বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কানন বালাদের জন্মই কি আজন্ম পাপ?
প্রকাশ: ০৯:৫৮ am ২১-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:০০ am ২১-০৫-২০১৭
 
 
 


শিতাংশু গুহ: এপ্রিল মাসের শেষপাদে ঢাকা ও কলকাতায় একটি নিউজ দেখেছিলাম। হেডিং ছিল, ‘বিশ্বজিতের লাশ কাঁধে করে শ্মশানে নিলেন মালেক-আজাদরা’।

মিডিয়া সাথে একটি ছোট্ট ভিডিও সংযুক্ত করেছিল। তাতে দেখলাম, মুসলমান শবযাত্রীরা হিন্দুদের মতো ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’ বলতে বলতে লাশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এ অনন্য নজির। চমৎকার।

ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের। প্রায় একই সময়ে বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটের ‘গোতিস্টা’ গ্রামে মুসলমানদের কবরস্থানটি নদীর ভাঙ্গনে অল্প অল্প করে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল। স্থানীয় মুসলিমরা মৃত্যুর পর ‘সাড়ে তিন হাত’ জায়গা নিয়ে বেশ চিন্তাক্লিষ্ট ছিলেন।

তাদের চিন্তা দূর করলেন সুদীপ ও সুনীল চক্রবর্তী, দুই ভাই। তারা পৈতৃক সম্পত্তি থেকে মুসলমানদের কবরস্থানের জন্যে প্রয়োজনীয় জমি দান করেছেন।


ওই ধরণের ঘটনা বাংলাদেশে এখন বিরল। দেশে ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ গানটি জনপ্রিয় হলেও আগের সেইদিন আর নাই। রাম নাম নেয়ায় মালেক-আজাদরা হিন্দু হয়ে গেছেন বলে শুনিনি।

যেমন, একাত্তরে হিন্দুরা বাধ্য হয়ে কলেমা ও ইসলামি সুরা-কালাম মুখস্ত করে মুসলমান হয়ে যায়নি। আমাদের দেশে অনেকেই বেশ উঁচু গলায় বলতে পছন্দ করেন যে, ‘বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু, ধর্মান্ধ নয়’।

কথাটা আগে সত্য ছিল। এখন নয়! আর বাংলাদেশে চমৎকার সা¤প্রদায়িক সপ্রীতির কথা বলতে বলতে রাজনৈতিক, ক‚টনীতিক, বুদ্ধিজীবী, মোল্লা সবাই মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলছেন।

‘যার বিয়া তার খবর নাই, পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই’! যাদের নিয়ে সপ্রীতি তারা কী বলে তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই? খান আতার কোনো এক সিনেমার ডায়লগ ছিল, ‘তোমার মাথা মাথা, আর আমার মাথা তোমার লাঠি মারার জায়গা?’ সপ্রীতির সংজ্ঞা যদি তাই হয় তবে নিশ্চিত আমার দেশে সপ্রীতির নহর বইছে।


পটুয়াখালীর দশমিনার আলিপুরে বিধবা কানন বালার ওপর সদ্য (১১ মে) ঘটে যাওয়া অত্যাচারের ভিডিও ঢাকায় একটি টিভি দেখিয়েছে। সম্পত্তি দখলের জন্যে কানন বালাকে হাত-পা বেঁধে অত্যাচার করা হয়। কানন বালা বলেছেন, ‘ওগো পাও ধইরা মাফ চাইছি। বাড়িঘর ছাইড়া ভারত চইল্যা যামু কইছি। তাও ওরা আমারে পাড়াইয়া মাটিতে ফালাইয়া রাখে’।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে জন্মই কি কানন বালাদের আজন্ম পাপ? বর্তমান বাংলাদেশে বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর জমি দখলের মহোৎসব শুরু সেই ভারত বিভাগের পর থেকেই। আজো তা সমানভাবে চলছে। বলার কেউ নেই। দেখার কেউ নেই। কারণ প্রায় সবাই অল্প-বিস্তর এই সুবিধা ভোগ করছেন।

