বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়ের ৮০তম জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৭:২২ am ১৭-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৭:২২ am ১৭-১২-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় (জন্মঃ- ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৬)

‘আমাদের গ্রামের নিধু পাগলা। সে কবে পাগল হয় তা জানা যায় না। তার বউ আমাদের বাড়িতে কাজ করত। যমুনা নদী তো পাড় ভাঙা। একদিন কি কারণে যেন সেই পাড়ভাঙা নদীতে ভরা বর্ষায় নিধু দিল ঝাঁপ, আর তখনি একটি পাড় পড়ল ভেঙে। অর্থাৎ নিধুর মৃত্যু নিশ্চিত হলো! রীতি অনুযায়ী নিধুর বউকেও বৈধব্য গ্রহণ করতে হলো। কিন্তু একবছর পর নিধু ফিরে এল। জলজ্যান্ত। আমাদের চেনা নিধুই। আমার দাদু নিধুকে বললেন, নিধু তুই তো পরলোকগত। পরলোক থেকে কী করে ফিরলি? নিধু বলল, ফিইরা আইলাম আর কি। দাদু বললেন, তোর তো শ্রাদ্ধ হইল, হবিষ্যি হইল। নিধু বলে, আমিও হবিষ্যি খাব। দাদু বলে, নিধু তুই এই ভরা বর্ষায় যমুনায় ঝাঁপ দিয়ে কি করিয়া বাঁচিলে? নিধু বলে, কর্তা, মইরা দেখলাম, মইরা কোনো সুখ নাই! -নিধুর এই ঘটনাটা আমি সারাজীবনেও ভুলতে পারি না। বিশেষত ওই কথাটি, ‘কর্তা, মইরা দেখলাম, মইরা কোনো সুখ নাই’। 
‘তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। একবার আমরা বন্ধুরা মিলে বুধগয়ায় পিকনিকে যাই। সেখানে ঘোরাফেরা করছি, এমন সময় এক পুরোহিত আমার পিছু নিল। আমি জানতে চাইলাম, কী চান? তিনি বললেন, পিণ্ডি দিতে হবে। আমি বলি, কার পিণ্ডি দেব? তিনি বলেন, ঠাকুর্দা, ঠাকুর্মা... এমন কারো। আমি বলি, সেই কবে ওনারা মারা গেছেন, ওনাদের পিণ্ডিও দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা পুরোহিত, আমার কাছ থেকে পিণ্ডি না আদায় করে ছাড়বেন না, দিতেই হবে পিণ্ডি। তো কি আর করা। বললাম, দিন, ৫০ পয়সার পিণ্ডি দিন। পুরোহিত পিণ্ডিদানের আয়োজন করলেন এবং বললেন, পিণ্ডি যার নামে তাঁর নাম কী? আমি বললাম, ওনার নাম শ্রী দেবেশ রায়। তিনি বললেন, পিতার নাম কী, মাতার নাম কী, গোত্র কী ? আমি ওগুলোও বললাম। এরপর তিনি বললেন, এবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন, উনি মানে শ্রী দেবেশ রায় স্বর্গীয় চেহারা নিয়ে এসে পিণ্ডি খাচ্ছেন। আমি চোখ বন্ধ করে থাকলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, দেখতে পাচ্ছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। উনি বললেন, এবার উনার জন্য মঙ্গল কামনা করুন। আমি বললাম, হ্যাঁ করলাম। এরপর ৫০ পয়সা দিয়ে চলে এলাম। বাড়ি এসে কথাটি কোনোভাবেই পেটে রাখতে পারলাম না। বলে দিলাম। আমার বাবা