শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কবি বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ৩৮তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৭:৫১ pm ০৯-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:৫১ pm ০৯-০২-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার এবং কবি বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) ( জন্মঃ- ১৯ জুলাই, ১৮৯৯ - মৃত্যুঃ- ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৯ )

কৈশোরকাল থেকেই তাঁর সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ। স্কুলে পড়ার সময়ে তিনি ‘বনফুল’ ছদ্মনামে কবিতা রচনা করেন। সম্পাদনা করেন বিকাশ (১৯১৫) নামে হাতে-লেখা একটি সাহিত্যপত্রিকা। তাতে প্রকাশিত হতো প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, অনুবাদ প্রভৃতি। এ সময় থেকে তাঁর সাহিত্যবিষয়ক রচনা প্রকাশিত হয় ভারতী (১৮৭৭), প্রবাসী (১৯০১), কল্লোল (১৯২৩) প্রভৃতি বিখ্যাত পত্রিকায়। এসব পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর কবিতার নিখুঁত ছন্দ এবং গল্পের বিষয় নির্বাচন ও ভাষার ওপর দক্ষতা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় নিসর্গ চেতনা, প্রেম ও আত্ম-উপলব্ধি। কবিতার আঙ্গিক বিবেচনায় লক্ষ করা যায়, তিনি লিখেছেন দীর্ঘকবিতা, গদ্যপদ্যের মিশ্রণজাত কবিতা, সনেট, হাইকু প্রভৃতি। বাংলা কবিতার আধুনিক ধারার সঙ্গে তাঁর কোনো সংযোগ ছিল না; তিনি ছন্দমিলের পুরানো ধাঁচেই কবিতা লিখেছেন। বনফুলের কবিতা (১৯৩৬), অঙ্গারপর্ণী (১৯৪০), চতুর্দশী (১৯৪০), আহবনীয় (১৯৪৩), করকমলেষু (১৯৪৯), বনফুলের ব্যঙ্গ কবিতা (১৯৫৮), নতুন বাঁকে (১৯৫৯) প্রভৃতি তাঁর কাব্য সংকলন।

সাহিত্যসাধনায় বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্ব কথাশিল্পে। নতুন ধারা ও বিচিত্র ধরণের কাহিনী নির্মাণে তিনি অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর উপন্যাসের বিষয়- ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, চিকিৎসাবিদ্যা, মনস্তত্ত্ব, প্রেম প্রভৃতি। তাঁর উপন্যাসগুলিতে লক্ষ করা যায় মানব জীবনের নানা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ। যথার্থ শিল্পীর বেদনাবোধ তাঁর সৃজনী প্রতিভায় বিদ্যমান। তিনি বিপুল কৌতূহলী মনে ও সহমর্মিতায় মানব জীবনকে দেখার চেষ্টা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস- তৃণখন্ড (১৯৩৫), জঙ্গম (তিন খন্ড, ১৯৪৩-১৯৪৫), অগ্নি (১৯৪৬), ডানা (তিনখন্ড, যথাক্রমে ১৯৪৮, ১৯৫০ ও ১৯৫৫), স্থাবর (১৯৫১), অগ্নীশ্বর (১৯৫৯), হাটেবাজারে (১৯৬১), ত্রিবর্ণ (১৯৬৩), ভুবনসোম (১৯৬৩), প্রচ্ছন্ন মহিমা (১৯৬৭), উদয় অস্ত (দুই খন্ড, ১৯৫৯ ও ১৯৭৪) প্রভৃতি। তাঁর প্রত্যেকটি উপন্যাসের গঠনভঙ্গি স্বতন্ত্র এবং অভিনব। তিনি কাহিনী বর্ণনা করেন কখনও নাটকীয় সংলাপে, কখনও স্বগতোক্তিতে, কখনও কবিতায়। তিনি উপন্যাসের গঠনরীতি এবং কথন-কৌশলে যেসব পরীক্ষা করেন, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। তিনি কিছু ইংরেজি উপন্যাস অনুবাদ করেন যা দেশজ পটভূমি ও চরিত্রের বিন্যাসে অলঙ্কৃত। তাঁর কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূবনসোম। 
সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবা করা ছিল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের ব্রত। এক্ষেত্রে ডাক্তারি ছিল তাঁর অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু এ সেবাতেই তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি সাধারণ, নিরন্ন, অবহেলিত, শ্রমজীবী মানুষের জীবন আঁকতে চেয়েছেন শিল্পে। তাঁর কাছে এর এক অসাধারণ মাধ্যম ছিল ছোটগল্প। ছোটগল্প রচনায় তিনি তুলনাহীন মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর ছোটগল্পে মানবজীবনের বিচিত্ররূপের সমাবেশ ঘটেছে- যেমন গল্পের বিষয়বস্ত্ততে, তেমনি ব্যাপক সৃজনশীলতায়। তাঁর ছোটগল্পে মানবজীবনের নানা স্ববিরোধিতা, দুর্জ্ঞেয় রহস্য, আত্মানুসন্ধানের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ছোটগল্প কত ছোট হতে পারে, খন্ডিত বা আকস্মিকতাজনিত অসমাপ্তির বোধ কীভাবে সৃষ্টি না হয় তার পরীক্ষা তাঁর গল্পগুলিতে পাওয়া যায়। ক্ষুদ্র পরিসরের মধ্যে গভীর চিন্তা ও জটিল অভিজ্ঞতার নিপুণ প্রকাশ তাঁর ছোটগল্পগুলিকে এক অসাধারণত্ব দান করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ-বনফুলের গল্প (১৯৩৬), বিন্দুবিসর্গ (১৯৪৪), অদৃশ্যলোকে (১৯৪৬), তন্বী (১৯৪৯), অনুগামিনী (১৯৫৮), দূরবীণ (১৯৬১), মণিহারী (১৯৬৩), বহুবর্ণ (১৯৭৬), বনফুলের নতুন গল্প (১৯৭৬) প্রভৃতি। 
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় নাটক রচনাতেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রহসন, একাঙ্কিকা, চিত্রনাট্য, নাটিকা ছাড়াও তিনি বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনচরিত অবলম্বন করে নাটক রচনা করেন, যাতে পাওয়া যায় তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার অপর একটি ভিন্ন রূপের পরিচয়। উনিশ শতকের দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে লেখা তাঁর নাটক, শ্রীমধুসূদন (১৯৪০) ও বিদ্যাসাগর (১৯৪১)। বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় এ দুটি নাটকের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে এঁদের ব্যাপকভাবে ও যথার্থরূপে পরিচিত করিয়ে দেন। বাংলা সাহিত্যে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়কে বলা যেতে পারে এ ধারার নাটক রচনার পথিকৃৎ। 
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যোগদান ও সভাপতিত্ব করে যেসব অভিভাষণ প্রদান করেন, সেগুলি গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। উত্তর (১৯৫৩), মনন (১৯৬২), ভাষণ (১৯৭৮), দ্বিজেন্দ্রদর্পণ (১৯৮৭) প্রভৃতি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ। রবীন্দ্রস্মৃতি (১৯৬৮) ও মর্জিমহল (১৯৭৭) গ্রন্থ দুটি তাঁর ডায়েরি জাতীয় রচনা। তাঁর আত্মজীবনী পশ্চাৎপট প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি রচনা করেন শোকোচ্ছ্বাসমূলক উপন্যাস লী (১৯৭৮)। তিনি ছোটদের জন্য লেখেন দুটি বই মায়াকানন (১৯৭৭) ও রাজা (১৯৭৭)। 
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের রচনায় আছে সুস্থ জীবনের আকাঙ্ক্ষা, মূল্যবোধের চেতনা, অন্ধ সংস্কারের বিরুদ্ধে ধিক্কার। তাঁর রচনারীতি সুমিত ও সংক্ষিপ্ত, তাঁর দৃষ্টি নির্মোহ ও নিরাসক্ত; জীবনের ক্ষুদ্র ও বৃহৎ, তুচ্ছ ও বিরাট সবকিছুর মধ্য থেকে শিল্পের উপাদান সংগ্রহের ক্ষমতা তাঁর রচনাকে দিয়েছে বৈচিত্র্য এবং গভীরতা। 
সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় লাভ করেন শরৎস্মৃতি পুরস্কার (১৯৫১), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৬২), বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পদক (১৯৬৭)। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিলিট উপাধি প্রদান করে ১৯৭৩ সালে; ভারত সরকারের কাছ থেকে তিনি পান পদ্মভূষণ উপাধি (১৯৭৫)।

