বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
ঐতিহাসিক রমেশ চন্দ্র মজুমদার
প্রকাশ: ১০:০২ am ০৬-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ১০:০২ am ০৬-১২-২০১৬
 
 
 


জীবনী ::  আর এস এসের আদর্শের অন্যতম ভিত্তি সাভারকরের মতবাদ। সেই সাভারকর অল্প বয়সে লিখেছিলেন, ১৮৫৭-র সংগ্রাম ভারতের "প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম"। নেহাৎ সিপাহী বিদ্রোহ নয়। একে সাভারকর হিন্দুত্ববাদী, তার উপর মারাঠী। সুতরাং আর এস এসও স্বয়ংসেবকদেরকে সেই তত্ত্বটাই গেলালো। এই তত্ত্ব যে 'হিন্দুত্বই রাষ্ট্রীয়ত্ব' তত্ত্বের বিরোধী - তা বোঝার ক্ষমতা ছিল না। ব্রিটিশকে তাড়িয়ে মোগল বাদশাকে সিংহাসনে বসানোর লক্ষ্য, উত্তরপ্রদেশে বহু স্থানে মৌলবী ও ইমামদের দ্বারা জেহাদের আহ্বান, সেই আহ্বানে প্রেরিত হয়ে অত্যন্ত নৃশংসভাবে অসামরিক ইংরাজ নারীপুরুষ-দের হত্যা - এর মাধ্যমে হিন্দুরাষ্ট্র তো দূরের কথা, এমনকি স্বাধীনতাও আসবেনা। এর মাধ্যমে হবে মুসলিম শাসনের পুনঃপত্তন। হিন্দুরা আবার হবে ইসলামের অধীন।

প্রখর দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী সাভারকর ব্রিটিশ বিরোধিতার তীব্র আবেগে অল্প বয়সে ১৮৫৭-র সিপাহী বিদ্রোহ-কে ভারতের "প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম" লিখেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে পরিণত বয়সে তিনি আর এর পুনরুক্তি করেননি। কিন্তু আর এস এস সেই তত্ত্বকে ধরে বসে আছে। আর সেই বইটা প্রকাশের আগেই ইংরেজ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। সেইজন্য আর এস এসের কাছে তা আরো আকর্ষণীয় হয়েছিল। আমিও ছোটবেলা থেকে তাই শিখেছিলাম।

কিন্তু আর একটু বড় হয়ে যখন কয়েকবার আনন্দমঠ পড়লাম, সীতারাম, রাজসিংহ ( সব বঙ্কিম ) পড়লাম, তখন থেকে খটকা লাগতে লাগল। ১৮৫৭-র অতবড় মহাসংগ্রামের মাত্র ২০-২৫ বছরের মধ্যে লেখা বঙ্কিমের এই কালজয়ী সৃষ্টিতে (১৮৮২) ওই মহাসংগ্রামের বিন্দুমাত্র উল্লেখ নেই কেন? বরং সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কথা ভালোভাবে আছে। ব্যাপারটা মেলাতে পারছিলাম না। তারপর মনে আরো প্রশ্ন এল - অতবড় একটা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে বাঙালি যোগ দিল না কেন? অথচ আমাদের ব্যারাকপুরেই তো ওই সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল! তাও বাঙালি কোনো সাড়া দিল না? কেন? অথচ তার ঠিক ৫০ বছর পর ইংরাজকে প্রথম বোমাটা তো বাঙালিই মারল। ১৯০৮-এ ক্ষুদিরাম। তার পর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে সব থেকে আগে তো বাঙালিই ছিল। তাহলে ১৮৫৭-র সংগ্রামে বাঙালি সাড়া দিলনা কেন?

