সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৯ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথবাড়ীর সতের রত্ন মন্দিরের ইতিহাস
প্রকাশ: ১২:৩১ am ০৫-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৩১ am ০৫-০৪-২০১৭
 
 
 


সতের রত্ন মন্দির : কুমিল্লা শহর থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে জগন্নাথপুর গ্রামে একটি বিচিত্র ধরনের প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবিশেষ আছে। এটি ছিল একটি সু-উচ্চ মন্দির।

এতে সতেরটি চূড়া বা রত্ন ছিল। এ জন্য এটিকে সতের রত্ন মন্দির বলা হত। অষ্টা কোণাকার একটি কেন্দ্রীয় কক্ষকে কেন্দ্র করে এই মন্দির নির্মিত হয়ে ছিল। এই কেন্দ্রীয় কক্ষের উপরেই ছিল এর সু-উচ্চ চূড়া বা রত্ন। সেটি এখনও টিকে আছে। এই কেন্দ্রীয় কক্ষের চারদিকে ছিল আরও অনেক কক্ষ। মন্দিরটি ছিল তিনতলা বিশিষ্ট। কেন্দ্রীয় কক্ষকে ঘিরে নির্মিত ছিল অষ্ট কোণাকার নির্মিত প্রথম তলা। এর উপরে ছিল ৮টি চূড়া বা রত্ন। দ্বিতীয়তলা অষ্টা কোণাকার নির্মিত হয়েছিল এর উপরেও ছিল ৮টি চূড়া বা রত্ন।

প্রথম ও দ্বিতীয় তলার চূড়া গুলি এখন বিনষ্ট প্রায়। পার্বত্য ত্রিপুরার অধিপতি দ্বিতীয় রত্ন মানিক্য (১৬৮৬-১৭১২) এই মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে ছিলেন বলে জানাযায়। তিনি এ কাজ শেষ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। ফলে তিনি এ কাজ সমাপ্ত করতে পারেননি। প্রায় চল্লিশ বছর পরে মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্য (১৭৬১) এই মন্দির নির্মানের কাজ সমাপ্ত করেন।

কুমিল্লা মহানগরী’র পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত সতের রত্ন নামক জগন্নাথ মন্দিরটি ত্রিপুরার মহারাজা কৃষ্ণ মাণিক্য (১৮৩০-৫০) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

রামমালায় উল্লেখ রয়েছে:-

শুভক্ষণে মঠ দিব দেবে উত্সগিয়া।
উত্কল হইতে জগন্নাথ ব্রহ্ম স্পশাইয়া।।সতের রত্ন মন্দির সর্ম্পকে আরও উল্লেখ আছে:
এক মঠ সপ্তদশ মঠের গঠন।
সপ্তদশ রত্ন নাম হৈল সে কারণ।।

সতের রত্ন মন্দিরটি মধ্যস্থিত চূড়ার উচ্চতা ১৫র্০। আর চারদিকে চারকোণে চতুর্ভূজ। দ্বিতীয় ধাপের শীর্ষে আছে ১৬টি ছোট চূড়া। সবমিলে সতেরটি শীর্ষ তাই বলা হয় সতের রতন।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়: সতের রত্ন মন্দিরটিতে কোন মূর্তি বা বিগ্রহ নেই। এটি কোন মতে তার ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে প্রত্নকীর্তি কুমিল্লা অঞ্চল এ মন্দিরটির দেখা শুনা করছেন। এছাড়াও বিভিন্ন জেলা হতে শতশত ভক্ত সতের রত্ন মন্দির দর্শনে আসেন।

জগন্নাথ দেবের মন্দির: সতের রত্ন মন্দিরের পাশ্বেই জগন্নাথ, বলদেব ও শুভদ্রা মহারানী’র মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত। এ মন্দিরের কাজ সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই জগন্নাথ, বলদেব ও শুভদ্রা মহারানী’র বিগ্রহ নিমকাষ্ঠ দ্বারা তৈরী করতে ভারতের উড়িষ্যা জগন্নাথ মন্দিরে সেবাইতের মাধ্যমে নির্মানের আদেশ দিলে যথা সময়ে নৌ পথে জগন্নাথ দেবের বিগ্রহ আনিতে বিলম্ব হইলে তদ্বীয় পত্নী গোপনে আরো ৩টি বিগ্রহ নির্মানের আদেশ প্রদান করেন।

