বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
কবি নবীনচন্দ্র সেনর ১৭০তম জন্ম বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১০:৫২ pm ১০-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৩০ am ১১-০২-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

কবি নবীনচন্দ্র সেন (জন্মঃ- ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৭ - মৃত্যুঃ- ২৩ জানুয়ারি, ১৯০৯)

তাঁর প্রথম বই "অবকাশরঞ্জিনী"র প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৮৭১ সালে এবং এর দ্বিতীয় খন্ড প্রকাশিত হয় ১৮৭৮ সালে। এটি ছিলো দেশপ্রেম ও আত্মচিন্তামূলক কবিতার সংকলন। কিন্তু তাঁর কবিখ্যাতি পরিপূর্ণতা পায় ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত পলাশীর যুদ্ধ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হবার পর। নবীনচন্দ্রের কাব্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাব্য হচ্ছেঃ ১। পলাশির যুদ্ধ-১৮৭৫, ২। রৈবতক- ১৮৮৭, ৩। কুরুক্ষেত্র-১৮৮৩ ও ৪। প্রভাস-১৮৯৭ শেষের কাব্য তিনটি একটি বিরাট কাব্যের তিনটি স্বতন্ত্র অংশ। এই কাব্য তিনটিতে কৃষ্ণচরিত্রকে কবি বিচিত্র কল্পণায় নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কবির মতে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির সংঘর্ষের ফলে কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ হয়েছিল। এবং আর্য অনার্য দুই সম্প্রদায়কে মিলিত করে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমরাজ্য স্থাপন করেছিলেন। নবীনচন্দ্রের অন্যান্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ১। ক্লিওপেট্রা (১৮৭৭), ২। অমিতাভ (১৮৯৫), ৩। রঙ্গমতী (১৫ই জুলাই ১৮৮০) এবং ৪। খৃষ্ট (১৮৯০)। নবীনচন্দ্র কিছু গদ্যরচনাও করেছিলেন। তাঁর আত্মকথা "আমার জীবন" উপন্যাসের মত একটি সুখপাঠ্য গ্রন্থ। আত্মজীবনীতে স্মৃতিকথায় নবীনচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর পরিচয়-হৃদ্যতা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেন। আমার জীবন পাঁচ খণ্ডে সামাপ্ত করেণ তিনি। এছাড়াও তিনি ভানুমতী নামে একটি উপন্যাসও রচনা করেছিলেন। তিনি ভগবতগীতা এবং মার্কণ্ডেয়-চণ্ডীরও পদ্যানুবাদ করেছিলেন।

জন্ম ও পরিবার
চট্টগ্রাম জেলার নোয়াপাড়ায় তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা গোপীমোহন রায় এবং মাতা রাজ রাজেশ্বরী। নবীন চন্দ্র সেনের আদি পূর্বপুরুষরা ছিলেন বৌদ্ধ সেন এবং পূর্বপুরুষ রাজারাম ঢাকা নবাবের নিকট থেকে "রায়" উপাধি লাভ করেছিলেন। তারা জাতিতে ছিলেন বৈদ্য। "রায়" সম্মান উপাধিটা ব্যবহার না করে তারা "সেন" উপাধিটাই ব্যবহার করতেন শুধুমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন এই দেশপ্রেমিক কবির পিতা গোপীমোহন, তিনি ঢাকা নবাবের সম্মানার্থে এই "রায়" উপাধিটা ব্যবহার করতেন। পিতার ‘রায়’ উপাধি বাদ দিয়ে তিনি কেন ‘সেন’ উপাধি ব্যবহার করতেন তা জানা যায় না। পরিবারটি বিশাল সম্পত্তি ও গৌরবময় ঐতিহ্যের অধিকারী ছিল। পিতার প্রজাবৎসল সহজ-সরল-উদার মানসিকতার কারণে যথেষ্ট সুনাম ছিল। গোপীমোহন ছিলেন চট্টগ্রামের জজ আদালতের পেস্কার, পরে আইন পড়ে মুন্সেফ ও উকিল হন। নবীনচন্দ্র ১৮৬৩ সালে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথমশ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৬৫ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পাশ করেন। তিনি ভর্তি হন স্কটিশচার্চ কলেজে। ১৮৬৮ সালে বিএ পাশ করেন। 
...কর্মজীবন...
হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ পান। কিছুদিন পরে বেকার হয়ে পড়েন। এসময় তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়। তখন বিদ্যাসাগরের অর্থসাহায্যে এবং ছাত্র পড়িয়ে নবীনচন্দ্র কোলকাতায় নিজের ব্যয় ও চট্টগ্রামের পোষ্যবর্গের ব্যয় নির্বাহ করেন। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট নিয়োগের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে উত্তীর্ণ হন। প্রথমে ১৭ জুলাই ১৮৬৮ বেঙ্গল সেক্রেটারীয়েটের এসিষ্ট্যাণ্ট পদে যোগ দেন। ২৪ জুলাই ১৮৬৯ যশোরে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদে তাঁকে পদায়ন করা হয়। এর পর ১৯০৪সালের ১ জুলাই পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বৎসর নবীনচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর রূপে উপমহাদেশের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্নস্থানে শাসনকার্য পরিচালনা করেন দক্ষতা ও যোগ্যতা সহকারে। তিনি দুই দফায় মোট প্রায় আটবছর ফেনীতে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এসময় তিনি অনন্য কর্মদক্ষতায় একটি জঙ্গলাকীর্ণ স্থানকে মনোরম শহরে পরিণত করেন। ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ফেনী হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যা বর্তমানে ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল।
.......
আত্মজীবনীতে স্মৃতিকথায় নবীনচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর পরিচয়-হৃদ্যতা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেন।
নবীনচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ থেকে বয়সের তুলনায় চৌদ্দ বছরের বড়। নবীনচন্দ্র ছিলেন নিষ্ঠাবান হিন্দু, আর রবীন্দ্রনাথ ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্ম। নবীনচন্দ্র ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জমিদারের ছেলে জমিদার, জীবনে কখনো চাকরি করেননি। মিল বলতে দু’জনেই আপাদমস্তক কবি ছিলেন, অবশ্য দু’জনের কাব্যসাধনায়-কাব্যধারায় যথেষ্ট গুণগত পার্থক্য বিরাজমান ছিল। রবীন্দ্রনাথের সাথে নবীনচন্দ্র সেনের প্রথম পরিচয় সাক্ষাৎ ঘটে ‘হিন্দু মেলা’তে ১৮৭৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে। কলকাতার উপনগরস্থ রাজা বদনচাঁদের টালার বাগানে ঐদিন ছিল হিন্দু মেলার একাদশ অধিবেশন। এবারের মেলায় বালক রবীন্দ্রনাথ একটি গান ও দিল্লি দরবার বিষয়ক একটি কবিতা নিয়ে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-এর সাথে মেলায় এসেছিলেন। সবিশেষ উল্লেখ্য, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে নবীনচন্দ্র সেনের সহপাঠী ছিলেন অর্থাৎ পূর্ব পরিচিত। মেলাস্থলে পুলিশী তান্ডবের ফলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠান পন্ড হয়ে যায়। অবশ্য সভাস্থলে না হলেও রবীন্দ্রনাথ মেলা প্রাঙ্গণে কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন এবং গানটি শুনিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তৎকালীন পত্রিকা ‘সাধারণী’র প্রতিবেদক লেখেন :
“রবীন্দ্র বাবু ‘দিল্লীর দরবার’ সম্পর্কে একটি কবিতা এবং একটি গীত রচনা করিয়াছিলেন। আমরা একটি প্রকান্ড বৃক্ষ ছায়ায় দুর্কাসনে উপবিষ্ট হইয়া তাঁহার কবিতা এবং গীতটি শ্রবণ করি। রবীন্দ্র এখনও বালক, তাঁহার বয়স ষোল কি সতের বৎসরের অধিক হয় নাই (রবীন্দ্রনাথের বয়স এখন পনেরো বছর ন’মাসের কিছু বেশি)। তথাপি তাঁহার কবিত্বে আমরা বিস্মিত এবং আর্দ্রিত হইয়াছিলাম, তাঁহার সুকুমার কক্তের আবৃত্তির মাধুর্যে আমরা বিমোহিত হইয়াছিলাম।....একজন সুপরিচিত কবিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি দ্রাবিত হৃদয়ে বলিলেন যখন এই কলি প্রস্ফুটিত কুসুমে পরিণত হইবে, তখন দুঃখিনী বঙ্গের একটি অমূল্য রত্ন লাভ হইবে।...”