এমনকি রাষ্ট্রযন্ত্র এ সুবিধাভুগী। কেউ যদি ১৯৪৭-এর আগে বা এমনকি ১৯৭২-এর আগে এবং ২০১৭-তে হিন্দু সম্পত্তির পরিমাণ যাচাই করেন, তাহলে অবাক হয়ে যাবেন বৈকি? হিন্দুরা রাজত্ব, রাজকন্যা দুটোই হারাচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র এ যাবৎ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ বিষয়ে সহায়তা করেছে।


১৯৫০ সালে পূর্ব-পাকিস্তানে জমিদারি প্রথা বাতিল হয় (পূর্ববঙ্গ জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০)। পশ্চিম পাকিস্তানে তা হয়নি, কারণ সেখানকার জমিদাররা ছিলেন প্রায় সবাই মুসলমান।

পূর্ব পাকিস্তানে হয়েছে, কারণ প্রায় সকল জমিদার ছিলেন হিন্দু। যদিও তখন বলা হয়েছিল, জমিদারদের থেকে জমি নিয়ে গরিবদের দেয়া হবে, বা অনেকে সমাজতান্ত্রিক স্লোগানে অভিভূত হয়েছিলেন, মূলত: সেটি ছিল ‘হিন্দুর থেকে জমি নিয়ে মুসলমানকে দেয়া’। তারপর এলো ১৯৬৫ সালে ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’।

এই আইন সাধারণ হিন্দুদের সর্বস্বান্ত করে দেয় এবং এটি করে রাষ্ট্রযন্ত্র। রাজার হস্ত করে সমস্ত হিন্দুদের ধন চুরি’। এ জ্বালা এখনো শেষ হয়নি। এজন্যে দায়ী এ যাবৎকালের প্রতিটি সরকার। কারণ পাকিস্তানি এই কালো আইন সবার হাত ঘুরে রয়ে গেছে।


কদিন আগে মন্ত্রীসভার এক বৈঠকে ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন ২০১৭’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এরফলে জনস্বার্থে মন্দির, মসজিদ বা অন্য ধর্মীয় উপাসনালয়, কবর, শ্মশানের জমি বা সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা যাবে।

এরই মধ্যে এই আইনের সফল প্রয়োগ হয়েছে মিরপুরের কাফরুলে। সেখানে জনস্বার্থে রাস্তা প্রশস্ত করতে সার্বজনীন দুর্গা মন্দির গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ হিন্দুদের আপত্তি শুনেননি, কারণ জনস্বার্থ বলে কথা? ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন গুলিস্তানের ‘গোলাপ শাহের মাজার কতটা ট্রাফিক বিড়ম্বনার সৃষ্টি করে অথবা মিরপুর রোডে সোহবানবাগ মাসজিদ? কর্তৃপক্ষ কি পারবেন ওগুলো স্থানান্তর করতে? নাকি বীরত্ব সব হিন্দুদের ওপর? রমনা কালীবাড়ির কথা তুললাম না, রাষ্ট্রযন্ত্র এর পুরোটাই গিলে খেয়ে ফেলেছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠিত ২০ একর জমির ওপর, দখলে আছে মাত্র ৬.১০ একর, বাকি ১৩.৯০ একর বেদখল, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হিন্দুর জমি মেরে খেয়েছে?


আবার বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আছে, এর বিশাল বাজেট আছে। কিন্তু অন্যদের জন্যে আছে সামান্য অর্থের ট্রাস্ট। হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মতিউর রহমান। ওই পদের জন্যে বাংলাদেশে কোনো যোগ্য হিন্দু পাওয়া যায়নি? বাংলাদেশে ধর্মমন্ত্রী সবসময় একজন মাওলানা। একদা ধর্মমন্ত্রী ছিলেন রাজাকার মাওলানা মান্নান। সেই থেকে ওই মন্ত্রণালয়ে একটি ‘রাজাকার রাজাকার গন্ধ’ আছে। এই মন্ত্রণালয়টি কি আদৌ কোনো দরকার আছে?

