বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
কুরুক্ষেত্রে চৌদ্দতম দিনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা (পর্ব দুই)
প্রকাশ: ০৭:৪৭ pm ০৭-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৭:৪৭ pm ০৭-০৫-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


শ্রুতায়ুর পুত্র নিয়তায়ু এইবারে অর্জুনের প্রতিদ্বন্দী। তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন বঙ্গ ও কলিংগের সেনারা- হাতীর পিঠে। "তখন বঙ্গদেশীয় সহস্র সহস্র সুশিক্ষিত ক্রোধনস্বভাব গজারোহীরা" এবং অন্যান্য ভুপালগন রণাঙ্গনে। আরো ছিলেন বিকটবেশ, বিকটচক্ষু, আসুরিক মায়াভিজ্ঞ যবন (গ্রীক) পারদ, শক, বাহ্লীক (উত্তর ভারতের এক উপজাতি) ও প্রাগজ্যোতিষের (আসামের) ম্লেচ্ছগন। আরো ছিলো দার্ব্বাতিসার, দরদ ও পুন্ড্রদেশের (উত্তর বংগ) সেনানীরা। গুহবাসী পাহাড়িয়া উপজাতিরাও ছিলেন। এই ম্লেচ্ছরা ছিলো "মুন্ডিত,অর্ধমুন্ডিত,অপবিত্র, জটিলবক্ত্র"।

এই লড়াইও অর্জুন হেলায় জিতলেন। ষাট হাজার ঘোড়া আর দশ হাজার ক্ষত্রিয় বীর মারা গেলেন। এর পরের লড়াই অবন্তী দেশের (মালব) বিন্দ আর অনুবিন্দের সাথে। এই সময়ে কৃষ্ণ এতো দ্রুত রথ চালাচ্ছিলেন যে অর্জুনের নিক্ষিপ্ত বান মাটিতে পড়বার আগেই রথ সেটিকে অতিক্রম করে যাচ্ছিলো। আসলে বাসুদেবের চিন্তা ছিলো অযথা সময় যেন নষ্ট না হয়। কতক্ষনে জয়দ্রথের কাছে তিনি রথ নিয়ে যেতে পারবেন সেটাই তার প্রধান লক্ষ্য। অতো দ্রুত ছুটে ও শরাঘাতে আহত ঘোড়াগুলি খুবই হাঁফিয়ে গেছিলো। সেই ক্লান্ত বাহনদের দেখে বিন্দ আর অনুবিন্দ নামলেন যুদ্ধে। বড়োভাই বিন্দ অচিরেই প্রান হারালেন, ক্রুদ্ধ অনুবিন্দ ছুটে এসে গদা ঘুড়িয়ে মারলেন - হ্যাঁ, সেই কৃষ্ণকেই, তার কপালে। বাসুদেবের কিন্তু কোনো হেলদোল হোলো না, তিনি মৈনাক পর্বতের মতন অকম্পিত রইলেন। অতঃপর অর্জুনের শরাঘাতে অনুবিন্দ নিহত হলেন।

কেশব এবার ক্লান্ত ঘোড়াদের একটু বিশ্রাম দিলেন। জল খাওয়ালেন। মালিশ করলেন। গায়ে বিঁধে থাকা তীরের ফলাগুলি বার করলেন। তারপর উজ্জীবীত ঘোড়াদের নিয়ে রথে আবার জয়দ্রথের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। অর্জুনের ঘোড়া চারটি- নাম তাদের বলাহক, মেঘপুষ্প, শৈব্য ও সুগ্রীব- কিন্তু কুরুক্ষেত্রের আঠারো দিনই বেঁচে থাকবে। আর একজন রথীর ক্ষেত্রেও এরকম ঘটনা ঘটেনি। ঘোড়াদের নাম ও বিশেষ হতো না। অর্জুনের রথের ঘোড়ারা একেবারে ব্যতিক্রম।

বোধহয় কৃষ্ণ ও অর্জুন, এদের একটু বিশ্রাম দরকার ছিলো। চিন্তায় চিন্তায় কৃষ্ণ তো আগের রাত থেকেই জেগে। সহকারী দারুককে নির্দেশ দিয়েছিলেন্র রথে যেন অস্ত্র শস্ত্র সব গুছিয়ে রাখা হয়। এমন কি নিজের দিব্য গদা কৌমুদিকীকেও রথে রাখতে বলেছিলেন। জয়দ্রথ বধ না হলে কৃষ্ণ কী করতেন কে জানে!

