সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৯ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
কেমন ছিল স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের শেষ দিনটি?
প্রকাশ: ০৬:৩০ pm ০৬-০৭-২০১৮ হালনাগাদ: ০৬:৩০ pm ০৬-০৭-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


১৯০২ - এর ২রা জুলাই | মহাপ্রয়াণের দু-দিন আগে | নিবেদিতাকে নেমন্তন্ন করলেন বিবেকানন্দ |
খাওয়ালেন কাঁঠালের বিচিসিদ্ধ, আলুসিদ্ধ, সাদা ভাত, বরফ দিয়ে ঠান্ডা করা দুধ | খাবার সময় কত কৌতুক আর মজা করে গল্প করলেন বিবেকানন্দ ! খাওয়ার পরে, নিবেদিতা প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও, কী গভীর স্নেহে তাঁর হাত ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিলেন |
- এ কী করলেন আপনি, এ তো আমার করা উচিত আপনাকে !
বললেন বিস্মিত নিবেদিতা |
- ক্রাইস্ট তো শিষ্যদের পা ধুয়ে দিয়েছিলেন, উত্তর দিলেন বিবেকানন্দ |
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে নিবেদিতা বললেন, কিন্তু সে তো শেষ সময়ে |
বিবেকানন্দ হেসে বললেন, ইউ সিলি গার্ল।

১৯০২ - এর ৪ঠা জুলাই |ভোরবেলা ঘুম ভাঙল বিবেকানন্দের | তাকালেন ক্যালেন্ডারের দিকে |আজই তো সেইদিন |
আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস | আর আমার দেহত্যাগের দিন | মা ভুবনেশ্বরীর মুখটি মনে পড়ল তাঁর | ধ্যান করলেন সেই দয়াময়, প্রসন্ন মুখটি | বুকের মধ্যে অনুভব করলেন নিবিড় বেদনা | তারপর সেই বিচ্ছেদবেদনার সব ছায়া সরে গেল |
ভারী উত্ফুল্ল বোধ করলেন বিবেকানন্দ | তাঁর মনে আজ নতুন আনন্দ | তাঁর শরীরে আজ নতুন শক্তি | তিনি অনুভব করলেন তাঁর সব অসুখ সেরে গেছে | শরীরে আর কোনও কষ্ট নেই | বিবেকানন্দ ডুবে গেলেন ধ্যানমগ্ন উপাসনায় |উপাসনার পরে গুরুভাইয়ের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করতে-করতে সামান্য ফল আর গরম দুধ খেলেন | বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ প্রেমানন্দকে ডেকে বললেন, আমার পূজার আসন কর ঠাকুরের পূজাগৃহে | সকাল সাড়ে নটায় স্বামী প্রেমানন্দও সেখানে এলেন পূজা করতে | বিবেকানন্দ একা হতে চান |প্রেমানন্দকে বললেন, আমার ধ্যানের আসনটা ঠাকুরের শয়নঘরে পেতে দে |এখন আমি সেখানে বসেই ধ্যান করব | অন্যদিন বিবেকানন্দ পুজোর ঘরে বসেই ধ্যান করেন | আজ ঠাকুরের শয়নঘরে প্রেমানন্দ পেতে দিলেন তাঁর ধ্যানের আসন |

