মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
এ দেশে নাটক করা কি অন্যায়?
প্রকাশ: ১০:২২ am ০৬-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ১০:২২ am ০৬-০৪-২০১৮
 
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
 
 
 
 


শঙ্কর ভৌমিকের (৫০) নেশা ও পেশা ছিল নাটক। নাটক ও যাত্রায় বিবেকের ভূমিকায় দেখা যেত তাঁকে। যাত্রা-নাটকে এমনভাবে জড়িয়ে ছিলেন যে অন্যকিছু করার আগ্রহ ছিল না তাঁর। নিবেদিতপ্রাণ এই সংস্কৃতিকর্মীকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর পিটুনির পর ডুবে মরতে হয়েছে।

এ ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত ইটনা উপজেলার পাঁচকাহনিয়া গ্রামে গত ২৬ মার্চ। মৃত শঙ্কর সদর উপজেলার গাগলাইল গ্রামের প্রয়াত শিবচরণ সরকারের ছেলে। একই দিন নৌকা ডুবে আরেকজনের মৃত্যু হয়। মৃত তুহিন (১৩) রাজকুন্তি গ্রামের মো. কোহিনূর মিয়ার ছেলে। মরতে মরতে ঘটনাচক্রে বেঁচে যায় নাট্যদলের আরো ৩৪ জন কর্মী। তাঁদের অনেকে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি। সেই রাতের কথা মনে হলে আঁতকে ওঠেন।

নাট্যকর্মীরা জানান, পাঁচকাহনিয়া গ্রামে গত ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে ‘নরসুন্দা অপেরা’র সদস্য হয়ে ‘আপন দুলাল’ নাটক করতে গিয়েছিলেন শঙ্কর। ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তাদের মঞ্চ ভাঙচুর করে। হামলা চালানো হয় নাট্যদলের সদস্যদের ওপর। লুটপাট করে যন্ত্রপাতি। গভীর রাতে পালিয়ে আসছিলেন ৩৬ জন। করিমগঞ্জের চামড়াঘাটের কাছে নাগচিনি নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে রাত সাড়ে ১২টার দিকে ট্রলারটি ডুবে যায়। ৩৪ জন স্থানীয় ইটভাটার শ্রমিকদের সহযোগিতায় সাঁতরে জীবন রক্ষা করতে পারলেও দুজন নিখোঁজ থাকে। পরদিন দুপুরে স্থানীয়রা শঙ্কর ভৌমিকের লাশ উদ্ধার করে। এর তিন দিন পর তুহিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় করিমগঞ্জ থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন করিমগঞ্জ থানার পরিদর্শক মো. মুজিবুর রহমান।

এদিকে নরসুন্দা অপেরার মালিক গত ৩ এপ্রিল কিশোরগঞ্জ বিচারিক আদালত-৪-এ একটি মামলা করেন। এতে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় আরো ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী রুবেল জানান, আদালতের বিচারক মো. আনিসুল ইসলাম মামলাটি তদন্তের জন্য ইটনা থানার পরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মো. ইসমাইল, সোহরাব খন্দকার ও ইসলাম উদ্দিনের নেতৃত্বে আসামিরা দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নাট্যদলের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা দুটি জেনারেটর, সাউন্ড সিস্টেম, বাদ্যযন্ত্র, কি-বোর্ডসহ নাটকের মালামাল ভাঙচুর করে পানিতে ফেলে দেয়। এতে প্রায় সাত লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। তা ছাড়া তখন নাট্যকর্মীদের মারধর ও অভিনেত্রীদের শ্লীলতাহানি করা হয়।

এদিকে গাগলাইল গ্রামের বাসিন্দা শঙ্করের পরিবারের লোকজন কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না। পরিবার জানায়, সারা দেশে নাটক করে বেড়াতেন শঙ্কর। বাবার পেনশনের টাকা আর নিজের নাটকের আয় দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে চলে যেত সংসার। বড় ছেলে শান্ত আগামীতে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে, মেয়ে পূজা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। বাবাকে হারিয়ে তারা যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে। বাবার প্রসঙ্গ উঠলে উদাস তাকিয়ে থাকে, কথা বলে না। সামনের দিনগুলো কিভাবে যাবে এ দুর্ভাবনায় ভেঙে পড়েছে পরিবারটি। শঙ্করের মা সুশীলা দেবী প্রশ্ন করেন, ‘এ দেশে নাটক করা কি অন্যায়?’

