বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কুরুক্ষেত্রে অভিমুন্যের গৌরবদীপ্ত লড়াই
প্রকাশ: ০১:০৮ pm ০৩-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০১:০৮ pm ০৩-০৫-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


দ্রোণপর্বে, এটা একটা প্রায় নিত্তনৈমিত্তিক রুটিন ছিলো যে দুর্যোধন হয় সরাসরি না হয় অন্যদেরকে নিয়ে দ্রোণকে গালমন্দ করতেন। দুর্যোধন সারাক্ষনই দ্রোণের কাছে খেদোক্তি করতেন, নালিশ করতেন।

সেই মতন সকালেই তিনি সংশপ্তক সেনা দের নির্দেশ দিলেন দক্ষিন দিকে গিয়ে অর্জুনকে যুদ্ধে আহ্বান কর। এই সংসপ্তকেরা, জানেনই তো আসলে নারায়নী সেনা। এরা আমৃত্যু লড়াই করে, কখনই পালিয়ে যায় না।

আর মূল রণাঙ্গনে উনি চক্রব্যুহ স্থাপন করলেন। চক্রব্যুহ একটি গোলাকার ব্যুহ। পর পর আটটি বৃত্তাকারে সেনা সাজানো হয়। এর প্রবেশের পথ একটাই থাকে। সর্বতোভদ্রও এইরকমই, তবে সেটি বৃত্তাকার হয় আবার চতুর্ভুজও হয়। আর সেই ব্যুহতে একটার বদলে আটটা প্রবেশ পথ থাকে।

সেই ব্যুহের একমাত্র দ্বার মানে খোলা জায়্গায় রইলেন রাজকুমারেরা। এরা হচ্ছেন কৌরবদের একশো ভাইএর ছেলেরা। একমাত্র দুর্যোধনের ছেলে লক্ষণ আর দুঃশাসনের অনামা পুত্র এদের আলাদা ভাবে রাখা হয়েছিলো। বাকীরা যেনো নিতান্তই একটি ঝাঁক - যেমন হয় মৌমাছি বা পিঁপড়ের মতন। এই দশ হাজার রাজকুমার দুর্যোধন পুত্র লক্ষণের নেতৃত্বে একজোট হলেন। সকলেই পরেছিলেন রক্তবস্ত্র, রক্তমাল্য ও সঙ্গে ছিলো রক্ত পতাকা। সেই দ্বারের পিছনেই স্বয়ং দুর্যোধন, পাশে কর্ণ, কৃপ ও দুঃশাসন। খুব পরিষ্কার ভাবে লেখা নয় ,তাবে মনে হয় এর পরের লাইনে জয়দ্রথ যিনি "সৈন্যমধ্যে সুমেরু পর্ব্বতের ন্যায় স্থিরভাবে অবস্থান করিতে লাগিলেন"। তিরিশ জন কৌরব ভাই ছিলেন ওনার সাথে। শকুনি, শল্য, ভুরিশ্রবা এরাও রইলেন ওখানেই।

দ্রোণ ছিলেন ভ্যানগার্ড। তিনি এমনই পরাক্রমে লড়াই করতে শুরু করে দিলেন যে যাবতীয় পান্ডব বীর কিছুতেই দ্রোণকে এঁটে উঠতে পারছিলেন না। নিতান্ত কাহিল হয়ে যুধিষ্ঠির "কী উপায়" চিন্তা করতে লাগলেন। শেষটায় ধরলেন অভিমন্যুকেই। বললেন , দেখ, এই চক্রব্যুহ ভেদ করতে পারে ভূ ভারতে মাত্র চারজন। তুমি, অর্জুন, কৃষ্ণ আর প্রদ্যুম্ন। আর অর্জুন যেন ফিরে এসে আমাদের নিন্দা না করে। তুমিই বরং সৈন্য সামন্ত নিয়ে দ্রোণকে আটকাতে এগিয়ে যাও, নয়তো অর্জুন আমাদেরকেই দুষবে। আর তুমি কুরু সেনাদের বেষ্টনী ভেদ করে এগিয়ে গেলেই আমরা সদলবলে তোমার পিছনে পিছনে এসে ঐ ব্যুহ ধ্বংস করব। ভীমও সায় দিলেন। অভিমন্যুর কাজ শুধু কৌরবদের বেষ্টনী ভেদ করা, বাকীটা সবাই মিলে করে দেবে।

