মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৩রা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
কিংবদন্তী কবিয়াল রমেশ শীলের ৫০তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১২:০৭ am ০৭-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:০৭ am ০৭-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

কিংবদন্তী কবিয়াল এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী রমেশ শীল ( জন্মঃ- ১৮৭৭ - মৃত্যুঃ- ৬ এপ্রিল, ১৯৬৭)

তিনি ছিলেন বাংলা কবিগানের অন্যতম রূপকার। কবিগানের লোকায়ত ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সমাজ সচেতনতার সার্থক মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন মাইজভান্ডারী গানের কিংবদন্তি সাধক। জনপ্রিয় এই শিল্পী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে এবং সেই সাথে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন পরবর্তী শাসক বিরোধী আন্দোলনে তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে অংশ নেন।

কবিয়াল রমেশ শীল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের বোয়ালখালি থানার অন্তর্গত গোমদন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম চন্ডীচরণ শীল। চন্ডীচরণ শীল ছিলেন পেশাতে নাপিত ও কবিরাজ। কবিয়াল রমেশ শীলের স্কুলজীবন ৪র্থ শ্রেণীতে অধ্যায়নকালে পিতার মৃত্যুর সাথে সাথে শেষ হয়ে যায় ও পরিবারের সকল দায়িত্ব এসে পড়ে কবির কাধে। তার নিজের লেখণীতে রয়েছে,
আমিই বালক, চালক,পালক, আমার আর কেহ নাই। মায়ের অলংকার সম্বল আমারা বিক্রি করে খাই'
তারপর তিনি পিতার পেশাতে গমন করেন। অবশেষে তিনি ভাগ্যান্বেষণে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) রেঙ্গুন শহরে গমন করেন। সেখানে একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে একটি দোকানেরও মালিক হন। কিন্তু স্বদেশের প্রতি ভালবাসার দরুণ পাঁচ বছরের মধ্যেই নিজের গ্রামে ফিরে আসেন। গ্রামে এসে তিনি পূর্বের নরসুন্দর কাজের পাশাপাশি কবিরাজ (গ্রাম্য চিকিৎসক) হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই কবিরাজি করতে করতেই কবিগানের প্রতি তিনি ভীষণ ভাবে অনুরাগী হয়ে উঠেন।

কোনরকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১৮৯৭ সালে প্রথম মঞ্চে কবিগান পরিবেশণ করেন এবং সমাদৃত হন। ১৮৯৯ সালে কবিগান পরিবেশনায় প্রতিদ্বন্দী তিনজন কবিয়ালকে পরাজিত করলে উদ্যোক্তা ও শ্রোতাকূলের কাছ থেকে মোট তের টাকা সন্মানী লাভ করেন, যা পেশা হিসাবে পরবর্তিকালে কবিগানকে বেছে নিতে রমেশ শীলকে অনুপ্রানিত করে। 
১৯৩৮ সালে বাংলা কবিগানের ইতিহাসে প্রথম সমিতি গঠিত হয় রমেশ শীলের উদ্যোগে। কবিয়ালদের এই সমিতির নাম রাখা হয় ‘রমেশ উদ্বোধন কবি সংঘ’। অশ্লীলতা মুক্ত কবিগান ছিল এ সমিতির অন্যতম লক্ষ্য। ১৯৪৪ সালে কবি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৮ সালে শ্রদ্ধানন্দ পার্কে কবিকে সম্বর্ধিত ও ‘বঙ্গের শ্রেষ্ঠতম কবিয়াল’ উপাধিতে ভুষিত করা হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জোরাল অবস্থান নিয়েছিলেন। যে কারণে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেওয়ার পরে অন্যান্য নেতা-কর্মীর সাথে রমেশ শীলকেও গ্রেফতার করা হয়। তার ‘ভোট রহস্য’ পুস্তিকাটি বাজেয়াপ্ত করে কেন্দ্রীয় সরকার। কবি দীর্ঘ্যদিন কারাভোগ করেন এসময়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরধিতা করায় রমেশ শীলের সাহিত্য ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শেষ জীবনে কবি নিদারুণ অর্থ কষ্টের সম্মুখিন হন।