পরবর্তীতে রথযাত্রা’র পূর্বেই মহারাজ কর্তৃক আনিত জগন্নাথদেবের বিগ্রহ সমুহ সপ্তরত্ন মন্দিরে স্থাপন করা হয়। সেবাইতের মাধ্যমে নিয়মিত সেবা পূজা করা হতো এবং পাকভারত যুদ্ধের পূর্বে মহারাজা কর্তৃক প্রেরিত হাতী দ্বারা ৩২চাকার রথ টানা হতো। কুমিল­া’র ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দর্শন করতে তদান্তিত ভারত ও পূর্ব বাংলা’র বিভিন্ন স্থান হতে লাখো লাখো ভক্ত জগন্নাথবাড়ীতে সমবেত হতো। ওই সময় জাঁকজমকভাবে রথযাত্রা উৎসব পালিত হতো। পাকভারত যুদ্ধের পর পরই মহারাজা কর্তৃক হাতী প্রেরণ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে জগন্নাথবাড়ীতে ভক্তদের থাকার জন্য দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভক্তশালা, প্রসাদ ঘর, গো-শালা, নাট মন্দির এবং প্রভুপাদ রচিত আধ্যাত্মিক ও পারমার্থিক জ্ঞান সমন্বিত গ্রন্থ, সিডি ক্যাসেট ও পূজার সামগ্রী’র ভক্তি বেদান্ত বুক স্টাল রয়েছে।

তৎকালীন জগন্নাথ দেবের মন্দির পরিচালনা কমিটি’র সভাপতি পরিমল সাহা ও সাধারণ সম্পাদক এড. তপন বিহারী নাগ ১৯৯৭সনের ২৪এপ্রিল জগন্নাথ মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সর্বসম্মতিক্রমে জগন্নাথ, বলদেব ও মহারানী শুভদ্রা দেবী’র সেবা পূজা ভালো ভাবে করার জন্য আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) বাংলাদেশের পক্ষে সভাপতি কে.বি রায় চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণকীর্তন দাশ ব্রহ্মচারী’র অনুকুলে দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থাপনায় দলিল সম্পাদন করিয়া দেন।

জগন্নাথ মন্দিরের সেবাইতের হিসেবে প্রথমে শ্রীমান দয়াল গৌরাঙ্গ দাশ অধিকারী জগন্নাথ, বলদেব ও মহারানী শুভদ্রা দেবী’র সেবা পূজা দিতেন। বর্তমানে জগন্নাথ দেবের মন্দির পরিচালনা কমিটি (টি.এম.সি) এর চেয়ারম্যান শ্রী সদাশিব সিংহ দাস ব্রহ্মচারী’র তত্ত্বাবধানে জগন্নাথ মন্দির, গুন্ডিচা মন্দির ও নৃসিংহ মন্দিরে ব্রহ্মচারী, গৃহস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এই ৪বর্ণের প্রায় ২৮জন ভক্ত জগন্নাথ, বলদেব ও মহারানী শুভদ্রা দেবী’র দৈনন্দিন সেবা পূজা দিয়ে থাকেন।

আরও জানা যায়- ভারতের সমস্ত তীর্থক্ষেত্র হতে জল আনিয়া জগন্নাথ দেবের পুস্কুনীতে মিশ্রিত করিয়া পুকুরটিকে মহাতীর্থ ক্ষেত্রে পরিণত করার ফলে ওই পুস্কুনীতে পূর্ণ্যার্থীরা প্রতিবছর বসন্তকালে অষ্টমীতিথিতে স্নান করিয়া মহাপূর্ণ সঞ্চয় করেন।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন পদযাত্রা’র মঠ: এছাড়াও সতের রত্ন মন্দিরের পশ্চিমপার্শ্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন পদযাত্রা’র মঠ রয়েছে। এই মঠটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ৫’শ ১৪তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভবিষ্যত বাণী অনুসারে যিনি সারা পৃথিবী জুড়ে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রচার করছেন সেই মহান কৃষ্ণভক্ত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য্য কৃষ্ণ কৃপা শ্রী মূর্তি শ্রীল অভয় চরনবিন্দ ভক্তি বেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য ইসকন ভক্তবৃন্দ ভারতের বিভিন্ন তীর্থ পরিভ্রমণ করে তীর্থের মৃত্তিকা সংগ্রহ করে ২০০০সালের গৌরপূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে এই স্থানটিতে সর্বতীর্থ মৃত্তিকা স্থাপন করেন এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মযুগল প্রতিষ্ঠা করেন।