নাট্যকর্মীরা জানান, ৩৬ জনের মধ্যে সাতজন অভিনেত্রী ছিলেন। তাঁদের একজন মায়া রানী ভৌমিক জানান, রাত সাড়ে ৯টায় মঞ্চের কাছাকাছি নৌকা ভেড়ানো হয়। ট্রলার থেকে সাউন্ডবক্সসহ সরঞ্জাম নামানো হয়েছে। অভিনেত্রীরা নৌকা থেকে নামেননি। এমন সময় দেখেন শ শ লাইট জ্বালিয়ে মানুষ মিছিল নিয়ে আসছে। তারা ভয়ে তাড়াতাড়ি এক পার থেকে নৌকা নিয়ে অন্য পারে গিয়ে ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। আধাঘণ্টায় মঞ্চ ভাঙা হয়। অভিনেতাদের মারধর করা হয়। যারা ওই পারে ছিল, তারা মার খেয়েছে। মৌলভিরা যাওয়ার পর দলের সবাইকে খুঁজে বের করা হয়। যারা মার খেয়েছিল, তাদের সামান্য চিকিৎসা দিয়ে ট্রলারে ফেরত পাঠানো হয়।

নাট্যদলের সদস্য খায়রুল, তুহিন ও শহীদ জানান, ঝড়ে ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর তারা কিভাবে যে জীবন বাঁচিয়েছেন তা আজ নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারেন না। নদীর পারে ইটভাটা ছিল। ভাটার লোকজন অনেকের জীবন বাঁচিয়েছে। তারা জানান, কারো শরীরের কাপড়চোপড় ঠিক ছিল না। প্রায় সবাই বিবস্ত্র হয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন। পরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দুদিনব্যাপী নাট্যানুষ্ঠানের আয়োজকদের অন্যতম মো. সোহরাব উদ্দিন জানান, দুটি নাটকের জন্য খাওয়াদাওয়ার খরচ বাদে ৬০ হাজার টাকা চুক্তি ছিল নরসুন্দা অপেরার সঙ্গে। কিন্তু স্থানীয় একটি চক্র ধর্মের নামে অপপ্রচার চালিয়ে তাদের আয়োজনটি পণ্ড করে দেয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, পাঁচকাহনিয়া নূর মসজিদের সভাপতি মো. ইসমাইল, বড় মসজিদের খতিব ইসলাম উদ্দিন ও বড়িবাড়ি মাদরাসার শিক্ষক সোহরাব খন্দকারের নেতৃত্বে মঞ্চ ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটে।

পাঁচকাহনিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী মো. বাবুল জানান, রাতে নাটকের যখন প্রস্তুতি চলছিল, হঠাৎ তিন-চার শ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে মঞ্চ, বাতি ও নাটকের মালামাল ভাঙচুর করে। আয়োজক ও নাটকের লোকজনকে ক্ষেতের মধ্যে ফেলে মারধর করে।

পাঁচকাহনিয়া বড় মসজিদের ইমাম শামসুল ইসলাম মঞ্চ ভাঙচুরের কথা স্বীকার এবং নাট্যকর্মীদের মারধরের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আয়োজকদের বলেছিলাম দিনে অন্য অনুষ্ঠান করতে পারেন। কিন্তু নাটকের নামে যাত্রা করতে দেব না। তারা আমাদের কথা শোনেনি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।’ বড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রউফ ভূঁইয়া বলেন, ‘হুজুররা নাটকের প্যান্ডেল ভাইংগিয়া ফালাইয়া দিছে।’ ইটনা থানার পরিদর্শক আব্দুল মালেক নাট্যকর্মীদের মারধরের বিষয়ে বলেন, ‘এগুলো ভুয়া কথা।’

বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মোনায়েম হোসেন রতন বলেন, ‘নাট্যকর্মীদের কেবল মারধরই করা হয়নি, তাদের জিনিসপত্রও রেখে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর ভয়ে নাট্যকর্মীরা গভীর রাতে ট্রলার দিয়ে পালিয়ে ফিরতে চেয়েছিল। না হলে তারা সকালে আসত। সকালে ফিরলে তো এ দুর্ঘটনা নাও ঘটতে পারত।’ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মিলন কান্তি দে বলেন, ‘প্রশাসন তৎপর থাকলে ইটনায় এ দুঃখজনক ঘটনা ঘটত না।’

নি এম/
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71