প্রথম দিকে প্রথাগত কবিয়ালদের মত রমেশ শীল পুরাণ ও কিংবদন্তী নির্ভর গান বাধতেন। তখন তার গানের বিষয় ছিল নারী-পুরুষ, সত্য-মিথ্যা, গুরু-শিষ্য, সাধু-গেরস্থ ইত্যাদি কেন্দ্রিক। পরবর্তি কালে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত কবি প্রবলভাবে সমাজ সচেতন হয়ে ওঠেন। কবিগানের বিষয়বস্তুতে আসে আমুল পরিবর্তন। যুদ্ধ-শান্তি, চাষী-মযুদদার, মহাজন-খাতক, স্বৈরতন্ত্র-গনতন্ত্র, এসব হয়ে যায় কবিগানের উপজীব্য।
১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারে মাঝিরঘাটে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কবিগানের আয়োজন করা হয় । প্রায় হাজার পঞ্চাশেক মানুষের উপস্থিতিতে কবিগান শুরু হয় । প্রধান কবিয়াল ছিলেন তৎকালীন জনপ্রিয় কবিয়াল মোহনবাঁশী ও চিন্তাহরণ । কিন্তু গানের আসরে চিন্তাহরণ অসুস্থ হয়ে পড়েন । এতে শ্রোতারা হট্টগোল শুরু করেন । তখন আয়োজকরা কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্রকে মঞ্চে আসার জন্য অনুরোধ করেন । কিন্তু কবিয়াল দীনবন্ধু মিত্র তাদের অনুরোধ গ্রহণ না করে রমেশ শীলকে মঞ্চে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন । প্রথমে ভয় পেলেও কোমরে চাঁদর পেঁচিয়ে মঞ্চে উঠে যান রমেশ শীল । মাত্র একুশ বছর বয়সের রমেশ শীলকে প্রতিপক্ষের কবিয়াল মোহনবাঁশি অবজ্ঞা করে বলেছিলেন , "এই পুঁচকের সাথে কি পালা করা যায় ?" প্রত্যুত্তরে রমেশ শীল বলেছিলেন "উৎসব আর ভয় লজ্জা কম নয়।/কে বা হারাতে পারে কারে।/পুঁচকে ছেলে সত্যি মানি শিশু ব্রজ ছিল জ্ঞানী/চেনাজানা হোক না আসরে।" ঐ আসরে তিনি দর্শকদের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছিলেন , "মা আমার রাজকুমারী চন্ডীচরণ বাপ, আমি হয়রে মানুষের বাচ্চা করবো না রে মাফ।" জীবনের প্রথম আসরে টানা আট ঘণ্টা গেয়েছিলেন কবিগান । ঐ আসরে কেও কাউকে হারাতে পারেনি । অবশেষে আয়োজকদের হস্তক্ষেপে কবিগান বন্ধ হয় সেদিনের মত । তবে তখন থেকেই রমেশ শীলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে ।
কবিগানের ভাষা ও পরিবেশনা থেকে অশ্লীলতা বিসর্জনে কবি ছিলেন সদা সতেষ্ট। স্থুল অঙ্গভঙ্গি ও কুরুচিপূর্ণ শব্দযোগে যৌনতার পরিবেশন ছিল কবিগানে আসল আকর্ষণ। রমেশ শীলের শিল্পীত উপস্থাপন ও মার্জিত শব্দচয়ন কবিগানে রুচিশীলতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। দেশাত্মবোধ, দুর্ভিক্ষ-মনন্তর, ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলন তার গানের ভাষায় উঠে এসেছে জোরালো ভাবে। যেমন- ‘ব্যবসার ছলে বণিক এল/ ডাকাত সেজে লুট করিল/ মালকোঠার ধন হরে নিল- আমারে সাজায়ে বোকা;/ কৃষক মজদুর একযোগেতে/ হাত মেলালে হাতে হাতে/ শ্বেতাঙ্গ দুষমনের হতে- যাবে জীবন রাখা’। অথবা- ‘দেশ জ্বলে যায় দুর্ভিক্ষের আগুনে/ এখনো লোকে জাগিল না কেনে’। কবির দেশাত্মবোধ ছিল সুগভীর – ‘বাংলার জন্য জীবন গেলে হব স্বর্গবাসি/ আমার বাংলার দাবি ঠিক থাকিবে যদিও হয় ফাঁসি’।
সংগ্রামী জীবন ও কারাভোগ
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে বাংলাদেশের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত কবিয়াল রমেশ শীল সক্রিয় ভাবে অংশ নেন। তার গণসঙ্গীত দেশের মানুষদের এই সব সংগ্রামে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ১৯৫৪ সালে জণগণের ভোটে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং নুরুল আমিনকে পূর্ববাংলার গভর্নর বানানো হয়। এই নুরুল আমীন চট্টগ্রামে এলে জনগণের কাছে লাঞ্চিত হন। এই নিয়ে তিনি বিখাত একটি ব্যাঙ্গাত্মক গান রচনা করেন। গানটি হচ্ছে,
শোন ভাই আজগুবি খবর
মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন করে চট্টগ্রাম সফর।
দিনের তিনটা বেজে গেল পল্টনে সভা বসিল
হায় কি দেখিলাম কি ঘটিল।
মানুষ ভয়ে জড়সড়
হঠাৎ দেখি পচা আণ্ডা
মন্ত্রীকে করিতেছে ঠাণ্ডা।
উড়তে লাগলো কাল ঝাণ্ডা,
মন্ত্রীর চোখের উপর।
বিপ্লবী চট্টগ্রাম গেলা সূর্যসেনের প্রধান কেল্লা
মন্ত্রী করে তৌব্বা তিল্লা,
করবো না জনমভরে চট্টগ্রাম শহর।
এই গানটি এতো জনপ্রিয় পেয়েছিল যে তা সাড়াদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই জন্য তাকে কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি এক বছর ছিলেন। এই সময় তার বয়স হয়েছিল সত্তর বছর এবং তাকে প্রচুর মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল। সেই সময় তাকে অঢেল বিত্তবৈভবের লোভ দেখিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লেখার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখান করেন। এই প্রলোভনের জবাব দিয়েছিলেন তিনি নিচের কবিতা দিয়ে,
আমার খুনে যারা করেছে মিনার
রক্তমাংস খেয়ে করেছে কঙ্কালসার
আজ সেই সময় নাই ত্বরা ছুটে আসো ভাই
বেদনা প্রতিকারের সময় এসেছে।