অভিমন্যু সারথিকে চালাও বলে আদেশ দিলে সারথি কিন্তু খুব খুশী হলেন না। বললেন, আপনার উপর বড় গুরুভার চাপানো হয়েছে। সারথি সুমিত্র বললেন "কারণ দ্রোণাচার্য যুদ্ধে সুনিপুণ, বিশেষতঃ তিনি উত্তম উত্তম অস্ত্রশিক্ষায় পরিশ্রম করিয়াছেন আর আপনি অত্যন্ত সুখে বৃদ্ধিলাভ করিয়াছেন আবার বালক বলিয়া যুদ্ধেও সেরূপ সুনিপুণ নহেন" এইসব বিবেচনা করেই যুদ্ধ করুন। অভিমন্যু হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, আমার সামনে এই দ্রোণ কে? সমস্ত ক্ষত্রিয়মন্ডলই বা কে?' আর এরা কোন ছাড়, বিপক্ষে যদি মামা কৃষ্ণ বা বাবা অর্জুনও থাকেন তাহলেও আমি ভয় পাবো না"।সারথি তখন "অতিশয় অসন্তুষ্ট মনে" দ্রোণের অভিমুখে রথ চালিয়ে নিয়ে গেলেন।

এরপরে অভিমন্যুর অভিযান। দ্রোণের দিকে কুড়ি পা যেতে না যেতেই কৌরব পক্ষ অভিমন্যুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন কিন্তু অভিমন্যু স্বচ্ছন্দেই দ্রোণের চোখের সামনে ব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়লেন। অন্যান্য রথীদের সাথে বাহ্লীক, কাম্বোজ, বনায়ু ও পার্বতীয় ঘোড়াদের সওয়ারী প্রাসধারী সেনারাও ছিলেন। মহাভারতকার তার সবিশেষ বর্ননা দিয়েছেন। বলেছেন ভাগীরথীর আবর্ত্ত সাগরে প্রবিষ্ট হলে যেরকম তুমুল হয়ে থাকে, সেই রকম দুই পক্ষের যোদ্ধাদের সংগ্রাম চলছিলো। সেই ভয়ানক সংগ্রাম দেখে কৌরব রাজপুত্রদের মুখ শুকিয়ে যাচ্ছিলো, তারা ভয়ে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠছিলেন। ক্রমে তারা নিহত আত্মীয় ও বন্ধুদের ছেড়ে পালাতে শুরু করলেন। অভিমন্যু চক্রব্যুহে প্রবেশ করলেন।

অভিমন্যুকে দেখে ছুটে এলেন দুর্যোধন। লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই। দ্রোণ প্রমাদ গুনে তার সেনাদের বললেন এখনই দুর্যোধনের কাছেই যাও আর "আপনাদের রাজাকে রক্ষা করুন"। সমবেত কৌরব রথীরা অতঃপর অভিমন্যুর কাছে থেকে দুর্যোধনকে নিয়ে পালিয়ে আসলেন।

অগত্যা সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে যাবতীয় কৌরব মহারথীরা অর্থাৎ দ্রোণ, অশ্বত্থামা, কৃপ, কর্ণ, কৃতবর্ম্মা, শকুনি, বৃহদ্বল (কোশলের রাজা), ভুরি, ভুরিশ্রবা, শল্য, পৌরব (পর্বত রাজ), বৃষসেন- এরা সবাই ছুটে এলেন। ভয়ানক যুদ্ধ চললো কিন্তু অভিমন্যুকে সামলানো যাচ্ছিলো না। কর্ণ যুদ্ধ করতে এসে গাঢ় বানবিদ্ধ হয়ে খুবই কাতর হয়ে পড়লেন। মামাদাদু শল্যও নিতান্ত আহত হলেন। শল্যের ছোটোভাইও যুদ্ধে নিহত হলেন।