ধ্যানে বসেছেন বিবেকানন্দ |
ধ্যানের মধ্যে তাঁর মনে হল, তিনি ঘরে একা নন ঘরে এত আলো কেন ?এ যে একেবারে আলোর সমুদ্র | আলোর ঢেউ |সেই আলোরই একটি ঢেউ শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ ধরে সামনে দাঁড়িয়ে |শ্রীরামকৃষ্ণের এ কীঅপরূপ রূপ !বিবেকানন্দ ধ্যানের মধ্যে বলে ওঠেন, ঠাকুর ! তুমি এসেছো !শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে সেই হাসি, সেই আনন্দ |বিবেকানন্দের বুকের মধ্যে ধ্বনিত হল শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠস্বর |নরেন, আমি এসেছি, তোকে এইটুকু জানাতে, তোর কাজ ফুরিয়েছে |আর কোনও কাজ বাকি নেই নরেন |নরেন, আমি জানি, তোর মনে পড়ে গেছে তুই কে, কোথা থেকে এসেছিস মর্ত্যধামে, কার কাজে তুই পৃথিবীতে এসেছিস, সব এখন জানিস তুই | তোর সব মোহ-আবরণ ক্ষয় হয়েছে নরেন | আমিই তো তোকে ডেকেছিলুম পৃথিবীতে | এবার আমিই তোর বিদায়ের দরজা খুলে দিলুম | তোর ইচ্ছামৃত্যু নরেন | আর দেরি করিসনি | এবার ফিরে আয় | দরজাটুকু পার হলেই দেখবি আমি দাঁড়িয়ে আছি তোর জন্যে | তোকে ছেড়ে আর যে থাকতে পারছিনি রে !

বেলা ১১টা পর্যন্ত ধ্যান করলেন বিবেকানন্দ |
তারপর মন্দির প্রাঙ্গণে পায়চারি করছেন আর গাইছেন:
মা কি আমার কালো ? কালোরূপা এলোকেশী হৃদিপদ্ম করে আলো |
স্বামীজি গান গাইছেন | পিছনেই প্রেমানন্দ | বিবেকানন্দ হেসে বললেন, তাড়াতাড়ি আজ খাওয়াদাওয়া সেরে নে | আজ আমি নিজের ঘরে একলা খাচ্ছিনে | সবার সঙ্গে খেতে বসব | সকালবেলা বেলুড়ঘাটে জেলের নৌকো ভিড়েছিল | নৌকো ভর্তি গঙ্গার ইলিশ | বিবেকানন্দ মহা উত্সাহে ইলিশ কিনিয়েছেন | তাঁরই আদেশে রান্না হয়েছে ইলিশের নানারকম পদ | গুরুভাইদের সঙ্গে মহানন্দে ইলিশভক্ষণে বসলেন বিবেকানন্দ |তিনি জানেন আরও মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ |ডাক্তারের বারণ শুনে চলার আর প্রয়োজন নেই |তিনি পেটভরে খেলেন ইলিশের ঝোল, ইলিশের অম্বল, ইলিশ ভাজা |

দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিলেন বিবেকানন্দ | তারপর প্রেমানন্দকে বললেন, সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ | চল একটু পড়াশোনা করা যাক |বিবেকানন্দ শুদ্ধানন্দকে বললেন, লাইব্রেরি থেকে শুক্লযজুর্বেদটি নিয়ে আয় |তারপর হঠাত্ বললেন, এই বেদের মহীধরকৃতভাষ্য আমার মনে লাগে না |আমাদের দেহের অভ্যন্তরে মেরুদণ্ডের মধ্যস্থ শিরাগুচ্ছে, ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী যে সুষুন্মা নাড়িটি রয়েছে, তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আছে তন্ত্রশাস্ত্রে | আর এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনার প্রাথমিক বীজটি নিহিত আছে বৈদিক মন্ত্রের গভীর সংকেতে | মহীধর সেটি ধরতে পারেননি |বিবেকানন্দ এইটুকু বলেই থামলেন |কেউ ধরতেও পারলেন না, বিবেকানন্দের মন ইতিমধ্যেই ভাবতে শুরু করেছে মেরুদণ্ড-সংলগ্ন কুলকুণ্ডলিনী - শক্তিকে জাগিয়েতাকে শরীরের অভ্যন্তরে ষঢ়চক্র ভেদ করিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেবার কথা !এরপর বিবেকানন্দ প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ব্যাকরণ চর্চা করলেন ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে |তিনি পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলি নানারকম মজার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন |ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্লাস হাসির হুল্লোড়ে পরিণত হল |বিকেল হয়েছে |প্রেমানন্দকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছেন বিবেকানন্দ |হাঁটতে-হাঁটতে একেবারে বেলুড়বাজার পর্যন্ত বেরিয়ে আসলেন |কোনও কষ্টই আজ আর অনুভব করলেন না |বুকে এতটুকু হাঁফ ধরল না |

