জারি করে, কিন্তু গভীর রাত পর্যন্ত মন্দির জ্বলছিল। ১৯৯১-তে ব্যাংকার দিলীপ দাশগুপ্ত এবং ডাক্তার অরূপ রতন চৌধুরী মন্দিরে অষ্টধাতুর মূর্তি প্রদান করেন। ১৯৯২-তে আবার মন্দিরের ওপর হামলা হয়। ২০০১-এর নির্বাচনের পরও একই ঘটনা। ৮ জানুয়ারি ২০০৮-এ পুলিশ প্রহরায় মন্দিরে চুরি হয়। এই প্রথম মন্দির কর্তৃপক্ষ একটি মামলা করেন। আসামিরা গ্রেপ্তার হন, কিন্তু পরে ছাড়া পেয়ে যান।

অধ্যক্ষ প্রবীর মিত্র জানান, ভাওয়াল রাজার দেয়া ৬৬০ ডেসিমেল জমির মধ্যে ২২০ ডেসিমেল মন্দিরের দখলে আছে, বাকি ৪৪০ ডেসিমেল বেদখল। ১০০ ডেসিমেল প্রভাবশালীদের দখলে এবং বাকি ৩৪০ ডেসিমেল প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিটি করপোরেশনের দখলে আছে। ঢাকার সঙ্গে ঢাকেশ্বরীর সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। হাজারো বছরের পুরনো এই মন্দিরের দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের। ষাটের দশকে নেপালের রাজা এবং অতিসম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখানে পূজা দিয়েছেন। সরকারের উচিত ঐতিহ্যবাহী এই মন্দিরকে ‘জাতীয় মন্দির’ ঘোষণা দিয়ে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়া। প্রশ্ন হলো, যারা চোর-জোচ্চোরের পক্ষে মানববন্ধন করলেন, তারা এতটা নির্লজ্জ-বেহায়া হলেন কি করে?

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71