তো মদ্রদেশীয় সেনারা তো রেগেই আগুন। তারা দল বেঁধে ছুটলেন বদলা নিতে। নিজের নিজের নাম, কুল আর বাসস্থান বলে (মানে আমাকে চিনে রাখো হে ছোকরা) তারা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কুরুক্ষেত্রের শেষ দিনেও শল্য মারা যাবার পর মদ্রদেশীয় সেনারা এরকম ক্ষেপে গেছিলো। "অদ্য জীবিতাবস্থায় আমাদের নিকট পরিত্রাণ পাইবে না" বলিয়া অভিমন্যুকে তর্জন করিতে লাগিল। অভিমন্যু এ শুনে একটু মুচকি হেসে ওদের কচুকাটা করতে লাগলেন।

সেই দুর্যোধন, ফের তার অনুযোগ শুরু করলেন। অন্য ভুপতিদের জড়ো করে তিনি বললেন যে দ্রোণ ইচ্ছে করেই অভিমন্যুকে খতম করছেন না। দুঃশাসন তখন বড়াই করে বললেন, কোন চিন্তা নেই। আমিই অভিমন্যুকে সংহার করতে চললাম। ফলাফল? সে আর বলার কী? অচিরাৎ দুঃশাসন আহত ও অবসৃত হলেন।

এইবারে অভিমন্যুর মোকাবেলায় এলেন কর্ণ। কিন্তু তিনিও পরাজিত হলেন। অভিমন্যু তার শরাসন ছিন্ন ও রথ ধ্বজ চুর্ণ করলেন। সমবেত পান্ডব সেনানীরা কর্ণের এরকম দুর্দশা দেখে চিৎকার করে, হাততালি দিয়ে অভিমন্যুকে উৎসাহ দিতে লাগলেন। কর্ণের এক ভাই (মানে পালক মা বাবা রাধা অধিরথের ছেলে, এই ভাইএর নাম উল্লেখ নেই, পরে অর্জুনের হাতে কর্ণের আরো তিন ভাইয়ের মৃত্যু হবে) অভিমন্যুকে তেড়ে এলেন ও অভিমন্যুকে বানবিদ্ধ করলেন। অভিমন্যু "কর্ণের ভ্রাতার শরে পীড়িত হইলেন দেখিয়া কৌরবগনের আহ্লাদের আর পরিসীমা রহিল না"। কিন্তু সেই "আহ্লাদ" ক্ষনস্থায়ী মাত্র কেননা এর পরেই অভিমন্যু কর্ণের ঐ ভাইয়ের মাথাটি কেটে ফেললেন। কর্ণও নিতান্ত আহত হয়ে "মহাবেগে রণস্থল হইতে প্রস্থান করিলেন"। একমাত্র জয়দ্রথই তখন তার সামনে।

জয়দ্রথের মুখোমুখী হয়ে পান্ডবেরা কেউই সুবিধে করতে পারছিলেন না। সবাই চেষ্টা করেছিলেন। যুধিষ্ঠির ভল্লাস্ত্রে জয়দ্রথের শরাসন ছিন্ন করলে তৎক্ষনাৎ জয়দ্রথ আরেকটি ধনুক গ্রহন করে যুধিষ্ঠিরকে তিন বানে বিদ্ধ করলেন। ভীমসেনও তিন ভল্লে জয়দ্রথের রথ ধ্বজ ও ধনুক কেটে ফেললে জয়দ্রথ নতুন ধনুক নিয়ে ভীমের ধনুক ছিন্ন ও ঘোড়াদের নিহত করলেন। অগত্যা ভীম সাত্যকির রথে উঠে বসলেন। চক্রব্যুহের দ্বারে বোধ হয় হাতীর পাল দিয়ে ব্যারিকেড করা হয়েছিলো কেনো না লেখা আছে যে "পুর্বে মহাবীর অভিমন্যু যোদ্ধাদিগের সহিত কৌরবপক্ষীয় অসংখ্য হস্তী সংহার করিয়া পান্ডবগনকে যে পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন" সেই পথে হাজির ছিলেন জয়দ্রথ। না, কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে নি। জয়দ্রথ নিজের বীরত্বেই পান্ডবদের রুখে দিয়েছিলেন।