জন্ম ও শিক্ষা
বিহার রাজ্যের মনিহারীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সত্যনারায়ণ মুখোপাধ্যায়। তাদের আদি নিবাস হুগলী জেলার শিয়াখালা।
প্রথমে মণিহারী স্কুলে এবং পরে সাহেবগঞ্জ উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেন। শেষোক্ত স্কুল থেকে ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশিকা (এন্ট্রান্স) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি আই,এস,সি, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন হাজারীবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজ থেকে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন তবে পাটনা মেডিক্যাল কলেজে থেকে এম,বি, ডিগ্রী লাভ করেন। প্যাথলজিস্ট হিসাবে ৪০ বৎসর কাজ করেছেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারী তারিখে কলকাতা শহরে তাঁর মৃত্যু হয়।
বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় কৈশোর থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। শিক্ষকদের কাছ থেকে নিজের নাম লুকোতে তিনি বনফুল ছদ্মনামের আশ্রয় নেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সাহেবগঞ্জ স্কুলে পড়ার সময় মালঞ্চ পত্রিকায় একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। পরে প্রবাসী, ভারতী এবং সমসাময়িক অন্যান্য পত্রিকায় ছোটগল্প প্রকাশ করেন।

নিমগাছ---বনফুল
কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে।
পাতাগুলো ছিড়ে শিলে পিষছে কেউ। 
কেউবা ভাজছে গরম তেলে। 
খোস দাদ হাজা চুলকানিতে লাগাবে। 
চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। 
কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে। 
এমনি কাঁচাই... 
কিংবা ভেজে বেগুন-সহযোগে। 
যকৃতের পক্ষে ভারী উপকার। 
কচি ডালগুলো ভেঙ্গে চিবায় কত লোক...দাঁত ভালো থাকে। 
কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। 
বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুশি হ'ন 
বলে--নিমের হাওয়া ভালো, থাক, কেটো না। 
কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না।
আবর্জনা জমে আসে চারদিকে। 
শান দিয়ে বাঁধিয়ে দেয় কেউ...সে আর এক আবর্জনা। 
হঠাৎ একদিন এক নূতন ধরণের লোক আসলো। 
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিড়লে না, ডাল ভাঙলে না, মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু। 
বলে উঠলো,--বাঃ, কি সুন্দর পাতাগুলো ... কি রূপ! 
থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার... এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ-- 
খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল। 
কবিরাজ নয়, কবি। 
নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগলো লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না। মাটির ভিতর শিকড় অনেকদূর চলে গেছে। বাড়ির পিছনের আবর্জনাস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলো সে। 
ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষী বউটির ঠিক এক দশা।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71