প্রকাশিত গ্রন্থ
রমেশ শীল রচিত পুস্তক সংখ্যা সম্পর্কে নির্ভূল তথ্য পাওয়া যায় না। যেসকল গ্রন্থের নাম পাওয়া যায় তার মধ্যে আশেকমালা, শান্তিভান্ডার, নুরে দুনিয়া, দেশের গান, ভোট রহস্য, চট্টল পরিচয়, ভান্ডারে মওলা, জীবন সাথী, মুক্তির দরবার, মানব বন্ধু, চাটগায়ের পল্লীগীতি ১ম ও ২য় ভাগ ইত্যাদী উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও তার প্রনীত পুস্তক তালিকার বাইরে নিম্নবণিত ৮টি পুস্তক পাওয়া যায়। যেমনঃ (১) পাকিস্তান সঙ্গীত (২)দেশ দরদী গানের বই (৩) লোক কল্যাণ (৪)১৩৬৭ সালের তুফানের কবিতা (৫) এসেক সিরাজিয়া (৬) মহাকাব্য বহি (৭) ১৯৬৩ সালের তুফানের কবিতা (৮) শান্তির কবিতা । এছাড়াও রমেশ শীল বেদুঈন ছদ্দনামের "বদলতি জমানা" শীর্ষক এবং ঋষিভত্ত ছদ্মনামের "ভণ্ড সাধুর" কবিতা শীর্ষক দু'টি পুস্তক প্রকাশ করে ছিলেন। তাঁর অন্যান্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে, নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী সহযোগে "গান্ধী হত্যার কবিতা"। এসব বইয়ের বাইরেও রমেশ শীলের প্রায় দেড়শয়ের বেশি কবিতা রয়েছে।
সংবর্ধনা
কবিয়াল রমেশ শীল জীবনের শেষ দুই দশকে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ তিনি প্রচুর সংখ্যক সংর্বধনার দ্বারা সম্মানিত হন। ১৯৫৮ সালের ঢাকার কারাগারে সহবন্দীদের আয়োজিত জন্মদিনের সংবর্ধনা, ১৯৬২ সালের ঢাকার বুলবুল একাডেমী প্রদত্ত সংবর্ধনা, ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামের নাগরিক সংবর্ধনা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

এইবেলাডটকম.প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71