‘সাধারণী’র প্রতিবেদক কর্তৃক উল্লেখিত ‘সুপরিচিত কবি’ হচ্ছেন নবীনচন্দ্র সেন। নবীনচন্দ্র তাঁর ‘আমার জীবন’ আত্মজীবনী গ্রন্থের ৪র্থ খন্ডে সেই দিনের স্মৃতিটা প্রকাশ করেন নিম্নরূপে:
“স্মরণ হয়, ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দে (১৮৭৭ হবে) আমি কলিকাতায় ছুটিতে থাকিবার সময় কলিকাতার উপনগরস্থ কোনও উদ্যানে “ন্যাশনাল মেলা’ দেখিতে গিয়াছিলাম।...একজন সদ্য পরিচিত বন্ধু মেলার ভিড়ে আমাকে ‘পাকড়াও’ করিয়া বলিলেন যে, একটি লোক আমার সঙ্গে পরিচিত হইতে চাহিতেছেন। তিনি আমার হাত ধরিয়া উদ্যানের এক কোণায় একটি প্রকান্ড বৃক্ষতলায় লইয়া গেলেন। দেখিলাম, সেখানে সাদা ঢিলা ইজার চাপকান পরিহিত একটি সুন্দর নব-যুবক দাঁড়াইয়া আছেন। বয়স ১৮/১৯, শান্ত, স্থির। বৃক্ষতলায় যেন একটি স্বর্ণ-মূর্তি স্থাপিত হইয়াছে। বন্ধু বলিলেন-‘ইনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ।’ তাঁহার জ্যেষ্ঠ জ্যোতিরিন্দ্র নাথ প্রেসিডেন্সী কলেজে আমার সহপাঠী ছিলেন। দেখিলাম, সেই রূপ, সেই পোশাক। সহাসীমুখে করমর্দ্দন কার্য্যটা শেষ হইলে, তিনি পকেট হইতে একটি ‘নোট বুক’ বাহির করিয়া কয়েকটি গীত গাহিলেন ও কয়েকটি কবিতা গীতকক্তে পাঠ করিলেন। মধুর কামিনী-লাঞ্ছন কণ্ঠে, এবং কবিতার মাধুর্য্যে ও স্ফুটোম্মুখ প্রতিভায় আমি মুগ্ধ হইলাম।....”
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে এ সম্পর্কে উল্লেখ করেন: 
“...সেটা (দিল্লি দরবার) পড়িয়াছিলাম হিন্দু মেলায় গাছের তলায় দাঁড়াইয়া। শ্রোতাদের মধ্যে নবীন সেন মহাশয় উপস্থিত ছিলেন। আমার বড়ো বয়সে তিনি একথা আমাকে স্মরণ করাইয়া দিয়াছিলেন।”
পরিচয়ের পর থেকে তাঁদের মধ্যেকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছিল। আতিথ্য গ্রহণ, একসাথে সাংগঠনিক কর্মসাধন, পত্রবিনিময়, লেখার উপর মতামত প্রদানের মধ্যে দিয়ে বয়সের ব্যবধান ঘুচিয়ে তাঁর পরস্পরের নৈকট্যে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। সাংগঠনিক কাজে-কর্মে তাদের মধ্যে মতান্তর ঘটলেও কখনো মনান্তর ঘটেনি।
উপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু পরবর্তী শোকসভা (২৮ এপ্রিল ১৮৯৪)’র আয়োজন করা হলে আয়োজকরা বঙ্কিম স্নেহভাজন কবি নবীনচন্দ্র সেনকে সভাপতি মনোনীত করেন। কিন্তু নবীন চন্দ্র শোকসভার আয়োজনকে পাশ্চাত্য ঘরানার বলে সভাপতিত্ব করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে নবীনচন্দ্র সেন স্মৃতিকথা ‘আমার জীবন’-এর ৫ম খন্ডে লিখেছেন:
“সভা-শ্রাদ্ধ গড়াইতে গড়াইতে এখন ইংরাজের অনুকরণে ‘শোক-সভা’ পর্যন্ত আরম্ভ হইয়াছে। বঙ্কিম বাবুর জন্য ‘শোক-সভা’ হইবে, রবি বাবু শোক-প্রবন্ধ পাঠ করিবেন, তাহার সভাপতিত্ব করিতে আমি আহূত হইয়াছিলাম। আমি উহা অস্বীকার করিয়া লিখিলাম যে, সভা করিয়া কিরূপে শোক করা যায়, আমি হিন্দু তাহা বুঝি না।.... ‘শোক-সভা’ সম্বন্ধে আমার উপরোক্ত মতের প্রতিবাদ করিয়া, রবি বাবুর ‘সাধনাতে এক প্রবন্ধ বাহির ‘হইয়াছিল।’ 
রবীন্দ্রনাথ নবীনচন্দ্রের মতের বিরোধীতা করে ‘শোক-সভা’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেন, প্রবন্ধটি ‘সাধনা’র জ্যৈষ্ঠ (১৩০১ সংখ্যায় ছাপানো হয়। রবীন্দ্রনাথ তাতে ‘য়ুরোপীয়তা নামক মহাদ্দোষে দুষ্ট’ বলে শোকসভা করার প্রথাকে নিন্দা করা উচিত নয় বলে মত দেন। ‘শোক-সভা’ প্রবন্ধে বলেন:
