মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কবি কালিদাস রায়ে’র ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০১:২০ pm ২৫-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:২০ pm ২৫-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

তাঁর রচিত কাব্যগুলির মধ্যে তাঁর প্রথম কাব্য কুন্দ (১৯০৮), কিশলয় (১৯১১), পর্ণপুট (১৯১৪), ক্ষুদকুঁড়া (১৯২২) ও পূর্ণাহুতি (১৯৬৮) বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। গ্রামবাংলার রূপকল্প অঙ্কনের প্রতি আগ্রহ, বৈষ্ণবপ্রাণতা ও সামান্য তত্ত্বপ্রিয়তা ছিল তাঁর কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য। ১৯২০ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের রংপুর শাখা তাঁকে ‘কবিশেখর’ উপাধি দেয়। পেয়েছেন বহু সম্মান।

বর্ধমান জেলার কড়ুই গ্রামে কালিদাস রায়ের জন্ম। তিনি ছিলেন চৈতন্যদেবের জীবনীকার লোচনদাসের বংশধর। কালিদাসের শৈশব কেটেছিল মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। সেখান থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করেন। কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে টালিগঞ্জে 'সন্ধ্যার কুলায়' নামক নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কালিদাস রায়।

১৯২৮ থেকে শুরু হয় রবিবারের এই বৈকালিক আড্ডা ‘রস চক্র’। এর স্রষ্টা কালিদাস রায় তখন বড়িষা হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। তত দিনে তাঁর কাব্যগ্রন্থ কিশলয়, ঋতুমঙ্গল, লাজাঞ্জলি, পর্ণপুট, রসকদম্ব প্রকাশিত। এর পরেও অসংখ্য কাব্যগ্রন্থ, গদ্য, রম্য রচনা, শিশু সাহিত্য ও পাঠ্যবই লেখার পাশাপাশি বাইশ বছর বাংলার শিক্ষকতা করেছিলেন ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনে। সেকেন্ডারি বোর্ডের বাংলা সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রধান পরীক্ষক পদেও ছিলেন। দীর্ঘদেহী, ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত কালিদাসবাবু ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর সাদাসিধে স্বভাব এবং পাণ্ডিত্যের কারণে। তাঁর ‘ছাত্রধারা’ কবিতা সুপরিচিত বহু প্রজন্মের কাছে।

ছাত্রধারা
বর্ষে-বর্ষে দলে-দলে আসে বিদ্যামঠতলে,
চলে যায় তারা কলরবে,
কৈশোরের কিশলয় পর্ণে পরিণত হয়
যৌবনের শ্যামল গৌরবে |
ভালোবাসি, কাছে ডাকি, নামও সব জেনে রাখি,
দেখাশোনা হয় নিতি-নিতি,
শাসন-তর্জন করি শিখাই প্রহর ধরি,
থাকেনাকো, হায়, কোনো স্মৃতি!
ক-দিনের এই দেখা— সাগর সৈকতে রেখা
নূতন তরঙ্গে মুছে যায় |
ছোট-ছোট দাগ পার ঘুচে যায় একাকার
নব-নব পদ-তাড়নায় |
জানে না কে কোথা যাবে, জোটে হেথা তাই ভাবে
পাঠশালা,— যেন পান্থশালা,
দু-দিন একত্রে মাতে, মেলে-মেশে, বসে গাঁথে
নীতি-হার আর কথা-মালা |
রাজপথে দেখা হলে কেহ যদি গুরু বলে
হাত তুলে করে নমস্কার,
বলি তবে হাসিমুখে— “বেঁচে-বর্তে থাকো সুখে,”
স্পর্শ করি কেশগুলি তার |
ভাবিতে-ভাবিতে যাই— কি নাম? মনে তো নাই,
ছাত্র ছিল কত দিন আগে ;
স্মৃতি সূত্র ধরি টানি, কৈশোরের মুখখানি
দেখি মনে জাগে কি না জাগে |
ঘন-ঘন আনাগোনা কতদিন দোখাশোনা,
তবু কেন মনে নাহি থাকে?
“ব্যক্তি” ডুবে যায় “দলে”, মালিকা পরিলে গলে
প্রতি ফুলে কে বা মনে রাখে?
এ জীবন ভেঙে-গড়ে শ্যামল-সরস করে
ছাত্রধারা বয়ে চলে যায়,
ফেনিলতা-উচ্ছলতা হয়ে যায় তুচ্ছ কথা,
উত্তালতা সকলি মিলায় |
স্বচ্ছতায় শুধু হেরি আমার জীবন ঘেরি
ভাসে শুধু ম্লান মুখগুলি ;
ভুলে যাই হট্টগোল অট্টহাসি-কলরোল,
ম্লান মুখ কখনো না ভুলি |
কেহ বা ক্ষুধায় ম্লান, কেহ রোগে ম্রিয়মান,
শ্মে কারো চাহনি করুণ,
কেহ বা বেত্রের ডরে বন্দী হয়ে রয় ঘরে,
নেত্র কারো তন্দ্রায় অরুণ |
কেহ বাতায়ন-পাশে চেয়ে রয় নীলাকাশে
যেন বদ্ধ পিঞ্জরের পাখি,
আকাশে হেরিয়া ঘুড়ি মন তার যায় উড়ি,
মুখে কালো ছায়াখানি রাখি |
স্মরিয়া খেলার মাঠ কেউ ভুলে যায় পাঠ,
বুদ্ধিতে বা কারো না কুলায়,
কেহ স্মরে গেহকোণ, স্নেহময় ভাইবোন—
ঘড়ি-পানে ঘন-ঘন চায় |
ডাকিছে উদার বায়ু লয়ে সাস্থ লয়ে আয়ু,
ডাক শোনে বসে রুদ্ধ ঘরে,
হাতে মসী, মুখে মসী, মেঘে ঢাকা শিশু-শশী—
প্রতিবিম্বে মোর স্মৃতি ভরে |
আর সবি গেছি ভুলি, ভুলিনি এ মুখগুলি,
একবার মুদিলে নয়ন
আঁখিপাতা ভারি-ভারি, ম্লান মুখ সারি-সারি
আকুল করিয়া তোলে মন |
---------------------------------------
পরিণতি

