বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
কনডেমড সেলে মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দীর ৭ বছর
প্রকাশ: ১২:১৩ pm ১৫-০৮-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:১৫ pm ১৫-০৮-২০১৭
 
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
 
 
 
 


বিশ্বজিৎ নন্দীর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার গোবিন্দপুর। তিনি টাঙ্গাইলের সা'দত কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এখন বয়স ৬১ বছর। দুই সন্তানের জনক। বর্তমানে টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকায় বসবাস করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ১৯ বছরের টগবগে যুবক বিশ্বজিৎ নন্দী। কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান আব্দুল কাদের সিদ্দিকী এ নির্মম, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গঠন করেন জাতীয় মুক্তি বাহিনী। একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে সেই বাহিনীতে যোগ দেন মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দী। সেই সময়ের অজানা ইতিহাসের সাক্ষী তিনি। 

শুরুতেই বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, জাতির জনকের লাশ যখন ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে ফেলে রেখে সুবিধাভোগীরা ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শকুনের মতো মত্ত, তখন জাতিকে কলঙ্কের দায় থেকে মুক্তি দিতে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রতিবাদে নেমেছিলাম।

শুধু বঙ্গবন্ধুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের চেতনায় খুনিদের বিনাশ করতে আমরা প্রাণ বিসর্জনেও প্রস্তুত ছিলাম। বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, আমার মনে হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুকে যারা সপরিবারে হত্যা করতে পারে, তারা এ দেশের মাটি ও মানুষের আজন্ম শত্রু। তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চেয়েও জঘন্য।

বিশ্বজিৎ নন্দী আরো বলেন, ১৯৭৫ সালের আগস্টে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাড়িতেই ছিলাম। সকালে ঘুম থেকে জেগে বৌদির কাছে জানলাম বেতারে প্রচার হচ্ছে- শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। রক্তে আগুন জ্বলে উঠল। এর এক মাসের মধ্যে যোগাযোগ হয় কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে আবার অস্ত্র হাতে তুলে নেই, অংশ নেই প্রতিরোধযুদ্ধে। তৎকালীন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জাতীয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল ভয়াবহ। ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে এ বাহিনীর পক্ষ থেকে সারা দেশে হরতাল ডাকা হয়। বিভিন্ন দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমিসহ (বিশ্বজিৎ নন্দী) আরো পাঁচজনের দায়িত্ব পড়ে মুক্তাগাছা উপজেলায়। আমরা ছয়জন ১৮ আগস্ট মুক্তাগাছার একটি বাড়িতে আশ্রয় নেই। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের ঘিরে ফেলে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর বিশ্বাসের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারিনি। তাই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ শুরু করি। একটানা আট ঘণ্টা চলে তা। একে একে পাঁচজন শহীদ হয়ে যান। আমার হাতে-পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। সেই অবস্থায় আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, ময়মনসিংহ হাসপাতালে সাত দিন চিকিৎসা চলে। সেখান থেকে ময়মনসিংহ সেনা ক্যাম্পে নিয়ে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর দুই দিন পর টাঙ্গাইল সেনা ক্যাম্পে। তারপর সোজা ঢাকা সেনানিবাসে। প্রায় এক বছর পর আমাকে তুলে দেওয়া হয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। পরে ঠাঁই হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। ১৯৭৭ সালের ১৮ মে ২ নম্বর বিশেষ সামরিক আদালতে আমার ফাঁসির রায় হয়। আমাকে রাখা হয় কনডেম সেলে। সামরিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ ছিল না। বাবা সুধারঞ্জন নন্দী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। সেটিও ঝুলে থাকে। অল্প বয়সী মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টি করে। কনডেম সেল থেকে অনেক বন্দিকে নিয়ে গিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। প্রতি মুহূর্তে ভেবেছি, এরপর হয়তো আমার পালা। এভাবে সাতটি বছর কেটে যায়।

বিশ্বজিৎ নন্দী স্মৃতিচারণা করে বলেন, ১৯৮৪ সালের ১১ এপ্রিল তখনকার প্রধান রাজনৈতিক জোট ১৫ দল এরশাদ সরকারের সঙ্গে বঙ্গভবনে বৈঠক করে। সেখানে পাঁচ দফা দাবির দ্বিতীয়টিতে আমার (বিশ্বজিৎ নন্দীর) মুক্তির বিষয়টি ছিল। এরশাদের সঙ্গে কয়েক দফায় এ নিয়ে আলোচনা হয়। তবু কোনো সুরাহা হচ্ছিল না। এরপর ওই বছরই রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আমার ফাঁসির রায় মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। কনডেমড সেল থেকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্যত্র। আইনের সব প্রক্রিয়া শেষ করে অবশেষে ১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আমি মুক্তি পাই।

বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, অনেকে হয়তো বলবেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে তো আমরা সফল হইনি। অনেকে মারা গেছেন, আমার যৌবনের সেরা সময়টা কারাগারে কেটেছে। আসলে তা নয়। আমরা অবশ্যই সফল হয়েছি। ভবিষ্যতে কেউ কোনো দিন বলতে পারবে না, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ হয়নি। সেই প্রতিবাদের মধ্যদিয়ে বাঙালি জাতি কলঙ্কের দায় থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত হয়েছে।

জীবনে অনেক কিছু থেকে বিশ্বজিৎ নন্দী বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু সে জন্য তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি অকপটে বলেন, ‘নিজে কিছু পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধে যাইনি। একইভাবে নিজের স্বার্থে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করিনি। দেশকে ভালোবেসেছি, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছি। সেই ভালোবাসা থেকেই ভালোবাসার মানুষ হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিরোধযুদ্ধ করি। কেউ কেউ আমাকে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করতে বলেছেন। তাঁদের পরিষ্কার বলে দিয়েছি, দেশকে, জাতিকে যা দেওয়ার তা দিয়েছি। আমার নিজের চাওয়ার কিছু নেই। তাঁরা জানেন, আমি এখনো বেঁচে আছি, কোথায় আছি। তাঁরা কি খোঁজ নিয়েছেন কোনো দিন?

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী হিসেবে স্বীকৃতি চান কি না—জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, এটা চাওয়া-পাওয়ার বিষয় নয়। বিষয়টা হচ্ছে, সত্যকে স্বীকার করা বা না করা। সভ্যতার ক্রমবিকাশে সমাজ বা রাষ্ট্রকে সুস্থ রাখতে যেমন ভালো কাজের প্রশংসা করতে হয়, তেমনি মন্দ কাজের জন্য নিন্দা বা ঘৃণা জানাতে হয়। প্রয়োজনে বিচারের আওতায় নিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হয়। তা না হলে রাষ্ট্র বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ইতিহাস বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে লেখা যাবে না। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখতে গেলে তাঁকে যে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে তার যেমন উল্লেখ থাকতে হবে, তেমনি তাঁর হত্যার প্রতিবাদে যে প্রতিরোধের আগুন জ্বলেছিল তাও লিখতে হবে। তা না হলে ইতিহাস অপূর্ণ থেকে যাবে। বঙ্গবন্ধুর অমরত্বকে খাটো করা হবে, তাঁকে অসম্মান করা হবে।

নি এম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71