“যাঁহারা বঙ্কিমের বন্ধুত্ব সম্পর্কে আপনাদিগকে গৌরবান্বিত জ্ঞান করেন এমন অনেক খ্যাতনামা লোক সভাস্থলে শোক প্রকাশ করা কৃত্রিম আড়ম্বর বলিয়া তাহাতে যোগদান করিতে অসম্মত হইয়াছেন এবং সভার উপযোগীগণকে ভর্‌ৎসনা করিতেও ক্ষান্ত হন নাই। এরূপ বিয়োগ উপলক্ষ্যে আপন অন্তরের আবেগ প্রকাশ্যে ব্যক্ত করাকে বোধ করি তাঁহারা পবিত্র শোকের অবমাননা বলিয়া জ্ঞান করে...যেমন আমাদের দেশে পিতৃশ্রাদ্ধ প্রকাশ্যে সভায় অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে এবং প্রত্যেক পিতৃহীন ব্যক্তির পিতৃশোক ব্যক্ত করা প্রকাশ্য কর্তব্যস্বরূপে গণ্য হয় তেমনি পাব্লিকের হিতৈষী কোনো মহৎ ব্যক্তির মৃত্যুতে প্রকাশ্য সভায় শোক জ্ঞাপন একটা সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে গণ্য হওয়া উচিত।....তাঁহারা বঙ্কিমের নিকট হইতে কেবলমাত্র উপকার পান নাই, বন্ধুত্ব পাইয়াছেন, তাঁহারা কেবল রচনা পান নাই, রচয়িতাকে পাইয়াছেন।....তাঁহাদের বন্ধুকে কেবল তাঁহাদের নিজের স্মরণের মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিলে যথার্থ বন্ধু ঋণ শোধ করা হইবে না।”
উপরোক্ত আলোচনা থেকে সহজে উপলদ্ধি করা যায় কবি নবীনচন্দ্র সেনের চেয়ে রবীন্দ্রনাথ নবীন হলেও অনেক আধুনিক চিন্তার মানুষ ছিলেন। তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, বঙ্কিম শোকসভা নিয়ে পরস্পরের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে সদ্ভাব বজায় ছিল, ঘটেছে পত্রবিনিময়। একই বছর (১৮৯৪) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ও দুই সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে রমেশচন্দ্র দত্ত, নবীন চন্দ্র সেন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নবীনচন্দ্রের একটি পত্রের উত্তরে একই সালের ৯ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ লিখেন :
“আপনার স্নেহপূর্ণ পত্রখানি পাইয়া অত্যন্ত প্রীতিলাভ করিয়াছি। হিন্দুমেলায় যখন আপনাকে প্রথম দেখি (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৭) তখন আমি অখ্যাত অজ্ঞাত এবং আকারে আয়তনে ও বয়সে নিতান্তই ক্ষুদ্র-তথাপি আমি যে আপনার লক্ষ্য পথে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তখনও আপনি যে আমাকে মন খুলিয়া অপর্যাপ্ত উৎসাহবাক্য বলিয়াছিলেন তাহা আমার পক্ষে বিস্মৃত হওয়া অকৃতজ্ঞতা মাত্র-কিন্তু আপনি যে সেই ক্ষুদ্রবালকের সহিত ক্ষণকালের সাক্ষাৎ আজও মনে করিয়া রাখিয়াছেন তাহাতে আপনার মাহাত্ম্য প্রকাশ পাইতেছে। 
...যদিও আমি বয়সে আপনার অপেক্ষা অনেক ছোট হইব তথাপি দৈবক্রমে বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসে আপনার নামের নিম্নে আমারই নাম পড়িয়াছে-
আপনি নবীন কবি, আমি নবীনতর। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদেও ঐতিহাসিক পর্যায় রক্ষা করিয়া আপনার নিম্নে আমার নাম লিপিবদ্ধ হইয়াছে। অতএব সর্ব্বসম্মতিক্রমে আপনার নামের নিম্নে নাম স্বাক্ষর করিবার অধিকার আমি প্রাপ্ত হইয়াছি-আশা করি ইতিহাসের শেষ অধ্যায় পর্য্যন্ত এই অধিকারটি আমি রক্ষা করিতে পারিব।”
মহৎ হৃদয়ের অধিকারী নবীনচন্দ্র সেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অনেক উঁচু ধারণা মনে পোষণ করতেন। একদিন যে এই কবি বাংলা সাহিত্যে তাঁদের সকলকে ছাড়িয়ে সর্ব উঁচু আসন নেবেন সেই ব্যাপারে নবীনচন্দ্র নিঃসন্দেহ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের উক্ত পত্রটির কথা স্মরণ করে নবীনচন্দ্র ‘আমার জীবন’ ৪র্থ খন্ডের স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন:
“স্মরণ হয়, ইহার প্রতিবাদ করিয়া আমি লিখিয়াছিলাম, আমার নিম্নে তাঁহার স্থান হইলে আমিও বঙ্গ সাহিত্য, উভয়ে নিরাশ হইব। তাঁহার স্থান অযোগ্যের বহু ঊর্ধ্বে হইবে।”