সাধারণত: মুসলিম দেশগুলোতে ধর্মমন্ত্রী পদটি থাকে। বাংলাদেশে যদি ধর্মমন্ত্রীর দরকার থাকে তাহলে একজন অ-মুসলমান ধর্মমন্ত্রী হলে কেমন হয়? ভারতে ধর্মমন্ত্রী নাই, কিন্তু সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় আছে এবং এর বর্তমান মন্ত্রী হচ্ছেন মুক্তার আব্বাস নাগভী। তার আগে ছিলেন নাজমা হেপতুল্লাহ; কে. রহমান খান; সালমান খুরশিদ প্রমুখ। ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাটা না হয় আমরা মানি না, কিন্তু একটি সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় খুলে একজন সংখ্যালঘু মন্ত্রী বানালে তো কিছুটা অপবাদ ঘুচে?


সবাই জানেন, বাংলাদেশের নাটক ভাল। ফেইসবুকে একজন লিখেছেন, নাট্যকার মামুনুর রশীদের নাটকের প্রায় সকল হিন্দু চরিত্র প্রধানত: নাপিত, জেলে বা হরিজন। অন্য একজন ঠাট্টা করে লিখেছেন, স্বজাতির কথা তিনি ভুলতে পারেন না? আর সিনেমায় হিন্দু নায়িকার মুসলমান নায়কের সাথে প্রেম, বিয়ে, ধর্মান্তর তো একটি সাদামাটা ঘটনা।

এরমধ্যে বিদ্যমান ধর্মীয় সুড়সুড়িটা সবাই উপভোগ করেন? কিন্তু নিম্ন মানসিকতার প্রসঙ্গ কেউ তোলেন না? এসবকিছু বা সম্পত্তি দখল ও ধর্ষণের লক্ষ্য হচ্ছে দেশ থেকে হিন্দু বিতরণ।

ভাবটা এই যে, হিন্দুশূন্য দেশ যেন জাতীয় অখণ্ডতার একমাত্র শর্ত? হিন্দু না থাকলেই কি দেশে শান্তির সুবাতাস বইবে? তা যদি হতো তবে পাকিস্তান ‘শান্তির নীড়’-এ পরিণত হতো, তা হয়নি। বরং পৃথিবীতে যত মারামারি কাটাকাটি সব মুসলিম দেশগুলোতে। আমাদের দেশে স¤প্রতি আহমদিয়া মসজিদের ইমাম খুন বা শিয়াদের ত্যাজিয়ার ওপর আক্রমণ কিন্তু সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে?


প্রয়াত পাকিস্তানি ওয়াসির মীর বিদেশী বন্ধু হিসাবে বাংলাদেশের সম্মাননা পেয়েছিলেন। তার ছেলে সাংবাদিক হামিদ মীর তা ফিরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বাংলাদেশের অনেকেই তার যর্থার্থ সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, পাকিস্তানিরা মানুষ হয় না, পাকিস্তানিই থাকে।

কথাটা হয়তো বহুলাংশে সত্য। সমস্যা হলো, পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কতটা বাঙালি হতে পেরেছি? বা দেশ কি এখনো পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণায় মোহগ্রস্থ নয়? সা¤প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আমরা আর একটি সা¤প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ছি এটাই কি বাস্তবতা নয়? ধর্মই যদি রাষ্ট্রের মূলভিত্তি হয়, তবে ‘সাধের পাকিস্তান’ ভাঙার কি দরকার ছিল? আমরা কি বাঙালি না বাঙালি মুসলমান? হামিদ মীরকে পাকিস্তানি বলে গালিগালাজ করে লাভ নেই, আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখুন!
নিউইয়র্ক থেকে

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

 

এইবেলাডটকম/পিসিএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71