সন্ধেবেলা |
মঠে ফিরে এসেছেন বিবেকানন্দ |গঙ্গাঁর ধারে আমগাছের তলায় একটি বেঞ্চি পাতা |সেখানে তামাক খেতে খেতে আড্ডায় বসলেন বিবেকানন্দ |সন্ন্যাসীরা কজনে মিলে চা খাচ্ছেন |স্বামীজিও চা চাইলেন |সন্ধে সাতটা |শুরু হল সন্ধ্যারতি |আর দেরি নয় |শরীরটাকে এবার জীর্ণবস্ত্রের মতো ত্যাগ করতে হবে -বিবেকানন্দ প্রস্তুত |তিনি তরুণ ব্রহ্মচারী ব্রজেন্দ্রকে নিয়ে নিজের ঘরে এলেন |বললেন, আমাকে দু - ছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর্ |আমি না ডাকলে আসবি না |

স্বামীজি ধ্যানে বসলেন |
তাঁর দেহের মধ্যে, মেরুদণ্ডের প্রান্তে, মূলাধার পদ্মে তিনটি বেষ্টনে অধোমুখে বিরাজিত পরমাশক্তি কুলকুণ্ডলিনী |
সেই কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করতে চলেছেন বিবেকানন্দ | সেই পরমাশক্তিকে প্রথমে ধীরে ধীরে বেষ্টন - মুক্ত করলেন তিনি |
তারপর তাঁকে করলেন ঊর্ধ্বমুখ |বিবেকানন্দের সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে গেছে |তাঁর মধ্যে জাগ্রত হয়েছে এক প্রবল শক্তি |সেই সদ্যজাগ্রত বেষ্টনমুক্ত ঊর্ধ্বমুখ ভয়ংকর কুলকুণ্ডলিনীকে মেরুদণ্ড দিয়ে আরোহী করালেন বিবেকানন্দ |মেরুদণ্ড বেয়ে সাপের মতো উঠতে লাগল কুণ্ডলিনী |বিবেকানন্দ চাইছেন সেই প্রবল শক্তিকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দিতে |বাধা দিচ্ছে তাঁর শরীরের ষঢ়চক্র |সেই সব বাধা বিবেকানন্দ যোগবলে অতিক্রম করলেন |ভয়ংকর কুলকুণ্ডলিনী ধীরে ধীরে প্রবিষ্ট হল বিবেকানন্দের মস্তিষ্কে |এরপর আর ফেরার পথ বন্ধ ।শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যেদিন নরেন বুঝবে ওর কাজ শেষ হয়েছে, সেদিন ও যোগবলে নিজের মুক্তির পথ খুঁজে পাবে |জাগ্রত কুণ্ডলিনী মেরুদণ্ড দিয়ে সাপের মতো উঠে গিয়ে বিবেকানন্দের মস্তিষ্কে যা ঘটাবার তাই ঘটিয়ে দিল |বিবেকানন্দ ধ্যানের মধ্যে দেখতে পেলেন, খুলে গেছে তাঁর আলোকময় মহাপ্রস্থানের পথ |বললেন, দরজা-জানালা সব খুলে দে |মেঝেতে বিছানা পাতা |সেখানে শুয়ে পড়লেন বিবেকানন্দ | হাতে তাঁর জপের মালা | ব্রজেন্দ্র বাতাস করছেন | বিবেকানন্দ বললেন, আর বাতাস করিসনি | একটু পা টিপে দে | 