এভাবে দুই কবির মধ্যে পত্রবিনিময়ের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা-প্রীতির বন্ধন সুন্দর থেকে সুদৃঢ় হয়েছিল। তা উপলদ্ধির জন্য এখানে নবীনচন্দ্র সেনের চিঠির প্রতি উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ১৩ আগস্ট ১৮৯৪ শিলাইদহ থেকে লিখেছিলেনঃ
“লেখকের জীবনে মাঝে মাঝে অনেকগুলো অচিন্ত্যপূর্ব্ব আনন্দের বিষয় ঘটিয়া থাকে। কখন আপনাদের গৃহের একপ্রান্তে আমি একটু খানি প্রীতির আসন অধিকার করিয়াছিলাম তাহা আমি জানিতেও পারি নাই। আপনার পুত্র যে আমার পত্রোত্তরের জন্য আগ্রহ সহকারে প্রতীক্ষা করিয়াছিলেন, তাহা আমার আশার অতীত। তাহাকে আমার আশীর্বাদ জানাইয়া কহিবেন, তাহার কল্পনার রবিবাবু যে গোপন প্রীতি উপহার পাইতেছে বাস্তব রবিবাবু সশরীরে সেই প্রীতি গ্রহণ করিবার চেষ্টা করিবে, কিন্তু বাস্তবে কল্পনায় বিরোধ বাধিলে বাস্তবকে বহুল পরিমাণে মার্জনা করিয়া লইতে হইবে।”
পত্র-বিনিময়ের মাধ্যমে দু’কবির মধ্যে সৌজন্য-বিনিময়ের যেমন ইতিবাচক প্রতিযোগিতা ছিল, তেমনি চিঠিগুলোতে ছিল ভাবরস ও সাহিত্যরসবোধের অপূর্ব প্রকাশ। নবীনচন্দ্র সেনের আরেকটি পত্রের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ ২২ আগস্ট ১৮৯৪ তারিখ লিখেছিলেন:
“আমার নমস্কারগুলি আপনার পত্রযোগে ফেরৎ পাইলাম এবং সেই সঙ্গে আপনার শতকোটি প্রণাম আসিয়াও পৌঁছয়াছে অত্র রসিদদ্বারা জানাইলাম।... আপনার পুত্রকে যে একটি চন্দ্রবিন্দু ‘তাহাকে’ শব্দযোগে পাঠাইয়াছিলাম সে যদি তাহার বয়সের পক্ষে গুরুতর হইয়া থাকে তবে সেটা ভবিষ্যতের জন্য রাখিয়া দিতে আমার কোন আপত্তি নাই।... আমার ভক্তটির মুখে আমার রচিত গান শুনিবার জন্য বড় ইচ্ছা হইয়াছে, এ ইচ্ছা আমি পূর্ণ করিবই সেজন্য আপনাদের পক্ষ হইতে কোনরূপ চেষ্টাই আবশ্যক হইবে না।”
বুঝা যায় তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক ব্যক্তি পর্যায় থেকে পরিবার পর্যন্ত গড়িয়েছিল। নবীনচন্দ্রের অনুরোধে (সম্ভবত) রবীন্দ্রনাথ একবার ২ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ তারিখ কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে রানাঘাটে নবীনচন্দ্রের বাসায় আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। নবীনচন্দ্র তার আত্মজীবনীতে দীর্ঘ বর্ণনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের আতিথ্য গ্রহণ স্মরণীয় করে রেখে গেছেন। দুই কবির চারিত্র মাহাত্ম্য উপলব্ধির জন্য ‘আমার জীবন’-এর ৪র্থ খন্ড থেকে ইহার অংশ বিশেষ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
“ইহার কিছু দিন পরে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) তাহার জমিদারী কার্য্যে কুষ্টিয়া যাইবার পথে একদিন প্রাতে নিমন্ত্রিত হইয়া ১০টার ট্রেনে দয়া করিয়া রানাঘাটে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন। আমার একজন আত্মীয় তাহাকে স্টেশন হইতে অভ্যর্থনা করিয়া আনিলে, তিনি যখন গাড়ী হইতে নামিলেন, দেখিলাম, সেই ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের (১৮৭৭) নবযুবকের আজ পরিণত যৌবন। কি শান্ত, কি সুন্দর, কি প্রতিভান্বিত দীর্ঘাবয়র! উজ্জ্বল গৌর বর্ণ; স্ফুটোন্মুখ পদ্মকোরকের মত দীর্ঘ মুখ; মস্তকে মধ্যভাগ-বিভক্ত কুঞ্চিত ও সজ্জিত ভ্রমরকৃষ্ণ কেশশোভা, কুঞ্চিত অলক-শ্রেণীতে সজ্জিত সুবর্ণ দর্পনোজ্জ্বল ললাট; ভ্রমরকৃষ্ণ গুম্ফ ও খর্ব্ব শ্মশ্রুশোভান্বিত মুখমণ্ডল; কৃষ্ণ পক্ষযুক্ত দীর্ঘ ও সমুজ্জ্বল চক্ষু; সুন্দর নাসিকায় মার্জিত সুবর্ণের চশমা।... মুখাবয়ব দেখিলে চিত্রিত খ্রীস্টের মুখ মনে পড়ে। পরিধানে সাদা ধুতি, সাদা রেশমী পিরান ও রেশমী চাদর, চরণে কোবল পাদুকা...”