ইঁদুর বলে বয়স হলে
আমি-ই হব হাতি,
দূর্বা বলে বংশ হব
আমি তো তার নাতি।
রুই কাতলা যা হোক হব
কয় পুঁঠি মাছ হেঁকে,
গুগলি বলে শঙ্খ হব
হুগলী গাঙেই থেকে।।
-------------------------------------
শরতে

ছুটির খবর এসেছে আজ নীল আকাশের পথে !
ও ভাই ছুটী – ছুটী – ছুটী,
আয়না – চোখে দেখনা – ওকে অরুণ আলোর রথে
সোনা – ছড়ায় মুঠি – মুঠি !
তরু লতায়, পাখীর নীড়ে, হর্ষে জড়াজড়ি
সারং – বাজছে বনে বনে,
নূতন নূতন পোষাক পরে’ মেঘ আকাশের পরী
কেমন – সাজছে খনে খনে |
খবর আসার আগেই এল গুপ্ত সুড়ং ধরি’
ছুটী – আজ যে মনে মনে,
কে জানালো ফুলকলিদের, ফুট্ ল কানন ভরি’
যারা-করত ফুটি-ফুটি–
ও ভাই – ছুটী – ছুটী – ছুটী |
কোণা হতে আয় বেরিয়ে সোনা কুড়াই ভাই,
আয় – গায়ে মাঠে মাঠে,
বাতাবি-বন মাতাবি-কে ? শিউলি বোঁটা চাই ?
আয়-বনের বাটে বাটে |
ঢেউয়ের তালে দুবল আজি, কলার ভেলা বাই,
আয় – নদীর ঘাটে ঘাটে,
কাশের বনে হাঁসেন সনে কণ্ঠ ছেড়ে গাই,
আয় – করব লুটোপুটি
ও ভাই – ছুটী – ছুটী – ছুটী |
চাইনা মোরা পায়ে জুতো – চাইনা মাথায় ছাতা,
বনে – ঘুরবো ছায়ে ছায়ে,
সাঁতার কেটে দীঘির জলে মুছব না আজ মাথা,
রোদে – শুকাক্ বায়ে বায়ে |
ফেলবো ছুঁড়ে আজকে শেলেট অঙ্ক কষার খাতা
তারা – লুটুক পায়ে পায়ে,
সরল-ভূগোল, নীতিকুসুম, ধারাপাতের পাতা
ছিঁড়ে – করব কুটি কুটি
ও ভাই – ছুটী – ছুটী – ছুটী |
আয়না সবাই দেখনা ও ভাই কে ওই অরুণ রথে
সোনা – ছড়ায় মুঠি – মুঠি |
ছুটির খবর পেয়েছি আজ নীল আকাশের পথে
ও ভাই – করব ছুটোছুটি — |
-------------------------------------------------
প্রকৃত দাতা

দাতার প্রধান জাফর নিত্য দান করে দুঃখী জনে,
তাহার তুল্য নাহি বদান্য বিশ্বাস মনে মনে |
একদা সহসা উদ্যানমাঝে সান্ধ্যভ্রমণ কালে,
হেরে তার দাস ক্ষুধায় কাতর বসে আছে আলবালে |
দিবস শেষের তিনখানি রুটি প্রাপ্য আহার তার
একে একে দিল কুকুরের মুখে,–বিচিত্র এ ব্যবহার !
কহিল জাফর, ‘ওরে কিঙ্কর, সারাদিন উপবাসী,
দিবস শেষের খাদ্য তাও কুক্কুরে দিলি হাসি ?’
চমকি বান্দা জোড় হাতে কয়,– ‘মানুষ হয়েছি ভবে,
আজিকে ভাগ্যে না হয় আহার, কালি পুনরায় হবে |
খোদার এ জীবে আহার কে দিবে ? ক্ষুধায় বাঁচাবে কেবা ?
মোরা যে ধরাতে এসেছি করিতে নিখিল জীবের সেবা |’
কহিল জাফর আঁখি ছল ছল– ‘ আবিসিনিয়ার দাস,
আজিকে দর্প করিলি চূর্ণ, ছিঁড়ে দিলি মোহ-পাশ |
গুরুর মন্ত্র কানে দিলি তুই, দে রে কোল, বুকে আয় ;
দুর্দিনে ধীর সেরা দানবীর তুই দীন-দুনিয়ায় |
রাজকোষ যে বা মুক্ত করেছে দাতা নাহি কই তারে,
সেই ত্যাগ-বীর বুকের রুধির হেলায় যে দিতে পারে |
রে চির বান্দা, নহিস বনদী– দিলাম মুক্তি প্রাণ,
এই বাগিচার মালিক হইয়া প্রাণ ভরে কর দান |’

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71