আমার কাছে তার একটাই উত্তর: ১২০৩ থেকে ১৭৫৭ পর্যন্ত ইসলামিক শাসনের যে নিষ্ঠূরতা, নৃশংসতা, ধর্মান্ধতা বাঙালি দেখেছে, ভুগেছে, সেই ভয়ংকর স্মৃতি বাঙালি জাতির কালেক্টিভ মেমোরি থেকে ১০০ বছরেও মুছে যায়নি। তাই বাঙালি দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরকে পুনরায় দিল্লির তখ্তে বসানোর যুদ্ধে যোগ দেয় নি।
তাই আমার কাছে ১৮৫৭-র যুদ্ধ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়। তা ছিল কিছু হিন্দু রাজাদের রাজ্য রক্ষার তাগিদ ও মুসলিমদের হৃত সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার তাগিদের সুবিধাজনক বা আপোষে বোঝাপড়া। তাই বাঙালি তাতে অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু ব্রিটিশ বিরোধিতায় বাঙালি সারা ভারতে কারো থেকে পিছনে ছিল না - ইতিহাস তার সাক্ষ্য।

এখন যখন জানতে পারছি, সিপাহী বিদ্রোহকে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে দেখানোর জন্য ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের উপর খুব চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল, কিন্তু নির্ভীক ঐতিহাসিক মজুমদার কিছুতেই তা মেনে নেননি- তখন মনে হচ্ছে যে আমার চিন্তাধারাই ঠিক।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ১৮৫৭-র সংগ্রাম বা যুদ্ধ বিষয়ে কংগ্রেস ও আর এস এসের একই মত। রমেশচন্দ্র মজুমদার সেই মত মানেননি বলেই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লেখার জন্য ভারত সরকার গঠিত কমিটি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এই প্রসঙ্গে আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।

ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরুর আরো দাবীদার আছে। মহারাষ্ট্রের বাসুদেব বলবন্ত ফাড়কে এবং চাপেকর ভাইরা ক্ষুদিরামের আগেই ইংরাজকে সশস্ত্র আঘাত হেনেছিলেন। কিন্তু আধুনিক ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের শুরু, ভিত্তিস্থাপন আমাদের এই বাংলাতেই হয়েছিল।

সিপাহী বিদ্রোহের মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৮৬৭ সালে কলকাতায় হিন্দু মেলা শুরু করেন নবগোপাল মিত্র, রাজনারায়ণ বসু (শ্রী অরবিন্দের মাতামহ), দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথের বড়দা), গিরিশচন্দ্র ঘোষ ও অন্যান্যরা। দ্বিজেন্দ্রনাথের লেখা "মলিন মুখচন্দ্র মা ভারত তোমারি", সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা "গাও ভারতের জয়", রবীন্দ্রনাথের লেখা "শিবাজী উৎসব" প্রভৃতি অনবদ্য দেশাত্মবোধক সংগীত ও কবিতা কয়েকবছর ধরে এই হিন্দু মেলাতেই গান ও আবৃত্তি করা হয়। এই হিন্দু মেলা, বন্দে মাতরম সংগীত, আনন্দমঠ, বিবেকানন্দের স্বদেশমন্ত্র, বন্দেমাতরম পত্রিকায় অরবিন্দের আগুন ঝরানো লেখাগুলি - এই সব দিয়ে যে ভিত্তি স্থাপন হল, তা থেকে একদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবাহ শুরু হল, অন্যদিকে শুরু হল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সহিংস সংগ্রামে প্রাণ আহুতি দেওয়ার উৎসব। এই দুটি প্রবাহই পরবর্তীতে সারা ভারতে ছড়িয়েছে। বাঙালি ছিল তার অগ্রদূত।
এই ইতিহাস কি বাঙালির গর্বের গাথা নয়?

আজকে যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পীঠস্থান বলে মহারাষ্ট্রকে মনে করা হয়, সে বিষয়ে পুনর্বিচারের সময় এসেছে। অবশ্যই লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের অবদান এই হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুষ্টিতে অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁর নামও তো আমাদের বিপিন চন্দ্র পালের সঙ্গে একসঙ্গে উচ্চারিত হয় ! লাল-বাল-পাল।

বাঙালি যে ভুলটা করেছে তা হল, সে ধর্মান্তরিত বাংলাভাষী মুসলমানকে চিনতে পারেনি। অথবা বলা ভাল যে, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর বাঙালি হিন্দুর মধ্যের কী পরিবর্তন হয়েছে - তা লক্ষ্য করেনি। এর ফল আমরা এখনো ভুগছি।

 

এইবেলাডটকম/নীল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71