ছবিতে আমরা রবীন্দ্রনাথের যেই শারীরিক সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধ হই, তা যেন বাঙময় হয়ে ফুটে উঠেছে কবি নবীনচন্দ্র সেনের অসাধারণ ও যথাযথ শব্দ প্রয়োগের এবং কাব্যিক বর্ণনার মাধুর্যে। এ সময় নবীনচন্দ্রের চৌদ্দ বছর বয়স্ক পুত্র নির্মল তাদেরকে তার বাবার রচিত গান শুনালেন, রবীন্দ্রনাথ নির্মলের গানের গলার প্রশংসা করলেন। রবীন্দ্রনাথও তার রচিত কয়েকটি গান ও কীর্তন পেয়ে শোনালেন। কথা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বঙ্কিমবাবুর ‘বন্দে মাতরম’ গানটি মুখস্থ নাই বলাতে নবীনচন্দ্র মৃদু কটাক্ষ করে লিখছেন:
“তিনি (রবীন্দ্রনাথ) বাঙালি অন্য কাহারও গান যে জানেন, কি বাঙালি অন্য কাহারও কাব্য যে পড়িয়াছেন, তাহার কথায় বোধ হইল না...”
এখানে সমসাময়িক অন্যান্য গীতিকারদের গানের প্রতি, অন্যান্য কবিদের কবিতার প্রতি রবীন্দ্রনাথ যে মনোযোগ দেন না তা নবীনচন্দ্র বুঝাতে চেয়েছেন; এতে রবীন্দ্রনাথের আত্মম্ভরিতা প্রকাশ পেয়েছে। নবীনচন্দ্র তার মহান অতিথির আদর-আপ্যায়নে সৌজন্যতার ও আন্তরিকতার ত্রুটি করেন নি। নবীনচন্দ্র আরো লিখেন:
“দুজনে বহুক্ষণ গল্প করিতে করিতে আহার (মধ্যাহ্ন ভোজন) করিলাম, এবং আহার করিতে করিতে সাহিত্য ও বহু বিষয়ে আলাপ করিলাম। অপরাহ্নে গাড়ি করিয়া তাহাকে রানাঘাট দেখাইতে ও বেড়াইতে বাহির হইলাম।... নগরভ্রমণ হইতে ফিরিয়া আসিলাম। রাত্রির আহারে বাবু সুরেন্দ্রনাথ পাল চৌধুরী মহাশয়কেও নিমন্ত্রণ করিয়াছিলাম। কিছুক্ষণ রবিবাবুর ও নির্মলের গান হইল। পরে টেবিলে পানাহার বড় আনন্দের সহিত চলিতে লাগিল।” কিন্তু সারা দিন রবিবাবুর মাপা কথা, মাপা হাসি, মাপা আচরণে নবীনচন্দ্র ভেতরে ভেতরে অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন। তাই কথা প্রসঙ্গে বলেই ফেললেন:
“রবিবাবু! সমস্ত দিন আপনার চাপা কথা ও চাপা হাসিতে বড় জ্বালাতন হয়েছি।”... দোহাই আপনার! আপনি একবার আমাদের মত প্রাণ খুলিয়া হাসিয়া কথা বলুন! তিনি এবার খুব হাসিলেন।”
তেমন খাচ্ছেন না দেখে নবীনচন্দ্র মহান অতিথি আপ্যায়নে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলে পর সৌজন্যতার বরপুত্র রবীন্দ্রনাথ বলেন:
“আমাকে ক্ষমা করিবেন। বধূঠাকুরাণী সকালে একদিকে আমার প্রতি ৫৩ রকমের ব্যঞ্জনাস্ত্র নিক্ষেপ করিয়াছিলেন। তাহাতে আপনার আলাপেও এরূপ একটা মোহিনী শক্তি (charm) আছে যে, আমি তাহাতে মুগ্ধ হইয়া সকালে অতিরিক্ত আহার করিয়া ফেলিয়াছি। এখন আর বোঝা লইতে পারিতেছি না।”
অতিথিপরায়ণ নবীনচন্দ্র-ও কম যান না! তিনি লেখেন:
“আমি বলিলাম- ‘এ কেবল শিষ্টাচারের কথা। কলিকাতার বৈঠকখানার বীরকে (Hero of the calcutta of rawing room) আমি গরীব কি খাওয়াইতে পারি? আর আলাপ! আমি ‘বাঙ্গালের আলাপে রবিবাবুকে মুগ্ধ করিবার শক্তি থাকিবারই ত কথা!... আহারান্তে আমি ও সুরেন্দ্রবাবু উভয়ে রবিবাবুকে নিশীথ সময়ে গোয়ালন্দ মেলে তুলিয়া দিয়া জীবনের একটি দিন বড় আনন্দে কাটাইয়া বাড়ি ফিরিলাম।”
