শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
একাত্তরে পটুয়াখালীর রাধেশ্যাম দেবনাথদের জীবন যুদ্ধ
প্রকাশ: ০৯:৪৪ pm ১৭-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ০৯:৪৪ pm ১৭-০৪-২০১৮
 
মশিউর রহমান টিপু
 
 
 
 


একাত্তরের এপ্রিল মাসে ২৬ তারিখ। এদিন আক্রান্ত হলো পটুয়াখালী। দখল হয়ে যায় পটুয়াখালী শহর সহ গোটা জেলা। পাক বাহিনীর আর তাদের দেশীয় সহযোগীরা চালায় ঘর-বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট আর হত্যাযজ্ঞ। জীবন আর সম্ভ্রম বাচাঁতে জন্মভূমি, ভিটেমাটি থেকে মানুষ পালাতে থাকে। 

কেউ শহর থেকে আশ্রয় নেয় গ্রামে। কেউ এক স্থান থেকে পালিয়ে যায় অন্যস্থানে। তাদের কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে সীমানা অতিক্রম করে আশ্রয় নেয় ভারতে। এদের কেউ কেউ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শরনার্থী ক্যাম্প কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনদের কাছে আশ্রয় নেয়।

নদী নালা বেষ্টিত উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী থেকে সে সময় সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যাওয়া ছিল খুবই কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ন। তার ভিতরও পটুয়াখালী শত শত মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কাটিয়েছেন কষ্টকর শরনার্থী জীবন। তাদের অনেকেই স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। কেউ কেউ সেই দুঃস্বপ্ন ভুলে আর ফিরে আসতে চাননি।

একাত্তরের অসংখ্য শরনার্থীর একজন সেই সময়ের পটুয়াখালী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাধেশ্যাম দেবনাথ। তার গ্রামের বাড়ি ছিল লাউকাঠী ইউনিয়ের মৌকরন গ্রামে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদান করেন এবং ২০০৩ সালে রেলওয়ের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহন করে এখন পটুয়াখালীতে অবসর জীবন যাপন করেছেন।

একাত্তরে শরনার্থী জীবন স্মরণ করে তিনি বলেন- মুক্তিযুদ্ধকালে আমরা স্ব-পরিবারে ভারতে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহন করি। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের কোন একদিন আমরা পটুয়াখালী থেকে বনগাঁওতে পৌছাতে সক্ষম হই। শিশু, নাবালক, যুবক, বৃদ্ধ মিলে ৪০ জনের একটি দলে পরিণত হই। দলটি পথিমধ্যে কাউকে না হারিয়ে ১৪ দিনের অভিযান শেষে যে স্থানটিতে পা রাখি তার নাম ছিল বাগদা- এটি বনগাঁ মহকুমার ছোট্ট একটি বাজার বা শহর। নৌকা থেকে নামতেই আমরা এক অভাবিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। অসংখ্য মানুষ, হাজার হাজার শরনার্থী উপস্থিত হয়েছে এ স্থানটিতে। দুর্গন্ধময়, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দাড়াবার স্থানটুকু পর্যন্ত সেখানে নেই। কথা বলার মতো পরিবেশ সেখানে ছিলনা। সর্বত্র চিৎকার কান্নার শব্দ। শিশুদের কান্না, বয়স্কদের কান্না সব একাকার। আমরা দেখলাম কয়েক হাজার মানুষের লম্বা লাইন। সেখান থেকে বর্ডার স্লিপ নিতে গেলে কমপক্ষে দুই দিন লাগবে। এরই মধ্যে আমরা খবর পেলাম সেখানে কলেরা রোগ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। এসব ভেবে সেখান থেকে আমরা ভ্যান সাইকেলে করে ৪ মাইল দূরে বনগাঁও পৌছালাম।