কিছুক্ষন পরেই তারা জয়দ্রথের দেখা পেলেন। তারা "আমিষলোভী শ্যুনপক্ষীর ন্যায় বিক্রমপ্রকাশপুর্বক ক্রোধভরে সিন্ধুরাজের সমীপে গমন করিতে লাগিলেন"। এর আগে এক অধ্যায়ে একটি উল্লেখ দেখে মনে হয় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসছে। সময় বেশী নেই। জয়দ্রথকে পাহারা দিচ্ছেন দিব্যকবচধারী দুর্যোধন।

ফিরে আসি চুরানব্বইতম অধ্যায়ে। দ্রোণের প্রতি দুর্যোধনের অভিযোগ। দুর্যোধন চটে কাঁই। বললেন ,আপনার প্রতিশ্রুতি পেয়েই আমি জয়দ্রথকে বাড়ী পাঠাই নি, এখন কতই সহজে অর্জুন ব্যুহ মধ্যে ঢুকে গেলো। আমাদের আশ্রয়েই আপনি জীবিকা নির্বাহ করে আমাদেরই অপকারে আপনি প্রবৃত্ত হয়েছেন। খুবই কড়া কথা। দ্রোণ বললেন, অর্জুনের রথ অত্যন্ত দ্রুতগামী। একবার ফাঁক পেয়েই ব্যুহ মধ্যে ঢুকে গেছে। আর আমার ও বয়স হয়েছে্ অতো আর ছুটতে পারি না। তাছাড়া আমি তো বলেই ছিলাম যুধিষ্ঠিরকে বন্দী করাও আমার একটা উদ্দেশ্য। সেই সব ছেড়ে আমি ব্যুহের দ্বার ফেলে রেখে যাই কী করে? এরপর দ্রোণ একটি সুক্ষ্ণ চাল চাললেন। দ্রোণ বললেন, মহারাজ, আপনিই বা কম কিসে? আপনি জগতের পতি। আপনিই যান না। অর্জুনকে ঠেকান।। তখন দুর্যোধন খুব স্তুতি করলে দ্রোণ সন্তুষ্ট হয়ে মন্ত্র টন্ত্র পরে দুর্যোধনের গায়ে এক অজেয় কবচ এঁটে দিলেন।

অর্জুনের সাথে দ্রোণের প্রথম লড়াইএর পর তার মুখোমুখী হল ধৃষ্টদ্যুম্ন। দুজনেই লড়াই করলেন মহাবিক্রমে। সমানে সমানে। উল্লেখযোগ্য যে রচনাকার ধৃষ্টদ্যুম্নের তরোয়ালের সাথে তুলনা করেছেন মৌর্ব্বী বিদ্যুতের, ঝোড়ো হাওয়ার সাথে, মেঘ গর্জনের সাথে। মহাভারতের প্রথম সারির নায়কেরা তরোয়াল নিয়ে ক্বচিৎ যুদ্ধ করেছেন। ঘোড়ার পিঠে চড়ার মতন হাতে তলোয়ার নিয়ে লড়াইটাও খুব রাজোচিত ছিলো না।

আরেকটি ঘটনা, দ্রোণাচার্য তার সেনাদের ঠিক মতন সংযুক্ত করতে পারছিলেন না। তিনি বারবার যত্ন নিলেও কৌরব সেনারা  বিভক্ত হয়ে যাচ্ছিলো। কিছু গেলো ভোজরাজের কাছে, কিছু জলসন্ধের কাছে, বাকীরা দ্রোণের কাছেই থেকে গেলেন। যেন কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেই। তিনি যতোই চেষ্টা করছেন সেনাদের সংহত করতে ততবারই বিফল হছেন ধৃষ্টদ্যুম্নের কৌশলে। বিভক্ত কৌরব সেনারা কচুকাটা হচ্ছিলো।