নবীনচন্দ্রের এই আন্তরিক আতিথেয়তায় এমনিতেই রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ, তার ওপর পেলেন নবীনচন্দ্রের কাছ থেকে তাকে অতিথি হিসেবে পাওয়ার জন্য আনন্দ ও সৌভাগ্য প্রকাশপূর্বক চিঠি। তাই প্রত্যুত্তরে ১৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ তারিখ পতিসর থেকে রবীন্দ্রনাথ নবীনচন্দ্রকে যেই চিঠি লিখেন তা সৌজন্যবোধে ও সাহিত্যমানে অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেন-
“... দিন কতক আমি এমনই কাজে ব্যস্ত ছিলাম যে নিঃশ্বাস লইবার অবকাশ ছিল না- এ কয়দিন নিঃশ্বাস লইবার উপযুক্ত বাতাসেরও অপ্রতুল ছিল। সেইজন্য এতদিন আপনাকে লিখিতে পারি নাই।... কিন্তু এমন কখনও মনে করিবেন না যে, আপনাদের স্নেহ এবং আদর আমি বিস্মৃত হইয়াছি বিশেষতঃ অলক্ষ্য হইতে বউ ঠাকুরাণী সাদৃশ ক্ষুদ্রশক্তি স্বল্পক্ষুধা ক্ষীণ ব্যক্তির প্রতি যে স্নেহপূর্ণ এবং ছত্রিশ ব্যঞ্চনাপূর্ণ পরিহাস ও পরীক্ষা প্রয়োগ করিয়াছিলেন তাহাও ভুলিবার বিষয় নহে। তাহাকে জানাইবেন যে, তাহার আয়োজনের মধ্যে ব্যঞ্জন অংশ নিঃশেষ করিতে আমি অশক্ত হইয়াছিলাম কিন্তু স্নেহ অংশটুকু সম্পূর্ণরূপেই সম্ভোগ করিয়াছিলাম এবং তাহা ব্রাহ্মণসুলভ লোভবশতঃ সঙ্গে বাঁধিয়াও আনিয়ছি।”
এই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ রায় রামানন্দের বিখ্যাত পদ ‘পহিলহি রাগ নয়ন ভঙ্গ ভেল’ পদটির অর্থব্যাখ্যা ও ‘এসো এসো ফিরে এসো’ গানটি কপি করে পাঠান। চিঠিতে নবীনচন্দ্রের একটি গ্রন্থ মাসিক পত্রিকায় সমালোচনা করে দেবেন বলে উল্লেখ করেছিলেন। নবীনচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যেকার এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ সুসম্পর্ক বলা যায় নবীন চন্দ্রের শেষ জীবন পর্যন্ত বলবৎ ছিল। নবীনচন্দ্রের ‘আমার জীবন’ এবং রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আরো কিছু পত্র থেকে তা অনুমান করা যায়। ছেলে নির্মলচন্দ্র ব্যারিস্টারী পড়বার জন্য বিলেত যাওয়ার প্রাক্কালে পুত্রের জন্য নবীনচন্দ্র বিলেতের কয়েকটি পরিচয়-পত্র চাইলে রবীন্দ্রনাথ ১০ আগস্ট ১৯০১ তারিখ চিঠিতে লেখেন:
“আমার দলের লোক বিলাতে এখন আর কই? পরিচিতবর্গের মধ্যে একমাত্র আমি (আশুতোষ চৌধুরীর ভ্রাতা অমিয়নাথ) আছে, সে সিভিল সার্ভিস পড়িতেছে- এই আগস্ট মাসে পরীক্ষা দিবে। সেত আপনারও পরিচিত। তবু তাহাকে একখানা চিঠি লিখিয়া দিলাম।... আর জগদীশ বসু অল্পকালের জন্য গিয়াছেন, তাহার স্ত্রীকেও একখানি পত্র দিলাম। কোন ভাল ইংরাজ পরিবারে আশ্রয় গ্রহণ করিলেই আমার মতে সবচেয়ে ভাল হয়।”
রবীন্দ্রনাথ নবীন চন্দ্রের কাব্য সম্পর্কেও তাঁর অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নবীন চন্দ্রের কাব্যমান তথা রচনা সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোষণ করতেন না। যেমন- ‘অবকাশরঞ্জিনী’ (দ্বিতীয় ভাগ) সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেন:
“এই মুহূর্তে আমার হস্তে অবকাশরঞ্জিনী দ্বিতীয় ভাগ (নবীন চন্দ্র সেন প্রণীত, প্রথম প্রকাশ : মাঘ ১২৮৪) রহিয়াছে। সমস্ত বহি খুঁজিয়া দুই একটি মাত্র স্বভাব বর্ণনা দেখিলাম। তাহাও এমন নির্জ্জীব ও নীরস, যে, পড়িয়া স্পষ্ট মনে হয়, কবি যাহা বর্ণনা করিতেছেন, প্রাণের সহিত তাহা উপভোগ করেন নাই। লেখা আবশ্যক বিবেচনায় লিখিয়াছেন।” 