বনগাঁওতে পৌছে দেখলাম শহরের রাস্তা বলতে কিছু নেই লাখ লাখ শরনার্থীদের পদচারনায় তা কাদা মাটিতে ভরে গেছে। এক ভয়ঙ্কর অবর্ণনীয় পরিস্থিতি। চারদিকে তীব্র কোলাহলের মধ্যে আমরা এসে দেখলাম একটি ট্রেন প্লাটফর্মের দিকে আসছে। সামনে পেলাম একটি খোলা বগি, দৌড়ে উঠলাম তাতে। ঘন্টা দুয়েক পর আমরা রানা ঘাট ষ্টেশনে পৌছালাম। সেখান থেকে আমরা নবদ্বীপ হয়ে কাটোরা ষ্টেশনে নামলাম। কাটোরা পশ্চিম বঙ্গের মধ্য ভাগে একটি মহাকুমা শহর। ষ্টেশনে নেমে সাথে রক্ষিত মালামালের পোটলাসহ আমরা হাটা শুরু করি। ষ্টেশন থেকে আমাদের গন্তব্য প্রায় দুই মাইল দূরে একটি গ্রাম। বর্ডার থেকে দূরত্ব বেশী হওয়ায় এখানে শরনার্থীর তেমন আগমন ঘটেনি। খুঁজতে খুঁজতে এক সময় দেখা পেলাম আমাদের ছোট মামার। তিনি এখন ভারতীয় নাগরিক। মামা আমাদের দেখে শিশুর ন্যায় কেঁদে উঠেন। মামার একটাই কথা তোরা কি এখনও বেঁচে আছিস। আমরা তো ভেবেছি তোরা নেই। জয়বাংলা ছারখার হয়ে গেছে। সেখানে মামার একটি ছাপড়া দেয়া ঘরে ঠাঁই পেলাম। মামার অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল ছিল না। স্বল্প পরিমান জমি চাষ করে তার তাঁত বুনে তিনি সংসার চালাতেন। পরদিন থানায় গিয়ে আমরা শরনার্থী ফর্ম পূরন করলাম। দীর্ঘযাত্রায় আমরা ছিলাম পরিশ্রান্ত। কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে ছুটলাম কৃষ্ণনগরের উদ্দেশ্যে। কৃষনগরের শরনার্থী ক্যাম্পে নাম তালিকাভুক্তির পর সেখান থেকে কার্ড দেয়া হলো। সকাল থেকে লাইনে দাড়িয়ে দুপুরের দিকে আমরা রিলিফ পেলাম। আমাদের দেয়া হলো বিশ কিলোর মতে চালের বস্তা, দুই প্যাকেট ডাল, এক বোতল খাবার তেল। সপ্তাহের প্রতি সোমবারই দেয়া হতো এ রিফিল। দেশের খবর পেতাম আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার শুনে আর বিভিন্ন পত্রিকা পড়ে। কোলকাতায় বাংলাদেশের অফিস আর বিভিন্ন শরনার্থী ক্যাম্পে ঘুরে খোজ খবর নিতাম।

এরই মধ্যে খবর পেলাম ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্থানীরা আত্মসমর্পন করবে। যেহেতু সরকারী চাকুরী করতাম তাই ১৬ ডিসেম্বরই আমি দেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। আমার মা-বাবাসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তখনও ভারতেই ছিল। বিভিন্ন পথ ঘুরে ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালী শহরে এসে পৌছি। শহর তখনও প্রায় ফাঁকা। তারপর যাই শহরের পুরানো বাজার এলাকায়। এখানে বেশীর ভাগই হিন্দু পরিবারের আবাস ছিল। গিয়ে দেখি পুরান বাজার এলাকার দোকানপাট শূন্য। পুরান বাজার এলাকার একটি বৃহৎ অংশ ২৬ এপ্রিল পাক বাহিনিরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এখানে লুটপাট চালায় তাদের এদেশীয় সহযোগীরা। সমগ্র পুরান বাজার যেন খা খা করছে। মনসা ফার্মেসী বন্ধ। নিতাই দা কোথায় কেউ বলতে পারে না। শ্যামল রায় ও সুভাষ রায় (বস্ত্র ব্যবসায়ী) ছিল জেলখানায় বন্দি। তারা ফিরে এসেছে। কিন্তু তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়ী লুটপাট হয়ে গেছে। বন্ধু নিলিখ দাম (পরবর্তীতে এ্যাডভোকেট) ২৬ এপ্রিল তারিখে মা-বাবা বড় ভ্রাতৃবধুসহ বেশ কয়েকজনকে হারিয়েছে পাক বাহিনীর হামলা।