মহাভারতকার বলেছেন যেই ভাবে অভিমন্যু একাই পুরো কৌরবদের নাস্তানাবুদ করছিল্লেন, জয়দ্রথও সেই ভাবে সমবেত পান্ডবদের রুখে দিয়েছিলেন। জয়দ্রথের উদ্দেশ্য একটাই। অভিমন্যু চক্রব্যুহের যে সেনাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন সেই "অভিমন্যুবিদারিত ব্যুহের পুরণ"।

এরমধ্যে অভিমন্যু কিন্তু যুদ্ধ করেই আরো গভীরে প্রবেশ করছেন। কৌরববীর বসাতীয়(এঁর কোনো পরিচয় নেই) আস্ফালন করে সামনে আসলে অভিমন্যুর তীর তার লৌহময় বর্ম ভেদ করে তার প্রাণনাশ করলো। কর্ণপুত্র বৃষসেনও যুদ্ধ করতে এসে সারথিশুন্য হলেন ও রণেভঙ্গ দিলেন।

আজকের দিনটাকে কুরুক্ষেত্রের "পুত্র দিবস" বলা যায়। সারা দিনের যুদ্ধে বার বারই বিভিন্ন রথী মহারথীদের ছেলেদের নাম উঠে এসেছে, যেন অভিমন্যুকে মোকাবেলা করতেই। কর্ণপুত্র বৃষসেন রণস্থল ছেড়ে যেতেই অভিমন্যুর মুখোমুখী হলেন শল্যপুত্র রুক্মরথ। কিন্তু তিনি দাঁড়াতেই পারলেন না। অচিরাৎ অভিমন্যু তার "সুন্দর ভ্রুশোভিত মস্তকছেদন করিয়া ক্ষিতিতলে নিপাতিত করিলেন"। অনেক রাজকুমারেরা এবারে অভিমন্যুকে একেবারে ঘিরে ফেললেন কিন্তু একশোজন কুমার অভিমন্যুর হাতে নিহত হলেন। দুর্যোধনও সংগ্রামে এসে আহত হলে তার ছেলে লক্ষণ এবার অভিমন্যুর সাথে সংগ্রামে। "পুত্রবৎসল রাজা দুর্যোধনও হাজির রইলেন। কিন্তু সেই "দুর্ধর্ষ, কুবেরপুত্র সদৃশ সুদর্শন" লক্ষণও প্রাণ হারালেন। অভিমন্যু তাকে আহ্বান করে বললেন হে লক্ষণ, তোমাকে পরলোকগমন করতে হবে। এইবার প্রাণভরে ইহলোক দেখে নেও, এই তোমায় যমালয়ে পাঠালাম, বলে সদ্য নির্মোকত্যাগী সর্পের মতন এক ভল্ল নিক্ষেপ করে লক্ষণের মাথাটি কেটে ফেললেন।