নবীন চন্দ্র শেষ জীবন পুত্রের সাথে রেঙ্গুনে কাটান। তখনও তাঁদের মধ্যে পত্র বিনিময় হতো, পরস্পরের প্রতি নিজেদের লেখা বই উপহার স্বরূপ প্রেরণ করা হতো। ১৯০৭ সালে রবীন্দ্রনাথের চট্টগ্রাম আগমণকালে সম্ভবত নবীন চন্দ্র সেন পুত্রের সাথে রেঙ্গুনে বসবাস করছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় নবীন চন্দ্র মাতৃভূমি চট্টগ্রামে চলে আসেন, ১৯০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক মৃত কবির স্মৃতি-চিহ্ন-স্থাপনার্থ একটি কমিটি গঠিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঐ কমিটির অন্যতম সদস্য। চট্টগ্রাম সম্মিলনও কবির স্মৃতি রক্ষার জন্য সচেষ্ট হলো। কীভাবে নবীন চন্দ্রের স্মৃতি রক্ষা করা যায় তা জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম-সম্মিলনী’র সম্পাদক রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেন। রবীন্দ্রনাথ এক পত্রে সম্পাদককে তাঁর অভিমত প্রকাশ করেন। অভিমত তথা চিঠিটির গুরুত্ব এখনো আছে বিধায় চিঠিটি হুবহু উপস্থাপন করা হলো:
“সবিনয় নিবেদন,
আপনারা আমাকে কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াছেন। কবির স্মৃতি-রক্ষা কেমন করিয়া করিতে হইবে? সে জন্য ত কাহাকেও চেষ্টা করিতে হয় না। কৃত্তিবাসের স্মৃতি নিজেকেই নিজে এত কাল রক্ষা করিয়া আসিয়াছে। যাঁহারা বড় কবি তাঁহারা নিজের কাব্যেই নিজের তাজমহল তৈরি করিয়া যান। 
বর্তমানকালে ছবি বা পাথরের মূর্তি প্রতিষ্ঠার দ্বারা সম্মান প্রকাশের চেষ্টা হইয়া থাকে। সাহিত্য-পরিষদ যদি সেরূপ কোনো প্রতিমূর্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন তাহাতে দোষ দেখি না। কিন্তু আমাদের দেশে মেলাই মৃত মহাত্মাদের প্রতি সম্মান প্রকাশের উপায়রূপে প্রচলিত। জয়দেবের বিখ্যাত মেলা তাহার প্রমাণ শুনিয়াছি সিন্ধুদেশের কোনো লোক-বিখ্যাত কবির মৃত্যু দিনের মেলায় সেখানকার লোকেরা সমস্ত রাত্রি সেই কবির কাব্য গান করিয়া থাকে। কত কাল হইতে বর্ষে বর্ষে এই প্রথা চলিয়া আসিতেছে এ জন্য কোনো সভা সমিতি বা চাঁদার প্রয়োজন হয় নাই। কবির নিজেরই কীর্ত্তির সাহায্যে তাহার প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ, ইহার মত সুন্দর পদ্ধতি আর ত কিছু জানি না। 
কবির জন্ম বা মৃত্যুর দিনে তাঁহার জন্মস্থানে বা সাহিত্য-পরিষদে বা নানা স্থানে তাঁহার কাব্য পাঠ, ব্যাখ্যা, আলোচনা প্রভৃতি প্রচলিত হইলে উপযুক্তরূপে তাঁহার প্রতি সমাদর প্রকাশ করা হয়। 
আমার মতে সাহিত্য-পরিষদে আমাদের দেশের প্রত্যেক সাহিত্য বীরের জন্মদিনে বা মৃত্যুদিনে তাঁহাদের গ্রন্থাদি আলোচনার দ্বারা উৎসব করা উচিত। অবশ্য, ছোট বড় সকলকেই একরূপ সমাদর করিলে তাহার গৌরব থাকিবে না। 
সাহিত্য-পরিষদের গ্রন্থাগারের একটি বিশেষ স্থান মৃত কবির জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করিয়া দেয়া উচিত। সেইখানে তাঁহার সমস্ত কাব্যের সমস্ত সংস্করণ, তাঁহার নানা বয়সের প্রতিমূর্তি, তাঁহার হাতে লেখা চিঠিপত্র ও কাব্যের পান্ডুলিপি, তাঁহার বংশাবলী ও জীবনী সমস্ত উপকরণ সংগৃহীত ও রক্ষিত হইতে পারিবে। 
যদি উপযুক্ত বোধ করেন, তবে সম্মিলনীর পক্ষ হইতে আমার এই প্রস্তাব সাহিত্য-পরিষদকে জ্ঞাপন করিতে পারেন। 
ইতি- ৩রা চৈত্র, ১৩১৫।
ভবদীয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71