এদিকে, জগন্নাথ দেবের মন্দির পরিচালনা কমিটি (টি.এম.সি) এর চেয়ারম্যান শ্রী সদাশিব সিংহ দাস ব্রহ্মচারী জানান- এ মন্দিরে সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে জগন্নাথ, বলদেব ও শুভদ্রা মহারানী’র রথযাত্রা মহোৎসব। এছাড়াও জগন্নাথ, বলদেব ও শুভদ্রা মহারানী’র দৈনন্দিন সেবা পূজা, শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী, অন্নকুঠ মহোৎসব, গৌর সুন্দরের আর্বিভাব তিথি মহোৎসবসহ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও বাৎসরিক মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

তিনি আরো বলেন- নগরী’র প্রধান প্রধান সড়ক গুলোতে প্রতি শুক্রবারে হরিনাম সংকীর্তন সহকারে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নগর পরিক্রমা করা হয়। ফাইভার দিয়ে তৈরী নৌকাটি ২০১৩ সনের ৫এপ্রিল কুমিল্লা জগন্নাথ মন্দির কমিটিকে দান করেন কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জেলার ভক্তরা। পরদিন ৬ এপ্রিল উৎসব মুখর পরিবেশে জগন্নাথ, বলদেব ও শুভদ্রা মহারানী’র নৌকায় ভ্রমণের মধ্য দিয়ে জলকেলী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন- কুমিল­া রথযাত্রা উৎসবে দেশ-বিদেশের লাখো লাখো ভক্তের সমাগম ঘটে।

কুমিল্লার জগন্নাথ দেবের মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভাপতি অ্যাড. কিরণময় দত্ত ঝুনু ও সাধারণ সম্পাদক ডা. উৎপল কুমার রায় জানান- ঐতিহাসিক স্থান কুমিল্লা জগন্নাথ বাড়ী ও সতের রত্ন মন্দির দর্শন করতে প্রতিদিন শতশত ভক্ত আসে এবং এ স্থানটি দেশ-বিদেশের জ্ঞান পিপাসু পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে সব সময়। তারা আরো বলেন, ত্রিপুরার অধিপতি ৮শত একর ভূমি জগন্নাথ দেবের নামে দেবোত্তর করে দিয়ে গেছেন।

বর্তমানে জগন্নাথ মন্দির, পুকুর, রথটানার রাস্তা, মন্দিরের প্রধান ফটক ও কিছু ফসলী জমি ও মামলাধীনসহ প্রায় ১৫একর সম্পত্তি মন্দিরের দখলে আছে। সরকার যদি আন্তরিক হয়ে জগন্নাথ দেবের জবর দখলকৃত বাকী সম্পত্তি উদ্ধার করে সীমানা প্রাচীর নির্মাণসহ রথটানার রাস্তাটি পাকা করে দেন তাহলে ভক্তদের থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা করা যাবে। সরকার ও ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য সহযোগিতা কামনা করেন কমিটি’র নেতৃবৃন্দ।

অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. তপন বিহারী নাগ জানান- ইতিমধ্যে পাথুরিয়াপাড়াস্থিত ১৪ একর সম্পত্তি তৎকালীন জগন্নাথ দেবের মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটি’র সভাপতি পরিমল সাহা ও সাধারণ সম্পাদক এড. তপন বিহারী নাগ এর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় পাথুরিয়াপাড়াস্থিত জগন্নাথ দেবের শ্বশুরবাড়ী অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরের বে-দখলকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করে তথায় রাধেশ্যাম বিগ্রহ মন্দির স্থাপন করেন।

গুপ্ত জগন্নাথ মন্দির: মহারানী কর্তৃক আদেশকৃত জগন্নাথ, বলদেব ও মহারানী শুভদ্রা দেবী’র আরো ৩টি বিগ্রহ নগরী’র ডিগাম্বরীতলায় দেবালয় স্থাপন করিয়া সেবা পূজা করা হতো। ঐ গুপ্ত দেবতার নাম অনুসারে গুপ্ত জগন্নাথবাড়ী হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। বর্তমানে এ মন্দিরটির সেবাইত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন- স্বপন গোস্বামী।

তাপস চন্দ্র সরকার

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিষ্ট, কুমিল্লা।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71