রাশভারী মানুষ ছিলেন। পিণ্ডি দেওয়ার কথা শুনে রেগে বাবা গেলেন। মা বলল, তুই এ-কি করলি বাবা? তো কি আর করা, পিণ্ডি ফিরাতে হবে। পরদিন শাস্ত্রমতে স্নান করিয়ে একজন পুরোহিত ডেকে মন্ত্রপাঠের আসরে যজ্ঞে বসাল আমাকে। যাতে শ্রাদ্ধ দূর হয়, পিণ্ডি ফেরত যায়। পুরোহিতের তন্ত্রমন্ত্রপাঠের কর্ম শেষ হলে আমি ঠাকুর মশায়কে জিজ্ঞেস করলাম, মশায়, আমি কি এইমাত্র পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলাম? তিনি বললেন, ধর, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে কি আমার জীবনের বিগত ১৭/১৮ বছর ক্যান্সেল হয়ে গেল!’ 
একবার জর্জিয়ায় গিয়েছি, নিমন্ত্রনে। ব্যাপক জলতৃষ্ণা পেয়েছে। এয়ারপোর্টে নেমে দেখি এক রেস্টুরেন্টের সামনে কাঠের চোঙের ভেতর থেকে জুসের মতো কি যেন অনেকেই গ্লাস ভরে নিচ্ছে আর খাচ্ছে। আমিও একটি গ্লাস ভরে নিলাম। এবং খেয়ে ফেললাম। দেখলাম ভালোই তো লাগে। এভাবে জুস ভেবে পর পর বেশ কয়েক গ্লাস খেলাম। পাশে যারা ছিল, তারা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। আমি তখন বুঝতে পারিনি রহস্যটা কী! পরে জানলাম, জুস ভেবে আমি যা খেয়েছি, তা আসলে জুস না, মদ। তো যারা আমাকে নিমন্ত্রন করেছিল, তারা আমাকে নিতে এসে যখন শুনল যে আমি পর পর বেশ কয়েক গ্লাস চুমুকেই ইতিমধ্যেই পান করে ফেলেছি, ওরা তো শুনে ভাবল ভারতবর্ষের মানুষ তাহলে দারুণ মদ খায়। সেজন্য আমি যেখানে উঠলাম, সেখানে বেশ কয়েক বোতল সরবরাহ করা হলো। সন্ধ্যার দিকে, বিকেলের শেষ মুহূর্তে আমি রেস্টহাউসের বেলকনিতে বসে সূর্যের সোনালি আভা এবং সূর্যডোবা দেখছিলাম। ওখানকার একটি ছেলে দু’বোতল নিয়ে এসে আমার পাশে বসল। এবং মদভর্তি গ্লাস আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। আমি বুঝলাম, এয়ারপোর্টের ঘটনাটাই এজন্য দায়ী। আমি তো আসলে মদ খাই না। জীবনে কখনোই না। না জেনে জুস ভেবে কয়েক গ্লাস খেয়েছি, কিন্তু জেনে তো এক ফোঁটাও খেতে পারবো না। কিন্তু ভারতবর্ষের সম্মান বলে কথা। ছেলেটির হাত থেকে গ্লাস নিয়ে ছেলেটিকে আমার বামপাশে বসতে দিলাম এবং আমি ডানপাশে বসলাম। কারণ ডানপাশে ছিল একটি জানালা। আমি গ্লাস হাতে নিয়ে ছেলেটির সাথে গল্পে মেতেছি, আর সূর্যডোবা দেখছি, ছেলেটি মদ খাচ্ছে। আর আমি ছেলেটির চোখ ফাঁকি দিয়ে জানালা দিয়ে মদটুকু বাইরে ঢেলে দিচ্ছি। এভাবে আবার ছেলেটি দুটো গ্লাসে মদ ঢালে, একগ্লাস সে খায়, অন্য গ্লাস আমাকে দেয়। আমিও যথারীতি বাইরে ঢেলে দিই। একসময় মদ শেষ হয়ে এল। ছেলেটি তখন মদাসক্ত, নেশায় ঢুলোঢুলো। আমি তো স্বাভাবিক। এরপর সেই ছেলেটি অনেকটা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে চলে গেল।’ ---দেবেশ রায়।