এটি গুরুত্বপুর্ণ এই কারনে যে মহাভারতে সাধারন সেনানীদের কথা প্রায় উল্লেখই হত না। তবে এই দিনে কৌরব সেনাদের এরকম বিশৃঙ্খল অবস্থা বোধ হয় ঘটেছিলো, কেননা তাদের সব মহারথীরাই খুব রক্ষণাত্মক লড়াইতে ব্যুহের মধ্যে নিশ্চল হয়ে শুধু প্রতিরক্ষীর ভুমিকায় ছিলেন। দিনের শেষে যখন অর্জুন জয়দ্রথের মুখোমুখী তখনই তার আসরে নেমে যুদ্ধে অংশ নিলেন। তুলনায় পান্ডবেরা ছিলো আক্রমণাত্মক। অর্জুনের সাথেও যুধামন্যু আর উত্তমৌজা ছাড়া সাহায্যকারী কেউ ছিলেন না।

এরমধ্যে আবার ভীমসেন হাজির। তাকে আটকাতে এলেন বিন্দ আর অনুবিন্দ (এর কিছু পরেই এই দুই ভাই অর্জুনের হাতে নিহত হবেন)। আরো এলেন তিন ধৃতরাষ্ট্র তনয় - বিবংশতি, চিত্রসেন ও বিকর্ন। এই সেই বিকর্ন যিনি সব সময়েই পান্ডবদের পক্ষে সওয়াল করেছেন নির্ভয়ে। খুব সংকুল যুদ্ধ শুরু হল। পান্ডবেরা চাইছেন অর্জুনকে সাহায্য করতে ব্যুহের ভিতরে ঢুকতে -আর কৌরবেরা তাদের আটকাচ্ছেন।

প্রবল লড়াই শুরু হল। দুই পক্ষের তাবৎ রথী মহারথীরা পরষ্পরের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলেন। তবে এই লড়াইএর নায়ক ছিলেন সাত্যকি। যদুবংশের রাজা শিনির পৌত্র। কৃষ্ণের সারথ্য করেছেন কখনো আর ছিলেন অর্জুনের শিষ্য।

দ্রোণের সাথে ধৃষ্টদ্যুম্নের লড়াইতে আবার ফিরে আসি। প্রথমটায় চমক দিলেও শেষ পর্যন্ত্য অভিজ্ঞতার কাছে হার মানলো তারুণ্য। দুজনের রথ একেবারে এ ওর ঘাড়ে এসে পরলে ধৃষ্টদ্যুম্ন ধনুক ছেড়ে তলোয়ার হাতে দ্রোণের ঘোড়ার উপর লাফিয়ে, কখনো রথের চূড়ায় উঠে, কখনো ঘোড়াদের পিছনে রথদন্ডের উপর দাঁড়িয়ে দ্রোণকে আক্রমন করলেন। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হল। দ্রোণ তার অসি, ঢাল, ঘোড়া ও রথ সবই ছিন্ন ভিন্ন করে দিলেন। অবস্থা সঙ্গীন দেখে সাত্যকি ছুটে এসে ধৃষ্টদ্যুম্নকে নিজের রথে তুলে নিয়ে পালিয়ে গেলেন।

দ্রোণের সাথে সাত্যকির তুমুল লড়াই শুরু হল। "ঐ মহারথদ্বয়ের শরজালে আকাশমার্গ ও দশদিক সমাচ্ছন্ন হইলো।" সেই ভয়ানক যুদ্ধ দেখতে অন্য যোদ্ধারা তাদের লড়াই বন্ধ করলেন। যাবতীয় রথী, গজারোহী, অশ্বারোহী ও পদাতিরা এই দ্বৈরথের চারিদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে অনিমেষ নয়নে এই লড়াই দেখতে লাগলেন। প্রথম রাউন্ডে সাত্যকিরই জয়। তিনি আচার্য্যের ধনুক ষোলোবার ছিন্ন করলেন। দ্রোণ চিন্তা করলেন পরশুরাম, কার্তবীর্য ও ভীষ্মের মতন সাত্যকিও সমান বীর। দ্রোণ দিব্য আগ্নেয়াস্ত্র গ্রহন করলে সাত্যকিও দিব্য বারুণাস্ত্র গ্রহন করলেন।

বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71