অভিমন্যু এইবার কর্ণীবানে কর্ণের কর্ণে আঘাত করলেন। এই অনুপ্রাসটি বহু পর্বেই বার বার উল্লেখ হয়েছে। যাই হোক, লক্ষণকে নিহত দেখে কৌরবপক্ষের ছয় মহারথী যার মধ্যে দ্রোণ ও কৃপ অর্জুনের এই দুই শিক্ষাগুরুও উপস্থিত ছিলেন। তারা অভিমুন্যকে ঘিরে ফেললেন। অভিমন্যু তাদের ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন জয়দ্রথের সেনাদের মধ্যে। সেখানে উপস্থিত ছিল কলিংগ ,নিষধেরা আর ক্রাথপুত্র ও তাদের সমবেত গজসৈন্য।। এই ক্রাথের নাম বার তিনেক উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু তিনি কোন দেশের রাজা বা বীর সেটা জানা নেই। ক্রাথপুত্রের নামও নেই। ক্রমে অভিমন্যু এই অনামা ক্রাথপুত্রকে যমালয়ে পাঠাবেন। তার হাতে আরো নিহত হবেন বৃক্ষারক, অশ্বকেতু, ও চন্দ্রকেতু। এই পর্বে এরকম বেশ কয়েকজন বীরেদের নাম উল্লেখ আছে কিন্তু তাদের পরিচয় মহাভারতে নেই। কৃপাচার্যর ঘোড়াগুলিকেও মেরে ফেললেন অভিমন্যু। অভিমন্যুর হাতে আরো নিহত হবেন কোশলের রাজা বৃহদ্বল , "কৌরবকুলের কীর্ত্তিবর্দ্ধন" বৃক্ষারক, মগধের অশ্বকেতু আর মাত্তিকাবত দেশীয় ভোজ। এই কোশলপতি বৃহদ্বল ছিলেন প্রথম যে ছয়জন মহারথী অভিমন্যুকে ঘিরে ধরেছিলেন তাদেরই অন্যতম। এই রাজা কর্ণিবানে অভিমন্যুর বুকে আঘাত করলে ক্রুদ্ধ অভিমন্যু কোশলরাজের ধনুক ছিন্ন ও সারথি ও অশ্বদের ভূপাতিত করেন। বৃহদ্বল অসি চর্ম নিয়ে ধেয়ে আসলে অভিমন্যু তাঁর বুকে তীর মেরে তাকে নিহত করেন।

কর্ণের ছয় জন মহাবলাক্রান্ত "সচিব"ও নিহত হবেন। রণক্ষেত্রে "সচিব" কথাটির উল্লেখ আর কোথাও পাই নি, মনে হয় ছয়জন সহকারী যারা কর্ণের পাশ্ব ও পৃষ্ঠরক্ষক ছিলেন। কর্ণও এঁটে উঠতে পারছিলেন না অভিমন্যুর মুখোমুখী। দুজনেই দু জনের তীরে ক্ষত বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে "পুষ্পিত কিংশুকতরুর ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন"।

অনামা দুঃশাসন তনয় বরং পাল্টা মার দিলেন অভিমন্যুর ঘোড়া সারথি ও স্বয়ং অভিমন্যুকেও শরবিদ্ধ করে। অভিমন্যু তাকে বললেন, তোমার বাবা একজন কাপুরুষ। আমার সাথে যুদ্ধ না করেই পালিয়ে গেছেন কিন্তু তুমি পরিত্রান পাবে না"।
এর কিছুক্ষন পরে, এই অনামা দুঃশাসন পুত্রের হতেই নিহত হবেন অভিমন্যু।

ইতিমধ্যে শকুনি ও যোগ দিলেন অশ্বত্থামা আর শল্যের সাথে। শল্য অচিরাৎ অভিমন্যুর "শরে জর্জরিত" হয়ে অব্সৃত হলেন। শকুনিও যথেষ্ট আহত হয়ে সটান চলে গেলেন দুর্যোধনের কাছে। বললেন, এই অভিমন্যুকে একাকী লড়াইতে সংহার করা অসম্ভব। আপনি বরং দ্রোণ ও কৃপের কাছে গিয়ে জেনে আসুন কী ভাবে অভিমন্যুকে আটকানো যায়। না হলে এ তো একাই আমাদের সকলকে এক এক করে সংহার করবে।

কর্ণ তখন দ্রোনের কাছে গেলেন। বললেন, নেহাৎ বীরদের যুদ্ধ ছেড়ে ছুড়ে চলে যাওয়া অনুচিত, তাই আমি "নিতান্ত নিপীড়িত”হয়েও যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছি। এক্ষনে কী উপায়। দ্রোণাচার্য্য খুবই তারিফ করলেন অভিমন্যুর শৌর্য্যের। বললেন, দেখেছো, ঐ কিশোর এতো দ্রুত শরনিক্ষেপ করছে যে শুধু ওর ধনুকটাই চোখে পড়ছে। আর জানালেন যে অভিমন্যুকে সরাসরি আক্রমন করে ফায়দা হবে না। ওকে ঘিরে ধরে ওর ঘোড়া রথ সারথিকে মেরে ফেলো, তবেই যুদ্ধ জিতবে। আভিধানিক অর্থে পার্ষ্ণি মানে পিছনদিক। অর্থাৎ এরা ছিলেন পৃষ্ঠরক্ষক রথী। দ্রোণ জানালেন পিছন থেকে আক্রমন করে অভিমন্যুর ঘোড়ার লাগাম ছিন্ন কর, তার পার্ষ্ণি সারথিদের নিহত করো আর ধনুকের জ্যা ছিন্ন কর, এর পরেই অভিমন্যুকে হারাতে পারবে।