পটুয়াখালীর আরেক শরনার্থী ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য তপন কুমার কর্মকার। একাত্তরে তিনি ছিলে ছাত্র ইউনিয়নের পটুয়াখালী জেলা শাখার সহ-সভাপতি। তিনি সেই সময়ের স্মৃতি চারণ করে বলেন- ৭১ এর ২৬ এপ্রিল পটুয়াখালীতে আক্রমন চালায় পাকিস্তানী আর্মিরা। এদিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমাবর্ষন করে নির্বিচারে। বোমার আঘাতে মৃত্যু বরণ করে শত শত নারী, পুরুষ, শিশু। চালায় হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। এ হামলার সময় আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি করার কারনে স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করা সম্ভব ছিল না। শহর থেকে পালিয়ে প্রথমে আমতলীর তৎকালীন এমএলএ নিজাম তালুকদার এর বাড়িতে কিছু কিছু দিন থাকি। পরবর্তীতে সেখান থেকে বিভিন্ন পথ ঘরে যশোর হয়ে ভারতে জুলাই মাসের দিকে প্রবেশ করি। এ সময় মুসলমান সেজে নাম পরিবর্তন করে আমাকে যাতায়াত করতে হয়েছে। যশোরের বাগদা থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে বনগাওয়ে আশ্রয় নেই। সেই সময় দিনের পর দিন না খেয়ে পায়ে হেটে হেটে আমাদের যেতে হয়েছে। বনগাঁও থেকে বাস করে হাবড়া যাই। হাবড়া স্টেশন থেকে শিয়ালদহ নামি। শিয়ালদহে ষ্টেশনে রাত কাটিয়ে পরদিন যাই সল্টলেকে। সেখানে দেখি হাজার হাজার শরনার্থী। রিলিফের জন্য মানুষের লম্বা লাইন। সেখান থেকে দেয়া হয় চাল, ডাল, লবন, তেল, চিড়া, গুর সহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী।

পরে বনগাঁও ক্যাম্পে গিয়ে ট্রেনিংয়ের জন্য নাম তালিকাভুক্তি করি। সে সময় ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন বরিশালের আওয়ামী লীগের নেতা মঞ্জুর হোসেন। আমি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত থাকার কারনে আমাকে ট্রেনিংয়ের জন্য আর ডাকা হয়নি। পরে ভারতে অবস্থানরত ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টির নেতাদের সাথে যোগাযোগ করি। সেখানে পরিচয় হয় নলীনি দাস, কুষ্টিয়ার মোহিনী মিলের শ্রমিক নেতা শেখ রওশন আলী, পরিমল গুহের সাথে। তারা বলেন, আমরা ভিন্ন ব্রিগেড গঠন করবো। পার্টি থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমি সে বিগ্রেডে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। স্বাধীনতার পর ডিসেম্বরের শেষ দিকে পটুয়াখালী ফিরে আসি। এসে দেখি বাড়ি ঘর সব লুট হয়ে গেছে। ঘর, দরজা, জানালা, আসবাবপত্র, হাড়ি-পাতিল, কিছুই ছিল না। এমনকি ঘরের মেঝে মাটির নিচে লুকানে স্বর্ণলংকার যা ছিল তাও রক্ষা পায়নি। স্বাধীনতার পরে ন্যাপের রাজনীতিতে যোগদান করি ও শিক্ষকতা শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ন্যাপ-কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনীর সনদপত্র পেলেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে আজো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাইনি।

বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71