মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
ক্ষমা করো বিশ্বজিৎ
প্রকাশ: ০৪:২৫ pm ০৮-০৮-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:২৫ pm ০৮-০৮-২০১৭
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


প্রভাষ আমির

বিশ্বজিৎ দাসের বাবা অনন্ত কুমার দাস, মা কল্পনা দাস, ভাই উত্তম কুমার দাসের চোখের জল শুকায় না। পাঁচ বছর ধরে তারা কাঁদছেন। হয়তো যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিনই কাঁদবেন। ন্যায়বিচার হয়তো তাদের সে শোকে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিতে পারতো। কিন্তু হয়নি। হাইকোর্টের রায়ের পর তাদের শোকের সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষোভ, হতাশা। ক্ষোভ-হতাশা শুধু বিশ্বজিতের পরিবারের নয়।

বিশ্বজিতের খুনীদের ন্যায়বিচারের আশায় অপেক্ষায় ছিল গোটা বাংলাদেশ। হতাশ হয়েছে সবাই। বিশ্বজিৎ দাস সামান্য একজন দর্জি দোকানের কর্মচারি ছিলেন। জীবিকার খোঁজে ঢাকায় আসা অতি সাধারণ ঘরের ছেলে। রাজনীতির সাথে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু সেই বিশ্বজিতকেই জীবন দিতে হয়েছিল রাজনৈতিক নিষ্ঠুরতায়।

বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে দুপুরে খুন হন বিশ্বজিৎ দাস। অসংখ্য মানুষ আর ক্যামেরার সামনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা কুপিয়ে খুন করে বিশ্বজিতকে। কারা কারা বিশ্বজিতকে খুন করেছে, তা সারা বাংলাদেশের সবাই জানে, অন্তত চেনে। সব টেলিভিশনে এবং পত্রিকায় তাদের ছবি ছাপা হয়েছে। বিশ্বজিতের খুনীদের বিচারের দাবিতে প্রবল জনমত গড়ে ওঠে দেশে-বিদেশে।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা বলে বিচার নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। কিন্তু সব সংশয় উড়িয়ে দিয়ে বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিচারিক আদালত ২১ আসামীর মধ্যে ৮ জনের ফাঁসি এবং ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ রায়ে তখন সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। কিন্তু হাইকোর্টের রায়ে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ৮ জনের মধ্যে মাত্র ২ জনের দণ্ড বহাল আছে, ৪ জনকে ফাঁসি কমিয়ে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়া হয়েছে। আর ২ জন পেয়েছে বেকসুর খালাস।

শেষ পর্যন্ত মাত্র ২ জনের ফাঁসির আদেশ হতাশ করেছে সবাইকে। শত শত মানুষ যা নিজের চোখে দেখলো, টেলিভিশনে দেশে-বিদেশের কোটি মানুষ যা দেখলো; আর আদালত দেখলো না। টেলিভিশন আর পত্রিকায় ছাপা ছবি দেখলে যে কেউ খুনীদের চিহ্নিত করতে পারবেন। কিন্তু আদালতের চোখ বাধা, তারা সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া বিচার করতে পারেন না।

আইনের খুটিনাটি জানি না। কিন্তু নিম্ন আদালতের রায়ের সাথে উচ্চ আদালতের রায়ের এত ফারাক হলো কী করে? নিম্ন আদালত তাহলে কী দেখে ৮ জনের ফাঁসি দিলো? আমি বলছি না, জন আবেগের কথা বিবেচনা করে আদালত রায় দেবেন। কিন্তু সারা বাংলাদেশ যেটা দেখলো, সে মামলায়ও যদি প্রমাণের অভাবে খুনীরা ছাড়া পেয়ে যায়, তাহলে অন্য মামলায় কী হবে?

যারা এর জন্য দায়ী তাদের কী বিচার হবে না। হাইকোর্ট অবশ্য বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন যিনি তৈরি করেছিলেন সূত্রাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুল হকের দায়িত্বে অবহেলা ও পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছে।

একই সঙ্গে বিশ্বজিতের লাশের ময়নাতদন্তকারী সলিমউল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের তখনকার সহকারী অধ্যাপক মো. মাকসুদের পেশাগত অসদাচরণ হয়েছে কি না, তা-ও তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বজিতের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যে একটি গুরুতর আঘাতের কথা উল্লেখ আছে, এর সঙ্গে সাক্ষ্য, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, ভিডিও ফুটেজ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় আদালতের কাছে ওই প্রতিবেদন দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে।

এটা এখন স্পষ্ট আসামীদের বাঁচিয়ে দিতে ইচ্ছা করেই পুলিশ এবং ডাক্তার সুরতহাল ও ময়নাতদন্তে ভুল করেছিলেন। হাইকোর্টের রায়ের পরও অবশ্য সব শেষ হয়ে যায়নি। আপিল করার সুযোগ আছে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার স্বার্থেই দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ ও ডাক্তার অপরাধীদের বাঁচিয়ে দিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ রিপোর্ট বানিয়েছে, তাদের খুজেঁ বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

শুরুতে সবার শঙ্কা ছিল, যেহেতু অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, তাই বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার বিচার হবে না। নিম্ন আদালতের রায় সে শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে। ছাত্রলীগ আইনের উর্ধ্বে নয়, সেটা প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগের দুই নেতার ফাঁসির রায় বহাল আছে, এতে আত্মপ্রসাদের সুযোগ নেই।

৬ জনের সাজা যে কমে গেল, বিবেচনায় নিতে হবে সেটাও। নইলে বিশ্বজিতের আত্মা আমাদের ক্ষমা করবে না। হা্ইকোর্টের রায়ে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কিছু বিপথগামী তরুণের কারণে ছাত্ররাজনীতি তার জৌলুস হারিয়ে দূষিত হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, ওপরের সারির কিছু নেতা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে থাকেন। আসল সমস্যাটা এখানেই।

ছাত্র রাজনীতির নামে আমরা যে দানব বানিয়েছি, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে বিশ্বজিতের মত আরো অনেক নিরীহ মানুষকেই জীবন দিতে হবে। তবে এই ছাত্রদের দানব বানানোর দায় অবশ্যই নেতাদের, যারা তাদের প্রশ্রয় দেন। ছাত্র রাজনীতি ঠিক করতে হলে, বিশ্বজিৎ হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

যাদের সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখেছেন, চেনে; তারা যদি আইনের ফাঁক গলে ছাড় পেয়ে যায়; তাহলে আইন-আদালত সম্পর্কে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করার স্বার্থেই ছাত্রলীগ হোক আর যেই হোক অপরাধীরা যেন সাজা পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

নি এম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71