ছয় জন "করুণরসশুন্য" মহারথী অতঃপর অভিমন্যুকে একই সাথে আক্রমন শুরু করলেন। মহাভারতকারের এই লড়াইয়ের বিবরণ খুবই সংক্ষিপ্ত। তাও যেটুকু ডিটেইলস পাওয়া যায়- পিছন দিক থেকে আক্রমন করা কর্ণের বানে ছিন্ন হল অভিমন্যুর ধনুক, ভোজের বানে নিহত হল তার ঘোড়ারা আর দুই পার্ষ্ণি সারথী যমালয়ে গেলো কৃপের বানে। অভিমন্যুর বাণে অশ্বত্থামা আহত হলে "পুত্রবৎসল" দ্রোণ ও "পিতার নিকট গমানার্থী" অশ্বত্থামা উভয়েই অভিমন্যুকে শরবিদ্ধ করলেন। কোশল রাজ বৃহদ্বল কর্ণী বানে অভিমন্যুর "বক্ষে তাড়না" করলে অভিমন্যুও বৃহদ্বলকে সারথীশুণ্য করলেন। 

অতঃপর রথহীন, ধনুর্বানহীন অভিমন্যু ঢাল তরোয়াল নিয়েই ভূমিতে পা রাখলেন। সমবেত মহারথীরা তখন একে একে তাকে নিরস্ত্র করতে লাগলেন। দ্রোণের নারাচে (লৌহময় ভারী তীর) ছিন্ন হল অভিমন্যুর মনিময় অসির মুষ্টিদেশ আর তার বর্ম্ম ছিন্ন হলো কর্ণের বানে।

অভিমন্যু চক্রাস্ত হাতে নিলেন। সারা মহাভারতে চক্রাস্ত নিয়ে যুদ্ধের এই একটিই বিবরণ রয়েছে। কিন্তু সমবেত বাণবর্ষণে সেই চক্রও খন্ড খন্ড হলে অভিমন্যু হাতে নিলেন গদা- এটাই তার শেষ অস্ত্র।

সেই গদা হাতে ভীষণ অভিমনুকে ছুটে আসতে দেখে অশ্বত্থামা তার রথের থেকে “তিন লম্ফে পলায়ন করিলেন"। অভিমন্যু তখনও সংহারী। তার গদার আঘাতে মারা যাবে গান্ধার রাজা কালিকেয় এবং আরো অনেক সেনানী। বহু তীরবিদ্ধ অভিমন্যুকে তখন সজারুর মতন দেখতে লাগছিলো। দুঃশাসন তনয়ের সাথে একক সংগ্রামে অভিমন্যু গদা দিয়ে চুর্ণ করলেন তার রথ ও অশ্বদের। এখন দুজনেই রণভুমে, দুজনের হাতেই গদা। পুরাকালে মহাদেব ও অন্ধক যেমন দুজনে দুজনকে প্রচন্ড গদাঘাত করেছিলেন সেইরকম দুই জনের ভয়ংকর গদাযুদ্ধ শুরু হল। অভিমন্যুর শেষ লড়াই কিন্তু এক ডুয়েল। এক সময়ে দুজনেই দুজনের আঘাতে মাটিতে আছড়ে পড়লেন কিন্তু দুঃশাসন তনয় "সত্বর অগ্রে সমুত্থিত হইয়া উত্তিষ্ঠমান" অভিমন্যুর মাথায় গদা দিয়ে মারলেন মোক্ষম আঘাত। আর তাতেই অভিমন্যুর মৃত্যু হল।

বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71