রাত ঠিক নটা |
বাঁ পাশ ফিরলেন বিবেকানন্দ | তাঁর ডান হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল | কুণ্ডলিনীর শেষ ছোবল | শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন বিবেকানন্দ | তারপর একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস | মাথাটা বালিশ থেকে পড়ে গেল | চোখের দুটি তারা চলে এল ভুরুর মাঝখানে | চোখ দুটি ক্রমশ রাঙিয়ে উঠল | ভিতরে রক্ত ঝরেছে | নাকের কোণে রক্তের ফোঁটা |ঠোঁটের কোণে রক্ত | তারপর ক্রমে দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিবেকানন্দের সারা অঙ্গ |

বিবেকানন্দ বলেছিলেন তাঁর মৃত্যুদিন ৪ঠা জুলাই | আর তাঁর বয়েস চল্লিশ পেরবে না | তাঁর বয়েস ঠিক ঊনচল্লিশ বছর, পাঁচ মাস, পঁচিশ দিন | পরের দিন ভোরবেলা |একটি সুন্দর গালিচার ওপর শায়িত দিব্যভাবদীপ্ত, বিভূতি-বিভূষিত, বিবেকানন্দ | তাঁর মাথায় ফুলের মুকুট | তাঁর পরনে নবরঞ্জিত গৈরিক বসন | তাঁর প্রসারিত ডান হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি | তাঁর চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ, অর্ধনিমীলিত, অন্তর্মুখী, অক্ষিতারা | নিবেদিতা ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন | স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন | তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে নীরব অজস্র অশ্রুধারা |

স্বামীজির মাথা পশ্চিমদিকে | পা-দুখানি পুবে, গঙ্গার দিকে | শায়িত বিবেকানন্দের পাশেই নিবেদিতাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সেই গুরুগতপ্রাণা, ত্যাগতিতিক্ষানুরাগিণী বিদেশিনী তপস্বিনীর হৃদয় যেন গলে পড়ছে সহস্রধারে | আজকের ভোরবেলাটি তাঁর কাছে বহন করে এনেছে বিশুদ্ধ বেদনা |
অসীম ব্যথার পবিত্র পাবকে জ্বলছেন, পুড়ছেন তিনি |
এই বেদনার সমুদ্রে তিনি একা |
নির্জনবাসিনী নিবেদিতা | বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায় | আর তখুনি সেখানে এসে পৌঁছলেন জননী ভুবনেশ্বরী | চিত্কার করে কাঁদতে- কাঁদতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে | কী হল আমার নরেনের ? হঠাত্ চলে গেল কেন ? ফিরে আয় নরেন, ফিরে আয় | আমাকে ছেড়ে যাসনি বাবা | আমি কী নিয়ে থাকব নরেন ? ফিরে আয় | ফিরে আয় | সন্ন্যাসীরা তাঁকে কী যেন বোঝালেন | তারপর তাঁকে তুলে দিলেন নৌকায় | জ্বলে উঠল বিবেকানন্দের চিতা | মাঝগঙ্গা থেকে তখনো ভেসে আসছে ভুবনেশ্বরীর বুকফাটা কান্না | ফিরে আয় নরেন ফিরে আয় | ভুবনেশ্বরীর নৌকো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল | তাঁর কান্না, ফিরে আয় নরেন, ফিরে আয়, ভেসে থাকল গঙ্গার বুকে |
নিবেদিতা মনে মনে ভাবলেন, প্রভুর ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ডের এক টুকরো যদি পেতাম !

সন্ধে ছটা |
দাহকার্য সম্পন্ন হল | আর নিবেদিতা অনুভব করলেন, কে যেন তাঁর জামার হাতায় টান দিল | তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন, অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে, ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি, সেখানেই উড়ে এসে পড়ল ততটুকু জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড যতটুকু তিনি প্রার্থনা করেছিলেন | নিবেদিতার মনে হল, মহাসমাধির ওপার থেকে উড়ে-আসা এই বহ্নিমান পবিত্র বস্ত্রখণ্ড তাঁর প্রভুর, তাঁর প্রাণসখার শেষ চিঠি |


বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71