জন্ম তার পাবনা জেলার বাগমারা গ্রামে। তার শৈশবের কয়েকটি বছর কাটে উত্তাল যমুনার পারে। দেশভাগের কিছু আগে, ১৯৪৩ সালে, তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে জলপাইগুড়ি চলে যান। 
যযাতি দিয়ে দেবেশ রায়ের উপন্যাসের সূচনা। রাজনীতি যখন নকশালবাড়ি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থায় টালমাটাল, বাংলা সাহিত্যে তাঁর নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চারের সূচনা ঘটে সেই ১৯৭০-এর দশকে। মানুষ খুন করে কেন, মফস্বলী বৃত্তান্ত, সময়-অসময়ের বৃত্তান্ত—একের পর এক উপন্যাসের অফুরন্ত প্রবাহ পাঠকের অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে থাকে। এ অভিজ্ঞতা তুঙ্গে পৌঁছায় তাঁর তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত-এ। উপন্যাসটির জন্য ১৯৯০ সালে তিনি অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন।
বাংলা ভাষা ও কথাসাহিত্য নিয়ে বহু মৌলিক প্রস্তাবও তিনি তুলেছেন তাঁর উপন্যাস নিয়ে, উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে, উপনিবেশের সমাজ ও বাংলা সাংবাদিক গদ্য, প্রভৃতি বইগুলোতে। বাংলা সাহিত্যে উপনিবেশের প্রভাব ও বাংলা ভাষার নিজস্ব প্রতিভা তাঁর অনুসন্ধানের বিষয়। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে তিনি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-প্রতিষ্ঠিত পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৯ সাল থেকে তিনি এক দশক পরিচয় পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল: মানুষ খুন করে কেন (১৯৭৬), মফস্বলী বৃত্তান্ত (১৯৮০), সময় অসময়ের বৃত্তান্ত (১৯৯৩), তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত (১৯৮৮), লগন গান্ধার (১৯৯৫) ইত্যাদি।
তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত উপন্যাসটির জন্য তিনি ১৯৯০ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন।

গ্রন্থ তালিকা
তিস্তাপাড়ের বৃত্তান্ত
মফস্বলি বৃত্তান্ত
সময় অসময়ের বৃত্তান্ত
লগন গান্ধার
আত্মীয় বৃত্তান্ত
শিল্পায়নের প্রতিবেদন
দাঙ্গার প্রতিবেদন
খরার প্রতিবেদন
যযাতি
তিস্তাপুরাণ
আঙিনা
ইতিহাসের লোকজন
উচ্চিন্নো উচ্চারণ
একটি ইচ্ছা মৃত্যুর প্রতিবেদন
চেতাকে নিয়ে চীবর
জন্ম
তারাশংকর:নিরন্তর দেশ
নবেলজোড়
বেঁছে বততে থাকা
শিল্পায়নের প্রতিবেদন
মার-বেতালের পুরান
যুদ্ধের ভিতরে যুদ্ধ
সহমরণ
বরিশালের যোগেন মণ্ডল
দেবেশ রায়ের গল্প (৬ খণ্ড) (১৯৬৯),
দুই দশক (ছোটগল্প সংকলন) (১৯৮২),
দেবেশ রায়ের ছোটগল্প (১৯৮৮),
স্মৃতিহীন বিস্মৃতিহীন (ছোটগল্প সংকলন) (১৯৯১),
রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর আদি গদ্য (প্রবন্ধগ্রন্থ)
সময় সমকাল (প্রবন্ধগ্রন্থ)
উপন্যাস নিয়ে (প্রবন্ধগ্রন্থ)
উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে (প্রবন্ধগ্রন্থ)
শিল্পের প্রত্যহে (প্রবন্ধগ্রন্থ)
উপনিবেশের সমাজ ও বাংলা সাংবাদিক গদ্য (প্রবন্ধগ্রন্থ)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়: নিরন্তর মানুষ (প্রবন্ধগ্রন্থ)

 

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71